ফোন বুথের ভেতর দাঁড়িয়েই রাস্তাটা দেখা যায়। সকাল দশটা, কেউ নেই এখন তেমন রাস্তায়,
রবিবার সকাল। রাস্তার দু'দিকে বড় বড় ফ্ল্যাট।
ফোনটায়
রিং হচ্ছে। ধরবে?
-
হ্যালো
- আমি বলছি
আমার
কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু না বলে যাবই বা কোথায়। আজ না হয় কাল তো বলতেই হবে।
সামনের রাস্তায় একজন মাঝবয়েসী মহিলা, একটা বাচ্চার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে
যাচ্ছে। পিঠে ব্যাগ, পড়তেই যাচ্ছে হয় তো। হাসি পাচ্ছে। একটু রিলিফ লাগছে। নিজেদের
যত গুরুত্ব দেবে লাইফ তত কমপ্লিকেটেড।
- আমি
বলছি, আমার কিছু কথা বলার আছে আজ তোকে...
- হুম, কিন্তু ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করা ছাড়া আর তো কিছু জানিস না...
বাচ্চাটাকে
নিয়ে একটা বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মহিলাটি। একতলা বাড়ি, ছাদে ফুলের টব সাজানো,
যা! এই বাড়িটা তো খেয়ালই করিনি এতক্ষণ, এতগুলো ফ্ল্যাটের দিকেই চোখ আটকে ছিল।
- হুম,
জানি, আমি কাল তোর সাথে মিসবিহেভই করেছি, আমি আসলে ভীষণ পজেসিভ জানিস তো...
- শোন, আমাদের মধ্যে এই কথাগুলো আর না হোক দশ হাজারবার হয়েছে, তোর যদি নতুন কিছু
বলার থাকে বল, নয় তো আমি রাখছি, কলেজ আছে, ট্রেন মিস হবে
মহিলাটি
কলিংবেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে। বাচ্চাটার শক্ত করে হাতটা ধরে রেখেছে, বাচ্চাটা
নেচেই যাচ্ছে, হাতটা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।
- আসলে
আমি জানি না, মানে বুঝতে পারি না, রিলেশানে থাকলে বেশি ভালো থাকব, না তোকে ছেড়ে
দিলে...
দরজাটা
খুলে একজন মহিলা বেরোলেন। বয়স্ক। শালোয়ার কামিজ পরা। মাথায় মেহেন্দি করা,
চুলগুলোতে রোদ পড়ে লাল আভা ছড়িয়ে আছে মাথায়। ঠিক মাথার উপরেই একটা ল্যাম্পপোস্টে
বসে একটা কাক। যদি ঠিক টিপ করে হেগে দেয় মাথায়? লাল চুলে সাদা হাগা।
-
শুনছি, বলে যা...
- আমি অসুস্থ মৈত্রী.... আমি ঠিক কাউকে ভালোবাসতে পারি না...
বাচ্চাটা
জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নীচু হয়ে বসে একটা ঢিল তুলল, তারপর জোরে মারল সামনের
ফ্ল্যাটের নীচে বসে থাকা একটা কুকুরের গায়ে। কুকুর? এটা এতক্ষণ ছিল খেয়াল করিনি
তো। এত কিছু এড়িয়ে যায় কেন চোখের সামনে থেকে?
- আমি
কাউকেই ভালোবাসতে পারব না মৈত্রী... শুধু তুই বলে না... আমার মনের মধ্যে একটা অসুখ
আছে, তোকে বলিনি এতদিন, আজ সকালে উঠেই মনে হল আজ বলে দিই। হয়তো তোর থেকে কিছুটা
দূরে আছি বলেই পারব আজ, নইলে আবার মামাবাড়ি থেকে ফিরে সেই কলেজ, তুই, ল্যাব,
ক্লাস, টিউশন, সুপারফিসিয়াল ক্যাজুয়াল সেক্স... আমার আবার সব গুলিয়ে যাবে....
কুকুরটা
একটু দূরে গিয়ে আবার বসেছে। বাচ্চাটা আরেকটা ঢিল খুঁজছে। পাওয়া শক্ত, এগুলো
বড়লোকের পাড়া। রোজ ঝাঁটা পড়ে। ঢিল পাওয়া যায় না, নাকি চোখে পড়ে না। এর মধ্যে
কয়েকটা সাইকেল, দুটো বাইক গেল। সাইকেলের সংখ্যা মনে নেই, বাইক দুটো গেল, একটা
বুলেট, কি করে ব্রেন রেজিস্টার করল? মৈত্রী কি পরে এখন? ব্রেনের সেক্স সাজেশান....
একটু পরে আমি কম্প্রোমাইজ করতে চাইব, ওর সাথে না, নিজের সাথে না, রিয়েলিটির
সাথে.... রিয়েলিটি মানে ডিজায়ার... ফর প্লেজার.... আর্জ টু ইজ্যাকুলেট... হোয়ার?
বাচ্চাটা ঢিল পেল...
- কিসের
অসুখ?
- নাম জানি না। আমার নিজেকে এলিয়েন লাগে মাঝে মাঝে। এমনকি নিজের শরীরটাকেও মনে হয়
ফরেন। নিজের চিন্তাগুলোকে মনে হয় আনকন্ট্রোলেবল সামথিং... আমি আসলে আমি নই... আমি
একটা অ্যাসম্বলড কিছু... আমি জেনুইন নই মৈত্রী...
