Showing posts with label কাব্যকাহিনী. Show all posts
Showing posts with label কাব্যকাহিনী. Show all posts

Tuesday, September 15, 2020

হরিহর



সব ক’টা উনুনের তাপ শীতল

দোকানের বাইরে এসে দাঁড়ালো হরিহর

মাথার উপরে গনগনে চাঁদ

চাঁদের নীচে কৃষ্ণচূড়া

পাতার ছায়া মাটির উপরে

থেকে থেকে বাতাসে উঠছে দুলে দুলে


আকাশ জুড়ে এত তারা কেন?


হরিহরের এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি কেউ কোনোদিন

সব তারাই অচেনা প্রতিদিন

তার রাতের অতিথি

তারার উপর দিয়ে ঈশ্বর হেঁটে যান রাতের বেলা

দিনের বেলা মাটির গন্ধে ঘুমান তিনি

প্রথম বৃষ্টির জলে জাগেন


হাসনুহানার গন্ধে

হরিহরের বুকের মধ্যে বন্ধ ঢাকনা গেল খুলে

সুখের গন্ধ উড়ে এল ধুপের গন্ধের মত

ঝিঁঝিঁপোকার তানে রাতের কুঁড়ি খুলছে পাপড়ি মেলে

সংসারে সব মানুষ একা

তারার মত একা একা জ্বলছে সবাই

নিজেকে ধরে কেয়াগাছের মত ঠেকনা দিয়ে


সারাদিন কত মানুষকে চা খাওয়াও হরিহর?


হরিহরের ভীষণ সুগার

শরীর জুড়ে মিষ্টি অবসাদ

সব স্বপ্নপূরণ হল হরিহর?


হরিহর স্বপ্ন দেখে না

স্বপ্ন মানে খেলনা

মাটির পুতুল

সাবধানে খেলতে হয়

পড়ে গেলেই চুরচুর

তখন ভাঙা পুতুলের কান্না দেওয়ালে, জানলায়


হরিহর সারাদিন চা খাওয়ায়

হাজার মানুষের গল্প শোনে

হারানো গল্পের খেই ধরিয়ে দেয়

মনে মনে কথা বলে

উনুনের সাথে, আগুনের সাথে, উথলে ওঠা দুধের সাথে

বুকের তাপে আগুন জ্বলে চোখের কোণায় চিকচিক

কান্নাতাপে পোড়া মাটির মত নিঃসন্তান হরিহরের বুক

হরিহর হাসতে হাসতে বিস্কুটের কৌটো খোলে

লুকিয়ে থাকা আরশোলা তাড়ায়

ইঁদুর ধরে, নদীর ধারে ছেড়ে দিয়ে আসে ভোরে


এখন হরিহর একা


মানুষ বাঁচে কল্পনায়

পশু বাঁচে জড়ের বাস্তবতায়, কারাগারে

হরিহরের কল্পনায় বেহাগের সুর

কখনও দরবারি, কখনও মালকোষ

সব রাগই অন্ধকারের

হরিহর বাঁশি বাজায়

বাঁশিকে কাঁদায়

নিজেকে বলে, আর না, আর না, আর না

রক্ত থেকে সুগার কমে

হরিহরের জিভ শুকায়

সারা শরীর ঝিনঝিন করে,

হাতের ভার, পায়ের ভার হালকা হয়

মাথাটা ঘোরে


এক-এক সময় ভাবে, দেখি না হয়

মরলে কেমন তারা ছোঁয়া যায়

ঈশ্বরের পায়ে হাত রাখা যায়!


হরিহর তবু ফিরে আসে

চিনির দানা মুখে পোরে

আবার শান্ত শরীর

এতবড় আকাশ, এত লক্ষকোটি তারা, এত যোজন যোজন মাটি

এসব কি তার?

মোটেও নয়

দোকানের এককোণে মাদুরে শুয়ে ওই যে---

তার লক্ষ্মীমণি

শ্যাওলায় লাগা শাপলা ফুল,

হরিহর বলে

লক্ষ্মীমণি হাসে

হরিহর জর্দাগন্ধে চুমু খায়

আবেশ আসে

কান্না আসে

ভালোবাসা প্রাণের আঁকশির মাথায় চড়লে কান্না হয়

হরিহর কাঁদে

আঁকশির মাথায় ধ্রুবতারা ফোটে


শিবমন্দিরে কে যায়?

দাঁড়াও আমি যাব

লক্ষ্মীমণি, চলো চলো


কত রাত?


