ভারতের হিন্দু সভ্যতার আজ সত্যিই বড় দুর্দিন। যে কোনো সভ্যতার এক, তপস্যার দিক থাকে,
আর দুই, আবর্জনার স্তূপ থাকে। সেদিন যে জঙ্গলের মধ্যে নানা বিষফলের সাথে পারিজাত ফুটেছিল,
আজ এমন মনে করা হচ্ছে যে সেদিনের সে জঙ্গলে বিষফল বা বুনোফল বলে যেন কিছুই ছিল না।
অনেকে আরো এগিয়ে গিয়ে সেই বিষফলের ফুলকেই পারিজাত বলে বিশ্বাস করাতে চাইছে। সাধারণ
মানুষের না আছে স্মৃতির দীর্ঘজীবন, না তো গভীর পাঠের ধৈর্য বা সময়। ফলে তারা ক্ষণে
ক্ষণেই বিস্মিত হচ্ছে, আহত হচ্ছে, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করছে, নিন্দামন্দ শাপশাপান্ত করছে।
হিন্দুধর্ম
বলতে আমরা যা বুঝি তার প্রধান দুটো ধারা হয়, এক দর্শনের দিক; দুই, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার
সাথে মিশে নানা লোকাচার, ধর্মাচার ইত্যাদি নানা আচারের দিক। আমরা কথার তোড়ে যাকে আচার-বিচার
বলে থাকি, সে আচার-বিচারের মধ্যে এখানে আচারের কথাই বেশি গুরুত্ব পায়।
একটা
অতি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে দেশের পত্রপত্রিকাগুলো নানা গোল পাকিয়েছে। হিন্দু মহাসভার একজন
বরিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যিনি বলেছেন মেয়েদের বেশি পড়াশোনাই হল বর্তমান সমাজের নানা বিরোধ-দ্বন্দ্বের
কারণ। কথাটা কিছু নতুন বলেননি। বাঙালি ভক্তকূল যারা প্রতিদিন এই কথাটা নিয়ে শয়ে শয়ে
আলোচনার সূত্রপাত করছেন, বা নিন্দা-তিরস্কার করছেন, তাদের একটু আমাদের আধুনিকতম অবতার
বলে যাকে মেনে নিচ্ছি, সেই রামকৃষ্ণদেবের জীবনী, কি তাঁর সহধর্মিনী সারদাদেবীর জীবনীর
কথাগুলো মনে করিয়ে দিতে চাইছি, যেখানে রামকৃষ্ণদেবও একই কারণে সারদাদেবীর পড়াশোনায়
বাধ সাধেন ও বলেন, রামায়ণ পড়ছ পড়ো, আর মহাভারত ইত্যাদি পাঠের দরকার নেই; কারণ, মেয়েদের
বেশি পড়াশোনা ভালো না। কার জন্য ভালো না? অবশ্যই সমাজের জন্য ভালো না। আরো মনে করে
দেওয়া যেতে পারে, হৃদে বলে যে ভাগ্নে ছিল রামকৃষ্ণদেবের তিনি সারদাদেবীর বই কেড়ে নিতেন।
কিন্তু এ-ও পাশাপাশি মনে রাখতে হবে এই সারদাদেবীই নিবেদিতাকে মেয়েদের স্কুলের জন্য
উৎসাহ জুগিয়েছিলেন শুধু না, বিয়ে করাটাকেই মেয়েদের একমাত্র ভবিতব্য, এমন কথাকেও অস্বীকার
করে শুধু পঠন-পাঠনে জীবন কাটানোটাকেও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
আমি
