যখন স্কুলে যেতাম রাস্তার ধারে এক বিরাট গাছ পড়ত। কি সে গাছ আমার নাম জানা নেই। একটা
নাম হয়ত বানিয়ে লিখে দেওয়া যেত, কিন্তু কি দরকার, গাছের ছায়ার তো কোনো নাম হয় না। এই
গাছটাও ছিল তেমন। সে গাছে কোনোদিন ফুল, ফল দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু ছায়াটা মস্ত
করে পড়ত, কিছুটা রাস্তায় আর কিছুটা ঘাসে। গরমের দিনে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম কোনো
ফেরিওয়ালা, কোনো রিকশাওয়ালা, কোনো ভিখারি, কোনো দিনমজুর সে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে।
কেউ গামছাটাকে পাকিয়ে মোটা করে মাথার তলায় দিয়ে ঘুমাচ্ছে, কেউ রিকশাতেই সিটে বসে পা’টা
সামনে টানটান ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে, কেউ গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে বিড়ি খেতে খেতে অন্যমনস্ক হয়ে
আছে – এক একদিন এক এক রকম দৃশ্য।
মানুষের
জীবনে অনেক না-মানুষী আত্মীয়তা থাকে। সে আত্মীয়তাগুলো এমন দাবিহীন নিস্তব্ধ যে তাদের
আলাদা করে চোখে পড়ার জো নেই। কিন্তু তারা আছে। পশুপাখি-বারান্দা-দালান-মাঠ-পথ-গাছ-রাস্তার
আলো-বাথরুমের কল-ছাদের ফাটা দাগ-কার্ণিশের ভাঙা ইট এরকম এত অজস্র অলক্ষ্য আত্মীয়তায়
জড়িয়ে আমরা যে প্রত্যেককে আলাদা করে উল্লেখ করা সম্ভব হয় কই? আমার মন খারাপ হলে তাদেরও
মুখ ম্লান হয়, মন ভালো থাকলে তারাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
এ গাছটার
সাথেও দীর্ঘদিন যাতায়াতে আমার একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল। যেদিন কেউ নেই তার ছায়ায়,
ফাঁকা রাস্তা আলস্যে শুয়ে আমার সামনে, আমি রাস্তা থেকে নেমে সে গাছটার নীচে এসে দাঁড়াতাম,
তার গায়ের ফাটা ফাটা ছালের ভিতর দিয়ে যাওয়া পিঁপড়ের সার দেখতাম, কি তাদের যাওয়ার তাড়া।
গাছের উপরে বসে থাকা কাকের ক্লান্ত ডাক শুনতাম, কাকে ডাকছে এই খাঁ খাঁ দুপুরে ঠাহর
করতে পারতাম না, মাথা তুলে এদিক ওদিক অন্য কোনো কাককে খুঁজে দেখতাম। কোনো কাককে না
দেখতে পেলে মনে হত হয়ত আমার উপস্থিতি তার নিশ্চিন্ত বিশ্রামে ব্যাঘাত আনছে, তাই সে
জানাচ্ছে, কিম্বা আনন্দ পাচ্ছে। খানিক দাঁড়িয়ে আবার বাড়ির পথে রওনা দিতাম।
একবার
স্কুল থেকে ফিরছি, ঘন কালো করে মেঘ এলো। যদিও ছাতা সাথে কিন্তু এমন জোর বৃষ্টি এলো
যে সে গাছের তলায় না দাঁড়িয়ে যাই কোথায়। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে, তাও এমন জোরে ছাঁট বৃষ্টির
যে ভিজেই যাচ্ছি। তখন হাফপ্যান্টের বয়েস, পিঠের ব্যাগ গাছের সাথে ঠেসিয়ে প্রাণপণে নিজেকে
বাঁচাতে চেষ্টা করছি। গাছের গায়ে পিঁপড়ের সেই সারি নেই। গাছের মাথায় কোনো কাক নেই।
রাস্তা, মাঠ বৃষ্টির প্রবল ধারায় ঝাপসা। হঠাৎ কি খেয়াল হল পিঠের ব্যাগটা গাছের একটা
নীচু ডালে ঝুলিয়ে মাঠে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে হল সমস্ত আকাশ যেন আমাকে ভেজাবে বলেই এমন
বৃষ্টির আয়োজন করেছে, যেন এতক্ষণ আমায় খেলায় ডাকবে বলেই অপেক্ষা করছিল। মাঠে চিৎ হয়ে
শুয়ে চোখটা বন্ধ করে দিলাম। কান ভাসিয়ে সেকি প্রবল শব্দ। মনে হচ্ছে কোথায় যেন ভেসে
চলে যাচ্ছি। একবার চোখ মেলে দেখলাম আমার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ভীষণ হাওয়ায় আর প্রবল
জলের ধারায় গাছটা হেলে দুলে কি আনন্দে স্নান করছে। আমি শুয়ে, সে দাঁড়িয়ে এই যা তফাৎ।
আমি চাইলেই ছুটে তার কাছে চলে যেতে পারি, কিন্তু সে আমার কাছে আসতে পারে না। কিন্তু
