Showing posts with label হাল হকিকৎ. Show all posts
Showing posts with label হাল হকিকৎ. Show all posts

Thursday, March 14, 2024

সাদি মহম্মদ



সাদি মহম্মদ। চলে গেলেন। খবরে পড়লাম আত্মহত্যা করলেন। গত বছর মা মারা গিয়েছিলেন। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে চলে গেলেন, এমনই পড়লাম। অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ সাদি। ভীষণ কঠিন জীবন ছিল। বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। আমি ওঁর একটা সাক্ষাৎকারেই শুনেছিলাম। সে যন্ত্রণা নিয়েই বড় হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গানকে কণ্ঠে নিয়েছিলেন। 

 অনেক ছোটোবেলায় বাংলাদেশের চ্যানেল আসত টিভিতে। ছোটো অ্যাণ্টেনা। মাঝে মাঝেই ছাদে উঠে অ্যাণ্টেনার মুখ এদিক ওদিক করতে হত। নীচ থেকে মা কি ভাই চীৎকার করে বলত, হ্যাঁ এসেছে, এসেছে, এরকমই রাখ। নেমে আয়। 

     সেই বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলে শুনেছিলাম সাদি মহম্মদের গান প্রথম। শান্ত ধীর স্থির একজন মানুষ, অত্যন্ত গভীর কণ্ঠস্বর, আর চোখদুটো কী অদ্ভুত! কী শান্ত! আত্মসমাহিত। 

     প্রথম গানটা শুনেছিলাম রেজওয়ানা চৌধুরীর সঙ্গে। খুব সম্ভবত, "

সাদি মহম্মদ। চলে গেলেন। খবরে পড়লাম আত্মহত্যা করলেন। গত বছর মা মারা গিয়েছিলেন। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে চলে গেলেন, এমনই পড়লাম। অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ সাদি। ভীষণ কঠিন জীবন ছিল। বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। আমি ওঁর একটা সাক্ষাৎকারেই শুনেছিলাম। সে যন্ত্রণা নিয়েই বড় হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গানকে কণ্ঠে নিয়েছিলেন। 

 অনেক ছোটোবেলায় বাংলাদেশের চ্যানেল আসত টিভিতে। ছোটো অ্যাণ্টেনা। মাঝে মাঝেই ছাদে উঠে অ্যাণ্টেনার মুখ এদিক ওদিক করতে হত। নীচ থেকে মা কি ভাই চীৎকার করে বলত, হ্যাঁ এসেছে, এসেছে, এরকমই রাখ। নেমে আয়। 

     সেই বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলে শুনেছিলাম সাদি মহম্মদের গান প্রথম। শান্ত ধীর স্থির একজন মানুষ, অত্যন্ত গভীর কণ্ঠস্বর, আর চোখদুটো কী অদ্ভুত! কী শান্ত! আত্মসমাহিত। 

     প্রথম গানটা শুনেছিলাম রেজওয়ানা চৌধুরীর সঙ্গে। খুব সম্ভবত, "বরিষ ধারা মাঝে শান্তির বারি।"

      তারপর অনেক অনেকবার ওঁকে শুনেছি। অবশ্যই টিভিতে। এপার বাংলাতেও শুনেছি। সেও টিভিতে। সাক্ষাৎকারটা খুব সম্ভবত তারা চ্যানেলে হয়েছিল। 

   পড়লাম উনি চলে যাওয়ার দিন সকালেও রেওয়াজে বসেছিলেন তানপুরা নিয়ে। কেউ লিখলেন যে ঘরে বসে গাইতেন সেই ঘরেই চলে গেলেন। কিন্তু কেন? মায়ের মৃত্যুশোকে? 

     মায়ের মৃত্যুশোকের সঙ্গে লড়াই করা ভীষণ অসম্ভব একটা ব্যাপার। হঠাৎ করে গোটা সংসারের সঙ্গে সম্পর্কটা শুধুই বাইরের সম্পর্ক হয়ে যায় এক লহমায়। কী একটা অভাব কিছুতেই আর মেটে না। কী একটা সুখ-শান্তি, কিছুতেই আর আসে না। মা নেই না! এই একটা কথা যে কতবড় শূন্যতা সে বলে বোঝানো যায় নাকি? 

   অথচ আমরা বলি রবীন্দ্রনাথের গান সব পারে। পারে না। এক সময় সুচিত্রা মিত্র তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, এক গভীর শোকের সময়, "এমন কী রবীন্দ্রনাথের গানও আমায় সান্ত্বনা দেয়নি।" 

   দেয় না। কোনো সান্ত্বনা কোথাতেও নেই। সব গান, সব কবিতা, সব বাণী এক সময়ে বাইরে পড়ে থাকে। এক গভীর শোক, অর্থহীন জীবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলে, চলে আয়। 

   কিন্তু চলে আয় বললেই কি যেতে হয় সাদি? তাও এই রমজানের মাসে, একি যাওয়ার সময়? এইভাবে যায় কেউ? 

  এর উত্তর জানা যায় না। নিঃসঙ্গ হৃদয় ভাষাকেও বলে দূরে যাও। তুমিও বোঝো না আমায়। 

   মানুষের ভাষা, অত শক্তিশালী নয় তো, যে, সে এই প্রাগৈতিহাসিক হৃদয়কে বোঝে। 

      আজ কলকাতার আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামছে সাদি। আপনার না থাকাটা আপনার গান কিছুটা ভরিয়ে দেবে। আমার শ্রদ্ধা জানাতে মনে মনে আপনার গানের ঘরে এলাম। আপনার তানপুরাটার তারে হাত রাখলাম। যে আজ ভীষণ একা হল। সত্যিই একা হল। কলকাতায় বৃষ্টি নামছে সাদি। কালো মেঘ করে আসছে। ধারা মাঝে শান্তির বারি।"

      তারপর অনেক অনেকবার ওঁকে শুনেছি। অবশ্যই টিভিতে। এপার বাংলাতেও শুনেছি। সেও টিভিতে। সাক্ষাৎকারটা খুব সম্ভবত তারা চ্যানেলে হয়েছিল। 

   পড়লাম উনি চলে যাওয়ার দিন সকালেও রেওয়াজে বসেছিলেন তানপুরা নিয়ে। কেউ লিখলেন যে ঘরে বসে গাইতেন সেই ঘরেই চলে গেলেন। কিন্তু কেন? মায়ের মৃত্যুশোকে? 

     মায়ের মৃত্যুশোকের সঙ্গে লড়াই করা ভীষণ অসম্ভব একটা ব্যাপার। হঠাৎ করে গোটা সংসারের সঙ্গে সম্পর্কটা শুধুই বাইরের সম্পর্ক হয়ে যায় এক লহমায়। কী একটা অভাব কিছুতেই আর মেটে না। কী একটা সুখ-শান্তি, কিছুতেই আর আসে না। মা নেই না! এই একটা কথা যে কতবড় শূন্যতা সে বলে বোঝানো যায় নাকি? 

   অথচ আমরা বলি রবীন্দ্রনাথের গান সব পারে। পারে না। এক সময় সুচিত্রা মিত্র তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, এক গভীর শোকের সময়, "এমন কী রবীন্দ্রনাথের গানও আমায় সান্ত্বনা দেয়নি।" 

   দেয় না। কোনো সান্ত্বনা কোথাতেও নেই। সব গান, সব কবিতা, সব বাণী এক সময়ে বাইরে পড়ে থাকে। এক গভীর শোক, অর্থহীন জীবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলে, চলে আয়। 

   কিন্তু চলে আয় বললেই কি যেতে হয় সাদি? তাও এই রমজানের মাসে, একি যাওয়ার সময়? এইভাবে যায় কেউ? 

  এর উত্তর জানা যায় না। নিঃসঙ্গ হৃদয় ভাষাকেও বলে দূরে যাও। তুমিও বোঝো না আমায়। 

   মানুষের ভাষা, অত শক্তিশালী নয় তো, যে, সে এই প্রাগৈতিহাসিক হৃদয়কে বোঝে। 

      আজ কলকাতার আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামছে সাদি। আপনার না থাকাটা আপনার গান কিছুটা ভরিয়ে দেবে। আমার শ্রদ্ধা জানাতে মনে মনে আপনার গানের ঘরে এলাম। আপনার তানপুরাটার তারে হাত রাখলাম। যে আজ ভীষণ একা হল। সত্যিই একা হল। কলকাতায় বৃষ্টি নামছে সাদি। কালো মেঘ করে আসছে।

Friday, March 8, 2024

গান্ধী বনাম

 এতদিন শুনেছিলাম গান্ধী বনাম আম্বেদকর। গান্ধী বনাম সুভাষ।


    এখানে দুটো ব্যক্তির মধ্যে তুলনা টানা হচ্ছে না। এখানে তুলনা টানা হচ্ছে দুটো সিদ্ধান্ত বা দুটো আদর্শের মধ্যে তুলনা। সেই নিয়ে অনেক অত্যন্ত উচ্চমানের বিতর্ক আলোচনা শুনেছি। 


   কিন্তু গান্ধী বনাম গডসে?! এটা কোনো তুলনা? প্রশ্নকর্তা সুমন আপনার রুচিকে বিস্ময়। আর প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎবাবু আপনাকে আরো বিস্ময়, এই নিয়েও ভাবতে হবে? এর উত্তর হয় কোনোটাই নয় হতে পারে, বা গান্ধী হতে পারে। গডসে আদর্শ?!! যে কারণে প্রজ্ঞা ঠাকুরকে টিকিট পাওয়া থেকে বাদ দেওয়া হল, আপনি শেষে সেই মানুষের পাশে গিয়ে বসলেন? গান্ধী বিরোধীতা করুন আপত্তি নেই। কিন্তু আম্বেদকরকে নিয়ে করুন, সুভাষকে নিয়ে করুন, একটা মান থাকে তাও। বাংলার দৈন্য কি শেষে এতটা নীচে এসে ঠেকেছে?


     প্রাক্তন বিচারপতি মশায় এই ভিডিওটা একটু মন দিয়ে শুনুন। অনেক সময় অনেক জানা জিনিসও ঝালিয়ে নিতে হয়।


https://m.youtube.com/watch?si=48L_zhLp3cqWnpfA&fbclid=IwAR0h-TaZMnjiK91ab0cDyF9j49vOOIk6xw5U6JHCybGEZIu1YD2iOzh8xIY&v=zDgU7pPFLLY&feature=youtu.be

Saturday, February 17, 2024

রৈলিক জীবন

 আমার পড়ার ঘরে, একতলায় আছি। একটা বইতে ডুবে আছি। হঠাৎ শুনতে পেলাম উপরের তলা থেকে কেউ বলছে, "আমি তো বেইমান। মানুষমাত্রেই বেইমান।" 

    গলাটা বাবার দেখাশোনা করতে আসা অস্থায়ী আয়ার। যিনি নিয়মিত থাকেন তিনি কদিনের ছুটিতে আছেন। আমি আবার কান পেতে শুনলাম,  কথাটা নিশ্চয়ই ফোনে হচ্ছে। কারণ এক, বাবা বেশি কথা বলার মানুষ নন, দুই, বাবাকে এসব বলার কোনো কারণই নেই। 

     ইতিমধ্যে বাবার ফোন দোতলা থেকে... "হ্যাঁ রে, এ কার সঙ্গে কথা বলে কাঁদছে এরকম?"