যারা বিদ্যাসাগরকে পড়েছেন, তাদের প্রত্যেককে বঙ্কিমবাবুর ‘সাম্য’ প্রবন্ধটা পড়ার অনুরোধ
জানাব। তিনি সমাজের নানা অসাম্যের আলোচনা করতে করতে শেষে আসেন আমাদের সমাজে স্ত্রী-পুরুষের
অসাম্যের ব্যাপারে, যে কয়েকটা দিক নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন তা হল –
"১ম। পুরুষকে বিদ্যাশিক্ষা
অবশ্য করিতে হয়; কিন্তু স্ত্রীগণ অশিক্ষিতা থাকে।
২য়। পুরুষের স্ত্রীবিয়োগ হইলে, সে পুনর্বার দারপরিগ্রহ করিতে অধিকারী। কিন্তু স্ত্রীগণ
বিধবা হইলে, আর বিবাহ করিতে অধিকারিণী নহে; বরং সর্বভোগসুখে জলাঞ্জলি দিয়া চিরকাল ব্রহ্মচর্যানুষ্ঠানে
বাধ্য।
৩য়। পুরুষে যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাইতে পারে, কিন্তু স্ত্রীলোকে গৃহপ্রাচীর অতিক্রম
করিতে পারে না।
৪র্থ। স্ত্রীগণ স্বামীর মৃত্যুর পরেও অন্য স্বামীগ্রহণে অধিকারী নহে, কিন্তু পুরুষগণ
স্ত্রী বর্তমানেই, যথেচ্ছ বহুবিবাহ করিতে পারেন।"
এই আলোচনার
এক জায়গায় বলছেন,
"প্রথম তত্ত্ব সম্বন্ধে,
সাধারণ লোকেরও একটু মত ফিরিয়াছে। সকলেই এখন স্বীকার করেন, কন্যাগণকে একটু লেখাপড়া শিক্ষা
করান ভাল। কিন্তু কেহই প্রায় এখনও মনে ভাবেন না যে, পুরুষের ন্যায় স্ত্রীগণও নানাবিধ
সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতি কেন শিখিবে না? যাঁহারা, পুত্রটি এম-এ পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ না হইলে বিষপান করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহারাই কন্যাটি কথামালা সমাপ্ত করিলেই
চরিতার্থ হন। কন্যাটিও কেন যে পুত্রের ন্যায় এম-এ পাশ করিবে না, এ প্রশ্ন বারেক মাত্রও
মনে স্থান দেন না। যদি কেহ, তাঁহাদিগকে এ কথা জিজ্ঞাসা করে, তবে অনেকেই প্রশ্নকর্তাকে
বাতুল মনে করিবেন। কেহ প্রতিপ্রশ্ন করিবেন, মেয়ে অত লেখাপড়া শিখিয়া কি করিবে? চাকরি
করিবে না কি? যদি সাম্যবাদী প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে বলেন, “কেনই বা চাকরি করিবে না?”
তাহাতে বোধ হয়, তাঁহারা হরিবোল দিয়া উঠিবেন। কোন বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি উত্তর করিতে পারেন,
ছেলের চাকরিই জোটাইতে পারি না, আবার মেয়ের চাকরি কোথায় পাইব? যাঁহারা বুঝেন যে, বিদ্যোপার্জন
কেবল চাকরির জন্য নহে, তাঁহারা বলিতে পারেন, “কন্যাদিগকে পুত্রের ন্যায় লেখাপড়া শিখাইবার
উপায় কি? তেমন স্ত্রীবিদ্যালয় কই?”
