একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গ'র গলায় হাঁটু দিয়ে পাড়া দিয়ে আছে। কৃষ্ণাঙ্গ মারা যাচ্ছে
কাতরাতে কাতরাতে। তারপর মারা গেল। ভিডিওটা, ছবিগুলো সারা সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে দেখলাম
গতকাল। কয়েকদিন আগেই ম্যান্ডেলা'র জীবনী পড়লাম। তবে এই ঘটনাটায় কি বিস্মিত হয়েছি? না।
বিস্মিত হইনি, যন্ত্রণা হয়েছে। মানুষ তো এরকমও। একজন শিশু শ্রমিকদের ট্রেনে চব্বিশ
ঘন্টা না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে। একজন মানুষ রাস্তায় পড়ে মারা যাচ্ছে। কাউকে সন্দেহ
করে পিটিয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছে। কাউকে একঘরে করে তার বেঁচে থাকার যাবতীয় মূল উপাদান থেকে
বঞ্চিত করে মরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।
মানুষ তো এরকমও। হিংসা, আক্রোশ, নিষ্ঠুরতা –
এগুলো অচেনা শব্দ নয় তো। যতগুলো সিনেমা বানানো হয় দেশে আর বিশেষ করে বিদেশে, তার সাথে
আজকাল যত ওয়েব সিরিজ বানানো হয়, তার মূল একটা বিষয়ই তো হিংসা। কেমন জীবন্ত খুনের দৃশ্য,
কেমন বাস্তবের মত কপটাচার, ধূর্তামি, নিষিদ্ধাচার – সব অন্ধকারের গল্প। ভালো লাগে তো
আমাদের। নইলে এত তাদের চাহিদা কেন? এত আলোচনা, এত আলোড়ন কেন? “পুরো রিয়েল লাইফের মত
না?” আসলেই তো তাই। আমাদের রিয়েল লাইফ আর রিল লাইফ এত মিশে যাচ্ছে একে অপরের সাথে যে
আমরা এখন আমাদের রিয়েল লাইফটাও রিল লাইফের মত করে চাইছি।
আমাদের থ্রিলার চাই। আমাদের ভায়োলেন্স চাই-ই
চাই। আমরা কি বুড়িয়ে গেছি? আমাদের রক্তে কি জোশ নেই? আমাদের কি শত্রু নেই? আমাদের কি
লড়াই করে কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার নেই? এ সব আছে। তাই আমরাও আছি। আমাদের ছোটো ছোটো বৃত্ত
আছে। তার পরিধি আছে। সেই পরিধি বরাবর আমার পাহারা আছে। আমার সেই পরিধি অনেক কিছু হতে
পারে। আমার চামড়ার রঙ হতে পারে, আমার ধর্ম হতে পারে, আমার অর্থনৈতিক অবস্থান হতে পারে,
আমার প্রতিভা হতে পারে, আমার রাজনীতি হতে পারে, আমার পেশা হতে পারে, আমার রূপ হতে পারে।
সেই পরিধির পাহারাদার আমি। আমার ইগো। আমার অস্তিত্বের ধ্বজা। পতপত করে উড়ছে আমার আকাশচুম্বী
আমিত্বে।
এর বাইরে যে সভ্যতা – সে রাস্তাঘাটের সভ্যতা,
আইন-কানুনের সভ্যতা, ব্যবসা-বাণিজ্যের সভ্যতা, প্রযুক্তিকরণের সভ্যতা। সেই সভ্যতার
গঠনমূলক আর কার্যমূলক একক – মানুষ। এক-একটা পরিধি আঁকা মানুষ।
শিক্ষাকে যদি মস্তিষ্কের তথ্যীকরণ না বলি শুধু,
শিক্ষাকে যদি প্রবৃত্তির কুশলীকরণ না বলি শুধু, তবে শিক্ষার বড় একটা কাজ চিন্তা আর
আবেগশক্তির আলোকিতকরণ। চিন্তা সুংসবদ্ধ, সংগত হয়ে উঠলে তা হয়ে দাঁড়ায় মানুষের বিশ্লেষণী
ক্ষমতা। তখন কোনো ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ বা অবলোকন করার ক্ষমতা সামান্যীকরণের
(generalization) মাধ্যমে বাস্তবানুগ হয়। সে নিজেকে একজন কেউকেটা ভাবে না। সে জানে
সংসারে সব কিছুর একটা প্রথা আছে, ধারা আছে, নিয়ম আছে। সেটাকে উল্লঙ্ঘন করে চললে আদতে
বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। এই গেল চিন্তার দিক। আর আবেগের শক্তিকে শিক্ষিত করে তুললে
‘চরিত্র’ নামে একটা বড় কবচ তৈরি হয়। সেখানেও মানুষ নিজেকে সৃষ্টিশীলতা ও সংযমের পথে
নিয়োজিত করতে পারে। আর দুইয়ের নিয়ন্ত্রণপ্রাপ্তিতে এমন একটা জীবনবোধ তৈরি হয় যেটা তার
নিজের মধ্যে নিজেকে নিয়ে অক্ষুব্ধ থাকার, সন্তুষ্ট বাঁচার রাস্তা দেখায়। সে নিজেকে
নিয়ে অনেক নিরাপদ তখন। বুদ্ধ বলেন, বিষে হাত দিলে তখনই সংক্রমণের ভয়, যদি হাতে কোথাও
