সব চাইতে বিধ্বংসী আগুন কি? বিদ্বেষ।
ঘৃণা। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে মানবসম্পদ ছারখার হয়ে যাচ্ছে এই এক আগুনে। ইউক্রেন রাশিয়া,
ইজরায়েল প্যালেস্টাইন যে আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই এই আগুন। বহু পরিবার, মানুষ
শেষ হয়ে যাচ্ছে এই বিদ্বেষের আগুনে পুড়ে রোজ। খবরের কাগজ তার নিত্য সাক্ষী। এত এত শান্তিচুক্তি
হচ্ছে, কিন্তু ভিতরে বিদ্বেষের আগুন চাপা রেখে বাইরে শান্তির বার্তায় কিছু আসে যায়
না। মহাত্মা গান্ধী যাকে বলতেন বগলে ছোরা লুকিয়ে মুখে রামনাম।
বিদ্বেষ অবশ্যই সব অমঙ্গলের জড়। ঘৃণা
থেকে ক্রোধ। ক্রোধ থেকে প্রতিশোধ স্পৃহা। প্রতিশোধ স্পৃহাকে চরিতার্থ করতে নানা কূটকৌশল,
আর বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারের ভয়াবহ ব্যবহার।
ঘৃণা অন্তরকে টক্সিক করে। রাগ স্বাস্থ্যের
পক্ষে ভালো না। ব্যক্তিগত জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায় যদি এই ঘৃণা আর ঘৃণাজাত অসন্তোষ তথা
রাগকে নিত্য সঙ্গী করে বাঁচতে চাই। ইজরায়েল প্যালেস্টাইন তো অনেক দূরের কথা। পরিবারের
দুটো মানুষের মধ্যেও রাতদিন এই ধারা চললে শান্তি শুধুই মরীচিকা।
এই বিদ্বেষ বা ঘৃণার উৎস কি? এটা একটা
ডিফেন্স মেকানিজম। যা ইগনোরেন্স থেকে জন্মায়। আমি হঠাৎ করে তোমাকে আমার থ্রেট মনে করলাম।
ব্যস, অমনি সেই মুহূর্ত থেকে তোমার উপর আমার যাবতীয় নেগেটিভ ইমোশানের সুইচ অন হয়ে গেল।
এইভাবে আমি ভাবছি আমি সুরক্ষিত হচ্ছি। আদৌ তা হচ্ছি না। কিন্তু আমি ভাবছি আমি তা হচ্ছি।
আসলে এটা একটা অ্যানিমাল ইনস্টিংক্ট। যেমন অনেকেই দেখে থাকবেন কুকুর বা বেড়াল যখন কাউকে
তার থ্রেট মনে করে, তখনই সে মুখে একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুরু করে, গরররর করে। কামড়ানো তার
পরের কথা। যেহেতু কুকুর বা বেড়াল চিন্তা করতে পারে না, তাই বিষ থেকে অ্যাটোম বোম অবধি
আসতে পারেনি, তাই কামড়ানোর বেশি নিজের প্রতিহিংসার অভিব্যক্তি সে দেখাতে পারে না। আমরা
পারি।
এখন কথাটা হচ্ছে যখনই কোনো মানুষের
উপর আমার এই ডিফেন্স মেকানিজমটা জন্মাচ্ছে, মানে আমি তাকে কোনোভাবে আমার অস্তিত্বের
জন্য একটা থ্রেট মনে করছি, তখন আমাকে একটু ভেবে দেখতে হবে, বিদ্বেষ ছাড়া কি আর কোনো
বিকল্প পথ নেই? এই চিন্তারই একটা বড় টাওয়ার হল নন-ভায়োলেন্সের উপর আস্থা। কিন্তু অতবড়
শব্দটার কথা আপাতত বলছি না। কিন্তু সত্যিই কি বিদ্বেষের কোনো বিকল্প নেই? যে আমার অনিষ্ট
করেছে, করে চলেছে তাকে ঠেকানো আমার ধর্ম, কর্তব্য। কিন্তু তার প্রতি অহরহ বিদ্বেষ বিষে
জ্বলেপুড়ে ছারখার হওয়াও কি আমার কর্তব্য? না ভবিতব্য?
