একজন মডেল আত্মহত্যা করেছেন। আজ একটি প্রথম সারির বাংলা সংবাদপত্রের
খবর - আত্মীয় গিয়ে দেখেন সে ঝুলছে। নাকের থেকে তরল বেরিয়ে এসেছে। ঘরে এসি না থাকাতেও
যা শুকিয়ে গেছে। চোখ সাধারণত বাইরে ঠিকরে বেরিয়ে আসে। এর বেলায় বেরোয়নি। এই সময়ে সাধারণত
প্রস্রাব বেরিয়ে আসে। সেটাও বেরিয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না কারণ সে গাঢ় রঙের পায়জামা
পরেছিল।
আমাদের উপর কি তদন্তের দায় পড়েছে?
আমাদের এত ডিটেলসের দরকার কি? একজন মৃত মানুষের কি কোনো মর্যাদা রাখা যায় না? নাকি
আমাদের বিনোদনের জন্য সবটুকুকে ত্যাগ করে দিতে হবে?
এরকম সংবাদ আজ বলে না, এটাই এখন সংবাদ
পরিবেশনের রীতি। আরো নোংরা, আরো কুরুচিকরভাবে লেখা হচ্ছে। আমি আটকে যাচ্ছি আরেক ভাবনায়।
সেটার জন্যেই লেখা।
একটা সময়ে আমিও বিশ্বাস করতাম শিক্ষা
আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। শিক্ষার মাধ্যমেই এই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। ইত্যাদি
ইত্যাদি স্লোগান, কি বাণীতে আমারও আস্থা ছিল। দিন দিন কমছে।
এই ধরণের সংবাদ যিনি লিখছেন, যারা
পড়ছেন তারা কি কেউ অশিক্ষিত? নিশ্চয় নয়। স্কুলে কলেজে শিক্ষা নিয়ে যে দুর্নীতি সারা
বিশ্বজুড়ে চলছে, সেও কি নতুন? তাও নয়। তবে? প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে গবেষণা স্তর
অবধি দুর্নীতিতে আক্রান্ত। দেখছি। পড়ছি। কিন্তু কেন?
এক সময় ধর্মের উপর মানুষ নির্ভর করেছিল।
ধর্ম ভালো মানুষ বানাবে, এমন বিশ্বাস ছিল। ধর্ম যা ধারণ করে ইত্যাদি। কিন্তু ধর্ম যে
আদতে কাউকে ভালো মানুষ বানায় না সেটা যত দিন গেল তত স্পষ্ট হল। তখন ধর্মের প্রচারের
থেকে শিক্ষার দিকে ঝোঁক গেল। শিক্ষা নানা কুসংস্কার দূর করবে এই হল কথা। করলও। এখন
কেউ আর সূর্যকে দেবতা জানে না, ঝড়বৃষ্টি দেবতার ইচ্ছায় হচ্ছে বিশ্বাস করে না ইত্যাদি
ইত্যাদি।
কিন্তু কথা হচ্ছে এই কুসংস্কার সরিয়ে,
সারা পৃথিবীর বস্তুজ্ঞান, শরীর, মন বিষয়ক নিঁখুত জ্ঞানের পরও কি আমরা বাসযোগ্য পৃথিবীতে
বাস করছি? প্রযুক্তি যত উন্নতি হচ্ছে জালিয়াতি তত কৌশলী হচ্ছে। আগে ডাকাত পড়ত। এখন
একটা ওটিপিতে কি আর কিছু উপায়ে মুহূর্তে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন নিজেদের
হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠছে। পাসওয়ার্ডের পর পাসওয়ার্ড জমেই উঠছে। তবে
উপায় কি?
এইখানেই প্রশ্নটা ভাবায় রাতদিন। আপেল
কেন মাটিতে পড়ে, গাছের পাতায় কি করে খাদ্য উৎপাদন হয়, বা অঙ্কের জটিল সমীকরণ, কি ভৌগলিক
কি ঐতিহাসিক জ্ঞান - আদৌ কি মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটাতে পারে? কোনো তথ্য, কোনো নিখুঁত
বিশ্লেষণ, কোনো কৌশল ইত্যাদি কিছুতেই কি মানুষের দুর্বুদ্ধিকে সুবুদ্ধিতে আনতে পারে?
তবে সরল হিসাব, শিক্ষার উদ্দেশ্য জীবিকা।
ধর্মের উদ্দেশ্য মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা। যে শান্তি ও নিরাপত্তা ততক্ষণই টিকে থাকবে
যতক্ষণ আমি একটা কম্ফোর্টিং মিথ্যাকে বিশ্বাস করছি।
তবে মানুষের হৃদয়ের আমূল পরিবর্তন
আনবে কে? তার মধ্যে শুভবোধ জাগাবে কে? এর উত্তর না দার্শনিকের কাছে আছে, না শিক্ষাবিদের
কাছে আছে, না বিজ্ঞানীর কাছে আছে। দার্শনিক হয় তো তর্কে আসবে 'শুভ' বলতে কি বোঝায়?