বাস্তবিক,
বঙ্গদেশে, ভারতবর্ষে বলিলেও হয়, স্ত্রীগণকে পুরুষের মত লেখাপড়া শিখাইবার উপায় নাই।
এতদ্দেশীয় সমাজমধ্যে সাম্যতত্ত্বান্তর্গত এই নীতিটি যে অদ্যাপি পরিস্ফুট হয় নাই—লোকে
যে স্ত্রীশিক্ষার কেবল মৌখিক সমর্থন করিয়া থাকে, ইহাই তাহার প্রচুর প্রমাণ। সমাজে কোন
অভাব হইলেই তাহার পূরণ হয়—সমাজ কিছু চাহিলেই তাহা জন্মে। বঙ্গবাসিগণ যদি স্ত্রীশিক্ষায়
যথার্থ অভিলাষী হইতেন, তাহা হইলে তাহার উপায়ও হইত।"
এটি
গেল শিক্ষা বিষয়ে। পুনর্বিবাহ নিয়ে লিখছেন এক জায়গায়,
"আর একটি কথা আছে।
অনেকে মনে করেন যে, চিরবৈধব্য বন্ধন, হিন্দু মহিলাদিগের পাতিব্রত্য এরূপ দৃঢ়বদ্ধ যে,
তাহার অন্যথা কামনা করা বিধেয় নহে। হিন্দু স্ত্রীমাত্রেই জানেন যে, এই এক স্বামীর সঙ্গে
সঙ্গে তাঁহার সকল সুখ যাইবে, অতএব তিনি স্বামীর প্রতি অনন্ত ভক্তিমতী। এই সম্প্রদায়ের
লোকের বিবেচনায় এই জন্যই হিন্দুগৃহে দাম্পত্যসুখের এত আধিক্য। কথাটি সত্য বলিয়াই না
হয় স্বীকার করিলাম। যদি তাই হয়, তবে নিয়মটি একতরফা রাখ কেন? বিধবার চিরবৈধব্য যদি সমাজের
মঙ্গলকর হয়, তবে মৃতভার্য পুরুষের চিরপত্নীহীনতা বিধান কর না কেন? তুমি মরিলে, তোমার
স্ত্রীর আর গতি নাই, এজন্য তোমার স্ত্রী অধিকতর প্রেমশালিনী; সেইরূপ তোমার স্ত্রী মরিলে,
তোমারও আর গতি হইবে না, যদি এমন নিয়ম হয়, তবে তুমিও অধিকতর প্রেমশালী হইবে। এবং দাম্পত্য
সুখ, গার্হস্থ্য সুখ দ্বিগুণ বৃদ্ধি হইবে। কিন্তু তোমার বেলা সে নিয়ম খাটে না কেন?
কেবল অবলা স্ত্রীর বেলা সে নিয়ম কেন?
তুমি
বিধানকর্তা পুরুষ, তোমার সুতরাং পোয়া বারো। তোমার বাহুবল আছে, সুতরাং তুমি এ দৌরাত্ম্য
করিতে পার। কিন্তু জানিয়া রাখ যে, এ অতিশয় অন্যায়, গুরুতর, এবং ধর্মবিরুদ্ধ বৈষম্য।"
অন্য
জায়গায় মেয়েদের নানা নিষেধের শিকলে আটকে রাখার বিষয়ে লিখছেন,
"কিন্তু পুরষের যত
প্রকার দৌরাত্ম্য আছে, স্ত্রীপুরুষে যত প্রকার বৈষম্য আছে, তন্মধ্যে আমাদিগের উল্লিখিত
তৃতীয় প্রস্তাব, অর্থাৎ স্ত্রীগণকে গৃহমধ্যে বন্য পশুর ন্যায় বদ্ধ রাখার অপেক্ষা নিষ্ঠুর,
জঘন্য অধর্মপ্রসূত বৈষম্য আর কিছুই নাই। আমরা চাতকের ন্যায় স্বর্গমর্ত্য বিচরণ করিব,
কিন্তু ইহারা দেড় কাঠা ভূমির মধ্যে, পিঞ্জরে রক্ষিতার ন্যায় বদ্ধ থাকিবে। পৃথিবীর আনন্দ,
ভোগ, শিক্ষা, কৌতুক, যাহা কিছু জগতে ভাল আছে, তাহার অধিকাংশে বঞ্চিত থাকিবে। কেন? হুকুম
পুরুষের।
এই প্রথার ন্যায়বিরুদ্ধতা এবং অনিষ্টকারিতা অধিকাংশ সুশিক্ষিত ব্যক্তিই এক্ষণে স্বীকার
করেন, কিন্তু স্বীকার করিয়াও তাহা লঙ্ঘন করিতে প্রবৃত্ত নন। ইহার কারণ, অমর্যাদা ভয়।
আমার স্ত্রী, আমার কন্যাকে, অন্যে চর্মচক্ষে দেখিবে! কি অপমান! কি লজ্জা! আর তোমার
স্ত্রী, তোমার কন্যাকে যে পশুর ন্যায় পশ্বালয়ে বদ্ধ রাখ, তাহাতে কিছু অপমান নাই? কিছু
লজ্জা নাই? যদি না থাকে, তবে তোমার মানাপমান বোধ দেখিয়া, আমি লজ্জায় মরি!
