ভয় পাচ্ছি, ভীষণ সত্যি কথা। ভীষণ ভয় পাচ্ছি। আতঙ্কের ছবি দেখছি,
মানুষজন বিনা অক্সিজেনে রাস্তায়-ঘাটে ছটফট করে মারা যাচ্ছে। মারা যাচ্ছি কোনো একটা
অপরিচিত ঘরে, একা, অপরিচিত আপাদমস্তক ঢাকা কিছু মানুষের সামনা সামনি। কোনো প্রিয়জন
পাশে নেই। একা একা চলে যাচ্ছি এই সমস্ত কিছু নিজের, আপন বলতে যা কিছু ছেড়ে। নয় তো প্রতিদিন
খবর পাচ্ছি এক একজন কাছের মানুষের, প্রিয় মানুষের মৃত্যুর। জানছি আমার অপ্রিয় মানুষটারও
চলে যাওয়ার খবর। আমিও দিন গুনছি। আমিও হতাশ হচ্ছি। নিজের হাতদুটো শত্রু এখন, কারণ ওরা
জীবাণুকে আমার অজ্ঞাতে আমার চোখ-নাক-মুখ দিয়ে শরীরের ভিতর চালান করে দেওয়ার ক্ষমতা
রাখে। বারবার ধুয়ে আসছি। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছি, যেন ভালো করে তাকালেই দেখা যাবে
জীবাণুদের। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ভয়, দুধের প্যাকেট হাতে নিয়ে ভয়, পরিচিত মানুষ ঘরের
দরজা পেরিয়ে ভিতরে এলে ভয়, প্রতিবেশীর হাঁচি-কাশির শব্দ শুনলে ভয়। আর সারাক্ষণ নিজেকে
বলে চলা – আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারপরেই নিউজ খুলে বসে পড়া – মৃতের সংখ্যা
গুনে যাওয়া, আক্রান্তের সংখ্যা গুনে যাওয়া, গ্রাফে চোখ রেখে দ্বিতীয় না তৃতীয় সপ্তাহে
পড়লাম সেই হিসাব রাখা, কোন স্টেজে আছি সেই খবর রাখা – এ সবই নাকি আমরা করে চলেছি বিনা
আতঙ্কে।
সারা পৃথিবী জুড়ে সব মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ানোর
নির্দেশ। মানুষ বড্ড কাছাকাছি চলে এসেছিল – ভালোবেসে না, প্রতিযোগীর স্পর্ধা নিয়ে।
ভীষণ হিংসা, অসহিষ্ণুতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম আমরা
অপরাজেয়। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, আমাদের ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সাহিত্য,
আমাদের সিনেমা, আমাদের রাজনীতি, আমাদের সভ্যতা – সব কিছু ক্ষমতাবান প্রতিযোগী এই বিশ্বে
প্রথম স্থান অধিকারের মোকাবিলায়। আমরা প্রত্যেকে রেসের ঘোড়ার মত যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে
বাঁশির অপেক্ষা করছিলাম। যেন সমস্ত প্রস্তুতি সারা। আমাদের হাতে অঢেল সময় শত্রুতা-শত্রুতা
খেলায়। ভালোবাসায় খেলা জমে না, ওতে কেবল দায় বাড়ে।
হঠাৎ সব কিছু
কালো হয়ে গেল। রেসের ঘোড়ারা বাঁশির আওয়াজে দৌড় লাগাতে শুরু করতে না করতেই গেল থমকে।
সামনে পথ বন্ধ – মৃত্যুপুরীর থেকে সৈন্য নেমেছে রাস্তায় শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে – রেস
বন্ধ।
হাতে হাত রাখা সোজা, কিন্তু হাতে হাত না রেখে
নিজেকে দূরত্বে রেখে নিজের দায়িত্ব পালন করা সোজা নয়। কিন্তু উপায় নেই। প্রবৃত্তিকে
লাগাম পরানো সোজা নয়। নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখার অভ্যাস করানো হয়নি, দৌড়ের অভ্যাস করানো
হয়েছে। সেদিন এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ফেসবুকের পোস্টে দেখলাম, আপনারা বাড়ির ভিতরে থেকে
প্রার্থনা, জপ, পূজো করে চলুন, কোনো দরকার নেই মঠে, মিশনে আসার। কথাটা শুনে আমার বহুকাল