    আমি এম এন শ্রীনিবাসের "ভারতীয় সমাজকে"  টাইমস অব ইণ্ডিয়ার উপর উপুড় করে উপরে উঠলাম। সত্যিই তো উনি এভাবে কান্নাকাটি করে কাকে এসব বলছেন। সে যাকেই বলুন, কিন্তু পাশে একজন অসুস্থ মানুষ, তার মানসিক চাপ তো হবে নাকি! 

   সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেক উঠেই থমকে গেলাম। দেখলাম উপরের বারান্দার জানলায় মোবাইল রাখা, আর অস্থায়ী আয়া যিনি, তিনি দুই হাত রিও দ্য জিনারিওর যীশুর স্ট্যাচুর মত দুই দিকে প্রসারিত করে উক্ত সংলাপটা বলতে বলতে দুলকি চালে মোবাইলের চলন্ত ক্যামেরার দিকে এগিয়ে চলেছেন। 

  বুঝলাম রিল নির্মাণ হচ্ছে। এখন নিজে লেখালেখি করি, শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাটা কি ঠিক? কি সংকট। কি করি। বাকি সিঁড়িটা উঠে, বাবার ঘরে ঢুকলাম। বলাবাহুল্য আমায় রিল নির্মাতা খেয়ালও করলেন না। 

  বাবা বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ রে, একই কথা ও বার কুড়ি বলেই যাচ্ছে... একই ভাবে কেঁদে কেঁদে.... ও কি পাগল?! 

    বাবার মুখের ভঙ্গি আর শেষের আশঙ্কাজনক সিদ্ধান্তের কথাটা শুনে আমার পক্ষে আর হাসি চাপা গেল না। বাবা ফেসবুক, ইনস্টা ইত্যাদি কিছুই বোঝেন না। অগত্যা আমি দুটো রিল চালিয়ে বললাম, এই... এই জিনিস বানানো হচ্ছে। 

     বাবা দু একটা দেখে বললেন, ওহ! থাক থাক। বানাক। এ বানিয়ে কি হয়? 

    কিন্তু দু একটা রিল ইতিমধ্যেই যা চলে এসেছে বাবা আর রিলের প্রসঙ্গ বাড়ালেন না। আমিও বাবার ঘর থেকে বাইরে এসে দেখি শিল্পী চেয়ারে বসে বসে সদ্য নির্মিত রিলটি বেশ আত্মতৃপ্তির সঙ্গে দেখছেন। 

   আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রিল বানাচ্ছিলেন বুঝি?

   তিনি একগাল হেসে বললেন, হ্যাঁ দাদাবাবু, আপনি আছেন ইনিস্টিয়ায়...

      না না, আমি কোনো ইনিস্টিয়ায় নেই। 

     মিথ্যা বললুম। পাছে যৌথ উদ্যোগে রিল বানানোর প্রস্তাব আসে। বলা তো যায় না! 

   নীচে এসে আবার এম এন শ্রীনিবাসকে সোজা করে কোলে রাখলাম। কিন্তু পড়ব কি, বাবার ওই সতেজ প্রশ্ন - ও কি পাগল! কথাটা যতবার মনে পড়তে লাগল, ততবার হাসতে হাসতে আমার পেটের মাংসপেশিতে টান ধরার উপক্রম হল। এই রিলের চক্করে আবালবৃদ্ধবনিতা পাগলামির দোরগোড়ায় এসেছে বাবা... সব পাগল হচ্ছি.... ক্যামেরার মুখ যদ্দিন ওদিকে ছিল তদ্দিন নানাবিধ  সৃষ্টি ছিল। ক্যামেরার মুখ যেই না ওদিক ছেড়ে আমার দিকে ঘুরেছে... ব্যস। তবে ক্যামেরাই বা বলি কেন, যা কিছুই হোক, তা যদি দশদিশি ছেড়ে সেল্ফিসি হয়, তো পাগল দশা হয় না মানুষের? .মেগালোম্যানিয়াক ইত্যাদি কি সব বলত না আগে.... তারই তো নতুন ভারসান এ। নিজেকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করেছ কি পাগল হব হব হয়েছ.... এ তো আদ্যিকালের কথা.... অগত্যা আধুনিকতাকে বরদাস্ত করাই শ্রেয় ভাবলাম।

      জীবনকে কোনোদিন সমস্যাহীন করার চেষ্টা করিনি। কারণ, ও হয় না। কিন্তু সমস্যাটা যতটা কম ক্ষতিকারক হয় সে চেষ্টা চালিয়ে গেছি বা যাচ্ছি প্রতিদিন। অগত্যা তিনি যখন নীচে নামলেন, বললাম, সে রিল বানান অসুবিধা নেই, খালি বাবা যখন ঘুমাবেন বানাবেন না, আর যখন জেগে থাকবেন দরজাটা বন্ধ করে নেবেন। 

   তিনি এক মুখ রৈলিক হাসি হেসে বললেন, আচ্ছা দাদাভাই!

Saturday, February 3, 2024

আত্ম-ক্ষমাহীন ঘুরে বেড়াব কোথায়?

ভেবেছিলাম বড় বড় প্ল্যাকার্ড থাকবে। ভেবেছিলাম কলেজ পড়ুয়া একদল যুবক-যুবতী গলার শিরা ফুলিয়ে, গিটার হাতে সুরে-না-সুরে চীৎকার করবে।

    গাজায় পোকামাকড়ের মত কচলে ফেলা শিশুদের ছিন্নভিন্ন ছবি। ধ্বংসস্তূপ। আর ধ্বংসস্তূপ। আর বিপন্নতার ছবি। যুদ্ধবিরোধী বইগুলো সাজানো থাকবে থরে থরে, সামনে সামনে। অনেক স্টলের দেওয়ালের রং হবে - কালো।

   মণিপুর নিয়ে প্রচণ্ড সরব থাকবে ওরা। যারা আমাদের আশ্চে প্রজন্ম। আলোচনা সভায় চীৎকার করে সৎ সাংবাদিক বলবে অসৎ সাংবাদিকতার কথা। বলবে, চুপ করিয়ে দেওয়ার কথা। বলবে, জেলের কুঠুরিতে বন্দীদের কথা। 

    কেউ হয় তো বলবে, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো ধর্ম প্রতিযোগিতার কথা। শ্রেণীবৈষম্যের কথা। সমাজ, শিক্ষায় দুর্নীতির কথা। 

   সব ভাঙা মেলার মত শান্ত, ভরা মেলায়। ভয়ে, না উদাসীনতায় জানি না। শুধু দেখলাম, অনুভব করলাম “ফিল গুড” পোষ্যতায় সাড়া দিয়েছে অনেকে। রাজপথ না, গলিপথেই হাঁটলাম শুধু। শুধু হাসলাম। শুধু উদযাপন করলাম। শুধু উৎসবের আমেজে গলিতে উঁকি দেওয়া মুখ ভার আকাশকে বললাম, দূরে যাও।

     বড় ভার বুক জুড়ে। একা একা পাগলের মত কথা বলে যাচ্ছে সে। যেদিকে তাকাতে নেই সেদিকেই তাকাচ্ছে। জটিল সমস্যার এত যে সরলীকরণ, এত যে একমুখীকরণে ভেসে যাচ্ছে স্রোত, আমার পাথরটা শুধু ভাসাতে পারছি না। যে ভাষায় ভাসে পাথর, সে ভাষা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তুচ্ছ। আমি দুর্বল। তবু আস্থাহীন নই।

   আজ হয় তো একা হওয়ার দিন। তাই হয় তো ভবিতব্য। কিন্তু তবু কোথাও জানি, আলো জ্বলে যে মন্দ ভালোর দ্বন্দ্বে, সে আলোকে পোষ মানাতে কেউ পারেনি কোনোদিন। সঙ্গে এও জানি, বই যেদিন পোষ্য হয়, সেদিন বড় দুর্দিন। মুখাগ্নি না করে আগুনেও নেয় না, এমনকি প্রাণহীন দেহ। আগুনে শুদ্ধ না হলে ভাষা, আত্ম-ক্ষমাহীন হয়ে ঘুরে বেড়াব কোথায়?

Saturday, January 27, 2024

চুলোচুলি

 যে গপ্পোটা বলে এবারের মত বইমেলা পর্বের ইতি টানি। 


      এখন এদ্দিন তো বাস, অটো গুঁতিয়ে মেলায় যেতে হত। ফেরার সময় বাসের জন্য কি ভোগান্তি হত। এইবারে তো মেট্রো। সোজা শিয়ালদা। 


  তো বইমেলা থেকে বেরিয়ে মেট্রোতে উঠলাম। বিশাল ভিড়। শরীরটা ক্লান্ত। মনটা ভীষণ খুশী। তো একটা স্টেশান পরেই এক তরুণ তরুণী উঠল। দরজার কাছে দাঁড়ালো। ভিড়, জনগণ, কোলাহল -  সমাজ সংসার মিছে সব হয়ে গেছে তাদের কাছে। সে ভালো। ভালোবাসা জগত না ভোলালো তো কেমন ভালোবাসা! মেয়েটা কি একটা বলছে ছেলেটার কানে, ছেলেটা হাসতে হাসতে মেয়েটার কাঁধে মাথা রাখছে। আবার ছেলেটা কি বলছে, মেয়েটা হাসতে হাসতে ছেলেটার বুকে মাথা রাখছে। যেন প্রবল ঝড়ে দুটো গাছ পাশাপাশি। 


     ওদিকে নির্লিপ্ত গলায় পরের স্টেশান, কোনদিকে প্লাটফর্ম, প্লাটফর্ম আর ট্রেনের দূরত্ব মেপে নামুন ইত্যাদি বেরসিকের মত ঘোষণা করেই যাচ্ছে। 


   হঠাৎ মেয়েটা চীৎকার করে উঠল, আঁক বলে! 


    কি হল তাই বলি। ছেলেটা বেশ কিছুক্ষণ ধরে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আদর করছিল। আচমকা মেয়েটার ব্রহ্মতালুর থেকে একটা চুল এক টানে তুলে নিল। মেয়েটা চীৎকার করে উঠল। ছেলেটা চুলটা পরম আদরে তার পিঠে ঝোলা ব্যাগটা সামনে এনে, চেন খুলে তার ভিতরে রেখে বলল, সোনা তুই কদ্দিন থাকবি না বল, এই থাকল আমার কাছে। তুই! 