চারটে হবে


লক্ষ্মীমণির হাত ধরে হরিহর হাঁটে

শিবমন্দিরে একা শিব

গোটা আকাশ, অগুনতি তারা, জল-মাটি’র অধিপতি

তাদের সন্তান

হরিহরের কাছে বাতাসা চায়

লক্ষ্মীমণির কাছে আদর


হরিহর বাঁশি বাজায়

ভোরের রাগ

ললিত, রামকেলী, কি ভৈরব

সূর্য ওঠে

আঁচের ধোঁয়ায় সূর্যের আলো আঙুল বোলায়

প্রথম মানুষ আসে, চায়ের তৃষ্ণায়

বেঞ্চে বসে

হরিহর লুকিয়ে পড়ে

জন্ম নেয় চা-ওয়ালা মানুষ একটা

সমাজ তাকে যেরূপে ভালোবাসে


মানুষ মানে বহুরূপী

সমাজ মানে বহুরূপীর মেলা

হরিহর গল্প শোনে

রাতের অপেক্ষায় বাঁশির সুর ভাঁজে

পাঁজরের খাঁজে খাঁজে

উনুনের তাপে

একা একা

আড়চোখে শুধু লক্ষ্মীমণি ঠেকে

(ছবি - Suman)

Monday, October 8, 2018

না


রাস্তা পেরিয়ে ওই যে দূরে যে বটতলাটা, ওই যে দূরে কাশের ঝালর, বহুকাল আমি ওই দিকেতে চাই না। আমার শিউলি গাছে বাজ পড়ল যেদিন, সেদিন থেকেই যাই না। নতুন জামা, নতুন গোছানো ঘর, নতুন কত কিছুই, তাকাই না। আকাশে শরৎ, ফুলেতে শরৎ, রাস্তাঘাটে শারদোৎসব, সাড়া আজ আর দিই না। আলো, আওয়াজ ঠেকিয়ে রাখি বার দুয়ারে। আমার ঘরের কোণে সাদামাটা রোজ যে জীবন, ভুলেও তাকে নাড়ি না। কোনো লোভেই ছাড়ি না। সব ফুরালে সেই থাকবে, সেই তরাবে দিনের খেয়া, রাতের পারাপার - ভুলেও সে আর ভুলি না। তাই উৎসব থাকে তারই মতন রাস্তাঘাটে, তাকে আমি ঘরের ভিতরে ডাকি না।


Sunday, June 11, 2017

মেঘলা চিরকুট

এই মেঘলা আকাশেই সে যাবে
যে শাড়িটা গেলবার পূজোয় কেনা, ভাঙা হয়নি
সেই শাড়িটাই পরে যাবে

যে বাড়ির পরিচারিকা সে
সে বাড়িতে মঞ্জুর হয়েছে তিনদিনের ছুটি
কল্যাণী থেকে যাবে কলকাতা
   মেয়ের নিজের বাড়ি

ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলো
তিপান্নটা বর্ষা পেরোলো
মুখের ভাঁজে হাল্কা পাওডারের দাগ
মাথার মধ্যেখানে সাদা দাগের রেখা
   লালদাগটা শুকিয়েছে
  শুকাতে শুকাতে পুড়িয়েছে অনেক
টোটোর একটা পাশে বসে উদাস তাকিয়ে মহিলা, পরিচারিকা

মেয়ের বাড়ি প্রথমবারের যাওয়া। 
জামাই আসবে নিতে। ক্যাটারারের কাজ করে।
তাছাড়া কলকাতার কোন হাস্পাতালে যেন কি একটা সাপ্লাইও করে
শিয়ালদায় দাঁড়াতে হবে, এনকুয়ারির কাছে
মহিলা পার্সে রাখা চিরকুট বার করে
 
   মোবাইল নাম্বারটা দেখে
বৃষ্টির ফোঁটা লাগল চিরকুটে
একটা সংখ্যা ভিজে গেল
নাম্বার লেখা কাগজটা মুড়ে ঢোকালো পার্সেতে

এই একটা নাম্বার
আচ্ছা, হারিয়ে যায় যদি?
মেয়েও কি তবে হারিয়ে যাবে?
নাকি সে ফিরবে কোনোদিন
   কি করে খোঁজ পাবে?
বুকের ভিতর মুচড়ে ওঠে
   পার্সটাকে বাঁ স্তনের সাথে চেপে
আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখে
  মেয়ের শরীর ছুঁলো যেন
    শান্ত হয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে

বড়লোকদের বাড়ি ভিজছে,
  ওই যে বাক্স বাক্স, ওগুলো মানে ঘরের ভিতর এসি
ওই যে ছাতার মত, ওগুলো মানে টিভি
  ভিজছে সব। বাইরে রাখা বাইক, গাড়ি সব ভিজছে।
 
কৃষ্ণচূড়ার গাছের উপর মেঘ নামছে
  যেন সেও এসেছে কার এক খোঁজে
  মেয়ের খোঁজে?
এই মেঘ তোর নাম্বার আছে?
  তোর ইন্টারনেটের লাইন আছে?
ওতে নাকি লোকজন যায় দেখা
  থাকুক না সে লক্ষ যোজন দূরে,
 
     অসম্ভব না, তারও নাগাল পাওয়া

মেঘ হাসলো চকিত বিদ্যুতে
  নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর,
 
   মাগো কি নিষ্ঠুর সে হাসি!
  পরিচারিকা-মা ছিল যে, হঠাৎ হল নারী
বুকের ভিতর মুচড়ে উঠল
তার সিঁথির যে ছিল লাল, তার মেঘের ওপারে বাড়ি
  এই মেঘ তার নাম্বার দে না
  এই মেঘ তার নাম্বার দে
  এই মেঘ তাকে বল না গিয়ে
  দাঁড়িয়ে আছি এনকুয়ারিতে শিয়ালদাতে গিয়ে
  এই মেঘ তাকে ডাক দে না রে,
    এই মেঘ শোন লক্ষীটি, আয় না নিয়ে একবার তাকে ডেকে
  তারও চুলে পাক ধরেছে? 
   আজও তেমন বায়না করে
    খাবার পাতে কাঁচা নুনের
     বর্ষা ভেজা রাত-দুপুরে
    বাউল গানের আখড়া জেগে
  গাঁজায়-মদে মাতাল হয়ে
    বেসুরো গানে জ্বালিয়ে মারে?

