জ্ঞান কি আনন্দের বিষয় হতে পারে? হতে পারে। একমাত্র দর্শনে হতে পারে। নইলে জ্ঞান কেবল
ব্যবহারের বিষয়। তা তো নয়। জ্ঞান মুক্তি। জ্ঞান সুখ। জ্ঞান আনন্দ। জ্ঞানের পাতায় ভক্তির
জলের বিন্দু।
জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই। জীবনানন্দ। জ্ঞান আর
প্রেম কি আলাদা? লাভ ইজ ওয়াইজ। রাসেল সাহেব। প্রেমই জ্ঞান, জ্ঞানই প্রেম। জ্ঞানাগ্নি।
প্রেমাগ্নি। জ্ঞানোন্মাদ। প্রেমোন্মাদ।
তবে ভাষায় কি বলি? কিছু না। সব মিথ্যা। জ্ঞানহীন
সব মিথ্যা। জ্ঞানহীন সব অসুখ। কার জ্ঞান হয়? সরল হলে হয়। রামকৃষ্ণ। কি সরলতা? বৃক্ষের
সরলতা। মাটির সরলতা। আকাশের সরলতা। জলের সরলতা। শিশুর সরলতা। যেখানেই ঈশ্বরের প্রকাশ
সেখানেই সরলতা। রামকৃষ্ণ। ঈশ্বর মানে জ্ঞান। সত্যং জ্ঞানং অনন্তং ব্রহ্ম। উপনিষদ। সত্য
জ্ঞান অনন্ত – এক কথা।
তুমি নিজেকে নিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে আছো। কিচ্ছু
খুলছে না। সব জটিল। সব যেন ধাঁধা। কোনো ধাঁধার সমাধান হচ্ছে না। একটা দড়ি। অসংখ্য গিঁট।
খোলা যাচ্ছে না। জাদুকর এলো। এক টানে সব গিঁট খুলে গেল। রামকৃষ্ণ। জাদুকর মানে জ্ঞান।
জ্ঞানের উল্টোদিক প্রেম। একই কথা। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখা। কাম হল। অর্থ হল। ধর্ম হল। মোক্ষ
চাই। কি মোক্ষ? জ্ঞান। আলগা দড়ি। ছুটির ঘন্টা। মুক্তি। কিসের থেকে? অবুঝ বেগ থেকে।
অসহ্য অতৃপ্ত বাসনা জ্বালা থেকে। যা পায়নি, তার জ্বালা। যা পেয়েছি, তা ফাঁস। প্রাণ
বড়বাজারে মাল ওঠাচ্ছে, নামাচ্ছে। মালিক পয়সা দিচ্ছে। গাঁজা টানছে। মনে হচ্ছে যেন সুখ।
সুখ, তবে ঘোরের মধ্যের সুখ। ঘোর বাঁচাতে আরো নেশা। নেশা বাঁচাতে মালিকের আরো আরো গোলামি।
আনন্দ নেই। সব শূন্য। নিহিলিজম। জগত মানে প্রহেলিকা। জগত মানে বিষাদ। জীবন মানে গোলামি।
এ মিথ্যা কথা। ঋজুতা হীন। ঋজুতা মানে জ্ঞান।
জ্ঞানের ঋজুতা মানে ধর্ম। প্রেমের ঋজুতা মানে ঈশ্বর। ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু। বিজ্ঞান
ছাড়া ধর্ম অন্ধ। আইনস্টাইন। ব্যক্তি ঈশ্বর নয়। সে কল্পনা। বোধের ঈশ্বর। সে সত্য। সে
জ্ঞান। সে মঙ্গল। সে চেতনা। সে আনন্দ।
জীবন মানে কি? কিছু না। জীবন ধাত্র। বোধ মধু।
বোধ আনন্দ। বোধের মধ্যে বোধের ঋজু সুখ। গভীর সুখ। আনন্দ। শত্রু কে? বিক্ষেপ। সুখ মিলনে।
বিচ্ছেদ মানে বিক্ষেপ। জ্ঞান মিলনে। প্রেম মিলনে। বিক্ষেপকে হানো। বিক্ষেপ অশান্তি।
বিক্ষেপ অসুখ। বিক্ষের অ-সুর। কিসে যাবে?