এই মুহূর্তের আনন্দ আমাদের দুজনেরই। হঠাৎ করে দেখি একটা কাক কোত্থেকে ভিজে স্নান করে
মগডালে বসে ভীষণ কোলাহল বাধিয়ে দিল। এ সেই আমার পরিচিত কাক কিনা কে বলবে। কিন্তু তার
অমন কর্কশ ডাক শুনেই মনে হল, তাই তো, এইবার তো বাড়িতে ফিরতে হবে। পিঠে ব্যাগটা নিয়ে
ছুটলাম বাড়ির দিকে, ছাতা খোলার আর দরকার হল না।
সেদিন
রাতে ভীষণ ঝড় শুরু হল। সারারাত কারেন্ট এল না। কেউ কেউ বলল অনেক জায়গায় তার ছিঁড়ে গেছে,
কারেন্ট আসতে নাকি দুদিন লেগে যেতে পারে। সারাটা রাত ধরে সেকি বাজ, সেকি ঝড়ের আওয়াজ।
আগে ভাবতাম ঝড়ের সোঁ সোঁ আওয়াজ বুঝি লেখকেরা এমনি এমনি বানিয়েছে। সেইদিন রাতে প্রথম
জেনেছিলাম তা তো নয়, ঝড় নিজেই এ আওয়াজ বানিয়ে লেখকদের কলমে পৌঁছিয়েছে।
পরেরদিন
স্কুলে যাওয়ার সময় দেখলাম সে গাছটা মাটি থেকে উপড়ে মাঠের উপর শুয়ে। মাটির মধ্যে বিশাল
গর্ত। মোটা মোটা শিকড়গুলো তারের মত জড়াজড়ি করে। কত লোক ভিড় করে গর্তটার দিকে দেখছে।
আমিও গিয়ে মাথা নীচু করে তাকালাম, গর্তটার মধ্যে জল। জলের মধ্যে কিছু পিঁপড়ে ভাসছে।
আকাশের আর অনেক মানুষের মাথার ছায়া টলটল করছে নোংরা কাদাগোলা জলে। আমার বুকটা মোচড়
দিয়ে উঠল, কান্না পেল। আমি বললাম এ গাছটাকে আবার সোজা করে বসিয়ে দেওয়া যায় না?
কেউ
শুনল না, সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। স্কুলের দিকে এগোতে লাগলাম। ইচ্ছাই করছে না।
মনে হচ্ছে মাঠে বসে গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকি। লোকগুলো সব চলে যাক। তবু যেতেই হল স্কুলে।
ফেরার পথে দেখলাম লোকজন নেই, গাছটা উপুড় হয়ে শুয়ে। যে ডালটা সব চাইতে উপরে ছিল গাছটার
সেই ডালটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাঠের উপর কেমন শুয়ে। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। একটানা দাঁড়িয়ে
দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে। কত ডাল মুচড়ে ভেঙে রয়েছে। পাতা ছড়িয়ে চারদিকে। কয়েকটা ছাগল অন্যদিকে
কচ কচ করে পাতা চিবিয়ে যাচ্ছে। আকাশটা তখন আবার মেঘলা হচ্ছে। বাড়ি ফিরে গেলাম।
এরপর
ধীরে ধীরে গাছটা কাটা হল। ক্রমে নিঃশেষ হয়ে গেল গাছটা। মাঠে কয়েকটা শুকনো ভাঙা ডাল
আর আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা গর্তটা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না গাছটার।
সংসারে অনেকটা রাস্তা হাঁটা হল। অনেক গাছ উপড়াতে
দেখলাম। অনেক ছায়া হারিয়ে ফেললাম। অনেককে ছায়াহীন হতে দেখলাম। নিজেই নিজের ছায়া হয়েছি,
এমন বড় মিথ্যা কথাটা নিজেকে কোনোদিন বলিনি, আজও বলি না। সেই উপড়ানো গাছগুলোর ক্ষতগুলোর
সামনে এসে দাঁড়াই। আকাশের দিকে তাকাই। মাটিতে এত ক্ষত, আকাশে বিন্দুমাত্র তার চিহ্ন
নেই। আকাশ আর মাটির সম্পর্কটা যেন ঈশ্বর আর মানুষের মত। সেই ক্ষতস্থানের মাটি কপালে
ছোঁয়াই, সেই উপড়ে যাওয়া ছায়াদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। ছায়াহীন আবার হাঁটা শুরু হয়।
সবার ছায়াদের জন্য প্রার্থনা করি। ঈশ্বরের জন্য একটা মা খুঁজি। ছায়া মানে তো মা। সে
কি শুধু জন্মদাত্রী?
ঈশ্বরের
মত মাতৃহীন হই। হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, সামনে নিশ্চয় একটা বড় গাছ পাব, তার হবে বিশাল ছায়া।
কেউ বলে এ ভাবনা মরীচিকা, কেউ বলে আশ্বাস। আমি হাঁটি আর হাঁটি। আমার সাথে সাথে হাঁটেন
মাতৃহীন ঈশ্বর। দুজনেই ছায়া খুঁজি, শূন্যে। শেষে যেন শূন্যতাই সেই ছায়া। কারণ শূন্যের
পরিধি বানিয়ে দেয় ভালোবাসা।
No comments:
Post a Comment