দিদি স্টেশান

    পার্সটা খোলে। চিরকুট বলে, মা।
      সে স্নিগ্ধ হেসে বলে, আসছিরে সোনা।
      মেঘকে বলে, আসি, তাকায় আড়চোখে
        দীর্ঘশ্বাসে নারীটাকে বুকে চেপে।

Saturday, March 12, 2016

লগ্নভ্রষ্টা?

মেয়েটাকে আমি আজও চিনি। সাদা লালপেড়ে শাড়ি জড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে এ পাড়া ও পাড়া। মেয়েটার কপালে বড় লালটিপ। সিঁদুর না, সিঁদুরের মত তবু। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। এককালে যে ছিল সে চিহ্নটুকুও নেই। 

ছোট্ট করে বলি। ছিল দাদা দিদির আদুরে ছোটোবোন। কেউ বলত দাম্ভিক, কেউ বলত প্রবল আত্মবিশ্বাসী, কেউ বলত বড্ড নাক উঁচু, কেউ বলত টনটনে ওর আত্মসম্মানবোধ।
সুন্দরী তো ছিলই। ফর্সা গায়ের রঙ, চোখের উপর ঝাউপাতার মায়া, নাকের গড়ন পাথরে খোদাই নর্তকীর মত। লম্বা ছিল - "এমন লম্বা মেয়ে, ছেলে জুটবে কপালে?" ঈর্ষা চাপা সহানুভূতি গরম বাতাসের মত চলত আগুপিছু। ও পাত্তা দিত না।
তখন কলেজে পড়ে। অনার্সের বিষয়টা পড়াবে কে? চলল মেয়ে অমুক স্যারের বাড়ি। অমুক স্যার অমুক স্যার, ভীষণ নাকি দেমাক! মেয়েমানুষ তার দু'চক্ষের বিষ। ক্ষমা ঘেন্না করে পড়ায় নাকি কোনোমতে মেয়েদের, তবে ওই যে- পড়ায় নাকি এমন, মা সরস্বতীও সুযোগ পেলে পাতেন নাকি আসন।
মেয়েটা যেদিন প্রথম এলো - পুড়ল সেদিনই অর্ধেকখানা বুক। বাকি বুকটা বাঁচিয়ে রাখল - আহা রে, পুড়তে এমন সুখ! 
ওদিকে যে চীনের পাঁচিল - শুধু রসায়নের কথা, ছিটকে ছিটকে যা আসে সে মুখের এঁটোকাঁটা। মেয়েটা এগোলো বিস্তর পথ, পড়ায় বহুত জোর, ছেলেগুলো হাবুডুবু খায়, সে এগোয় তরতর।
সেবার শীতে পিকনিক হবে। যাওয়া হল নদীর ধার। খুব হুল্লোড়, খুব হইচই। তবু মেয়েটার মনে কিসের বাঁধ। বন্ধু বলল, সর্বনাশী, ও যে পাষাণের পাষাণে গড়া। ওই পাথরে তোর প্রণয় কুসুম!!? - হায় রে কপালপোড়া! 
তখন সন্ধ্যে। অনেকটা হেঁটে মেয়েটা বসেছিল ঘাসে, আঁচলখানা মেলে। হঠাৎ পাশে সিগারেটের গন্ধ - আরে চেনা চেনা যে রে! পাশে এসে বসল পাঁচিল, পাথর, পাষাণের পাষাণ।
তারপর? জানি না। এসো আমরা সরেই বসি। ওদিকে অনেক উতোর চাপান। 
তৃতীয় বর্ষে সে মফঃস্বলে সে কি হইচই। পাষাণ নাকি বিয়ে করবে। কাকে করবে? সে নাকি আস্ত একটা মেয়েই। 
বিয়ে হল। খুব ধুমধাম। সংসার পাতা হল। কেউ করে না চাকরী। দুজনেই পড়ানোতে মন দিল।
বছরখানা ঘুরতে না ঘুরতে, মেয়েটার চোখে পড়ল কালি। শরীর হল ক্ষীণকায়, কিছু গোলমাল হল নাকি? দাদা শুধায়, মায়ে শুধায়, শুধায় প্রতিবেশী, মেয়েটা বলে, কই কিছু না, এই তো ভাল আছি। 
দেড় বছর ঘুরতে না ঘুরতে, পড়ল বিনা মেঘে বাজ! কই সে ছেলে, কই সে পাষাণ, কই সে পাঁচিল, কই সে অহংকারী? 
খবর এলো মাস দুই পর। পশ্চিমে এক কলেজে চাকরী পেয়েছে সে, সাথে গেছে সেই মেয়েটা, যে অনার্সে এবার প্রথমবর্ষের।
দাদা শুধাল, মা শুধাল, বান্ধবীরাও শুধায়, হ্যাঁ রে জানতিস আগে? কি রে বল জানতিস আগে? বল, বল, বল না রে!!!!
মেয়ে মুখে রা কাটে না। কিছু না। শুধু পাঁচিলের মত বসে। তার চোখের সেই ঝাউপাতার দল, উদাস হাওয়ায় দোলে।

