আজ একটু নারকেল দিয়ে চিংড়ি মাছ রাঁধবে বউমা....
এখনও তোমার জিভে এত তার? একটা জোয়ানমদ্দ ছেলে
চলে গেল..তারপরও!!
সুনন্দা বাটনা বাটছিল, মাথাটা নীচু করেই ছিল,
থাকলও সেভাবেই। শ্বশুর মশায় মাথাটা নীচু করে ঘরে ঢুকে গেলেন। শাশুড়ি বারান্দায় বসে
হাতপাখাটা জোরে জোরে নাড়াতে নাড়াতে কি সব বলে যাচ্ছেন। স্টোভে চায়ের জল ফুটছে, এখনই
চা পাতাটা দিয়ে দিতে হবে, কিন্তু নড়তে ইচ্ছা করছে না। হাত বাড়িয়ে আগুনটা কমিয়ে দিল।
যে গেছে সে তো গেছেই। আটমাস হল।
সুনন্দা লুডো খেলছে খাটে বসে। একটা পুট চাই।
নইলে সাপের মুখে পড়তে হবে। শাশুড়ি শ্বশুর নেই, কুড়ি বছর হল। মেয়েটা ফোন করেনি চারদিন
হয়ে গেল। ঝড়ে নেটওয়ার্ক গেছে। প্রাণে বেঁচে আছে কিনা তাও জানে না। ট্রেন চলছে না। লকডাউন।
মেয়ের বাড়ির আশেপাশে কোনো বাড়ির ফোন নাম্বার জানা নেই। সুনন্দার ফোনটাতে চার্জ শেষ।
কারেন্ট নেই আজ চারদিন হল। যা হবার তা হবে।
ঝড় উঠল আজ আবার। আজ আবার বুধবার। গেল বুধবার
উম্পুনে বাগানের ন'টা গাছ নষ্ট হয়ে গেল। ফুলগাছ সবগুলো। কতদিন ধরে মাটি করা, সার দেওয়া,
বড় করা। বাগানটাই তছনছ হয়ে গেল। ভাঙা টবগুলো এখনও বাগানের একটা ধারে জমা করা। নিজের
হাতে রঙ করা। ভাঙা টুকরোগুলোতেও জ্বলজ্বল করে।
বেল বাজল। রান্নার মেয়েটা হবে। হাঁটার ধাতব লাঠিটায়
ভর করে দাঁড়াল। দাঁড়াতে সময় লাগে, হাঁটুটার যা অবস্থা। তার উপর কারেন্ট গেল কিছুক্ষণ
হল। আগের ঝড়ে সব ঠিক হতে সময় গিয়েছিল পাঁচদিন। মেয়েটারও ফোন পেয়েছে। পাশের বাড়ির ল্যাণ্ডফোন
থেকে কল করেছিল - ভালো আছে।
রান্নার মেয়েটা ভিজে একশা। সুনন্দা নিজের মেয়ের
একটা সালোয়ারকামিজ বার করে দিল। ঢোলা হল। ন্যাপথলিনের গন্ধ জামাটায়। সুনন্দার সব স্মৃতিগুলোতে
ন্যাপথলিনের গন্ধ। ঘুমের মধ্যে অনেকবার স্বপ্ন দেখেছে, তাকে ন্যাপথলিনের ওপর শোয়ানো,
মারা গেছে। নীচ থেকে কেউ বলছে, আগুন দিয়ো না। সুনন্দা গলার আওয়াজ শুনে চিনতে পেরেছে,
তার স্বামী।
রান্নার মেয়েটা বলল, আমি আজ বাড়ি থেকে নারকেল
দিয়ে চিংড়ি রেঁধে নিয়ে এলাম। আমার মায়ের জন্য রেঁধেছিলাম। দেখো খেয়ে, আমি তোমার জন্য
ভাত আর একটা চচ্চড়ি রেঁধে দিয়ে যাচ্ছি।
সুনন্দার গলার কাছে কান্না। কিন্তু আজকাল চাইলেও
কাঁদতে পারে না। ইচ্ছা করে না, বড্ড বোকা লাগে নিজেকে।
রান্নার মেয়েটা চলে গেল। কারেন্ট এসে গেছে। খাবার
টেবিলে বসে সুনন্দা। সামনে একটা টিফিন বাটি খোলা নারকেল চিংড়ি। টেবিলের চারদিকে চারটে
চেয়ার। তিনটে ফাঁকাই থাকে। সুনন্দা এই ফ্রিজের পাশের চেয়ারটাতেই বসে। বাকি চেয়ারগুলোর
ধুলো কাজের মেয়েটা ঝেড়ে যায়। চেয়ারগুলোতে অদৃশ্য ভালোবাসারা বসে। যে ভালোবাসা সুনন্দা
নিজে বুনেছিল।
সুনন্দা টিভিটা চালালো। লকডাউন ফোর উঠে যেতে
পারে। মনটা খারাপ হল। এই লকডাউনে সবার বাড়ি কত মানুষ। বিকালে ছাদে কত লোক। কেউ কথা
বলে না তার সাথে, তবু আছে তো সবাই পাশাপাশি। করোনায় মৃত্যুর হার বেড়েই যাচ্ছে। সুনন্দা
জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে - তাকে কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে নাকি কিছুদূর
অন্তর অন্তর বেড আছে। কথা বলার মানুষ। তারপর মৃত্যু আসবে। কেউ বাড়ি ফিরতে বলবে না।
কেউ মৃতদেহ নিয়ে যেতে বলবে না। সে অশুচি তখন। কোথাও একা একা শেষকৃত্য হবে। কাউকে ডাকার
দরকার হবে না। কেউ না আসার অজুহাত খুঁজবে না। কিন্তু করোনা হবে কি করে? বাতাসে তো সব
মৃত্যুর পরোয়ানা ভাসে না। কে ছোঁবে তাকে? ভালোবেসে না হয় নাই বা হল, করোনাতেই না হয়
ছুঁয়ে যাক।
লুডো নিয়ে আবার বসে শোয়ার ঘরে সুনন্দা। একটা
পুট চাই, সাপের মুখ থেকে বাঁচিয়ে দেবে? না তো, সাপের মুখে ফেলবে। সুনন্দা চায় না খেলাটা
শেষ হোক। নতুন খেলা শুরু করার মত সাহস কমে আসছে। প্রাণপণ আশা করে আছে, যদি একটা পুট
পড়ে।
No comments:
Post a Comment