    এই বলে সে পরম আদরে মেয়েটার দিকে তাকালো। 


   আমি একবার "সোনার" মুখের দিকে তাকালাম। সে দুটো হাতের পল্লব শাঁখের মত করে মুখটা ঢেকে আছে। চোখটা ছলছল। ব্যথায় না প্রেমে বুঝলাম না। 


  তারপর? তারপর আমি আমার কেশহীন মাথায় হাত বুলালাম। এ কেশহীন মস্তক দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য বোঝার চেষ্টা করলাম। এমন কেশোৎপাটি প্রেম ভালো না মন্দ বোঝার আগেই তারা নেমে গেল। আমি ভাবলাম সত্যিই প্রেম কি বিচিত্রপথগামী! জয়গুরু!

আমার বইমেলা

    আজ বইমেলায় যা পেলাম, তা অপার্থিব। আশীর্বাদ। ভালোবাসা। স্নেহ। টুকরো টুকরো মুহূর্ত এখানে বাঁধিয়ে রাখি। "দরিদ্রে রতন পেলে, সেকি অযতনে রাখে".... গানে আছে না? তাই আমিও যতনে রেখে দিই। 


যশোদি

------------



বইমেলায় গিয়ে শুনলাম যশোদি এসেছেন। ব্যস! বুক ঢিপঢিপ করতে শুরু করল। দেখা করার উত্তেজনা, আনন্দ, ভয় --- সব মিলিয়ে কি একটা হতে শুরু করল। গিয়ে দেখি উনি একটু ব্যস্ত। আমি দূরে দাঁড়ালাম। যশোদিকে দেখছি। ওঁকে যত দেখি বিস্মিত হই। ওঁর ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়াতে কেমন এক বিহ্বলতায় আবেশিত হই। এবারও হলাম। যখন দেখে, ডাকলেন, পাশে বসতে বললেন, পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, পাশে বসলাম। যন্ত্রের মত। ভীষণ সঙ্কোচ হচ্ছে। অমন পাশে বসা যায় নাকি! কিন্তু নীচে বসলে বড্ড চোখে পড়বে সবার। কথা সামান্য হল। অনেকে অপেক্ষা করছেন। আমি সময় নেব না আর। উঠব। ইচ্ছা করছে না। তবু উঠতে হবে। যশোদির কাছে বসে যেটা মনে হয়, নিজেকে এত কাজের মধ্যে, এত দায়িত্বের মধ্যে এমন সুন্দরভাবে গুছিয়েও রাখা যায়! আপনার স্নেহ, আপনার ভালোবাসা আমার পথের কড়ি দিদিভাই। আপনার প্রশ্রয়ে আমার মত আরো অনেকে কয়েক পা এগোবার সাহস পাই। ভালোবাসা। শ্রদ্ধা জানবেন। বইমেলা যাওয়া আমার শুরুতেই সার্থক। আমার দেবীদর্শন। 


রাজাদা

-----------


রাজাদা, Friends FM-এর। সবার প্রিয় মানুষ। আমারও। ওরকম একটা কণ্ঠস্বর, না প্রেমে পড়ে থাকা যায় নাকি! সময় করে দেখা করলেন। একি কম বড় পাওয়া! শুধু একটাই দুর্ভাগ্য কোনো ছবি পেলাম না আমাদের একসঙ্গে। 


শিপ্রাদি

------------



শিপ্রাদি। স্নেহ, ভালোবাসায় গড়া এক মানুষ। আমি আসছি শুনে অত রাতেই বসেছেন পিঠে বানাতে। আমি পড়েছি সঙ্কোচে। এতটা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য কিনা আমি জানি না। শিপ্রাদি'র গানে মুগ্ধ হয়েছি এতদিন। আজ সাক্ষাতে ওঁর অমলিন অমন উজ্জ্বল হাসিতে আমার চিত্তশুদ্ধি ঘটে গেল। আমি ধন্য, আপনার স্নেহে, ভালোবাসায়। আর অসময় মা ছেড়ে যাওয়া সন্তানের কাছে এর মূল্য আরো অনেক গভীরে। হৃদয়ের শূন্যতার পাশাপাশি বসে। স্নেহের উষ্মায়। রিনি, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়েও খুব ভালো লাগল। খুব ভালো থাকবেন। 


নিবেদিতা ও তাঁর সুপুত্র

---------------------------------



নিবেদিতা আর টিটোকে দেখে মনে হল আমাদের তো অনেকদিনের চেনা। যেন অনেক আড্ডা হয়েছে আগে। টিটো'র সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছিল ‘গোঁসাই’ বই উদ্বোধনের দিনে। আজ আরো বেশি পরিচিত লাগল। নিবেদিতাও ভীষণ উজ্জ্বল। ভীষণ আন্তরিক। খুব খুশী হলাম দেখা পেয়ে দু'জনের। খুব ভালো থাকবেন। 


মানসদা

------------



মানসদা। কিছু মানুষকে দেখলে মনে হয় না, এর উপর আবদার চলে, জোর চলে। মানসদাকে দেখে তাই মনে হল। মানসদার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে বহুবার। আজ মুখোমুখি হয়ে মনে হল, এঁকে তো আমি অনেকদিন থেকে চিনি। মানসদার স্বচ্ছ ভাবনা, নিজের মত ভীষণ অকপটে, সোজাসুজি বলার ক্ষমতা আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে। আজও তাই দেখলাম। মানসদার লেখা একটা বইও উপহার পেলাম। কথা হল। কিন্তু মন ভরল না। আবার গল্প হবে নিশ্চয়ই। ছেলের সঙ্গেও আলাপ হবে। মানসদার ছেলে ভীষণ গুণী। নিজের বানানো দুর্গামূর্তিতে নিজেই পুজো করে। ইচ্ছা আছে একবার ওর পুজো সামনে থেকে দেখার। এত ছোটো বয়সে এমন নিষ্ঠা! 


রাজা পোদ্দার

---------------------



রাজা পোদ্দার। অদ্ভুত মানুষ। ‘গোঁসাই’ বাস্তব হল যার জন্য। বইমেলা থেকে ফিরে আসছি। মনটা খচখচ করছে। দেখা হবে না? ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু আমারও তো আজকে দেখা না করলে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই আপাতত। তবে? বেরোবার আগের মুহূর্তে জানলাম উনি এসেছেন। কফিতে চুমুক দিতে দিতে ওঁর আসন্ন কাজগুলোর কথা শুনলাম। সত্যিই মানুষটা বিস্ময়ের। মনে মনে প্রার্থনা করলাম, আপনি সুস্থ থাকুন। আপনার মত মানুষের ভীষণ দরকার। আমার বইয়ের জন্য বলছি না। আপনার মত ভাবতে পারা মানুষের খুব দরকার। অনেক অনেক সম্ভাবনার দরজা আপনার হাতে খুলবে। আপনি ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। এই একান্ত কামনা।

পাঠ্য সুখ

   এই যে আমি হালিশহর স্টেশানে এসে বসলাম। ট্রেন ধরব বলে। বইমেলা আসছি। 

    এখন ট্রেনে উঠব। শয়ে শয়ে মানুষ। কেউ কাউকে চিনি না। আমি হকারদের দেখব। কি চটি পরেছে। কি জুতো পরেছে। সারাদিন এত ট্রেনে ট্রেনে ঘোরা। টিভিতে যারা বিজ্ঞাপন দেয়, তারা তো মিথ্যাকথা বলে। তারা তো জানে না হকারে কোন চটি পরে। আদতে কোন চটি সত্যিই টেকসই।

    বাদাম বিক্রি করতে করতে কামরার চারদিকে তাকাবে। খদ্দের খুঁজবে। চীৎকার করে বেচতে বেচতে, ট্রেনের হাতলে হাতলে হাঁটতে হাঁটতে, শ্বাস নেবে, তাকাবে খানিক ক্লান্ত। আবার হাঁটবে। স্টেশানে নামবে। আবার পরের কোনো ট্রেনে উঠবে। ওরা তো যায় না কোথাও। 

    তারপর শিয়ালদায় গিয়ে মেট্রোতে উঠব। সেখানে অন্যরকম মানুষ। সেখানে কথা নেই। আমার ভালো লাগে না মেট্রোতে যেতে। সময় বাঁচাতে উঠব। তবু। 

    বইমেলায় ঢুকব। আমি বইমেলায় আসি মূলত কবিতা খুঁজতে। কয়েকজন সুবিখ্যাত কবি তো আছেনই, কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের ওদিকে, ছোটো ছোটো প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কবিতার ছোটো ছোটো বই খুঁজে বেড়াতে। আমি তো মহাকাব্য খুঁজি না জীবনে, আটপৌরে সুখেদুখে বাঁধা জীবনের তার সুরে মেলাই বারেবারে। তাই ছোটো কবিতার বই খুঁজি। বইমেলাতেও অসংখ্য মানুষ। কেউ কাউকে চিনি না। তবু সবাইকে যেন বুঝি আমরা সেদিন। সবাই আদতে একটা কি দুটো সুর খুঁজছে। সুখ খুঁজতে এসেছে। এইটুকুই তো দেওয়া নেওয়া। পাঠ্য সুখ।

Thursday, January 25, 2024

যা খুশি লিখে দেওয়া


"এই সময়" টাইমস অব ইণ্ডিয়া গোষ্ঠী থেকে প্রকাশিত বাংলা দৈনিক পত্রিকা। এখন রীতিমতো জনপ্রিয়। এসব বলার অপেক্ষা রাখে না। এই পত্রিকার বাংলা ভাষা আমাকে অনেকবার চমকে দিয়েছে। যার একটা উদাহরণ দিচ্ছি এখানে। 

    "ইঁদুরগুলির ব্যাপক ওজন কমে গিয়েছিল, হয়ে পড়েছিল একেবারে পরিশ্রান্ত এবং তাদের চোখ হয়ে উঠেছিল সাদাটে.." 

   না আপনি নেটফ্লিক্সে কোনো স্প্যানিশ বা ইংরেজি ওয়েবসিরিজের হিন্দি ডাবিং পড়ছেন না, না শুনছেন না। ওখানে যেমন বলে, "তুমহে উসসে মিলনা চাহিয়ে, উয়ো বড়ে কামালকে ইনসান হ্যায়"..... কিম্বা, " ইয়ে মামলা তো বড়ি পেঁচিদা হ্যায়"....ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সব ডাবিং - এ বিশেষ একটা সুরে, নির্লিপ্ত ঢঙে বলে যাওয়া সংলাপের মত লাগল আমার এই পত্রিকার বাংলাটা। আরো আছে এমন উদাহরণ। 

   কিন্তু পরেরটা আরো ভয়ানক। বাংলা সিনেমায় রবীন্দ্রনাথকে কবে দেখা গিয়েছে? নেতাজীকে নিয়ে বাংলা সিনেমা হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবে হল? আর দ্বিতীয় ভুলটা তো আরো সাংঘাতিক। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে পাহাড়ি স্যান্যালের সিনেমাটা একদম ভুলে গেলেন? আরে মশায়/মহাশয়া সেই সিনেমার ক্লিপিংসও তো রিলে ঘোরে। তাও আবার খবরের শিরোনাম হিসাবে লিখছেন? 