আমি যখন সব জানলাম, তখন সে মেয়েটা চারের ঘর ছোঁবে। সবই অতীত। তবু গল্পটা এখনো আছে বেঁচে। সে এখন পড়ায় না আর। পড়াতে তার ঘেন্না। শাড়ির ব্যবসা করে ফেরে সে। সব দীর্ঘশ্বাস এখনো ঘোরে, একা একা তার চারপাশে। আর কি করে? দীক্ষা নিয়েছে। সারাদিন করে নামগান। কোন প্রভুতে কি যে খোঁজে - কি সে চায়, মুক্তিধাম? 

প্রচুর করে ধর্মসভা। প্রচুর করে দান। জীবনে সবই বেহিসাবি তার। খবর রাখে তাদের নাকি দুটো ছেলেমেয়ে। মেয়েটা নাকি খুব সুন্দর। ওরা এখন নাকি এলাহাবাদেতে।
কে বলেছিল - কুম্ভে যাবেন? তার মন উঠেছিল দুলে। যাবে যাবে যাবে। গিয়েছিল তো। জল ছাপিয়ে, রাত ছাপিয়ে ঘুরেওছিল সেই সে পাড়া। যদি। একবার পড়ে চোখে।
পরে শুনেছিল তার পোড়া কপাল। তারা সবাই নাকি সে সময় কাশ্মীর গিয়েছিল। হা বিধাতা। কুম্ভ কেন? কেউ না বলল, কাশ্মীর চল, বৈষ্ণোদেবী পুণ্যদর্শন হতই না হয় যেন। 
একে কি ভাগ্য বলে? সেদিন সে দাঁড়িয়ে স্টেশানে। কলকাতা যাবে। শাড়ির অনেক অর্ডার আছে। "কেমন আছো?" পিছন থেকে কে যেন ডাকল? তার সারাটা শরীর হিমশীতল হল। বুকের কাছে হৃৎপিণ্ডটা বিরাম যেন দিল।
ফিরে তাকাল। ঘরে ডেকে নিল। এ কি চেহারা তোমার? শুকিয়ে কাঠ। বলল, সুগার ধরেছে, আরো নাকি কি সব রোগ!
লোকটা কিসব বলেই চলে। মেয়েটার মাথাজোড়া শুধু ভোঁ ভোঁ। কে সে সামনে? সে তো নয়, এ তো নির্জীব, নিষ্প্রাণ এক শবদেহ। এরই জন্য এতগুলো বছর??? হা ঈশ্বর? এরই জন্য? এতটা দুর্বল, এত কাপুরুষ ছিল সে? এ যে তোমার চেয়েও অসহায় প্রভু। তবু তোমায় গড়ে নেওয়া যায় - আর এ যে পূর্ণ কলঙ্কে ছেয়ে।

ফিরে গেল সে। মেয়েটার কি হল? এতবড় এক লড়াই যেন সবটা ব্যর্থ হল। হারাবে যাকে, মনে ছিল পণ, সে আগেই আছে হেরে, সব জেনে শুনে গভীর করূণায় বুক এল তার ছেয়ে।

প্রেমে যে জোর করূণায় তা নিমেষে হারিয়ে গেল। সব রক্ত তার মাথার শিরায় ঘনিয়ে সে বাহ ছিঁড়ল।
মৃত্যু চুমে গেছে তার কপালের খানিক স্পর্শ নিয়ে, ভাগ্যরেখা ফিরিয়ে এনেছে, কিছুটা সময় চেয়ে। 
এখন কি করে? জানি না, জানি না। চিনতে পারে না কাউকে। অপেক্ষা নেই, অধৈর্য্যও নেই - আছে আছে, তবু বেঁচে সে।



Saturday, February 6, 2016

নিরাবরণ



এ এক পৌরাণিক বসন্তের কথা। বিকাল থেকেই আজ বসন্তের দখিনা বাতাস বিভিন্ন ফুলের সৌরভ মদিরাপানে উন্মত্ত। প্রেমিক প্রেমিকার শরীর মনকে মদনাহত করে কামাগ্নিকে 'হু হু' করে জ্বালিয়ে পাগল করে তুলেছে। এতৎসত্ত্বেও ঋষিপুত্রের মন আজ ভীষণ অস্থির। আজও অপ্সরা আসবে। আজ তাদের মিলন শূণ্যমার্গে, ওই নীলাকাশের আঙিনায়। তবু সুদর্শন তরুণের মন কি এক চিন্তায় চঞ্চল।
সন্ধ্যার প্রথম প্রহর। অপ্সরা তার সকল নিয়ে মিলিত হলেন ঋষিপুত্রের সাথে শূণ্যমার্গে, ঋষিপুত্রের যোগবলে। তিনিও লক্ষ্য করলেন ঋষিপুত্রের অন্যমনস্কতা। নীরব রইলেন।

