Wednesday, May 18, 2022

ওভারব্রীজ

এরকম হয় না, আজই হল। বুড়োটা রোজ স্টেশানের সিঁড়িটার গোড়ায় বসে থাকে। ভিক্ষা করে। তাকেই কিনা গিয়ে জিজ্ঞাসা করে বসল, কেমন আছেন?

ছি ছি! কেউ যদি শোনে? ভাববে না, এই পঞ্চাশ ছুঁতে না ছুঁতেই লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? নইলে ভিখারিকে কেউ জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছেন? 'আছেন'?!!। কোনো মানে হয়? ভিখারির সঙ্গে আত্মীয়তা হয়? ভিখারির সমাজে কনট্রিবিউশন কি? জিরো। পরগাছা।

বাইকটা স্টার্ট করল। বাইকের আলোয় বৃষ্টিভেজা রাস্তাটা ঝলসে উঠল যেন। চারদিক অন্ধকার। আজ জবরদস্ত কালবোশেখী হয়েছে নাকি, পরমা বলছিল। অঞ্জনের স্ত্রী। রাস্তার সব আলো নেভানো।

বুড়োটা হাঁ করে তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তাকে এই প্রশ্ন কেউ হয়তো তার জীবনে প্রথম করল। তারপর মাথাটা নেড়ে বলল, এই তো দাদা… আপনি?

কি স্পর্ধা! একজন ভিখারি তাকে জিজ্ঞাসা করছে? তা হবে না? আস্কারা তো সে-ই দিল। দাঁত কেলিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছেন?.... আচ্ছা জেঠু না দাদু কিছু বলেছিল? নাহ্! মনে পড়ছে না।

সব পানসে লাগল। ডিনারের পোলাও। পরমার চুমু। শরীরের খেলা। সব পানসে।

পরেরদিন অঞ্জন অন্য জায়গা থেকে ট্রেনে উঠল। সাধারণত ভেণ্ডারের পরের কম্পার্টমেন্টে ওঠে। আজ উঠল প্রথম কোচে। বাইচান্স যদি মালটা আবার জিজ্ঞাসা করে বসে, দাদা কেমন আছেন? ছি ছি!

অঞ্জনের বাবার মুখটা মনে পড়ল। বাজারের মোড়ে চায়ের দোকান ছিল। রাতদিন বেকার ঝাঁটমালদের আড্ডা। বাবাকে দেখলে ঘেন্না লাগত। বিশেষ করে অমূল্যস্যারের কোচিং-এ যাওয়ার পর থেকে। অমূল্যস্যারই তাকে চিনেছিলেন, যার জন্য আজ তার এই মোটা মাইনের চাকরি। অ্যাজ সাচ, স্যারই টাকা খরচ করে পড়িয়েছেন। বারবার বলতেন, ওরে অঞ্জন, কি করে যে অমন মুখ্যু বাপের সন্তান হলি! তোর বাপ আর আমি তো ব্যাচমেট ছিলুম। তোর বাবা তো এইট অবধি পড়ে আর পড়ল না। তোর ঠাকুর্দা মারা গেল হঠাৎ। সে সেই চায়ের দোকানে বসে গেল। অবশ্য যা মাথা ছিল তোর বাবার… তাছাড়া কি বল তো...! স্বপনের কোনো অ্যাম্বিশান বলে কিছু কোনোদিন ছিল না। নইলে পেপারে টেপারে পড়িস তো… মানুষ কত কষ্ট করেও কত উপরে উঠেছে, পড়িস না?

অঞ্জন সব পড়েছে। কিন্তু তার বাবাকে মনে পড়লে তার এখনও ঘেন্না লাগে। লোকে বলে মা মারা যাওয়ার পর তাকে মানুষ করবে বলে নাকি বিয়ে করেনি তার বাবা… যত্তোসব চিপ গ্লোরিফায়িং…. মুরোদ ছিল আরেকটা বিয়ে করার? একটা ঠিকঠাক টিউশান দিয়েছে? শালার বাপ...

