Tuesday, May 31, 2022

কি হত, না হলে

 লাল লাল বাতাসা। কৌটো ভরা। বাচ্চাটার হাত কৌটোর ঢাকার উপর।

রান্নাঘর। লিক হওয়া কলের আওয়াজ, টুপ টুপ। ঠিক করে না বন্ধ হওয়া জানলা দিয়ে আসা চৌকো আলোর খণ্ড। বাচ্চাটা ডাকল, মা!

টিভির শব্দে ডাক গেল না শোয়ার ঘরে। মা ঝিমিয়ে। সুগার, প্রেসার, থাইরয়েড। এসি ষোলোতে। বিদেশী কুকুর দেশী আদরে পুষ্ট, সোফাতে।

বাচ্চাটা ডাকল, মা!

কেউ নেই। একটা টিকটিকি চার পা নিয়ে দুড়দুড় করে দেওয়াল বেয়ে নামছে। ওভেনে দুধের পোড়া দাগ। পিঁপড়ে উঠছে শীতল ওভেনের শরীর বেয়ে।

এখন যদিও আরশোলা বেরোনোর সময় নয়, তবু দুটো আরশোলা সিলিণ্ডারের পিছন থেকে শুঁড় বার করে ঘরের বিপদের আঁচ বুঝতে চাইছে।

বাচ্চাটা টলটল পায়ে উঠে দাঁড়ালো। ইতিমধ্যে চারবার কলিংবেল বাজিয়ে আটত্রিশ ডিগ্রী, ফিল লাইক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রীতে ঘামছে সেলস বয়, পে-অন-ডেলিভারি, বাক্সবন্দী নতুন মোবাইলের সেট।

বাচ্চাটা ডাকল, মা!

গভীর ঘুম। শরীর, সংসার, স্বামী, সন্তান সারাটা ঘর ছাড়া কাপড়ের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে। গুছিয়ে গুছিয়ে ক্লান্ত। ভালোবাসা উথলানো দুধের বাটি ছেড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে শেষ। শূন্য বুক, শুষ্ক শরীর, গভীর বিষাদ, শেষ দেখা যায় না এমন হাইরোডের মত ক্লান্তি।

বাচ্চাটা ডাকল, মা! টলতে টলতে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো। কথা বলতে পারে না। শব্দ উচ্চারণ করে। প্যাণ্ট গড়িয়ে হিসি নামছে দামী মার্বেল বসানো মেঝেতে। বাচ্চাটা বসল, হিসিতে দুটো থাবা মেরে বলল, মা! আবার বাজল কলিংবেল। দুয়ারে মোবাইল, পে-অন-ডেলিভারি।

বাচ্চাটা ঘুমিয়ে হিসির উপর উপুড় হয়ে। কুকুরটা ঘুমিয়ে সোফায়। মা ঘুমিয়ে বিছানায়। ডেলিভারি বয় ঘুমিয়ে দরজার বাইরে শেড লাগানো বারান্দায়।

এলো কালবৈশাখি। রান্নাঘরের জানলা পড়ল, ধড়াম। ছাদে মেলা কাপড় উড়ল, সাঁ। কুকুর উঠল চীৎকার করে ডেকে। মা উঠল, মুখের লাল মুছে আঁচলে, হলুদের গন্ধ। টলমল পায়ে দৌড়ে এলো বাইরে। বাচ্চাকে তুলে নিয়ে যেতে যাবে বাথরুমে, আবার বাজল কলিংবেল। জলের ফোঁটায় ঘুম ভেঙেছে ডেলিভারিবয়ের।

দরজা খুলল। বিকিকিনি সারা। বাইক উঠল গর্জন করে। বাইরে কালো আকাশ। তুমুল ঝড়। উত্তাল বৃষ্টি।

ক্লান্ত চোখ। শিথিল শরীর। আলুথালু চিন্তা। সুর এলো। তবু সুর এলো। সারা গা ভিজিয়ে যৌবন বলল, আয়।

বাচ্চা কাঁদল, মা!

অবসন্ন শরীর। বুকের ভিতর একদলা হতাশা মাথায় এসে বলল, কি হত, না হলে মা!

No comments:

Post a Comment