ঋষিপুত্রের গভীর আলিঙ্গনপাশে আবদ্ধ সুন্দরী সমর্পণ করলেন নিজেকে তাঁর প্রেমিকের কাছে। তিনি জাগছেন। কুয়াশা যেন অপসারিত হচ্ছে ধীরে ধীরে। 
ঋষিপুত্র অপ্সরার রক্তিম ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠ স্পর্শ করালেন। শিহরণ জাগল শরীর মন বেয়ে। তাঁর শ্বাসের বেগ হল দ্রুত ঘন, রোমকূপে বিন্দু বিন্দু জমল স্বেদ। তিনি ওষ্ঠ তুললেন। আলতোভাবে স্পর্শ করলেন তাঁর আরক্তিম বিম্বাধর নিজের দীর্ঘ তর্জনী দিয়ে। অপ্সরার দু'চোখ আবেশে বন্ধ। 
না, আজ তিনি ভেসে যাবেন না। আজ তাঁর উত্তর জানতেই হবে। তিনি অপ্সরার পৃষ্ঠদেশে হাত দিয়ে উন্মুক্ত করলেন নীপবন্ধ। সে আবরণ অপ্সরার বক্ষকে নগ্ন করে উড়ে চলল নীচে, ভূমির দিকে।
ঋষিপুত্র কিছুক্ষণ সেদিকে চেয়ে রইলেন। তারপর তাকালেন উন্মুক্ত যৌবনগর্ব্বে উদ্ধত দুই স্তনযুগলের দিকে। আরক্তিম দুটো স্তনবৃন্ত সদ্য ফোটা পদ্মকলির ন্যায় গোলাপি আভায় সিক্ত। তিনি তাঁর ওষ্ঠ ও জিহ্বা দিয়ে সেই স্তনবৃন্ত স্পর্শ করলেন। তাঁর হাতের অঙ্গুলিগুলি দিয়ে দুই স্তনকে ধীরে ধীরে নিষ্পেষিত করতে করতে তিনি ভাবলেন, এই কি নারীর যৌবন রহস্য!?
"না না না। আরো গভীর, গভীরে তা..", তাঁর অন্তর বলে উঠল। তিনি মুখ তুলে অপ্সরার সুগভীর নাভির দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করলেন। গভীর আবেশে চুম্বন করলেন সেটি। প্রাণ হয়ে উঠল উদ্বেল। তিনি পুনরায় সংযত করলেন নিজেকে। এও না, আরো আরো গভীর। তিনি এক ঝটিকায় অপ্সরার কটিবন্ধন করলেন মুক্ত। ফাল্গুন পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রমা তারকাখচিত মধ্যনীলাম্বরে রাজকীয় বেশে জ্বাজল্যমান। তার স্নিগ্ধকিরণে দিগন্তব্যাপী মায়ারাজ্য সুধামগ্ন। সেই আলোয় সম্পুর্ণ নিরাবরণ অপ্সরাকে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মত লাগল ঋষিপুত্রের। তিনি নিজেকে নিজের মধ্যে ধারণ করে নিজেকেও নিরাবরণ করে সুনিবিড়ভাবে বেষ্টন করলেন অপ্সরার ক্ষীণতনুকে। তবু স্থির হতে পারলেন না। নারীর যৌবন রহস্যের নাগাল যে তাঁকে পেতেই হবে আজ!
তাঁর হাত জিহ্বা ওষ্ঠ পাগলের মত বিচরণ পর্যবেক্ষণ আস্বাদন করে চলল অপ্সরার সিক্ত উত্তপ্ত যোনি, দীর্ঘ ঊরু, উন্নত কোমল নিতম্ব ও সুবিন্যস্ত পদপল্লব। ঋষিপুত্র উঠছেন অধৈর্য হয়ে, তাঁর শ্বাস হয়েছে দ্রুততর, তাঁর স্বেদসিক্ত কলেবর, অপ্সরার জঙ্ঘোপরি তাঁর প্রবল গর্জনরত উপস্থ... অপ্সরা সবই অনুভব করছিলেন গভীর মাদকতার মধ্যেও। কি যেন খুঁজছেন ঋষিপুত্র। তিনি নির্বাক রইলেন, না হলে রসভঙ্গ হবে যে!
হঠাৎই ঋষিপুত্রের ধৈর্য বাঁধ ভাঙল। অপ্সরার নাভি, যোনি, ঊরু স্নাত হল ঋষিপুত্রের উত্তপ্ত বীর্যে। অপ্সরা চমকে উঠেও ক্ষণিকের মধ্যে নিজেকে স্থির করে নিজের ওষ্ঠদ্বয় ঋষিপুত্রের ওষ্ঠে চেপে ধরলেন, গভীরভাবে আলিঙ্গন করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন তাঁকে। ইঙ্গিত করলেন নীচে ঝর্ণাধারার দিকে।
ঋষিপুত্র তাঁকে নিয়ে শুয়ে রইলেন ঝরণার বারিধারার নীচে, তিনি শুলেন অপ্সরার দেহের উপরে অপ্সরার কাঁধে মাথা গুঁজে। ঝর্ণাধারা তাঁদের ধৌত করে চলল নিজের স্বাভাবিক ছন্দে।
বোধহয় রাত্রির শেষ প্রহর। কতক্ষণ এভাবে শুয়ে রইলেন ঋষিপুত্র জানেন না। জানতে চানও না। তিনি তাঁর উত্তর পেয়েছেন। নারীর যৌবন মাদকতার বীজ নারীর নিজের শরীরে নেই, তা আছে পুরুষের কামনার মধ্যে লুক্কায়িত। তার প্রতিফলন সে পায় নারীশরীরে। যেমন পুষ্পের অন্তঃস্থল মকরন্দ হয়ে ওঠে পতঙ্গের কামনায়! ঠিক তেমন।
ঋষিপুত্রের মনে হল কি অপূর্ব জ্ঞান তিনি লাভ করলেন, কি এক আদিম অন্ধকারের পারে এলেন। তিনি মুখ তুলে অপ্সরার দিকে চাইলেন, কি অপূর্ব চোখ দু'খানি তাঁর। ঋষিপুত্রের চোখে জল এল। তিনি উপলব্ধি করলেন যে কমলখানি তাঁদের উভয়ের হৃদয়ে প্রস্ফুটিত, তা চিরকালের। তা বাইরের বসন্তের অপেক্ষা রাখে না। সে চিরবসন্তের। তাদের এ ক্ষণিকের কামনা চিরকালের গভীর কামনারই ছায়ামাত্র। অনন্তকালের চাওয়া ক্ষণিকের দেহতে ক্ষণকালের চাওয়া হয়ে দেখা দেয়। তারা চিরকালের।
তিনি অপ্সরাকে শান্ত গভীর চুম্বন করলেন, বললেন, তুমি আমার! চিরকালের আমার!
অপ্সরার কাছে এই কথাটি বহুকালের বিস্মৃত সুরের মত কানে বাজল। তাঁর চোখের কোল বেয়ে ঝর্ণাধারার সাথে অশ্রুধারা বইল। 
তখন পূর্বকাশে অরুণাভা দেখা দিয়েছে। দূরে মন্দিরে শুরু হয়েছে স্তবগান। পাখির কলরবের সাথে তা মিশে ধ্বনিত হচ্ছে চিরপ্রেমের জয়ধ্বনি।