আগে শোনা স্বামী আত্মস্থানন্দজীর কথা মনে পড়ল। শীতের সকালে একজন মানুষ এসে বসেছেন ওনার
সামনে, খুব দুঃখের সাথে জানাচ্ছেন যে ওনার মঠে আসার শক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে। আত্মস্থানন্দজী
ফিসফিস করে কথা বলতে পারতেন না, বেশ জোরের সাথে বলে উঠলেন, কি মুশকিল, আপনি আসবেনই
বা কেন? আপনি বাড়ি বসে যা করার তাই করে যান না, আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাই
এই মঠে মিশনে পড়ে থাকি।
ওনার বলার মধ্যে এমন একটা মজার ভাব ছিল যে আশেপাশে
সবাই হেসে উঠলেন, এমনকি সেই কাতর মানুষটাও। তারপর আবার মহারাজজী বললেন, আসলে কি জানেন
তো, বিশ্বাস আর আনন্দই আসল কথা, সে আপনি যদি নিজের মনের মধ্যে খুঁজে নিতে না পারেন
তবে কোথাতেও নেই। ভূতেশানন্দজী কি বলতেন? গুরুকে কোথায় ধ্যান করতে বলা হয়েছে? এই মঠে
একটা চেয়ারে বসে আছেন? নাকি নিজের মধ্যে? নিজের মনের মধ্যে শান্ত হোন, তবে আর বাইরে
ছুটোছুটির দরকার হবে না।
নিজের মনের মধ্যে শান্ত হোন – কি বড় কথা, কি
যুগের সাথে বৈসাদৃশ্য কথা। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, তুমি যদি নিজের মধ্যে সে শান্তিকে না
খুঁজে পাও তবে কোনো পাহাড়ের গুহাতেও পাবে না। বিবেকানন্দ বলছেন, তুমি যদি এই নিউ ইয়র্কের
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে মনের মধ্যে হিমালয়ের গুহার প্রশান্তি অনুভব করতে না পারো, তবে
তুমি কর্মযোগী হতে পারলে না। রমণ মহর্ষি বলছেন, সমস্ত ধর্মের সার কথা হল – BE
STILL.
কিন্তু আমাদের আজ প্রশ্ন, আমাদের যে বলা হচ্ছে
আমাদের দুই সপ্তাহ ঘরে থাকতেই হবে, আমরা থাকব কি নিয়ে? যদি বলি নিজেকে নিয়ে, তবে তার
কোনো স্পষ্ট অর্থ হবে না। আমায় বলতে হবে বই নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, মদ নিয়ে, পরিবার নিয়ে
ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের বই থেকে সিনেমা – সব কিছুই তো একটা বিশ্রামের, অবসরের
উপাদান। আমরা তো বই পড়ব বলে অফিস কামাই করি না, আমরা তো বাড়িতে বসে সিনেমা দেখব বলে
পেশাকে ফাঁকি দিয়ে বসে থাকি না। আমরা তো পরিবারের সাথে সময় কাটাবো বলে নিজেকে সব কিছু
থেকে গুটিয়ে নিয়ে, স্মার্টফোনকে দূরে সরিয়ে বসে থাকি না। যদিও আমরা সবাই জানি সেটা
আমাদের করা কর্তব্য। যদিও আমরা দশ মিনিট মোবাইল থেকে দূরে সরে কারোর সাথে কথা বলে নিলে
নিজেকে ক্ষুদিরামের থেকে বড় আত্মত্যাগী মনে করে বসি।
তবে এ কোন অবসর? এ তো অবসর নয়। এ তো ভয়যাপন।
নিজেকে প্রাত্যহিক জীবন থেকে সরিয়ে এনে ভাইরাসের মানুষী যোগসূত্রটাকে ছিন্ন করার প্রয়াস।
কিন্তু ভয় কতক্ষণ মানুষকে কোনো কাজে মোটিভেট করে? তারপরেই তো আসে অবসাদ। হ্যাঁ, তাও
শুরু হয়েছে, ক্রমে অবসাদ এক গভীর বিষন্নতায় মনকে গ্রাস করতে চাইছে। মুশকিল হল, বিষাদের
পরের ধাপ – বেপরোয়তা। ভয় থেকে বিষাদ, বিষাদ থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠা – এ অভিব্যক্তি খুব
স্বাভাবিক। তবে যদি বলি আমি ঘরে আছি – কারণ আমার সাবধানতা? এই শব্দটাতেও একটা সমস্যা
আছে। ‘সাবধান’ শব্দটা ভয় শব্দের ভ্রাতা। একে অন্যকে ছেড়ে থাকে কি করে?