   বাংলায় সাংবাদিকতা করতে এসে ভুল বাংলা লিখব। তার উপর বাংলার সাহিত্য, সিনেমার ঐতিহ্য নিয়ে কোনো খবর রাখব না। যা হোক একটা চালিয়ে দিলেই বাঙালি পাঠক গিলে নেবে, এ কি ধরণের মানসিকতা ভাই? বাঙালি আত্মবিস্মৃতর জাত, আত্মঘাতীর জাত ইত্যাদি অনেক শুনেছি। তার মধ্যে কিছুটা সত্য থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে যা খুশী লিখে দেওয়া যাবে সেটা তো চলতে পারে না! 

   প্রসঙ্গত বলে রাখি, বর্তমানের এক জনপ্রিয় লেখিকার বিদ্যাসাগরের উপর একটা লেখা নিয়ে ওয়েবসিরিজ হতে চলেছে, সেই নিয়ে খবর লিখতে গিয়েই এই সব ভূমিকা করেছেন। 





#এইসময় #EiSamay

Friday, January 19, 2024

অপ্রচলিত প্রেম



 আমন্ত্রণ এসেছিল গতকাল বইটির প্রকাশের দিন উপস্থিত থাকার জন্য। যেতে পারিনি, তার জন্য আন্তরিক দুঃখিত। কর্তব্য সামলে পৌঁছানো অনেক জায়গাতেই হয়ে ওঠে না। তার জন্য সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী। 


     অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা শিবশঙ্করবাবুকে, আমার লেখাটাকে এমন সব খ্যাতনামা লেখকদের মধ্যে স্থান দেওয়ার জন্য। আর নবনীতা সিংহ রায় আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ, সবটুকুর জন্য। অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল।

Thursday, January 18, 2024

বইমেলায় গোঁসাই

    ‘গোঁসাই’ বই হয়ে আসছে, খোয়াবনামা প্রান্তজনের কথা জানিয়েছিলেন “বাদল দেখ ডরি” শিরোনামের লেখাটা পোস্ট করে। 


      আজ ‘গোঁসাই’ যখন বই মেলায় এলেন, সেদিনও বাদলকে সঙ্গে করেই নিয়ে এলেন। 


      বাদলের সঙ্গে ভালোবাসার এক নিবিড় সম্পর্ক। বৈষ্ণব কবিদের পদে বাদলের তাই এত রূপ। এত দর্শন। চেনা আর অচেনা জগতের মধ্যে এসে দাঁড়ায় বাদল ছায়া। বাদলের সঙ্গে গোঁসাইয়ের যোগ নিবিড়। গোঁসাইয়ের চিত্তে ভাবের আলপনা আঁকে কে মেঘমল্লারে। গোঁসাই সুরে-কথায় বিহ্বল হয় সে কথা জানাতে চায় রসিকজনকে। কথা আর ভাবের মিলন হয় অশ্রুতে, আনন্দে। একতারায় ওঠে সুর। শান্তি নামে প্রাণে।


     ‘গোঁসাই’ এর কাছে যাওয়া যাবে কিভাবে? খোয়াবনামা জানাচ্ছেন, দু নাম্বার গেট দিয়ে ঢুকে, মুক্তমঞ্চের পাশেই। স্টল নাম্বার ১৬৬। 


     নমস্কার জানবেন। ভালো থাকবেন। 


(ছবিগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা Debasish Bose, Joydeep Ghosh, Tanmay Bepari Shawon এর কাছে। ❤️)

Friday, January 5, 2024

চায়ের দাম কিম্বা

   আরতি শেষ হল। সবাই পঞ্চশিখায় দশ আঙুল ছড়িয়ে উষ্ণ আশীর্বাদও নিল। তারপর একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক আপাদমস্তক সাদা শালে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে সবার "জয়" দেওয়া শুরু করলেন। চৈতন্য মহাপ্রভুর জয়, নিত্যানন্দের জয়, ষড় গোস্বামীর জয়, জগন্নাথের জয়.... সবাই সুর মিলিয়ে বলে যাচ্ছেন "জয়.. জয়"। 

     হঠাৎ শুনি উনি বলছেন, চায়ের দামের জয়! 

     ভোরের আড়ষ্টভাব মুহূর্তে কেটে গেল। সেকি! এতদিনে এমন কাউকে পেলাম যিনি পারমার্থিক দৃষ্টিতেও চায়ের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করেছেন! আহা আহা! মনে হল শীগগির গিয়ে ওঁকে আলিঙ্গন করি। আর বলি যে, প্রভু, স্বয়ং মহাপ্রভুও যে চায়ের  দামের জয়ের শুনতে এত উৎসুক জানতাম গো!

    পরেরদিন আবার সাততাড়াতাড়ি আরতিতে গেলাম। আজ জয় দিচ্ছেন অন্য জন। যুবক। তিনি  উচ্চারণ করলেন "চারধামকি জয়"।

    আমি আবার কান পেতে শুনলাম। তিনবারই চায়ের দাম না, চারধামের জয় বলছেন! ব্যস, সমস্ত আশা গেল ভেঙে। বুঝলাম, আশার ছলনে ভুলি কি শ্রবণ করিনু হায়! চায়ের দাম আসলে চারধাম!! হায় হায়!

Tuesday, January 2, 2024

যমুনার তীর

 যমুনার তীর। কুয়াশা ঘিরে আছে কম্বলের মত। যমুনার পাড় ধরে ধরে রাস্তা। পরিক্রমা পথ। শয়ে শয়ে মানুষ চলেছে সারাদিন ধরে। গভীর রাতেও চলেছে। সংখ্যায় কম। আবেগে নয়। অনেকের খালি পা। অনেকের হাতে খঞ্জনি। জিহ্বায় রাধা নাম। 

      সেই যমুনার তীরে রামজির চায়ের দোকান। না না, অযোধ্যার রাজারাম না। কিন্তু সেই রাজারামজী একদিন স্বপ্ন দিলেন এই রামজীকে, বললেন ওরে আপদ, কোথায় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। আয় বৃন্দাবনে আয়। তখন রামজীর বয়েস অল্প। যুবক। এলেন রামজী পরদিন সকালেই সব কাজ ছেড়ে বৃন্দাবনে, চিরকালের মত। পড়ে রইলেন এদিক ওদিক। রোগ হল। সেবা করলেন এক সন্ন্যাসী। এমনি এমনিই। সন্ন্যাসীর কাছে গেলেই কেউ সন্ন্যাসী হয় বুঝি। সাধন পেলেন রামজী। শ্রীরামেরই সাধন। কিন্তু একা কি সব সাধন হয়? এলেন সাধনসঙ্গিনী। 

    গল্প শুনছি রামজীর মুখে। পাশ দিয়ে একদল যুবতী গেল নূপুরের আওয়াজ তুলে, গাইতে গাইতে রাধে রাধে। চায়ের দুধ ফুটছে। ফিকা চা। মানে কম চিনির চা। রামজীর গল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হামানদিস্তায় কিছু গুঁড়ো করছেন সাধনসঙ্গিনী। মাঝে মাঝে সলাজ গর্বিত মুখে স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেন। এক ছেলে, বাইরে থাকে। সুরাটে। বড় ছেলে। 

    জিজ্ঞাসা করলাম, এই চায়ের দোকানের মধ্যেই তো সব। এইটুকু তো দোকান। কিভাবে চলে সব? 

    কি এক আজব প্রশ্ন করলাম যেন। খইনি বেটে হাতের তালুতে, ঠোঁটের মধ্যে পুরে বললেন, কি বলেন বাবু, শ্রী রাধার কিরপায় সব চলে যায়। কোনো দুখ নেই। আর দুখ হবে কি করে এই যে আমার রামজী আছে। 

     রামজী চা ছাঁকে। আরেক উনি পয়সার হিসাব রাখেন। পাশে বয়ে চলে যমুনা। বারোমাস। আরো দুটো হৃদয়ের খাতে বয়ে চলে গুপ্ত যমুনা বারোমাস। 

    একদল চা খাচ্ছে। একজনের পিঠে লেগে চায়ের কাপ গেল উল্টে। চা পড়ল মাটিতে। 

    চায়ের দামের হিসাব হচ্ছে। অনেকে তারা। হয়েছে ১৫২ টাকা। সঙ্গে বিস্কুট ছিল। কিন্তু ওই পড়ে যাওয়া চায়ের দামটা? ওটা তো আমাদের পিঠে লেগে পড়েছে। 

   আমাদের শিক্ষার নীতি। নির্ভুল। কিন্তু তারপরেও কিছু আছে তো। 

     রামজীর স্ত্রী বললেন, না গো, ওটা ধরিত্রীমাতা নিলেন। ওর কি দাম হয়? তুমি ইচ্ছা করে ফেলেছ, না আমি ফেলেছি? আমাদের ইচ্ছার বাইরে জগতে আরেক ইচ্ছা আছে। সেই ইচ্ছাই বলবান। সেই হয়। ওর দাম নিতে নেই। 

    এরপর কোনো কথা হয় না।

     চায়ের দুধ বসাতে হবে। কিন্তু দুধের প্যাকেট শেষ। একজন সন্ন্যাসীকে চা খাওয়াচ্ছিলেন সেই বড় দলের কেউ। সন্ন্যাসীর চা শেষ হয়েছে এইমাত্র। রামজী বলল, রাধে তুমি গিয়ে দুপ্যাকেট দুধ নিয়ে এসো তো। এই নাও টাকা। 

       জিজ্ঞাসা করলাম, চেনো ওকে? 

      রামজী বলল, সবাইকে চিনি। তুমাকেও। সব প্রভু, রাধারাণীর বান্দা। 

     খানিকবাদে সে সন্ন্যাসী দুধ এনে দিল। ফেরত টাকা দিল। তারপর একগাল হেসে সবাইকে রাধে রাধে জানিয়ে কুয়াশা ঘেরা যমুনার তীরে মিশে গেল। 

      আমরা গ্লাসের ফিকে চা শেষ। মনে তীব্র আকুতি। এত ভরসা, এত আনন্দ, এত বিশ্বাস জীবনের এই পশ্চিমপ্রান্ত অবধি জমিয়ে আনো কি করে গো? এত অভয় কিসের আনন্দে? 

