কথামৃতের গল্প – ছেলে মাকে শুতে যাওয়ার সময় বলছে, মা আমার যখন হাগা পাবে আমায় তখন ডেকে
দিও। মা বলছেন, আমায় ডাকতে হবে না বাবা, ওই হাগাই তোমায় ডেকে তুলবে।
এখন সেই হাগাই আমায় ডেকে তুলেছে। এত বাণী, এত
উপদেশ, এত শিক্ষা – এক কোভিড এসে ঘেঁটে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিতে দিতে বলছে, ওঠো,
জাগো, নিজের ফাণ্ডামেন্টাল প্রয়োজনটা বোঝো, খোসা ছাড়াও, মূলের দিকে যাও, উৎসের দিকে
হাঁটো।
এখন মৃত্যু মানে রুমালচোর খেলা। কার পিছনে কখন
রুমাল রেখে কে যাবে বোঝা দায়। এই মৃত্যুচেতনাকে অধ্যাত্মিক জগতে খুব গুরুত্ব দেওয়া
হয়। সমস্তটা যে নশ্বর, সমস্তটাই যে সরে সরে যাচ্ছে, পুরো সংসারটা যে হাত থেকে অল্প
অল্প করে পিছলে পিছলে যাচ্ছে, সেটা বোঝো। তোমার সংসারে দু’দিন ঝুল না ঝাড়লে এদিকে সেদিকে
ধুলো, ঝুল, ময়লা, কালি। তুমি ঝাঁট দিচ্ছ, ঝুল ঝাড়ছ, ঘর মুচছো, ফিনাইল দিচ্ছ, সাবান
দিচ্ছ, শ্যাম্পু করছ – চারদিক ঝাঁ চকচক করছ। ভালো, পরিষ্কার থাকা ভালো, বেশ ভালো। পরিষ্কার
থাকতে থাকতে শুচিবায়ুগ্রস্থ হচ্ছ, প্রয়োজনীয় জিনিস জমাতে জমাতে লোভী হচ্ছ, ওষুধপত্র
আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র নির্ভর করে অমরত্ব পাচ্ছ ভাবছ, মৃত্যু যেন তোমার আবাসনের ময়লা
ফেলার লোক, সময় করে এসে ঠিক বাড়ির বোঝা বুড়ো মানুষটাকে টুক্ করে নিয়ে চলে যাবে। তুমি
ঝাড়া হাত-পা হয়ে বগল বাজাতে বাজাতে বিশ্ব সংসার ভোগ করে বেড়াবে। হিংসুটে হবে, স্বার্থপর
হবে, জ্ঞানী হবে, মানী হবে – সব তুমি হবে। তুমি কোনোদিন বুড়ো হবে না। ডেথ ইজ ফর আদার্স
– এই ভেবে কোলবালিশ জাপটিয়ে ইন্টেলেকচ্যুয়াল সুখ পাবে, শপিং মলে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে
কুতকুতে লোভী লকলকে চোখে ইতিউতি চাইবে, মাল্টিপ্লেক্সে সামাজিক উৎপীড়নের উপর বানানো,
ভীষণ প্রশংসিত উচ্চমানের সিনেমা দেখতে দেখতে দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক সাজবে।
২০২০ বলল, না, এবার একটু উল্টোদিকে চাকা ঘোরাতে
হবে। চণ্ডীতে আছে “সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশানাং”। বাছাধন, ওই সৃষ্টি যিনি করেন, যিনি রাখেন,
তিনিই আবার ধ্বংস করেন। মানে গুটিয়ে নেন। তুমি শরণ চাইলে নিতে পারো, তবে তোমার এই অস্থিচর্মসার
শরীরটার রক্ষার দায় আমি নেব না, তোমার মধ্যে এক জ্ঞান-আনন্দময় সত্তা আছে, তুমি বিস্মৃত
হয়েছ, তুমি সেই সত্তাকেই নানা জ্ঞানের অন্বেষণে আর নানাবিধ সুখে খুঁজে বেড়াচ্ছ। আদতে
তুমি নিজেকেই খুঁজছ। আদতে তুমি নিজেকেই চাইছ। আদতে তুমি তোমাতেই শেষ হবে। সারাটা জীবন
যে ‘ভগবান ভগবান’ করে দৌড়ে মরলে, চোখ বন্ধ করে দৌড়ালে। সব কিছু নশ্বর, পরিবর্তনশীল
জেনেও ভাবলে তোমার বেলায় উল্টোপাল্টা হবে। তাই কি হয় বোকা? আমায় যদি চাও তবে ফুল-প্যাকেজে
চাও। মানে আমার সৃষ্টি আর স্থিতি নিলে আমার ধ্বংসটাও নিতে হবে। নইলে চাকা থেমে যাবে।
যা পূর্ণ তা-ই শূন্য। তুমি এক বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে আবার যখন সেই বিন্দুতে ফেরো
তখন তাকে কি বলো? কেউ বলে পূর্ণ, কেউ বলে শূন্য। তুমি যা দেখেছ, যা শুনেছ, যা ভেবেছ
– সব নিজেকেই দেখেছ, শুনেছ, ভেবেছ। নিজেকে রক্ষা করতে চাইছ এখন, কিসের থেকে? মৃত্যুর
হাত থেকে। রক্ষা পাবে। কিছুদিনের জন্য। কেউ রক্ষা চিরকালের জন্য পায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানই
সেই কথা বলবে। যে কোষের স্বাভাবিক মৃত্যু হয় না, সে আদতে কি কোষের স্বভাব বহন করছে
জানো? ক্যানসার কোষের। সে কোষ নিয়ম মানতে চায় না, সে নিজের মত একটা স্বতন্ত্র সত্তা
বানাতে চায় তোমার শরীরে থেকেই, সে সীমা মানে না, লক্ষ্য মানে না। তোমার শরীরকে ধ্বংস