অঞ্জন ফ্ল্যাটে থাকে। নিজেদের বাড়ি বাবা বেঁচে থাকতেই ছেড়েছিল। শ্যামনগরও ছাড়ত, নেহাত পরমা ওর বাবা মা-কে ছেড়ে দূরে যাবে না তাই।

******* ********

অঞ্জন দু'দিন পর একবার কি ভুলে আবার প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির কাছে চলে এসেছে। অনেক বছরের অভ্যাস তো এদিক দিয়ে নামা, রিফ্লেক্সেই চলে এসেছে বুঝল। ভিখারিটা বসে। তার দিকে তাকালো। তার বুকটা ঢিপঢিপ করছে, কিছু কি জিজ্ঞাসা করবে?

না। রাতে চোখে দেখে না বোধহয়। পুষ্টি বলে শরীরে কিছু থাকে নাকি ভিখারির! সব ঝাপসা দেখে।

বাইকটা যখন স্টার্ট করছে তখন বুঝল সে মনে মনে রেগে যাচ্ছে। কেন তাকে চিনতে পারল না? কেন? শালা এত গুমোর! সারা জীবন ক'টা মানুষ তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, "কেমন আছেন?"... অঞ্জনের একবার মনে হল গিয়ে একটা চড় কষিয়ে আসে গালে। এত ভায়োলেন্ট হচ্ছে কেন সে? জানে না। কিন্তু হচ্ছে সেটা সত্যি।

পরমা আসার সময় চপ নিয়ে যেতে বলেছে। নিল না। ইচ্ছা করেই নিল না। বাড়ি গিয়ে বলবে, ভুলে গেছে। ইচ্ছা করেই বলবে। কষ্ট পাবে। পাক।

****** ********

আজকাল বুড়োটাকে স্বপ্ন দেখছে অঞ্জন মাঝে মাঝেই। কাল দেখল বুড়োটা তার ফ্ল্যাটে এসে সারা দেওয়াল নিজের পায়খানা মাখাচ্ছে। সে যত জল ঢালছে ধুচ্ছে না।

আরেকদিন দেখল তার বসের বাবা ওই বুড়োটা। তাকে চাকরি থেকে তাড়ানোর কথা বলছে। তাড়িয়েও দিল। সে আর পরমা স্টেশনে বসে ভিক্ষা করছে।

কি হচ্ছে এটা অঞ্জন বুঝতে পারছে না। পরমাও জিজ্ঞাসা করল সেদিন, অফিসে কি চাপ চলছে? এত অন্যমনস্ক থাকো কেন সারাদিন?

বুড়োটা একটা অবসেশান হয়ে গেছে অঞ্জনের। সারাদিন ওর কথা ভাবে। ওকে দেখলেই মাথা থেকে পা অবধি জ্বলে যায়। কিন্তু তবু ওর সামনে দিয়েই আসা চাই তার।

একদিন বুড়োটা তাকে জিজ্ঞাসা করল, আজ দেরি হল যে?

মাথায় আগুন জ্বলে গেল অঞ্জনের। আজ সত্যিই অনেক দেরি হয়েছে। মিটিং ছিল। তাই বলে তুই জিজ্ঞাসা করবি?

সে কড়া স্বরে বলতে গেল, তাতে আপনার কি?

কিন্তু বলল, ওই আর কি।

মাথাটা ঝনঝন করছে। বাইকে বসে আশ্চর্য লাগছে তার, মনটা খুশি হল। কেন হল? তাকে চিনেছে বলে? এত চিপ ইগো তার?

ফেরার সময় পরমার জন্য চিকেন স্যান্ডুইচ নিল। ও ভালোবাসে।

এরপর থেকে মাঝেমাঝেই বুড়োর সঙ্গে অঞ্জনের কথা হয়। পুজো গেল। শীত আসছে। একদিন বুড়ো একটা কম্বল চাইল অঞ্জনের কাছে। অঞ্জন দিল। কিন্তু কেন দিল?