     বিকিকিনি শেষ। উঠলাম। রামজীর সামনে সদ্য ঢালা দুধ, ফোটার অপেক্ষায়। রামজীর গরবিনী দুটো পা ছড়িয়ে গল্পে মগ্ন। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, আসবেন আবার, জানবেন কিরপা না হলে কেউ এ মাটিতে পা রাখে না। মনে রাখবেন। 

   ফিরছি যমুনার তীর ধরে। সন্ধ্যে নেমে গেছে। জীবনে স্থিতি চাইলাম, শান্তি চাইলাম না। হাজার অস্থিতির মধ্যেও শান্তিকে জেনেছি অনেকবার, কিন্তু স্থিতির মধ্যে সব সময় শান্তি পেয়েছি কি?

Wednesday, December 27, 2023

ফুটবল বনাম গীতাপাঠ


 ফুটবলকে উনি গীতাপাঠের বিকল্প বলেননি, তবে তো রামকৃষ্ণ মিশন না বানিয়ে রামকৃষ্ণ ফুটবল টিম বানাতেন। উফ!! কি নিয়ে খবর পড়তে হচ্ছে। আরে ভাই পড়াশোনা কি সব ছেড়ে বসে আছেন আপনারা! উনি বলেছিলেন ফুটবল খেলে শরীরটা সবল হলে গীতাটা আরো ভালো বুঝবে। ফুটবল খেলাকে গীতাবোধের উপায় বলতে চেয়েছিলেন। আর কোন বিষয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন? না, ভারতীয়রা কিভাবে বেদান্তকে নিজের জীবনে প্রয়োগ করবে সেই বিষয়ে বলছিলেন। অর্থাৎ গীতাকে কিভাবে অ্যাপ্লাই করা হবে সেই নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন মাদ্রাজে। এই নিন গোটা কথাটা.... হল্লা না করে, জনগণকে বিভ্রান্ত না করে গোটা উক্তিটা পড়ুনদিকিনি....

      "দুর্বল মস্তিস্ক কিছু করিতে পারে না; আমাদিগকে সবলমস্তিষ্ক হইতে হইবে — আমাদের যুবকগণকে প্রথমতঃ সবল হইতে হইবে, ধর্ম পরে আসিবে। হে আমার যুবক বন্ধুগণ, তোমরা সবল হও — তোমাদের নিকট ইহাই আমার বক্তব্য। গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে। আমাকে অতি সাহসপূর্বক এই কথাগুলি বলিতে হইতেছে; কিন্তু না বলিলেই নয়। আমি তোমাদিগকে ভালবাসি। আমি জানি, সমস্যা কি — কাঁটা কোথায় বিঁধিতেছে। আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। তোমাদের বলি, তোমাদের শরীর একটু শক্ত হইলে তোমরা গীতা আরও ভাল বুঝিবে। তোমাদের রক্ত একটু তাজা হইলে তোমরা শ্রীকৃষ্ণের মহতী প্রতিভা ও মহান্ বীর্য ভাল করিয়া বুঝিতে পারিবে। যখন তোমাদের শরীর তোমাদের পায়ের উপর দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান হইবে, যখন তোমরা নিজেদের মানুষ বলিয়া অনুভব করিবে, তখনই তোমরা উপনিষদ্ ও আত্মার মহিমা ভাল করিয়া বুঝিবে।" (ভারতীয় জীবনে বেদান্তের কার্যকারিতা। মাদ্রাজে তৃতীয় বক্তৃতা।)




Thursday, December 7, 2023

নোম চোমস্কি



মানুষকে নিয়ে দল পাকাতে গেলে মানুষকে নিয়ে দল পাকাতে গেলে ছোটোকথা লাগে। ভয় সেখানে একটা বড় অনুপান। যত ভালো করে মেশানো যায় তত ভালো কাজ করে। যে যুক্তি ভয় থেকে জন্মায়, আরেক ভয়ের কাছে মাথা নীচু করে, সে খুব কাজের যুক্তি হয়। ভয়কে যতটা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, অনুভব করা যায়, আর কিছুকে অতটা না। 

    আপনাকে দেখি, কি অনায়াসে, কি নম্রতায় ভয়ের মুখোমুখি হতে পারেন। হতে শেখান। সাধারণ মানুষকে বলেন, জাগো। ভয় থেকে জাগো। মুখোমুখি হও। কোনো প্রোপাগাণ্ডায় বিশ্বাস কোরো না। 

   আর একটা জিনিস দেখি, কি সহজলভ্য করে রেখেছেন নিজেকে। অতি সাধারণ মানুষের সঙ্গেও কি অনায়াস আলাপন আপনার। সক্রেটিস যেমন ভরা বাজারে সবার সঙ্গে কথা বলে চলেছেন, আপনিও বলে চলেছেন। 

   আপনাকে নিয়ে বলার শেষ নেই। আপনার কাছে আমার মত অতি সাধারণ লক্ষ মানুষের ঋণের শেষ নেই। আপনি ভালো থাকুন। শুভ জন্মদিন, নোম চোমস্কি। লাগে। ভয় সেখানে একটা বড় অনুপান। যত ভালো করে মেশানো যায় তত ভালো কাজ করে। যে যুক্তি ভয় থেকে জন্মায়, আরেক ভয়ের কাছে মাথা নীচু করে, সে খুব কাজের যুক্তি হয়। ভয়কে যতটা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, অনুভব করা যায়, আর কিছুকে অতটা না। 

    আপনাকে দেখি, কি অনায়াসে, কি নম্রতায় ভয়ের মুখোমুখি হতে পারেন। হতে শেখান। সাধারণ মানুষকে বলেন, জাগো। ভয় থেকে জাগো। মুখোমুখি হও। কোনো প্রোপাগাণ্ডায় বিশ্বাস কোরো না। 

    আর একটা জিনিস দেখি, কি সহজলভ্য করে রেখেছেন নিজেকে। অতি সাধারণ মানুষের সঙ্গেও কি অনায়াস আলাপন আপনার। সক্রেটিস যেমন ভরা বাজারে সবার সঙ্গে কথা বলে চলেছেন, আপনিও বলে চলেছেন। 

     আপনাকে নিয়ে বলার শেষ নেই। আপনার কাছে আমার মত অতি সাধারণ লক্ষ মানুষের ঋণের শেষ নেই। আপনি ভালো থাকুন। শুভ জন্মদিন, নোম চোমস্কি।

Sunday, November 19, 2023

রবীন্দ্রনাথ কখনও ছট নিয়ে লেখেননি

 


রবীন্দ্রনাথ কখনও ছটপুজো নিয়ে লেখেননি। বিবেকানন্দ কখনও ছটপুজো ও বেদান্ত নিয়ে ভাষণ দেননি। যদিও অনেক বাঙালি আজকাল দেখি ছটপুজো করেন, তবে সে অন্য বাঙালিরা। যারা অত ‘সাংস্কিতিক মনোস্কো’ নন, তাঁরা করেন। কিন্তু অনেক বাঙালি পরিবেশ নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়েন। “খোঁট্টা”-দের বিচার-বিবেচনাহীনতায় সোশ্যালমিডিয়া জুড়ে গ্রেটা থুনবার্গের বাঙালি সংস্করণদের পোস্টে রীতিমতো মেলা বসে যায়। প্রতি বছর রবীন্দ্রসরোবর আলোচনায় চলে আসে। এবং কিভাবে কলকাতা দূষণের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সে নিয়ে আলোচনার পর আলোচনা হয়। 

   আমি সেগুলো সব মেনে নিয়ে আমার দেখা ছটপুজো নিয়ে লিখতে চাইছি। কেন চাইছি? তার একটা গপ্পো আছে। কদিন আগে, একটা অবাঙালি পাড়া দিয়ে যেতে যেতে প্যাণ্ডেল বাঁধা দেখে আমার এক বন্ধু বলে, এটা হয় তো বা ছটপুজোর জন্য হচ্ছে। 

   আমি বললাম, তা কেন হবে? এদিকে তো কোথাও পুকুর-টুকুর নেই। তাছাড়া এটা ঘাটে আর বাড়িতেই হয় সাধারণত। ঘাটের পাশে মঞ্চ হয়, মূর্তি বসে এসব হয়, কিন্তু তার তো কারণ আছে, পুজোর সঙ্গে জলাশয়ের যোগ আছে যে! 

     ওকে এই কথাগুলো বলতে গিয়ে জানলাম ছটপুজো নিয়ে আমার একটা ধারণা আমার অজান্তেই তৈরি হয়েছে। 

   ছটপুজো অবশ্যই বিহারের সব চাইতে বড় উৎসব। উত্তর প্রদেশেও হয় যদিও। সেইভাবে দেখতে গেলে এখন সারা ভারতে তো হয়ই, তাছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও নানা ডায়াস্পোরাতে হয়। 

   ছটের মত এত বড় একটা উৎসবে ব্রাহ্মণ লাগে না, পুরোহিত লাগে না। এইটা আমার সব চাইতে ভালো লাগে। সমাজে সব স্তরের মানুষের এই উৎসবে নিয়মকানুন এক। জাতপাতের ভেদ ছাড়া এতবড় উৎসব আর কি আছে? অনেক সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ দুর্গাপুজোতেও দেখেছি ব্রাহ্মণ ছাড়া পুজো করানো হয় না। সেখান এতবড় উৎসব বিনা মন্ত্রে শুধু লোকগানের ভাষায়, এটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। 

     আমাদের যেখানে তর্পণের দিন নিজের বাপ-মাকে স্মরণ করতে পুরুতের খুঁটো ধরতে হয়, যেখানে আমরা মেনে নিই যে, যে মানুষটা আমার সঙ্গে রীতিমতো বাঙলা চলিতে কথা বলে জীবন কাটালো, সে-ই নাকি আত্মা হয়েই তার ভাষা ভুলে গেল, সংস্কৃত ছাড়া আর কোনো ভাষার ডেটা নেই তার কাছে। কি তাজ্জব না? আপামর হিন্দু ভারতীয়েরই এই বিশ্বাস। 

  কিন্তু এইখানে, এই পুজোয় ভক্ত বিশ্বাস করে ছট মা তার দেহাতি ভাষার গান বুঝছেন। সে গানে দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি, সুখদুঃখ, জিনিসের দাম সাধ্যের বাইরে যাওয়া ইত্যাদি কি নিয়ে না কথা নেই! 

