Monday, May 16, 2022

৪০

 


বুদ্ধ পূর্ণিমার সন্ধ্যে কাটল আদিবাসীদের মধ্যে। বারবার স্মৃতিতে আসছে 'আগন্তুক' এর শেষ দৃশ্যের কথা। মমতাশঙ্করের অস্থির, অধৈর্য পায়ের কথা। সঙ্গে সেই মাদলের আওয়াজ। বুকের মধ্যে বারবার ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে, বলছে বাইরে আয়, বাইরে আয়।

সবার সঙ্গে সবার হাত ধরে ধরে নাচ চলছে। শয়ে শয়ে মানুষ। আদিবাসী বাৎসরিক মেলা। হাতে হাত ধরে নির্দিষ্ট ছন্দে নাচ। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।

আমি একটু সরে একটা বাচ্চাকে দেখছিলাম। ভিড়ে তার যাওয়ার অনুমতি নেই, মা শক্ত করে ধরে রেখেছে হাত। অল্প অল্প দুলছে তার শরীর। ছন্দে। কি আশ্চর্য, কেউ শেখাচ্ছে না, কিন্তু সাবলীলভাবে নেচে উঠছে পা। দুলে উঠছে কোমর। এটাই স্বাভাবিক। প্রাণের জিনিস প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে। কৃত্রিম যা তা অপেক্ষা করে আরোপিত হওয়ার।

আবার চোখ গেল চাঁদের দিকে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। আমার সামনে আসছে নাচতে নাচতে বিহ্বল জনতা। মাদল বাজছে পাঁচটা ছটা। সঙ্গে আরো বাদ্য। বুকের মধ্যে আবার উথলে উঠছে রক্ত। কিন্তু মনে পড়ছে বুদ্ধকে নয়। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, সেই কাঁচরাপাড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যে নদীয়া, সেই নদীয়াকে মাতিয়েছিল যে দুজন তাদের কথা। শুধু নদীয়া না, ভেসে গেল ভারত। গৌর নিতাইয়ের ডাকে রাস্তায় নামল মানুষ। শুধু ঘরের কোণে বসে ধ্যান আর জ্ঞান চর্চায় নয়, রাস্তায় নেমে সবার সঙ্গে মেলার রাস্তা দেখিয়েছিলেন তিনি। মিলতে না পারলে সব ব্যর্থ। আজ এই যে চেনা, অচেনা মানুষ হাত ধরে নাচের তালে তালে পূর্ণিমাস্নাত আকাশের নীচে, একি শুধুই উন্মাদনা? না। একজন ঘুমন্ত মানুষকে ডাকতে ধাক্কা দিতে হয় - নয় শব্দে, নয় শরীরে। এ সেই ধাক্কা। জড়ত্ব কাটানোর ধাক্কা। না জাগলে বাইরে আসা যাবে না। বাইরে না এলে হাত ধরা যাবে না। হাত না ধরলে হাত দুর্বল হয়। ক্রমে রিক্ত হয়, নিজের দীনতায় নিজেই শেষ হয়ে যায়।

আজ সত্যিই ধন্য হলাম। ফেরার পথে নামল বৃষ্টি। রেল স্টেশানে বসে। একদল তরুণ আদিবাসী ফিরবে শিয়ালদহ। বলল, ট্রেন থামবে এখানে? বললাম, না, এটা রেলের কারখানার স্টেশান। দূরে ওই যে আলো, ওখান থেকে পাবেন ট্রেন। ওটা কাঁচরাপাড়া স্টেশান।

ওরা যেতে যেতে বলে গেল, থ্যাংক ইউ।

ইংরেজি শব্দ। যারা খানিক আগেই নাচছিল তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যে তারাই বলে গেল।

খারাপ লাগল না। ভালোই লাগল। পুরানো যা, তাকে না মাড়িয়ে, তাকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগোলে ক্ষতি কি? তাছাড়া এই ভাষাটা না জানলে এখনও তো ভারতের অনেকেই শিক্ষিত মনে করে না। যারা আলোতে সাড়া না দেয়, তাদের চোখে ধাঁধা ধরালেই তাকায়। নইলে এতবড় উৎসবে সমাজে বাকি অংশের উপস্থিতি এত কম কেন? প্রচারই বা নেই কেন সে অর্থে?

একটা লিঙ্ক শেয়ার করলাম। Debasish এর তোলা ভিডিওর।


 

No comments:

Post a Comment