(ছবি - Suman)


Wednesday, January 6, 2016

মিলনাপেক্ষা

অনেকটা রাস্তা সমতলে হাঁটার পর পাহাড় এলো। পথকে বললাম, এবার? 
পথ বলল, ওই তো। সে পাহাড়ের দিকে ইশারা করল।
 
বললাম, পথ কোথায়? এ যে চড়াই শুধু। ঘন জঙ্গল।
খানিক এগোলাম। পথ হারালো জঙ্গলে। ঢুকলাম জঙ্গলে। মানুষ সব হারিয়েও নিজেকে আর হারাতে পারে না, সেই ভয়, সেই ভরসা।
ঘন জঙ্গলের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে বললাম, কোনদিকে যাব কেউ জানো?
 
আমার কণ্ঠস্বর আমারই কাছে এলো ফিরে - প্রতিধ্বনি হয়ে।
 
আরো এগোলাম, ঝরণাকে দেখলাম লুটোপুটি খেলছে সকালের হালকা রোদের সাথে। বললাম, পথ বলতে পারো?
 
সে বলল, যাবে কোথায়?
বললাম, সামনে।
ঝরণা বলল, জানোই তো পথ। সামনে।
 
আমি হকচকিয়ে গেলাম, তাই তো, এ উত্তর তো আমারই মনে ছিল, আমার চেতনার গোপনে।
ঝরণাকে বললাম, যদি বাধা পাই?
সে বলল, পাথর বাধা দিয়েছিল বলেই তো হলাম ঝরণা। তুমিও ঝরণা হোয়ো।
বললাম, কিসে তোমার এত জোর? এত সাহস?
সে বলল, বুকে যে আমার সাগরের অভিসার আহ্বান! সেই আমার সাহস, সেই আমার জোর।
মনে ভাবলাম, আমার কি আছে সাগরের অভিসার আহ্বান?

ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা হল। আকাশে উঠল তারার দল। আমার প্রাণের গভীরে লাগল নিশার ছোঁয়া। কে অন্ধকার থেকে ডেকে বলল, থেমো না... এসো... এগোও... আমি তোমার জন্য যুগান্তরের অপেক্ষায়।
বললাম, কে তুমি?
সে বলল, তোমার জাগা-ঘুমের অনন্তকালের সাক্ষী, তোমার 'আমি'র আমি।

Saturday, September 12, 2015

ব্যানার্জী বাড়ির বড়বউ




মেয়েটা ভরা সংসারে এসে পড়ল
না চাইল নিজেকে, না চাইল সংসারকে
তবু অনেক চাওয়ার ভাঁড়ার ঘরের দ্বারী সে
ব্যানার্জী বাড়ির বড়বউ।

দিন যত গেল, পা তত দাবল
অভ্যাস যত পোক্ত হতে লাগল
মন হল তার চেয়ে দ্বিগুণ অবাধ্য
সে বুঝল - সে বাধ্য হলেও, পোষ্য নয়
তবু সে ব্যানার্জী বাড়ির বউ।

স্বামী চাইল শরীর, শাশুড়ি চাইল রান্নাঘর
শ্বশুর চাইল তার ছবিতে রোজ নতুন ফুলের মালা
দেওর চাইল ঠাট্টা, ননদ চাইল সাজের বাক্স
টিয়া চাইল লঙ্কা, দেবতা চাইল দুবেলা প্রদীপ ধুপ আর নকুলদানা।
সে দিল। রোজ দিল। দিতে দিতে হাতে পড়ল কড়া, কপালে পড়ল ভাঁজ
যদিও সে পুরোদস্তুর গিন্নী, তবু কিসে যেন ফাঁক-
হল না যেন পুরোপুরি ব্যানার্জী বাড়ির বড়বউ।

কোল ভরে এলো দুই ছেলে
 
মান বাড়ল। খোরাক বাড়ল কিছু।
তবু কি যেন তার আটকে থাকে গলার কাছে।
জানে সে। একটা মাত্র খাতা। তার কবিতার খাতা।
সেই ছোট্ট বেলার শখ। পরে হল সাধনা।
শব্দের সুরে আত্মতৃপ্তি। এই কারণেই তো দিন যাপনা!
আঁৎকে উঠল বর! দুশ্চরিত্রা!
শোয়ার বিছানায় ওকি খাতা রাখা!
ছি ছি। বল না কাউকে। লুকিয়ে রাখো।
তবু লিখবে? বেশ লিখো
লুকিয়ে লেখো, যেমন লুকাও মাসিকের নোংরা ন্যাকড়া।
তাই হল। তবু লিখল।
 
একটু যেন ফিকে হল সে পরিচয়, ব্যানার্জী বাড়ির বড়বউ।

মনের ভিতর খুলল আগল। নিজেকে চিনল কবিতায়।
বাইরের বিশ্ব কড়া নাড়ল দরজায়। সাড়া দিও না! হুঙ্কার দিল স্বামী।
সাড়া দিল না। জানলাখানা করল, রত্তি মাত্র ফাঁক।
তাতেই এল শীতল হাওয়া। প্রাণ জুড়ালো। কিছু কবিতা ছাপা হল।
লোকে বলল, বাহ। ছেলেরা ভেংচী দিল।
 
স্বামী বলল, মেয়ে মানুষের মনের কথা স্বামী জানবে।
পাড়া রাষ্ট্র হল, তুমি তো হলে বেশ্যা!
সে কাঁদল। বালিশ জানল। স্নানের জল জানল।
 
নষ্টা হল ব্যানার্জী বাড়ির বড়বউ।

ছেলেরা এখন বড়। সে ঠাকুমা এখন।
নাতি নাতনিরা এড়িয়ে চলে।
 
কি করেছে সে সংসারে! শুধু বাচ্চা বিইয়ে, কাব্য লিখেছে!
হারামজাদী, গতরখাগি, বেবুশ্যে মাগী - এরকম বহু শিরোপা পেয়েছে তো!
তবু বুকের রক্তে ভিজে, ওই যে বালিশের নীচে, কবিতার খাতা।
এরপরের ঘটনা কিছু নেই। মনে বড্ড জ্বালা।
 
কবিতাগুলো তার বুক থেকে জন্মে, হল বড্ড হেলাফেলা।
না হল সে ব্যানার্জী বাড়ির সার্থক বড়বউ
তবু কবি তো সে!
 
কেউ চিনবে না! কেউ জানল না, বুঝল না সে কথা!

ভগবান, তার একমাত্র চোখের বিষ!
কি দিল সে? তারই করুণার দিকে তাকিয়ে ছিল শুধু!
সব কেড়েছে। ভুল পথে ভুলিয়ে ছলেছে তাকে!
 
সে দেয় না ধুপ, না দীপ, না নকুলদানা।
বর বলে, বেশ্যার কি আর ধর্মেতে হয় মন।
 
আত্মীয়েরা বলে, অলক্ষী!
এমন স্বামীতেও যে না হয় সতী সাবিত্রী!
এখন সে না চায় বাঁচতে, না পারে মরতে।
 
যদিও শরীরে ধরেছে একাধিক মারণ ব্যাধি।
 
কবিতাগুলো রোজ স্বপ্নে আসে। বলে আরো কিছু আছে তো গো, না লেখা। অনেক আছে বাকি!
সে ধড়মড়িয়ে ওঠে। গভীর রাত। রাস্তাতে স্ট্রীটের আলো।
নিঝুম কলকাতা। কেউ চেনেনা তাকে।
 