  ছটের অনেক পৌরাণিক মত আছে। কেউ বলেন শ্রীরাম ও সীতা লঙ্কা থেকে ফেরার পর এই পুজো করেছিলেন। কেউ বলেন, দ্রৌপদী এই পুজো করেছিলেন। কোনো মতে কোনো রাজার পুত্র হচ্ছিল না বলে এই পুজো করেছিলেন। আবার এও আছে যে কর্ণ, নিজের পিতা সূর্যদেবকে যে জল অর্পণ করতেন সেই থেকে এই পুজো চলে আসছে। আরো আছে, ছট মা ব্রহ্মার মানসকন্যা, সূর্যের বোন। কেউ বলেন তিনি কাত্যায়নীর রূপ। এরকম নানা গল্প তো আছেই। যত মানুষ তত ভাব। এই তো সত্য। 

   পুজোর অনেক অনুষঙ্গ। একদিন লাউভাত খাওয়া। একদিন ক্ষীরপুরী খাওয়া। তারপর প্রায় চল্লিশ ঘন্টা উপোস থেকে সন্ধ্যার্ঘ ও প্রভাত অর্ঘ্য দেওয়া জলে দাঁড়িয়ে।

     পঙ্কজ ত্রিপাঠি আমার খুব প্রিয় অভিনেতা। তিনি আজকে একটা দৈনিক পত্রিকায় খুব সুন্দর লিখেছেন নিজের ছটের অনুভবের কথা। লিখছেন যখন ছোটো ছিলাম আমার বাড়ির ঠিক পিছনেই একটা নদী ছিল, তার পাড়েই আমরা ছটে যেতাম। তখন এত বাজারদোকান তো ছিল না। ফলে আমাদের ক্ষেতের আঁখ আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতাম। তাদের ক্ষেতের ফল তারা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিত। ছটের বিশেষত্বই হচ্ছে এ পুজোয় ক্ষেতের জিনিসই লাগে। ফসল, ফল ইত্যাদি। তখন আমাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা করে জামা তো বাবা আনতেন না, বড় ছিট কিনে আনতেন, সেটা কেটে কেটেই আমাদের জামা হয়ে যেত। আমরা যখন একসঙ্গে নদীর ধারে যেতাম সবাই দেখত সবারই এক ধরণের জামা। অনেক পরিবারেই তাই হত। আমরা ছেলেরা পুজোর আগেই নদীর ধার পরিষ্কার করার কাজে লেগে যেতাম। নদী ধার, পুকুরের ধার পরিষ্কার করা। সাজানো। সব আমাদের কাজ ছিল। আসলে পাড়াপ্রতিবেশি সবাই মিলে না এক হলে এ পুজো করা যায় না। মাকে দেখতাম যখন সন্ধ্যা বেলা নদীর জলে দাঁড়িয়ে অর্ঘ্য দিচ্ছেন, গান গাইছেন, সেই গানে পরিবারের সবার নাম করছেন। বৃহৎ পরিবারের কথা বলছি। এমনকি যার সঙ্গে মায়ের কিছু মনোমালিন্য হয়েছে তার নামও বাদ যাচ্ছে না। 

   পঙ্কজ ত্রিপাঠি শেষে লিখছেন যদি আমরা এইভাবেই সারা বছর আমদের রাস্তাঘাট, নদী-পুকুর-দীঘি পরিষ্কার রাখতে  পারি কতই না ভালো হয়। 

   ভালো তো হয়, কিন্তু আমাদের নদী পুকুর তো দূরের কথা, মন্দিরের ভিতরে বাইরে যা অবস্থা করে রাখি! মহাত্মা গান্ধী তো কাশী ইত্যাদি ধর্মস্থানে গিয়ে আঁতকে উঠতেন যে, যে স্থানকে আমরা এত পবিত্র বলি, সেই স্থানকেই এত নোংরা করে রাখি কি করে! 

   কাঁচরাপাড়া বড় শহর। আজ বাজারে গিয়ে দেখি রাস্তার দুই ধারে আঁখ আর নানা ফল নিয়ে কত কত দোকান। অবাঙালি মানুষের ঢল। রাস্তায় যেতে যেতে ছটের গান কানে আসছে। আমাদের রামপ্রসাদী গানের মত, সুর শুনলেই চেনা যায়। টানা টানা গায়কীতে কি এক দরদ। পদ্মভূষণে ভূষিতা বিখ্যাত লোকগীতি গায়িকা ও বিশেষজ্ঞ ডক্টর শারদা সিনহা এক পত্রিকায় লিখছেন ছটে গানের অনুষঙ্গের কথা। কিভাবে দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে গানের ভাষায় বদল হয়েছে। নিত্য জীবনের টুকিটাকি কথা উঠে আসে। যে কথা খানিক আগেই লিখছিলাম। 

    ছটে রাস্তায় দণ্ডি কাটতে দেখি প্রত্যেকবার। একবার লিখেছিলাম কাঁচরাপাড়া স্টেশানের এক ভিখারির দণ্ডি কাটার কথা। তখন আমি ছোটো। সে রাস্তায় দণ্ডি কাটছে আর তার পিছনে পিছনে তার দুই ছেলে আর বর যাচ্ছে, মাথায় ফলের ঝুড়ি নিয়ে। আমার বিস্ময় লেগেছিল দেখে, ওরও পরিবার আছে! আমার অনভিজ্ঞ কিশোর মনে ধারণা জন্মেছিল সে একা! নিতান্ত বেচারি। তার যে পরিবার আছে শুধু না, তার রাস্তায় সর্বসমক্ষে নত হওয়ার মত এমন বিশ্বাসও আছে ওই রুগ্ন শরীরের বুকের মধ্যে জেনে আশ্চর্যই হয়েছিলাম। 

    মানুষ যখন ভালোবেসে নত হয়, তার মধ্যে একটা সৌন্দর্য থাকে। ছোটো শিশুকে কোলে তুলে নিতে যখন নিজে নত হই, কাউকে নত হতে দেখি, আমার চোখে বুকে মাথায় কি আরাম লাগে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে লিখছেন, যদি বলি মানুষ স্বাধীনতা চায়, তবে মিথ্যা কথা বলা হয়, সে অধীন হতেই চায়। 

  রবীন্দ্রনাথ বলছেন ভালোবাসার অধীন হওয়ার কথা। যে অধীনতাটুকু গেলে এমন কাঙাল হতে হয় যে গোটা বিশ্বের সব সম্পদও সে কাঙালপনা দূর করতে পারে না। আর এমন দুর্মতি ভর করে যে শিশুদের হত্যা করতেও বুদ্ধির কোনো কোণায় বাধে না। 

   যখন এ লেখা লিখছি, দূর থেকে ছটের সুর ভেসে আসছে। বেদবেদান্তে ছটের কথা লেখা থাকুক চাই না থাকুক, কিন্তু এই ঘর, ঘাট আর মহাকাশের জ্যোতিষ্কের মধ্যে যে মেলবন্ধন সে আমাকে বিস্মিত করে। মুগ্ধ করে। এ ততটা পুজো নয় যতটা আত্ম-নিবেদন আর সামাজিক মেলবন্ধনের উৎসব। মধ্যাহ্ন প্রীতিভোজের মেলবন্ধন বা প্যাণ্ডেল হপিং না। এ উৎসবের মেল বন্ধন। বিনা ব্রাহ্মণ্যবাদ, বিনা সামাজিক ছুঁৎমার্গ!











(ছবি Debasish Bose এর আর্কাইভ থেকে।)

Saturday, November 11, 2023

ঝাঁটাতে-সোনাতে-লাইটিং-দশাসই প্রতিমাতে

হিন্দু আর হিন্দু। আমি না, রবি ঠাকুর বলতেন। বৈষ্ণব আর বোষ্টুম। এও আমি না, রবীন্দ্রনাথ বলতেন। 


    গতকাল রাস্তায় দেখি ঝাঁটা আর ঝাঁটা। যেদিকে তাকাই ঝাণ্ডার মত করে ঝাঁটা হতে চলেছে নরনারী। এর নিশ্চয়ই কোনো পৌরাণিক বিধান আছে, কি গপ্পো আছে, দেবদূত পট্টনায়ক জানবেন, আমার সেসব জানার ইচ্ছা বা কৌতূহল কোনোটাই নেই। গয়না কেনা নিয়েও অনেক গপ্পো নিশ্চয়ই আছে। সেও জানবেন তিনি, ওতেও আমার কোনো উৎসাহ নেই। হিঁদুর নিয়মের, বিধানের, আচারের শেষ নেই। আর নেই শুচিবাইতার। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন হিঁদুর আচার-বিচার এক অলৌকিক শুচিমার্গে চলে। কখন কোন নক্ষত্রে, কি রাশিতে কি কি করলে অশুচি হয়, আর হয় না সে নিয়ে তর্ক, বিধান কিছুরই কোনো সুষ্ঠু সমাধান নেই। এই যে আমরা কথায় কথায় বলি না, "তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে?".... অর্থাৎ ওই "অশুদ্ধ" হওয়া নিয়েই আমাদের যত গোল। 


    তো গতকাল সোনায়-ঝাঁটায় রাস্তায় দোকানে বাঙালিকূলকে দেখে পরম পুলকিত হলাম। রবীন্দ্রনাথের নাম শুধু যে কোথায় কোন ফলক থেকে মুছে যাচ্ছে তাই নয়, বুদ্ধির ঘটেও আর সে চিহ্ন নেই দেখছি। শুধু কি রবীন্দ্রনাথ? রামকৃষ্ণ, রামপ্রসাদও দেখছি রীতিমতো বাঙালির ভক্তিবুদ্ধি ছাড়া হয়েছে। নইলে মা কালীর আকার এমন সত্তর হাত, পাঁচশো হাত হয়! বালাইষাট! যাঁকে বাঙলার এই মাটিতেই মাতৃসাধকেরা মা, মেয়ে রূপে দেখে এত এত পদ লিখল, তাঁর দেবীরূপের থেকে আত্মিক রূপ বড় হল, সে ভক্তিবুদ্ধিও জলে চলে গেল? রামকৃষ্ণদেব বলছেন ভক্ত ঈশ্বরের মাধুর্যে মগ্ন হয়, ঐশ্বর্যে মত্ত নয়। আর এদিকে একি দেখি! ঘাড় উঁচু করে ওই দশাসই চেহারায় মা! আচ্ছা আমাদের গীতাতেই আসা যাক। যখন অর্জুনকে ভগবান বিশ্বরূপ দেখাচ্ছেন তখন অর্জুন ব্যথিত হয়ে স্তব করে বলছেন, হে প্রভু তুমি মানুষ রূপেই আমার সামনে এসো, তোমার এই রূপ দেখে আমার মন ব্যথিত হচ্ছে, অশান্ত হচ্ছে। তুমি মানুষরূপে এসো প্রভু, মানুষরূপে এসো। ভগবান তখন মানুষ রূপে এসে দাঁড়ালেন অর্জুনের সামনে। রামকৃষ্ণদেবও বলছেন তাই, ভক্তের ভগবান ভোরের সূর্য। সে কোমল, সে মাধুর্যময়। আনন্দময়। একবার দক্ষিণেশ্বরে মায়ের গা থেকে সব সোনার গয়না চুরি হল। মথুর ক্ষোভ করে ঠাকুরের কাছে বলছেন, তোমার মা গয়নাগাটিও রক্ষা করতে পারল না? ঠাকুর বলছেন, তোমার কাছেই ওসব গয়নাগাটি। মায়ের কাছে ওসব মাটির ঢেলা।


     কিন্তু ভিড়ের কাছে এসব কথা শুধুই ভাবের কথা। অকাজের কথা। সেখানে গয়না চড়ালেই ভিড় বাড়ে। বলে মায়ের গয়না দেখতে গিয়েছিলাম! সেখানে আর মাধুর্য কে খোঁজে। ভিড় খোঁজে উন্মাদনা। আসল যে সে তো মনের মাধুর্যের আলোয় মধুর। বাকি যা সে বিস্ময়ের ঝলকানিতে অভিভূতি বই তো নয়!