এখন মাঝে মাঝে অকারণে ছুটির দিনেও এটা ওটা ছুতো করে প্ল্যাটফর্মে যায়। দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুড়োকে দেখে। কখনো ওভারব্রীজ থেকে দেখে। একবার সাইকেলের দোকানের ছেলেটাকে দিয়ে তার পুরোনো কিছু জামাকাপড় পাঠিয়ে দিল। নিজে গেল না। কেন গেল না বুঝল না। আসলে নিজেকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না এখন অঞ্জন। নিজেকে থামাতেও পারছে না।

******** **********

পরমা, পরমার বাবা-মা আর সে কাশ্মীর বেড়াতে যাবে। একবার ঠাট্টা করে অঞ্জন বলল, ওই জেঠুকেও নিয়ে যাই?

পরমা এতদিনে চিনে গেছে। অঞ্জন ভীষণ খেয়ালি। তাই এটাও একটা খেয়াল হিসাবেই নিয়েছে সে। নইলে একজন ভিখারির জন্য এত কে ভাবে?

অঞ্জন যদিও বুড়োকে নিয়ে যাওয়ার কথাটা ঠাট্টার সুরেই বলল, তবু সে জানে যে সবটা ঠাট্টা নয়। তার ইচ্ছা করছে না ওকে রেখে যেতে।

কাশ্মীরে যাওয়ার আগের দিন ইচ্ছা করে অনেক রাত করে অফিস থেকে ফিরল। বুড়োর কাছে গিয়ে বলল, আসব না ক'দিন বুঝলেন। এই নিন। অঞ্জনের হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট। বুড়ো হাঁ করে তাকিয়ে তার দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে টাকাটা নিল, চোখ ভর্তি জল।

অঞ্জন তাড়াতাড়ি চলে এলো। রুমালে চোখের কোনাটা মুছে বাইক স্টার্ট করল। অনেক গোছানো বাকি, সব পরমা একাই সামলাচ্ছে।

****** *******

কাশ্মীর থেকে ফিরছে অঞ্জনরা। সন্ধ্যে হয়েছে খানিক আগেই। সবাইকে স্টেশানের বাইরে টোটোতে তুলে আবার স্টেশানে এলো অঞ্জন। বুড়ো নেই। শুনলো মারা গেছে তার ফেরার আগের দিনই।

অঞ্জনের বুকটা চাপ হয়ে গেল। নাকের কাছটা টাটাচ্ছে। ওভারব্রীজে উঠল। কাঁদতে জানে না। কিন্তু না কাঁদলে মারা যাবে এখনই… কাঁদতেই হবে। অঞ্জন একটা কোনে এসে, অন্ধকারে রেলিংটা ধরে মাথাটা নীচু করে দাঁড়ালো। বুকের ভিতর দিয়ে আগুনের গোলা ছুটছে। আচমকা মুখ থেকে "বাবা" শব্দটা বেরিয়ে এলো। সঙ্গে কালবৈশাখী কান্না। সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে বারবার…. "বাবা.. ফরগিভ মি... বাবা… মিস ইউ… বাবা…", বলেই যাচ্ছে। কোনো বাক্য পুরো হচ্ছে না। কান্নাটা দমকে দমকে বেরিয়ে আসছে। তার শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। হঠাৎ পিঠে হাত রাখল কেউ।

পরমা। সে কাঁদছে। কখন এসে দাঁড়িয়েছে?

পরমাকে জড়িয়ে বলল, আমি ভীষণ পাপী পরমা… ভীষণ নীচ….

এই গোটা গোটা বাক্য বেরোতে শুরু করল। পরমা বলল, প্রায়শ্চিত্ত করেছ তো..

অঞ্জন বলল, অনেক অনেক বাকি… সারাজীবন দিয়ে করলেও হবে না গো…. আমি বাবার চায়ের দোকানটা আবার খুলব… কাউকে বললে সে বসবে না? আমি ইনভেস্ট করব….

পরমা বলল, বেশ তো, তাই হবে।


No comments:

Post a Comment