কাঁদতে পারো? রামকৃষ্ণ। কার জন্য? ঈশ্বরের জন্য।
কোন ঈশ্বর? না গো, মন্দিরের নয়। প্রতিষ্ঠানের নয়। ধর্মের নয়। তোমার মর্মের। তোমার মর্মে
সুখ নেই। তোমার মর্মে তুমি একা। নিঃসঙ্গ। বিষয় সুখ মর্মে প্রবেশ পায় না। মর্মের মধ্যে
কাঁদো। মরমী হও। মানুষের সব সুখের প্রকাশ নেই। কিছু সুখ অবর্ণনীয়। অনির্বচনীয়। যেই
ভকত সেই জানে, তুমি জানাও যারে সেই জানে। রবীন্দ্রনাথ। মরমে সুখী হও। মরমী হও। শুধু
জাগতিক হয়ে মানুষ বাঁচে না। শুধু তর্কে বুদ্ধি জেতে। মর্ম না। কাঁদলে মানুষ নরম হয়।
লোকে মাগছেলের জন্য ঘটি ঘটি কাঁদে, ঈশ্বরের জন্য কে কাঁদে? রামকৃষ্ণ। নিজের মর্মের
জন্য কাঁদো। ও মোর দরদিয়া। আসন হয়নি পাতা, মালা হয়নি গাঁথা, আমার লজ্জাতে হেঁট মাথা,
ও মোর দরদিয়া। রবীন্দ্রনাথ। এই দুয়ার দেওয়া ঘরে, কভু আঁধার নাহি সরে, তবু আছ তারি পরে,
ও মোর দরদিয়া। রবীন্দ্রনাথ। মরমে মরমী আসুক। দরদী আসুক। কাঁদলে আসে। ভাবলে আসে না।
ভাবায় ভাবায় ভাবান্ত। অবশেষে সব ফক্কা। ফাঁকি।
পাশ্চাত্য দ্বিধা বিভক্ত। কেউ বলল, জ্ঞান মানে
অভিজ্ঞতা। কেউ বলল, জ্ঞান মানে মননের মধু। কান্ট বলল, দুই সত্য। ক্ষেত্র বিশেষে। বেদান্ত
বলল, অভিজ্ঞতা মানে প্রকৃতির রাজ্য। অভিজ্ঞতাপূর্ব জ্ঞান, কান্টের ভাষায় যা প্রায়োরি,
অর্থাৎ বিশুদ্ধ জ্ঞান, মানে পুরুষ। দুই সত্য। মানুষের দুই জগতই সত্য। তবে তার মধ্যে
এক তৃতীয় জগত আছে, পরা জগত। সব ছাপিয়ে নয়। সব নিয়ে। স্পিনোজা বুঝেছিল। তাই বলেছিল জীবন
মানে বোধ। ঈশ্বর আবেগহীন নৈর্ব্যক্তিক। শঙ্করাচার্য বলেছিল ঠিক বুঝেছিস। চৈতন্য দিয়ে
চৈতন্যকে জানা। ওগো সার্জেন আলোটা এবার তোমার মুখের ওপর ফেলো। রামকৃষ্ণ। প্রেমটি যেদিন
জ্বালি হৃদয় গগনে কি উৎসবের লগনে, সব আলো তার কেমন করে পড়ে তোমার মুখের পরে, আমি আপনি
পড়ি আলোর পিছনে। রবীন্দ্রনাথ।
জগত ঘুর্ণীয়মান নয়। তোমার ঘুরে ঘুরে মাথা ঘুরছে।
তুমি স্থির হও, জগত স্থির হবে। রুমি। কামুক দেখে জগতময় কাম। লোভী দেখে অর্থ। আমি দেখি
যেন রাম। তুলসীদাস। কে রাম? সিয়ারামময় সব জগ জানি। সমস্ত জগৎ যা ময়, সেই আমার রাম।
বুকের মধ্যে আনন্দ ঘট। জ্ঞানের। প্রেমের। তুমি যদি সোজা তাকিয়ে দু কিলোমিটার স্পষ্ট
দেখো, সেটা তোমার চোখের রেটিনা আর লেন্সের সমীকরণ। তার বাইরে ঝাপসা দেখলে সেও সেই সমীকরণের
সীমাবদ্ধতা। তার মানে কি তার বাইরে কিছু নেই? আমি যদি পাঁচশো মিটার দেখি সেও আমার রেটিনা
আর লেন্সের সমীকরণ। তার বাইরে কি কিছু নেই?
অন্ধকারে হাত বাড়ালেম কাহারো তরে। রবীন্দ্রনাথ।
হাত বাড়ানোই আসল কথা। সেই বিশ্বাস। অন্ধকারকে অস্বীকার করা নয়। আলোর সন্ধান, অন্ধকারের
মধ্যে থেকে। বিশ্বাস। একদিন ঝড় থেমে যাবে। বিশ্বাস। শান্তং শিবং অদ্বৈতম ব্রহ্ম। সূত্র।
উপনিষদ। দোগ্ধা রবীন্দ্রনাথ। প্রথমে শান্ত হও। তারপর শুভকে আহ্বান করো। যা ভালো। যা
মঙ্গল। তাই আসুক। শুভ বলেই আসুক। মঙ্গল বলেই আসুক। আর কোনো কারণ না। সেই শুভর শক্তিতে
আড়াল দূর করো। তোমার নিজের সাথে নিজের। তোমার সাথে আমার। সেই শুভর শক্তিতে বাধা দূর
হোক। রাস্তা বানানো হোক। সেতু গড়ে উঠুক। সব সত্য হবে। হতেই হবে। নইলে মহতী বিনষ্টি।
সত্যং জ্ঞানম অনন্তম ব্রহ্ম।
[ছবি: Debasish Bose]

No comments:
Post a Comment