  যা হোক, তবে বিস্মিত হওয়ার আরো বাকি ছিল। এখন তো কোলেকাঁখে, বাইকে, সাইকেলে, ট্রেনেবাসে গোপাল নিয়ে যাওয়ার চল হয়েছে। বাঙালিকে যাঁরা ভক্তিমার্গ শিখিয়েছেন, সেই তাঁদের মধ্যে যিনি উজ্জ্বলতম, সেই মহাপ্রভুর ওসব লাগেনি। বাদবাকি অনেক পরে যদিও বা কেউ নিয়েছেন তাঁরা হয় তো গোপনে, অতিযত্নে আড়ালে নিয়ে গেছেন। কিন্তু আজ সে সবের বালাই নেই। বিজ্ঞাপনের যুগে সবই বিজ্ঞাপনের বিষয়। এক ভক্ত শুনলাম তিনি তাঁর গোপালকে মাছ-চিকেন-মটন সব খেতে দেন। আশ্চর্যই লাগল। বৈষ্ণব মতে এসব তো শুনিনি। তারপর মনে হল এই এত বছর ধরে তো হংসেশ্বরী মন্দিরে, মায়ের সামনে বলি হয়ে এসেছে। গোপাল কি আর কালী নন? তবে আজ হংসেশ্বরীতে সে সব বন্ধ হল। কেন বন্ধ হল জানি না। তবে আবার রামকৃষ্ণদেবের একটা গল্প মনে পড়ে গেল। এক বাড়ি ধুমধাম করে পুজো হয়। অনেক অনেক পাঁঠাবলি হয়। তা এক বছর হল কি, বলি হল না। তখন একজন কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, হ্যাঁ গা, তোমাদের বলি হবে না এবছর? তো গৃহকর্তা বললেন, না না, সব দাঁত পড়ে গেছে তাই আর বলি-টলি হয় না। 


       ধম্মো বলো, অধম্মো বলো, নীতি বলো, দুর্নীতি বলো…সবের মূলে হল মানুষের মন। ওই মনেতেই সব। মন সৎ হলেই সব সৎ হয়। স্বার্থবুদ্ধি আর নিঃস্বার্থ বুদ্ধি, এই গোলকধাঁধায় সব। তার মধ্যে অলিগলি চোরাপথে চালাকির গুপ্ত স্রোত। মন যদি চালাকি না ছাড়ে তবে বাইরে যতই যাই হই না কেন - আস্তিক, নাস্তিক, সেক্যুলার, ফাণ্ডানেন্ডালিস্ট ইত্যাদি ইত্যাদি….সবই শুধু পোশাক। রামকৃষ্ণদেব বলছেন তিনি মন দেখেন। কথাটা বিশ্বাস হয় না আমাদের। কারণ মনটাকে স্বচ্ছ করে দেখার অবকাশ সংসারে এত এত রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান-বিশ্বাস-প্রথা ইত্যাদি সামলাতে সামলাতে আর পাওয়া যায় না। তখন মনে হয় অত তলিয়ে ভাবার দরকার কি? স্রোতে গা ভাসিয়ে দিই। সবার যা হবে, আমারও তাই হবে। এই করে একটার পর একটা চালাকি গ্রাস করতে থাকে। ভাষা পটু হয়ে ওঠে। ভাব পঙ্গু হয়ে ওঠে। চিন্তার জালে আটকে পড়ে গভীরের প্রাণী হাঁসফাঁস করে ওঠে। অথচ বেশি কিছু না, নিজের মনটাকে একটু স্বচ্ছ করে দেখার কথা ছিল। ওকেই নিজেকে জানা বলে। ওকেই অন্তরের আলো বলে। ওকেই শান্তি বলে। ওকেই তুষ্টি বলে। কিন্তু সে আলোকে চাই কি আমরা? নাকি বাইরের আড়ম্বরের আলোরই তৃষ্ণা আমাদের?

Wednesday, October 25, 2023

সেক্যুলার বিজয়াদশমী

 



বিজয়া দশমী মানে ছোটোবেলায় ছিল বাড়ির বড়দের ঢিবঢিব করে প্রণাম। তারপর আত্মীয়স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ঢিবঢিব প্রণাম। আর পেট ঠুঁসে মিষ্টি, নিমকি, গজা ইত্যাদি খাওয়া। কারুর কারুর বাড়িতে আবার চানাচুর দিত। সেই বাড়িগুলোর উপর আকর্ষণ থাকত আরো বেশি।

তারপর দিনকাল বদলালো। ঢিবঢিব প্রণামটা হাত জোড় করে হল। সোশ্যালিজম থেকে ইণ্ডিভিজুয়ালিজম বাড়ল। গণ্ডী ছোটো হল। লৌকিকতা বাড়ল, আন্তরিকতা কমল। রক্তে চিনির হিসাব, মিষ্টি ইত্যাদি কিনতে ট্যাঁকের হিসাব আবেগী-হুজুগ বাঙালিকে রুখে দাঁড়ালো। ক্রমে শুভেচ্ছা বার্তা চিঠি ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপে এলো। নিজকৃত টাইপ ছেড়ে ফটোশপে পাঠানো শুভেচ্ছা এলো।

সব ভালো হচ্ছে। এই যে কদ্দিন বাড়ির সামনে খবরের কাগজ কোলে ওঠার জন্য ছটফট করে না। কদ্দিন ধরে বুড়ো মানুষগুলো খবরের কাগজের নেশায় বিছানায় এদিক ওদিক করে, পুরোনো কাগজের পাতা উল্টায়, অনলাইনে নিউজ পড়তে পারে না। এ সব ভালোর জন্যেই হচ্ছে। গাছের পাতা বাঁচছে। ছাপাখানা বিশ্রাম পাচ্ছে। আসলে প্রিন্ট মিডিয়া বুঝে গেছে যে বৈদ্যুতিক মিডিয়ায় এখন তারা দুয়োরাণী। তাই ওসব কমিটমেন্টের কথা ভুলে-টুলে গোঁত্তা খেয়ে ঘুম লাগানোই ভালো। অন্তত বাজেটের দিকে তাকিয়েও তাতেই লক্ষ্মীলাভ।

কিন্তু কথা হচ্ছে এই সে বিজয়া দশমী, এতে বাঙালির দ্বিচারিতা আবার স্পষ্ট হয়ে যায়। এদিকে একদল "মা গেল, মা গেল বলে হাপুস নয়নে কেঁদে ভাসায়।" ওদিকে আরেকদল রাস্তায়ঘাটে নেশায়-অনেশায় ঢাকঢোলের সঙ্গে নেচে বেড়ায়। কিন্তু বিজয়টা কিসের? রাবণ বধের না অসুর বধের?

এর কোনো স্পষ্ট ধারণা আমাদের নাই। তবে ভিলেন হিসাবে দশমাথা রাবণ আমাদের সবুজ ঘাড়-কেতে অসুরের চাইতে হেভিওয়েট। তার একটা স্ট্রং স্ট্র‍্যাটেজি আছে। মা সীতাকে স্পর্শ করেননি অমতে। ওদিকে আবার অসুর নাকি মা দুগ্গার রূপের মোহে-টোহে…. যাক গে ওসব অশাস্ত্রীয় কথা। আসলে রাবণ তো ভক্ত মানুষ। তিনি মহাদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত।

এখন বাঙালি দেখো একজন সেরিব্রাল মানুষ, তার ভাবনার লেভেলই আলাদা। যেই দেখল রামচন্দ্র নাস্তানাবুদ হয়ে মা দুর্গার স্মরণে এসে অকালবোধন করছেন, ব্যস বাঙালি বুঝে গেল। ও রামচন্দ্রে কাজ হবে না। তিনি যে মিনিস্ট্রিতে অ্যাপিল করছেন, মায় নিজের চোখ উপড়ে দিচ্ছেন একটা পদ্ম কম পড়াতে, সেইখানেই ঘাঁটি পাততে হবে। তাই রামের অকালবোধনই হল আমাদের সঠিক কালের বোধন। কিন্তু হঠাৎ কি যে হল! এই তো সেদিন, ব্যাণ্ডেল নৈহাটি লোকালে উঠেছি, ও বাবা, একদল অবাঙালি চ্যাংড়া ছেলে উঠল। তারা যাচ্ছে কল্যাণীর ব্রহ্মাণ্ড বিখ্যাত, ট্রেনে যাত্রীদের দিনরাতের নাভিশ্বাস তুলিত প্যাণ্ডেল ও বহুত স্বর্ণখচিত মাকে দর্শন করতে। কিন্তু হলে কি হবে, যেই না ট্রেন ছাড়ল, অমনি কি জোরে জোরে চীৎকার করে "জয় শ্রীরাম" বলতে শুরু করল। শুনেছি নাকি সে মণ্ডপেও অমন ধ্বনি উঠছে। শয়ে শয়ে মানুষ সে ধ্বনি তুলছে। হবেও বা। কার যে কোনটা অকাল, আর কাল যে কোনটা ঠিক কাল, এ হিসাব জানে মহাকাল। কিন্তু শুধু কি রামনাম! বাপ রে সেকি গালাগাল গো। মা-বোন এক করে গালাগাল দিচ্ছে। কেউ কেউ ফুর্তির চোটে নানাবিধ অরগ্যাজমের শব্দ বার করছে। সারা ট্রেনের লোক চুপ। আমি ভাবলাম এই ভালো। কিছু বললেই আবার যদি বোমাবন্দুক বার করে বসে! কোনো বিশেষ আদর্শে বিশ্বাস করা আর সঙ্গে সেই আদর্শের প্রয়োগে বন্দুক-পিস্তল-বোমার যোগাযোগ আমাদের মত নিরীহ মানুষদের পক্ষে বড়ই জ্বালাতনের।

