ট্যাক্সিটা দাঁড়ালো। হলুদ ছাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ছাঁট স্ট্রিট লাইটের
হলুদ আলোয় ঝরণার মত লাগছে। গাড়িটার মেশিন বন্ধ করল ড্রাইভার। পিছনের দিকে ফিরে বলল,
বেশি দেরি করবেন না।
বাঁদিকের দরজাটা একটু খুলে গেল। সাদা শাড়ি পরা
একজন মহিলা নামল। ছাতাটা এক হাতে শক্ত করে ধরা, সাথে ফুলের তোড়া। আরেক হাতে শাড়িটা
উঁচু করে ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগল। ছাতার উপর বৃষ্টির ঝরণা আরেকটা। রাস্তায় কিছুটা
জলও জমেছে। মহিলা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। যেন তাড়া নেই
কিছুর। সামনে লোহার গেট। একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে। আপাদমস্তক ভিজে। মহিলা সামনে আসতেই বলল,
ছাতাটা থাক, এমনিই এসো।
মহিলা হাতটা বাড়িয়ে ফুলের তোড়াটা পুরুষের হাতে
দিল। পুরুষ হাতে নিয়ে শুঁকে বলল, শখের বাজার থেকেই কেনা?
মহিলা মাথা নাড়ল। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে। চারদিকে
আওয়াজ বলতে বৃষ্টির। ভীষণ জোরে পড়ছে আবার। মহিলা আঁচল দিয়ে পুরুষের শরীরের ঊর্ধাঙ্গ
ঢেকে দিল। একটা পোস্টের পাশে বসার জায়গা, বাঁধানো, সিমেন্টের।
পুরুষটি এগিয়ে মহিলাটির মাথাটা বাঁ হাতে শক্ত
করে ধরে চুমু খেল। অনেকক্ষণ ধরে খেল। তারপর বলল, আজ মল্লার শোনাবে?
মহিলা বলল, কোন মল্লার?
পুরুষটা মহিলার থেকে কিছুটা সরে গিয়ে বেঞ্চে
হেলান দিয়ে বলল, রামদাসী।
সুর উঠল। প্রথমে ধীরে। তারপর ধীরে সুর চড়তে শুরু
করল। বৃষ্টিও বাড়তে শুরু করল। যেন বন্যা হবে। এদিকটা জঙ্গল। ব্যাঙ ডাকছে কয়েকটা। সুরে।
গান থামল। পুরুষটি মহিলার আঙুলের মধ্যে আঙুল
দিয়ে বসে। দুজনেই সামনে তাকিয়ে। সামনে কিছুটা বিদ্যুতের আলো। তারপর অন্ধকার।
"চলুন দিদি"
ড্রাইভার সামনে দাঁড়িয়ে। মহিলা উঠল। পাশে বেঞ্চে
রাখা ফুলের তোড়াটা ড্রাইভার তুলে নিল। হাঁটতে শুরু করল। আগে ড্রাউভার। পিছনে মহিলা।
একটা জায়গায় এসে থামল। ফুলের তোড়াটা মহিলার হাতে দিয়ে বলল, প্রত্যেক বছর একই ফুল আনেন
কেন?
মহিলা একটা ফলকের উপর হাত রাখল। পলাশ চ্যাণ্ডী
(1965 - 1999)। ফুলের তোড়াটা বাঁধানো পাটাতনে রাখল। পলাশ সামনে দাঁড়িয়ে ভিজছে। গুনগুন
করে গাইছে রামদাসী মল্লার। ড্রাইভার বলল, আসুন।
গাড়িটা মিলিয়ে গেল বৃষ্টিতে। আলো আর বৃষ্টির
ঝরণাটা হারিয়ে গেল। বন্ধ জং ধরা লোহার গেটটা মূক বধির দাঁড়িয়ে। শয়ে শয়ে মৃত মানুষ বৃষ্টিতে
ভিজছে। একা একা। ভালোবাসা আকাশে থেকে মল্লার হয়ে ঝরে পড়ছে। হয় তো রামদাসী মল্লার। অপেক্ষা
মৌসুমি বাতাসের মত সজল।
No comments:
Post a Comment