জিজ্ঞাসা
করি, তোমার অপমান, তোমার লজ্জার অনুরোধে, তাহাদিগের উপর পীড়ন করিবার তোমার কি অধিকার?
তাহারা কি তোমারই মানরক্ষার জন্য, তোমারই তৈজসপত্রাদিমধ্যে গণ্য হইবার জন্য, দেহ ধারণ
করিয়াছিল? তোমার মান অপমান সব, তাহাদের সুখ দুঃখ কিছুই নহে?
আমি
জানি, তোমরা বঙ্গাঙ্গনাগণকে এরূপ তৈয়ার করিয়াছ যে, তাহারা এখন আর এই শাস্তিকে দুঃখ
বলিয়া বোধ করে না। বিচিত্র কিছুই নহে। যাহাকে অর্ধভোজনে অভ্যস্ত করিবে, পরিশেষে সে
সেই অর্ধভোজনেই সন্তুষ্ট থাকিবে, অন্নাভাবকে দু্খ মনে করিবে না। কিন্তু তাহাতে তোমার
নিষ্ঠুরতা মার্জনীয় হইল না। তাহারা সম্মত হউক, অসম্মতই হউক, তুমি তাহাদিগের সুখ ও শিক্ষার
লাঘব করিলে, এজন্য তুমি অনন্ত কাল মহাপাপী বলিয়া গণ্য হইবে।"
পরিশেষে
লিখছেন,
"এই তিনটি বিঘ্ন নিরাকরণের
একই উপায়—শিক্ষা। লোকে সুশিক্ষিত হইলে, বিশেষতঃ স্ত্রীগণ সুশিক্ষিতা হইলে, তাহারা অনায়াসেই
গৃহমধ্যে গুপ্ত থাকার পদ্ধতি অতিক্রম করিতে পারিবে। শিক্ষা থাকিলেই, অর্থোপার্জনে নারীগণের
ক্ষমতা জন্মিবে। এবং এ দেশী স্ত্রীপুরুষ সকল প্রকার বিদ্যায় সুশিক্ষিত হইলে, বিদেশী
ব্যবসায়ী, বিদেশী শিল্পী বা বিদেশী বণিক্, তাহাদিগের অন্ন কাড়িয়া লইতে পারিবে না। শিক্ষাই
সকল প্রকার সামাজিক অমঙ্গল নিবারণের উপায়।
আমরা
যে সকল কথা এই প্রবন্ধে বলিয়াছি, তাহা যদি সত্য হয়, তবে আমাদিগের দেশীয় স্ত্রীগণের
দশা বড়ই শোচনীয়া। ইহার প্রতিকার জন্য কে কি করিয়াছেন? পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর ও ব্রাহ্মসম্প্রদায় অনেক যত্ন করিয়াছেন—তাঁহাদিগের যশঃ অক্ষয় হউক; কিন্তু
এই কয় জন ভিন্ন সমাজ হইতে কিছুই হয় নাই। দেশে অনেক এসোসিয়েশন, লীগ, সোসাইটি, সভা, ক্লাব
ইত্যাদি আছে—কাহারও উদ্দেশ্য রাজনীতি, কাহারও উদ্দেশ্য সমাজনীতি, কাহারও উদ্দেশ্য ধর্মনীতি,
কাহারও উদ্দেশ্য দুর্নীতি, কিন্তু স্ত্রীজাতির উন্নতির জন্য কেহ নাই। পশুগণকে কেহ প্রহার
না করে, এজন্যও একটি সভা আছে, কিন্তু বাঙ্গালার অর্ধেক অধিবাসী, স্ত্রীজাতি—তাহাদিগের
উপকারার্থ কেহ নাই। আমরা কয় দিনের ভিতর অনেক পাঠশালা, চিকিৎসাশালা এবং পশুশালার জন্য
বিস্তর অর্থব্যয় দেখিলাম, কিন্তু এই বঙ্গসংসাররূপ পশুশালার সংস্কারণার্থ কিছু করা যায়
না কি?"