তবে শুধু ভয়ে হবে না, শুধু সাবধানতায় হবে না।
এর পরের ধাপ হবে, বাইরে থেকে বলপ্রয়োগ। অর্থাৎ, বাইরে বেরোলেই দণ্ড। এই ভয়কে মানুষ
মেনে চলবে, কারণ একে সে বলবে শাসন। ভয় যখন একটা নির্দিষ্ট আকারে, নির্দিষ্ট প্রোটোকলের
বাইরে থেকে আসে, তখন তাকে বলে শাসন। সেখানে তার বিষাদ নেই, সেখানে তার নিরাপত্তাবোধ।
আজ যদি বলা হত বাইরে বেরোলেই জরিমানা কিম্বা জেল – তবে যে ক’জন মানুষ আজ মানসিক চঞ্চলতা,
কৌতুহল, একঘেয়ে ইত্যাদির তাড়নায় বাইরে এসেছে তাদের দেখা পাওয়া ভার হত।
বাইরের শাসন অথবা ভয় – এই দুইয়ের হাত থেকে সরে
নিজের মধ্যে ফিরে এসে শান্ত হয়ে, এই ক’দিন সমাজকে সুস্থ হতে সাহায্য করছি, সাথে নিজের
সুরক্ষাও বাড়াচ্ছি, এই ভাবনায় দাঁড়ালে কোনো ক্ষুব্ধতা ছাড়াই কাটানো সম্ভব হবে। সবাই
ভালো থাকলে, সুস্থ থাকলেই যে আমিও ভালো থাকি, সুস্থ থাকি – এই সামাজিক বোধটা জন্মে
গেলে তখন আর অতিরিক্ত সঞ্চয় করে দুর্দিনে শুধুমাত্র আমি ভালো থাকব, এরকম একটা অদ্ভুত
বিকার থেকে মন মুক্ত হয়, সবল হয় প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করতে। তখন নিজেকে
সুরক্ষিত রাখার দায় শুধুমাত্র রাষ্ট্রের হাতে না দিয়ে নিজেও নেওয়া যায়। নেতা-মন্ত্রীর
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার করা ছাড়া আনুষঙ্গিক এত কাজ এসে ভিড় করে রাখে যে কুলিয়ে ওঠা
যায় না।
যখন বুঝছি আমার দেশ-ধর্ম-সাহিত্য-কৃষ্টি-চলচ্চিত্র-রাজনীতি
ইত্যাদি সমস্ত’র গর্বটার ধারক-বাহক আমার প্রাণ, আর সেই প্রাণই আজ বিপন্ন, আর সে না
থাকলে সবটাই অন্ধকার – তখন লড়াইয়ে নাম লিখিয়েই ফেলি। বাকি সব আবার গড়ে নেওয়া যাবে পরে,
আগে নিজেকে আর নিজের চারপাশকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস চালাই। আস্তিক হও কিম্বা নাস্তিক,
বামপন্থী কিম্বা ডান কিম্বা ঊর্ধ্ব-অধঃ যে কোনো পন্থী, মন্ত্র বলো, স্লোগান বলো – একটাই
কথা – “অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে / ধর্ম বলে জানিস তাকে।” কার্যসিদ্ধি শুধু বলন ঠিক করলেই
হবে না তো, চলনটাই আসল, ওটাই ঠিক করতে হবে, কারণ, ভাইরাস মুখের ভাষা বোঝে না, শরীরের
ভাষা বোঝে।
No comments:
Post a Comment