মানুষ এইখান থেকেই আলাদা হতে পারে।
বিদ্বেষের বিকল্প কি? গভীরভাবে যারা মানুষকে নিয়ে ভেবেছেন তারা বলেন প্রথম শর্ত - ধৈর্য।
আমাকে বুঝতে হবে তার অনিষ্ট করার প্রবৃত্তিকে ডিফিউজ করা আমার ক্ষমতায় নেই, কিন্তু
তার অনিষ্ট থেকে আর নিজের মধ্যে তার উপর জাগা নেগেটিভ ইমোশানগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা
করা আমার কর্তব্য। কিন্তু সমস্যা হল আমি যদি তার ছোঁড়া বিদ্বেষের বীজাণুতে আগেই নিজেকে
আক্রান্ত করে ফেলি তবে আমার অর্ধেক জমি ইতিমধ্যেই আমার অনিষ্টকারীর হাতে। আমার জমি
বলতে কি? আমার জমি বলতে আমার বুদ্ধি, আমার চিন্তার কারখানা।
আমি যে জুতো পরে রাস্তায় হাঁটি, সে
রাস্তার ধুলোর প্রতি আমার বিদ্বেষে নয়। নিজেকে রক্ষা করার জন্য। আমি যে বীজাণু আক্রান্ত
হলে ওষুধ খাই সেই একই কারণে। আসলে আমাকে বুঝতে হবে কারোর উপর বিদ্বেষ জাগিয়ে রেখে আমার
আদতে কোনো লাভ হচ্ছে না। বিদ্বেষ থেকে রাগ। রাগ থেকে অধৈর্য। অধৈর্য থেকে আমার বুদ্ধির
কুয়াশাচ্ছন্নতা, আমাকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে, আমাকে আরো আমার অনিষ্টকারীর কাছে সহজলভ্য
করে দিচ্ছে। আমাকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে বাঁচার আগে নিজের শত্রুর হাত থেকে বাঁচার
আছে, সে হল আমারই চিন্তা-বুদ্ধিকে আক্রান্তকারী আমার বিদ্বেষ।
অহিংসা মানে অনিষ্টাকারীর গলা জড়িয়ে
নিত্যানন্দ পোজে, "মেরেছিস কলসীর কানা, তা বলে কি প্রেম দেব না" মার্কা নাটকীয়
মুহূর্তের পুনর্নির্মাণ নয়। অহিংসা মানে অনিষ্টকারী প্রদত্ত হিংসার বলটা আবার তার কোর্টে
দ্বিগুণ বেগে ফিরিয়ে দিতে রাজী না হওয়া। এ একটা চর্চা। জীবন চর্চা। উপনিষদ বলেন, তাঁকে
তর্কের দ্বারা না, মেধার দ্বারা না, তাঁকে তাঁর কৃপার দ্বারা পাওয়া যায়। গীতা বলেন,
নিজেকে অবসন্ন হতে না দিয়ে, নিজেই নিজেকে উদ্ধার করার কথা। বুদ্ধ বলেন নিজেকে নিজের
বন্ধু করে তোলার কথা। অর্থাৎ কৃপাটা আগে নিজেকে নিজে করা। নিজের প্রতি নিজের করুণা
না জাগলে, নিজেকে বারবার রেসের ঘোড়া বানিয়ে ছোটাতে চাইলে এ প্রতিহিংসার আগুন কোনোদিন
নিভবে না। অনিষ্টাকারীর উপর প্রেমাসক্ত হতে হবে না, অন্তত নিজেকে রক্ষা করে তার উপর
উদাসীন হয়ে থাকার সামর্থ্যটুকু যেন আসে।
আনন্দ জীবনের মূল সত্য। সে আনন্দকে
লাভ করা তপস্যা। সে তপস্যা আসে ক্ষমার মধ্যে দিয়ে, সহ্যশক্তির মধ্যে দিয়ে, ত্যাগের
মধ্যে দিয়ে। স্নায়ুকে নিস্তেজ করা নানাবিধ ওষুধ নির্ভর জীবন অবধি যাওয়ার আগে, যদি অন্তত
কিছুটা হলেও এই বোধটা আমার জাগে যে, আমার আনন্দকে অনিষ্টকারীর উপর বিদ্বেষে পুড়িয়ে
ধ্বংস না করে, নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা আমি অর্জন করেছি, তবে সে-ই আমার অনেক বড় সার্থকতা
জীবনে। বাইরে আমি রাজা, ধনকুবের নাই হই। সন্তোষের সমান ধন নেই, বুদ্ধ থেকে মা সারদা
একই বাণীর দ্রষ্টা তাই।
No comments:
Post a Comment