চেয়েছিল আর কিচ্ছু না, একটুখানি স্বীকৃতি।
কাশতে কাশতে গলায় রক্ত আসে ।
 
কবিতার খাতা বুকে জড়িয়ে বসে,
গভীর অন্ধকারে, সে কবি-
আর কেউ জানুক না জানুক, সে জানে।
চোখের জল গড়িয়ে পড়ে শীর্ণদুটো গালে।
ফুঁপিয়ে কাঁদে কবি,
ব্যানার্জী বাড়ির বড়বউ - এক বেবুশ্যে মাগী।



(ছবিঃ সুমন দাস)

Sunday, February 22, 2015

কাসন্দী



-শুধু ঠকলাম
-কে ঠকালো
-তার চাইতে জানতে চাও কে ঠকালো না
-বেশ। তাতে কি হয়েছে? খুব ক্ষতি হয়ে গেছে কি?
-তা হয় নি! আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না এখন
-কি মনে হয়?
-মনে হয় মুখোশ সব
-ছিঁড়ে ফেললেই হয়!
-একটা আলপটকা কথা বললেই হয়! কে ছিঁড়বে? আর কত ছিঁড়বে?
-তা হলে উপায়?
-উপায় আর কি, মেনে নাও চুপচাপ। যে পিছন থেকে ছুরি মেরে গেল, সেও যখন আসবে ভদ্রবেশে, ভদ্রসমাজে তোমার সামনে, তাকে দেখেও তখন দাঁত ক্যালাও। উফ! কি জ্বালা!
-জ্বালার কি হল?
-তুমি তো আচ্ছা আহাম্মক লোক হে। একটা বিশ্বাসঘাতকের সাথে সৌজন্যতামূলক আচরণ করা চাট্টিখানি কথা নাকি, অ্যাঁ!
-কেন, তুমি তো ঠকাও নি। ঠকিয়েছে তো সে। অস্বস্তি তো তার লাগবার কথা।
-সে যুগ আর নেই চাঁদু! এখন সবাই সবাইকে ব্যবহার করে। সেই ব্যবহার করাতে যে ব্যবহৃত হয় সে আরেকজনকে ব্যবহার করার তাল খোঁজে।ওসব অনুতাপ-টাপ পুরোনো সেন্টু দাদা, কেউ মাথা ঘামায় না।
-তা হলে তোমার রাগের কারণ, ওর আগে তুমি কেন ওকে ঠকালেনা? কেন তুমি ঠকে গেলে আগে, এই তো?
-না, ঠিক তা নয়। আমি ঠকাতে চাই নি কোনোদিন কাউকে। কিন্তু তাই বলেই কি আমায় ঠকিয়ে যেতে হবে সব্বাই কে?
-আমি বুঝি। তাই বললাম, তুমি তো কাউকে ঠকাও নি ভাই। তুমি মরমে মরছ কেন?
-কিন্তু আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে!
-এই তো করতে পারছ। তুমি যে কোথাও বিশ্বাস করছ যে-সবাই মিথ্যুক, এও তো বিশ্বাস।
-এ বিশ্বাস? তা হলে সন্দেহ কি?
-যা বিশ্বাস করতে চাই না, তাকেই বিশ্বাস করতে চাওয়াকে সন্দেহ বলে। তাও বিশ্বাসেরই আরেকটা রূপ।
-মাথাটা গুলিয়ে দিলে
-কিছুই গোলাই নি। তুমি আশা-ভরসাগুলো, ধ্যান-ধারণাগুলোকে আবার ধোয়া মোছা করো দিকিনি। দীর্ঘদিন একই রকম থাকতে থাকতে ওগুলোতে মরচে ধরেছে।
-যে ঠকায় তার সাথেও ভাল করে কথা বলতে হবে?
-আরে বাবা, যে ঠকালো, সে তো সেখানেই ইতি টানল ঘটনাটার। তুমি কি করছ? তাকে হিঁচড়ে টেনে নরকে পাঠাবার মতলব আঁটছ রাতদিন মনের মধ্যে। এতে করে, সে কতবার নরকে যাবে জানি না, কিন্তু তুমি দিনে কতবার যে সেদিকে যাচ্ছ সে খেয়াল আছে? নিজের জীবনটাকে শাস্তি দিচ্ছ কেন, অন্যকে শাস্তি দিতে গিয়ে?
-তা ঠিক
-তবে সে মতলব ছাড়ো ভাই। যাঁর হাতে সব বিচারের ভার তাঁকেই দিই না কেন। নিজে নিয়ে কি দরকার নাস্তানাবুদ হওয়ার তো বুঝিনা। বরং আরেকটু এগিয়ে বলি, ভুলে যাও। যা পাল্টানোর নয়, তা নয়ই। বরং এসো আমরা পাল্টে যাই। কাউকে অবিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করেই - যে সেও একটা মানুষ। দোষে-গুণে ভরা জলজ্যান্ত মানুষ। এসব নিয়েই যখন চলতে হবে, তখন এভাবেই চলি, অতীতকে ঝেড়ে ফেলে সামনে দিকে! কাসন্দী বরং কৌটোতেই থাক। আর নেড়ে কাজ নেই। কি বলো?