কুকুরটা
ঢিলটা দেখেই পালিয়েছে। দুই মহিলা কথা বলেই যাচ্ছে। কাকটা উড়ে গেছে। বয়স্কা মহিলা
কথা বলতে বলতে মাথা চুলকাচ্ছে, হেনা করলে মাথা চুলকায়? নাকি মুদ্রাদোষ? সমাজ মানে
একটা অলিখিত সেনশারশিপে বাঁচা। চারদিকে এত সেনসার করা কেন? মানুষ কি বাধ্য হয়ে
সভ্য হয়েছে, আসলে কি সে জংলী? তার সব সুখ কি তার জংলীপনাতেই? এই ফ্ল্যাটগুলো না
থেকে যদি এটা একটা জঙ্গল হত। ওই মহিলা দু'জন উলঙ্গ, ওই বাচ্চাটাও, ওটা কুকুর না,
একটা বাঘ, ঢিল না, ওর হাতে একটা তীর-ধনুক...
- আমি
আসলে জংলী মৈত্রী... সভ্য নই... আমার সভ্য ব্যবহার আসলে একটা মুখোশ...
নিষ্প্রাণ
বৌদ্ধিক উত্তেজনায় মানুষ নাগরদোলা হয়। ঘুরেই যায়, ঘুরেই যায়। আমি নাগরদোলা হব না,
ঢেউ হব। আমি ঝড় হব। আমি মাতাল হাতি হব। আমি ময়ূর হব। সভ্যতা মানে নাগরদোলার মেলা।
বাসি মেলা। অনেকদিন হয়েছে। বাসি খাবারের গন্ধ।
-
মৈত্রী আমি সব ছেড়ে চলে যাব
- সকালে কি খেয়েছিস?
- কিচ্ছু না
আমি
ছ'টা লুচি আর আলুর তরকারি খেয়ে বেরিয়েছিলাম ফোন করতে। তবু মিথ্যা বললাম, নইলে বাসি
সভ্যতায় সুখ নেই, চমক নেই। স্নায়ুরাও অসাড়। বয়স্কা মহিলা বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরের
ভেতর চলে গেলেন। আরেকজন মহিলা ফিরছেন। পিছনে একজন লোক, বাজার করে ফিরছে। লুঙ্গি আর
পাঞ্জাবি পরা। দু'জনেই হাঁটছে। কেউ কাউকে চেনে না, আবার চেনে না বলেই কোনো কৌতুহল
নেই। একই সময়, একই রাস্তা, একই মোড়, বাড়িগুলোর একই চেনা রঙ, আকাশে একই রঙ, বাতাসে
একই ধারাবাহিক গন্ধ। কৌতুহল কই?
- তুই
পলাশকে হ্যাঁ বলে দে। ও অনেক প্রমিসিং ছেলে। কিছু না কিছু করবেই ও জীবনে। আমি
কিচ্ছু করতে পারব না রে, কিচ্ছু না। আমি তা নই যা তোরা সবাই ভাবিস।
রাস্তাটা
ফাঁকা আবার। দুটো সাইকেল আর একটা স্কুটার গেল। এইবার সাইকেল রেজিস্টার করল ব্রেন।
যেহেতু পয়েন্টটা নোট করা গেছিল। চেতনা কি ক্যালকুলেটিভ না ক্যাজুয়াল, না কি
অপারচুনিস্ট?
- সেটা
আমার উপর ছেড়ে দে। তুই ব্রেক আপ চাইছিস তো?
- দেখ তোর গলাটা ভাবলেশহীন। আমি জানি তুই আমায় সিরিয়াসলি নিচ্ছিস না। আমি রিয়েলি
নরম্যাল নই মৈত্রী।
- আচ্ছা শোন, ধর আমি তোকে বললাম, আমি বাইসেক্সুয়াল? তুই শকড হবি না?
আমি
শকড হলাম না। ভালো লাগল। আসলে চমক লাগল।
-
রিয়েলি?
- সেটা ইস্যু না, তোর চমক লাগল না?
- না, মানে হ্যাঁ, রিয়েলি?
- দেখ তোর গলায় একটা ভাইটালিটি এসে গেছে, তুই এখন আবার অনেক বেশি কম্পোজড, নোস?
- হুম
আমি
কম্পোজড? তাই কি?
- পলাশ
ভালো ছেলে। বাট ইউ আর নট মাই অপশান, চয়েস।
- তুই ঘুরে আয়, কথা হবে, আমি রেডি হই, বেরোতে হবে...
- তুই সত্যিই....
- হতেও তো পারে.... আবার নাও.... বাট ইউ আর নাও ইন্টারেস্টেড অন মি সাম হাও...
- আমি তোকে কিন্তু রিয়েলি ভালোবাসি... আই মিন যখন আমি ফিল করি ইটস জেনুইন...
- তুই নিজেকে কন্ট্রাডিক্ট করছিস এবার... এটাই তুই... ফুল অব সেল্ফ
কন্ট্রাডিকশান... এটাই আমরা শান্তনু... আমরা সবাই, বাকিটা ন্যাচেরাল সিলেকশান....
রাখ গাণ্ডু এবার... মুয়ায়ায়ায়ায়া
রাস্তায়
লোক। কখন এলো এত মানু্ষ? আমি কি সত্যিই কম্পোজড ছিলাম এতক্ষণ? সত্যি? বুথের ভেতর
আমার ঘামের গন্ধ, এতক্ষণ খেয়াল করিনি, সিগারেটের প্যাকেটটা ফেলে এসেছিলাম, এখন
খেয়াল করলাম। এরকমভাবে কত জায়গায় নিজেকে রেখে আসছি? কত জায়গায়? কিন্তু মৈত্রী যা
বলল... হতে পারে?... না হওয়ার কি আছে... কিন্তু? জীবন মানে কিন্তু না তবু?
No comments:
Post a Comment