কাটা থাকে। সঠিক শিক্ষা সেই কাটাদাগটা মিলিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু সব চাইতে গভীর সমস্যা হল, আমাদের এই সময়ে
উচ্চপদস্থ, ক্ষমতায় আসীন, প্রভাবশালী ইত্যাদি বহু সভ্যবৃন্দের আচরণ। সাধারণ মানুষ ঠিক-ভুল
যাই বুঝুক, সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতা তো তার নেই। সে তাই একজন সভ্য নির্বাচন করে
তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে। বাস্তবে সে তার চোখ না হয়ে তার চোখে বাঁধা কাপড় হয়ে দাঁড়ায়,
সে তার মুখ না হয়ে তার মুখের মধ্যে গোঁজা কাপড় হয়ে দাঁড়ায়। সে আন্দোলন করে, চীৎকার
করে, প্রতিবাদ করে – কিন্তু মনে মনে বিশ্বাস করে আসলে ক্ষমতায় এলে ওরকমই হয়। তাই একজনকে
সরিয়ে আরেকজনকে আনলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই – 'যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ' হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ, যে সেই ক্ষমতায় এসেছে, সেও সেই সাধারণের থেকে উঠে আসা মানুষ, যে কুশলী, যে তথ্যীকৃত
মস্তিষ্কের বাহক, কিন্তু যে আদতে জানে না কি করে নিজের চিন্তার আর আবেগের দিক নির্ণয়
করতে হয়। সে দিক নির্ণয় করার ধ্রুবতারাটি কি? সে শিক্ষা সে পায়নি। সে ধ্রুবতারাটি চিরটাকাল
একটাই – বোধের সামান্যীকরণ। যখন কাউকে আমরা মহাত্মা বলি, তখন বলতে চাই অনেক ক্ষুদ্রাত্মা
তার মধ্যে এসে আশ্রয় পেয়েছে বলে সে মহাত্মা। একজন উদারচিত্ত মানুষ বলতে তাই বুঝি। এই
উদারতাই সামান্যীকরণের বেগ, প্রাণশক্তি।
তবে কি বিশেষ বলে, উৎকর্ষতা বলে কিছু থাকবে না?
অবশ্যই থাকবে, সেটা ব্যক্তিবিশেষের প্রতিভা, ক্ষমতার বিশেষত্ব। কিন্তু চিত্তবৃত্তি
তো আর ক্ষমতা নয়। সেখান থেকে একটাই শক্তি আসে, তাকে অনুকম্পা, সহানুভূতি ইত্যাদি যে
নামেই অভিহিত করি না কেন।
একটা ঘটনা মনে পড়ল। উদাহরণ হিসাবে বলি। দক্ষিণ
ভারতের প্রখ্যাত গায়িকা এম এস শুভলক্ষ্মী একটা অনুষ্ঠান করে বাড়ি ফিরেছেন বেশ রাতে।
এমন সময় এক গরীব পরিবার তার দরজায় এসে উপস্থিত হন। একজন পুরুষ তার বৃদ্ধা মা আর ছেলেমেয়ে
নিয়ে অনেক দূর থেকে আসছিলেন গান শুনতে। কিন্তু রাস্তায় নানা কারণে পৌঁছাতে দেরি হয়।
অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। সেই পুরুষমানুষটার মা ভেঙে পড়েন। তাই অনুরোধ জানাতে এসেছেন যদি
একটা গান অন্তত শোনানো যায়। এম এস শুভলক্ষ্মী তাঁর বাড়ির উঠানে বসে তাদের কয়েকটা গান
শোনান।
একবার আমার মা কিশোরী আমোনকরের একটা গান টিভিতে
শুনে মুগ্ধ হয়ে যান। তখন মা খুব অসুস্থ। আমি অনেক খোঁজ করে জানতে পারি উনি এই গানটা
এখনও রেকর্ড করেননি। আমি নেট ঘেঁটে ওনাকে ফোন করি মুম্বাইতে। উনি সবটা শুনে বলেন ওনার
এক ছাত্রী চন্দননগর থেকে আসে, তিনি তার হাতে আমার জন্য ওটা রেকর্ড করে পাঠিয়ে দেবেন।
তিনি কথা রেখেছিলেন। গানটা ছিল, "মন শিব শিব কি শরণ হো, যব প্রাণ তন সে নিকলে",
ভৈরবীতে বাঁধা অসামান্য একটা ভজন।
এইটাই বলতে চাইছিলাম, প্রতিভা যাই থাকুক না কেন,
চিত্তের ঔদার্যতায় যদি তার স্বাধিষ্ঠান না হয়, তবে আদিম প্রবৃত্তির হাত থেকে নিস্তার
পায় কি করে মানুষ? উপনিষদে একটা কথা আছে – নির্বিশেষ। কথাটা আমার খুব ভালো লাগে। প্রথাগত
শিক্ষার সবটুকু যেমন আমাকে অমুকের মত হতে হবে'র দিকে, তাকে প্রতিস্থাপিত করে কবে যে
‘আমাকে বিকশিত হতে হবে বা evolved হতে হবে’র দিকে যাবে জানি না। আগন্তুক সিনেমার শেষ
কথাটা দিয়েই শেষ করি – কে দেবে আলো? কে দেবে প্রাণ?
No comments:
Post a Comment