করে ফেলে। তুমি নিজে কি সেই ক্যানসার হতে চাও সমাজে? বেরিয়ে এসো, এই ভুল ধারণা থেকে।
তুমি নিজেকে আবিষ্কার করো আবার। নিজেকে খোঁড়ো। নিজেকে প্রশ্ন করো – কে আমি? কিসের জন্য
এ আয়োজন? আমি কি শুধুই একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া? যদি তাই হই, তবে এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার
সমন্বায়ক কে? এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অণুতে পরমাণুতে যে বিচিত্র কর্মযজ্ঞ, যে আলো অত
কোটি মাইল দূর থেকে এসে তোমার বাগানের সবুজ পাতাটার উপর এসে পড়ছে তাকে ধারণ করার রাসায়নিক
কণা সে গাছের পাতায় কে এনে দিল? রক্তের মধ্যে কে প্রাণবায়ুকে মিলিয়ে নিল? এই মহাবিশ্বের
নানা কর্মকাণ্ডের সমন্বায়ক কে? কে সমস্ত পৃথক পৃথক চেষ্টা – অপচেষ্টা – বিরোধী চেষ্টা
– বিদ্রোহী চেষ্টাকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে? খোঁজো খোঁজো সে সূত্র। সেদিন আরেক মহামারী
এসেছিল কলকাতার বুকে। বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে নিয়ে সেবায় ব্রতী। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে নিবেদিতাকে
দিলেন আর এক মহান ভার। কলকাতাবাসীকে শোনাতে
হবে এ মহামারীর আর এক ব্যাখ্যা, আরেক দৃষ্টিকোণ। ভয় না, অভয় আসবে মনে। ভয়ংকর সত্যকে
সামনে রাখতে হবে। মৃত্যুরূপা মাতা - বক্তৃতা দিলেন, নিবেদিতা। কিছু সঙ্কীর্ণ বাঙালী
নাক সিঁটকালো, ম্লেচ্ছ দেবে কালীর উপর বক্তৃতা? তবু দিলেন নিবেদিতা। সে ইতিহাস। আজ
বিজ্ঞানের যুগ। যুক্তির যুগ। সেই বিজ্ঞান, সেই যুক্তি কিসের অন্বেষণে? সেই মহাসমান্বয়কের
অন্বেষণ। সেই সূত্র যা সমস্তকে একটা ছন্দে বাঁধছে।
কার
ছন্দে? এই মহাকালের সাথে খণ্ডকালের ছন্দ কার নৃত্যালয়ের তালে বাঁধা পড়ে আছে? “নৃত্যের
বশে সুন্দর হল বিদ্রোহী পরমাণু, পদযুগ ঘিরে জ্যোতিমঞ্জীরে বাজিল চন্দ্র ভাণু।”
কে সে? হয় তো কেউ নয়? তুমি তাকে চেতনা বলতে পারো,
তুমি তাকে ঈশ্বর বলতে পারো, তুমি তাকে কেন্দ্র বলতে পারো। তুমি যা কিছু বলতে পারো।
কিন্তু যতদিন বলতে পারো, ততদিন তুমি এ সংসারে পর্যটক মাত্র, ট্যুরিস্ট। একদিন বলতে
পারবে না। একদিন স্থিরচিত্তে নিজেকে সে মহান সমন্বায়কের হাতে সঁপে দিয়ে বলবে, “দিও
না আমারে ছড়ায়ে”। নিজেকে আর ফেলে ছড়িয়ে রাখতে পারবে না। সেদিন তোমার কোনো তর্ক নেই।
সেদিন তোমার কোনো ধর্ম নেই। সেদিন তোমার কোনো ঈশ্বর নেই। সেদিন তোমার কিছুই নেই। কারণ
সেদিন তোমার তুমিই নেই। সেদিন শুধু আনন্দ। সুখের আনন্দ না। নির্ভয়তার আনন্দ। নির্ভরতার
আনন্দ। আইনস্টাইন যেমন নিজের প্রাণসংশয়কালে ম্যাক্স বর্নের স্ত্রী হেডিকে বলেছিলেন,
'প্রতিটা প্রাণীর সঙ্গেই আমি এমন একটা একাত্মতা অনুভব করি যে, ব্যক্তির শুরু কোথায়
আর শেষই বা কোথায়, তাতে আমার কিছু আসে যায় না'।
একদিন এ মানবকূল এ ঘোর বিপদ কাটাবে। সেদিন কে
থাকবে, কে থাকবে না – সে হিসাব আমরা জানি না। কিন্তু সেই মহাসমন্বায়কের সাথে আমাদের
যে হাঁটার ছন্দপতন শুরু হয়েছিল, সে ছন্দকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের জঙ্গল, নদী,
সমুদ্র, আকাশ, বাতাস, পশুপাখি, শিশু আবার সুস্থ হবে। বাসযোগ্য হবে। ততদিনে আমাদের প্রার্থনা,
আকাঙ্খা, আশা এই কয়েকটা প্রাচীন শব্দবন্ধে উচ্চারিত হোক -
সর্বে ভবন্তু সুখিন,
সর্বে সন্তু নিরাময়া,
সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্তু,
মা কশ্চিদ দুঃখ মাপ্নুয়াত,
ওম শান্তি শান্তি শান্তি।
সবাই সুখী হোক, সকলে নিরাময় হোক, সকলের দৃষ্টি
মঙ্গলময় হোক, সকলের ভাগ্য দুঃখাতীত হোক। শান্তি শান্তি শান্তি।
No comments:
Post a Comment