এতগুলো
উদ্ধৃতি দেওয়ার কারণ কি? আমি এইটাই বলতে চাই যে আমাদের শুধু আবর্জনাই ছিল তা নয়, সেই
আবর্জনা পরিষ্কারের চেষ্টাও ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ধর্মতত্ত্ব’, ‘কৃষ্ণচরিত্র’ সেই সাক্ষ্য
বহন করে যেখানে তিনি তাঁর সমস্ত ধীশক্তি, বিচারশক্তি, শিক্ষা ইত্যাদি দিয়ে লড়াইয়ে নামছেন।
এককথায় যাকে আমরা ‘সমাজসংস্কারক’ ইত্যাদি বলে থাকি। যদিও আজকের বাঙালি ঘরের নানা বিশ্ববিদ্যালয়
ফেরত রমণীকূলের আগ্রহে পুষ্ট অত্যাধুনিক তত্ত্বে নিপুণ ধারাবাহিকগুলোর ব্যাখ্যা কি
করতেন সাহিত্যসম্রাট বলা শক্ত, কিন্তু সে অন্য কথা।
তবে
শুধু কি বঙ্কিম? নিশ্চয় না, 'ভারতের নবজাগরণ' বলে একটা কথা কথা প্রচলিত আছে। আমার কথাটার
সাথে খুব একটা সম্মতি নেই। পাশ্চাত্যে যা হয়েছিল তা অবশ্যই নবজাগরণ, কিন্তু ভারতে সেদিন
রামমোহনের হাত ধরে যা হয়েছিল, তা কি নবজাগরণ, না পুনর্জাগরণ? রামমোহন তথা বিদ্যাসাগর,
বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নিবেদিতা, রমণ মহর্ষি, গান্ধী, অরবিন্দ, দয়ানন্দ
ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজে যে প্রাণের ঢেউ এসেছিল সেকি পাশ্চাত্যের কোনো তত্ত্বে? না তো।
রামমোহনের মননে উপনিষদের তত্ত্ব, ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠায় নতুন রূপ ধারণ করেছিল। ক্রমে
আমাদের সভ্যতায় পাশ্চাত্যের নানা আলোকিত দিক এসে নিজের জায়গা করে নেয়। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের
মধ্যে একটা যোগসূত্র হয় জ্ঞানের, বিদ্যার, দর্শনের। ভাবজগতের আদান-প্রদানের পথ খোলে। সংস্কার শুরু হয়েছিল
এ সবের পথ ধরে। রাধাকৃষ্ণান যেমন বলছেন যে, এই মেলবন্ধন ছাড়া কোনো সভ্যতা উন্নত হতে
পারে না। আজ যদি সেই যুগের ঋষিরা এসে দেখে আমরা তাদের দাগের উপর দাগই বুলিয়ে চলেছি,
সেকি খুব গর্বের কথা হবে? না তো। যে গীতা, যে উপনিষদ ঘোষণা করে যে সমস্ত পুস্তকস্থিত
তত্ত্ব মৃত, সত্যের পথে বাধাস্বরূপ, সে ঋষিরা নিশ্চয় আমাদের বিচার-পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে
অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র শব্দের বেড়ি পরে জীবনযাপন করতে শেখাননি? যদিও সে পথে ভারত হাঁটেনি
বেশিদিন, বারবার নানা ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা জনজীবনকে আটকে ধরেছে, আবার নতুন করে স্রোতকে
জাগিয়ে তোলার কেউ না কেউ এসেছে।
এগুলো
গেল অতীতের কথা। আজ যখন কেউ বলছে, ঋতুমতী স্ত্রী-র কুকুর হয়ে জন্মানো বিধান, তখন বুঝতে