বিজ্ঞানী হয় তো সামাজিক ও মানসিক অভিব্যক্তিতে সমষ্টিতে নীতিবোধের ধারাবাহিকতার বর্ণনা
দেবেন। শিক্ষাবিদ আরেকটি কারিকুলামের কথা বলবেন। কিন্তু উপায় কি?
আজ সমস্যা কুসংস্কার নয়। আজ সমস্যা
দুর্নীতি। আমি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বলেই হয় তো দেখছি আরো স্পষ্ট করে,
কিভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আরো স্মার্ট থেকে আরো আরো স্মার্ট হচ্ছে। অথচ মানবিকগুণগুলো
কিভাবে অচর্চিত থেকে যাচ্ছে নিত্য জীবনচর্যায়। কার্ল য়ুং, বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী বলেছিলেন
আমাদের অধ্যাত্মদৈন্যের কথা। এখানে অধ্যাত্ম মানে মিস্টিসিজম নয়। মনুষ্যত্ববোধের উৎকর্ষতার
দিকগুলোকেই বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উপায় কি?
স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই কোনো। কোন জ্ঞান
মানুষের চেতনার পরিবর্তন আনে? কোন জ্ঞান মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন আনে? কোন জ্ঞান মানুষকে
অনুকম্পা ও সহানুভূতিশীল করে তোলে?
জানি না। আমরা মহাপুরুষদের জীবনে অনেক
পাষণ্ড মানুষের হৃদয় পরিবর্তনের কথা পড়েছি। তারা কি কোনো কৌশল বা যাদুতে সে কাজটি করতেন?
পড়েছি অসীম ক্ষমায়, ভালোবাসায়, সহ্যশক্তির জোরে সে কাজটি তারা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সমাজ মহাপুরুষ আমদানি বা উৎপাদন করবে,
সে সম্ভব নয়। সে বাণী ও জীবনীগুলো এখন নানা প্রতিষ্ঠানের উপজীব্য। সেখানে আয়োজন আছে
নানা, কিন্তু প্রাণহীন, অনুভবহীন।
তবে এ কাজ কি সেই মহাকালের হাতেই ন্যস্ত?
হৃদয়ের পরিবর্তন আনতে যদি ধর্ম আর শিক্ষা দুই-ই ব্যর্থ হল, তবে এবার কার পালা?
বুদ্ধ একটা কথা বলেছিলেন, আত্মদীপো
ভব। নিজেই নিজের প্রদীপস্বরূপ হও। সক্রেটিস বলেছিলেন, নিজেকে জানো। আধুনিককালে বিবেকানন্দ
বলেছিলেন, নিজের ভিতর থেকে ভালো হতে চেষ্টা না করলে, বাইরে থেকে কেউ ভালো করে দেবে
না।
কিন্তু এই ভালো হওয়ার প্রেরণা কে দেবে?
যে ছেলেটি বন্দুক হাতে ক্লাসে ঢুকে এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করল, তার নিজের ছোটোবেলা
যে খুব সুস্থ পরিবেশে ছিল না সে তো জানলাম আমরা। কিন্তু তাকে কোন প্রার্থনায়, কোন নামগানে,
কোনো ওষুধে বা থেরাপিতে সুস্থ জীবনে ফেরানো যেত? কেন কেউ সে চেষ্টাটুকু করেননি? নাকি
সব করেও সব ব্যর্থ হয়েছে?
আমরা এ জগত ছেড়ে যে যার সময়ে চলে যাব।
তারপর? যে প্রজন্মকে আজ কোলে নিয়ে ঘুরছি, সমাজের নানা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে সমাজে চলনসই
করে তুলতে চাইছি, সে যদি বড় হয়ে মনুষ্যত্ব শব্দটাতেই আস্থা হারায়, তাকে সুস্থ জীবনের
প্রতিশ্রুতি দেবে কত টাকার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের, কতগুলো ডিগ্রী,
কত রোম্যান্টিক স্থায়ী সম্পর্ক, কোন ধর্মবিশ্বাস? কোনোটাই নয় আমরা জানি। আসলে তো আমরা
অনেক কিছুই জানি। হয় তো কাল নক্ষত্রের দিক বদল করতেও জেনে যাব, কিন্তু জানব না কি করে
মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন করতে হয় স্থায়ীভাবে। আজ সেই নিয়েই মানুষের খোঁজ বাড়ুক। যদি
সত্যিই মানুষ বলে কোনো জীবকে সুস্থ বেঁচে থাকতে হয় এই পৃথিবীতে।
No comments:
Post a Comment