হবে তারা সেই আবর্জনার ধারক-বাহক যারা মাথা তুলে দেখতে শেখেনি। ভারত বলে নয়, সভ্যতার
প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মের ক্ষেত্রে ঋতুমতী হওয়াকে সাদরে গ্রহণ করা হয়নি। হয় তো ভারতে
নানক, সারদাদেবী ছাড়া তেমন বিশেষ কাউকে চোখেও পড়ে না যারা এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবে
দেখেছেন। অনেক অল্পবয়েসি মেয়ে আজও শীতের মধ্যে এক কাপড়ে মেঝেতে শুয়ে নিজের এই অভিশপ্ত
সময়কে কাটানোর জন্য প্রাণ অবধি বিসর্জন দিয়েছে, এ-ও আমরা জানি। এ লোকাচার।
এখানে
উপায় কি? বাছতে শেখা। কে শেখাবে? আমাদের অতীত ও বর্তমানের পরিশ্রমী, সৎ মানুষেরাই।
অরিন্দম চক্রবর্তী মহাশয় যখন সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের কথা লেখেন, বলেন, যিনি বিদেশী
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, বর্তমান যুগের অনুকূল করে ভারতের দর্শনকে বোঝাতে যান,
তিনি সীতারামদাসের বর্ণাশ্রম নিয়ে মতামতকে সমর্থন করে তার ব্যাখ্যা খুঁজে কালপাত করেন
না। বিবেকানন্দ যেমন বলেন, উপনিষদে অনেক অবান্তর শ্লোক আছে, সেগুলো বলি না, বেছে নিই।
তাঁর গুরু যেমন বলতেন, বালিতে চিনিতে মেশানো আছে, বেছে নিতে। “ল্যাজা মুড়া বাদ দিয়ে
নাও” – এই যে উদারতা, এর শিক্ষাটা আজ মাঠে মারা যাচ্ছে। এক পক্ষের কাছে সবটাই নিন্দনীয়,
সবটাই দূষণীয়, আরেক পক্ষের কাছে সবটাই গ্রহণীয়, সবটাই পূজনীয়। এরা দু'জনেই ভয়ঙ্কর।
আর আজ এরা দু'জনেই মুখোমুখি। কোনো ধর্মগুরুর ছবি নিয়ে, কয়েকটা বাছাবাছা উদ্ধৃতি নিয়ে
অত্যন্ত নোংরা ভাষায় অকথা, কুকথা লিখে কেউ নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করছেন, অন্যদিকে কেউ
একজন দেবতার ছবি না শেয়ার করলে কি কি বিপদ হবে সেই কথা শেয়ার করছেন। দু'জনেই একই দোষে
দুষ্ট, গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কম, সেই ক্ষমতাকে পাঠের মাধ্যমে পূরণ করে নেওয়ার
সদিচ্ছাহীনতা। সস্তায় বাজিমাতের চেষ্টা সব দিকে। আরে ভাই পুরাকালে কোনো বইতে কি মানুষে
পুরাকালের গন্ধ থাকবেই, সে বিষয়ে অবগত থাকা আবশ্যিক, কিন্তু শুধু সেইটুকুই আছে বলে
তাকে হাটে এনে নিজের গায়ে সেই কাদা মেখে ঘুরে বেড়ানোটা যেমন মূর্খামি, তেমন তাকেই ধ্রুবসত্য
বলে মেনে নিয়ে প্রচারে নামাটাও পাগলামি।
মাঝের
পথে হেঁটে আজকের আবর্জনা পরিষ্কারের বড় বেশি দরকার। অবশ্যই সেই পুরোনো সূত্রে, যা বিবেকানন্দের
ভাষায়, অন্ধকার অন্ধকার বলে চীৎকার করলে কিছু হবে না, আলো আনলে অন্ধকার এমনিই যাবে।
No comments:
Post a Comment