উফ কি কথায় কোথায় এসে পড়লাম। সে রামই হোক, কি দেবী, কথা হচ্ছে কার ভিলেনের উপর বিজয়ে যে এই বিজয়া আমাদের ধারণা স্পষ্ট নয়। নাই হোক। হোয়াটসঅ্যাপ জানে আর মেসেঞ্জার জানে, মন তুমি আনন্দে থাকো।

যদিও পশ্চিম ভারতে এই নিয়ে কোনো গোল নেই। তারা ইয়াব্বড় বড় রাবণ বানায়। অগ্নি সংযোগে তীর মারে। রাবণ পুড়ে মরে। এদিকে বিজয়োল্লাস হয়।

========

কিন্তু আরেকটা উৎসবও হয়। এইদিন কেরল সেজে ওঠা আরেক আনন্দে। বাড়ি, মন্দির, লাইব্রেরি এমনকি কিছু কিছু চার্চ, ক্লাবেও হয় বেশ আয়োজন। তাদের আজ হাতে খড়ির উৎসব। বাড়ির বড়দের কোলে, কি গুরুমশায়ের কোলে, কি বিখ্যাত কোনো মানুষের কোলে

কুঁচেকাঁচারা বসবে, এক থালা ধান, কি চাল আর বালি আনা হবে। সেখানে তারা লিখবে, "হরি শ্রী", বা, "হরি শ্রী গণপতয়ে নম"। তারপর একটা সোনার কয়েন দিয়ে সে পুচকের জিভেও লেখা হবে "হরি শ্রী" ইত্যাদি। তারপর সেই চালের পায়েস হবে। এই উৎসবের নাম তাদের ভাষায় হল "ইজুথিনইরুথু"। আরো নাম হল, বিদ্যারম্ভম বা অক্ষরভ্যাসম। ইজুথি মানে অক্ষর। আর ইরুথু মানে শুরু। মানে হল গিয়ে হাতেখড়ি।

এও এক বিজয়। দেখো, রাবণ, কি অসুরের চাইতে বড় ভিলেন তো নিরক্ষরতার ভিলেন। সাক্ষর হল মানেই তো সে সব চাইতে বড় আয়ুধ বা অস্ত্রটি পেয়ে গেল অজ্ঞানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার। কেন সেই স্বামী সহজানন্দের কথা মনে নেই? যিনি দলিতদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য মন্দিরেই পাঠশালা খুলে বসেছিলেন। নন্দানার এজুকেশানাল ট্রাস্ট খুলেছিলেন ১৯১৬ সালেই, পরাধীন ভারতেই। বিশেষ করে দলিত মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কত কাজই করেছিলেন। সেই সহজানন্দ ছিলেন মহাদেবের ভক্ত।

এখন ওদেশেও গোলমাল হয়েছে খানিক। গোঁড়া হিন্দু বলেছে এই উৎসব শুধু আমাদের। বাকিরা বলেছে, কেন, এতে সবার অধিকার। অজ্ঞানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অক্ষরই মহা অস্ত্র। আয়ুধ। দেখো, এই বিজয়াদশমী, কি দসেরা আবার আয়ুধ উৎসবও তো। তবে? কেন সবাই এতে অংশ গ্রহণ করবে না? হল কোর্টে কেস। গোঁড়ারা হেরে গেল। হাইকোর্ট বলল সব্বাই নিজেদের ধর্ম, মাতৃভাষা অনুযায়ী শেখাবে। তাই হল। কুন্নুরে এক ক্লাবে, হিন্দু লিখল, "হরি শ্রী" মালায়লমে। মুসলমান লিখল, "আল্লা হো আকবর", উর্দুতে। আর খ্রীষ্টান লিখল, "যীশু স্তুতি", ইংরাজিতে।

আসলে এই হল আসল বিজয়। অক্ষরজ্ঞানের অস্ত্র তুলে দিতে হবে। আর বলতে হবে, অক্ষর দেবে শিক্ষার আসন, সেখানে বসবে সু-চরিত্র। নইলে অক্ষরজ্ঞানও চলবে ভ্রান্ত। সেই হবে সত্যকারের বিজয়াদশমী। এক্কেবারে সেকুলার বিজয়াদশমী।







Monday, October 23, 2023

মা

 



'মা' মানে কি? সে কি দেবীর চাইতেও বড়?

দক্ষিণেশ্বর মন্দির। নবমীর সকাল। একজন মহিলা এলেন। সঙ্গে স্বামী। দুই সন্তান। তিনি দারুণ সেজে এসেছেন। খুব সাবধানে চলাফেরা করছেন। নাটমন্দিরে দাঁড়ালেন। হাতজোড় করে। মায়ের দিকে। সেখানে তো পুজোর লাইনে মানুষের পর মানুষ। একটু ফাঁক হলেই মায়ের মনমুগ্ধকর, জগত আলো করা হাসি। গালটা অল্প অল্প কেঁপে উঠল। তারপর নীচের ঠোঁট। তারপর দুই চোখ থেকে জলের ধারা গালের রঙ বেয়ে নামতে শুরু করল। রঙ চটল। কিন্তু কে খেয়াল করছে? ঢাক বাজছে পাশেই। ছন্দ জাগছে। ওই তো ঠাকুরের ঘর। ঢোকার নিয়ম নেই। দরজায় বসে আছেন দ্বারী। চরণামৃত দিচ্ছেন। ফুল দিচ্ছেন। দরজায় দাঁড়ালে দৃষ্টি নত হয়ে ঘরে বসছে। মন বলছে, মায়ের কাছে এলাম। সব শান্ত। মা মানেই সব।

======

বেলুড় মঠে দুর্গামণ্ডপে পর্দা দেওয়া। ভোগ নিবেদন হচ্ছে। সন্ন্যাসীরা গান গাইছেন। মায়ের নাম। মায়ের মহিমা হয় না। মায়ের আশ্রয় হয়। আশ্রয়ের মহিমা হয় না, শীতলতা হয়। সব শান্ত। গানে বিহ্বল। সুরে বিহ্বল। পাশে গঙ্গা। পাশে ঠাকুর। পাশে স্বামীজি। পাশে ব্রহ্মানন্দজী। পাশে শিবানন্দজী। আরো কত মানুষের পায়ের ধুলো। শান্তি। মাধুর্য। আনন্দ। অশ্রু গড়িয়ে গাল বেয়ে নামছে হুইলচেয়ারে বসে বসে। শরীরে চলাফেরা নেই। মন ছুটছে গোটা বেলুড়মঠ জুড়ে। মা মানে অভয়। মা মানে আশ্রয়। মা মানে জানা আর অজানার মাঝে তট। অজানা সাগরের ঢেউ লেগে যাচ্ছে অনবরত, চেনা তটে। মা জানেন সব। অজানাকেও মা জানেন। অনাদির যিনি আদি। সব কারণের যিনি কারণ। আমি যেখান থেকে শুরু যেখানে গিয়ে শেষ সবটুকু জুড়ে মা। মধ্যেখানেও আমার 'আমি'কে ঘিরে মা। মায়ের আশ্বাস। মায়ের বাণী। মায়ের সব চাইতে গভীরতম বাণী কি? আমি মা। এ কেউ বলতে পারে না। শুধু মা পারেন। মায়ের নামই মায়ের বাণী। মা নামই মন্ত্র।

======

ব্যাণ্ডেল স্টেশান। প্ল্যাটফর্মের উপর একটা প্লাস্টিক পেতে ভাত খাচ্ছেন এক প্রৌঢ়া। প্লাস্টিকে তরকারি। প্যাণ্ডেল থেকে দেওয়া। গরম ভাত। ভাতে ফুঁ দিচ্ছেন। তরকারিতে ফুঁ দিচ্ছেন। নিজেকে খাওয়াচ্ছেন। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন। এ তাগিদ মায়ের তাগিদ। নিজেকে নিজের মা হতে হয়। নিজেকে শুশ্রূষা করতে হয়। বুকের ভিতর থেকে আটপৌরে শাড়ি পরে মা বসেন। বলে দেন, এত গরমভাত মুখে দিস না। জিভ পুড়বে। ফুঁ দে। আমিই দিচ্ছি ধরে নে।

বেলুড়মঠে খাওয়ার জায়গা। প্লাস্টিকের থালায় খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে চাটনি। বোঁদে। সবার প্লাস্টিকের থালা নয়। কেউ কেউ এনেছে বাড়ির থালা। মায়ের কাছে খিদের কথা বলতে লজ্জা কি? কেউ এনেছে কৌটো। ভরে খিচুড়ি নিচ্ছে। পাশে রাখা। বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। ততক্ষণে নিজের জন্যেও কিছু খেয়ে নেওয়া দরকার। শয়ে শয়ে মানুষ খাচ্ছে। মা বাতাস করছেন। খিচুড়ি জুড়াচ্ছে। প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।

======

ঠাকুর বলছেন, একটু মায়ের নাম শুনব। ভগবান মানে বোঝো না-ই বোঝো। আনন্দ মানে তো বোঝো। আনন্দ মানে মা। মায়ের নাম করো একটু শুনি। গাইতে জানো না? হতে পারে না। মানুষের কান্নারও সুর আছে। যে কান্না যত গভীরের সে কান্না তত প্রাণ নিংড়ানো। আমি নিংড়ানোর সুরের কথা বলছি। মায়ের নাম প্রাণ নিংড়ে গাও। প্রাণ আজ আছে কাল নেই। প্রাণে মায়ের নামের আগুন জ্বালাও। "একা যদি না পারিস মন রামপ্রসাদকে সঙ্গে নে না"। রামপ্রসাদ সুর দেবে। কথা দেবে। তুমি শুধু প্রাণ দেবে। নিংড়ে বার করবে সুর। মায়ের নাম গাও। নোঙর মাটি পাবে। পাল বাতাস পাবে।

Sunday, October 22, 2023

আমার দুর্গা

 


গতকাল আমরা একটু বেরোলাম। মাত্র কজন। কোথায় যাই? ঠিক হল ত্রিবেণীতে বেণীমাধব শিবমন্দিরের ঠিক পিছনে যে দুর্গাপুজোটা হয়, ওখানে যাই। বাইকেই বেরোনো হল।

বেণীমাধব শিবমন্দিরে এসে দেখি নন্দীর সাজ চলছে। দুই তিনজন শিল্পী কি যত্ন নিয়ে নন্দীকে সাজাচ্ছে। তার গায়ে তুলি দিয়ে কি চমৎকার ছবি আঁকছে।

দুর্গামণ্ডপের সামনে গেলাম। দেখি মাকে রীতিমতো গ্রিলে তালা দিয়ে রাখা। আরাধ্যা সামনে গিয়ে বলল, হ্যাঁ গো, কার্তিক গণেশ কই?

তাই তো। কার্তিক-গণেশ তো নেই? পাশে একজন বললেন, দুর্গার পাশে যে দু’জনকে লক্ষ্মী-সরস্বতী ভেবে ভুল করছেন, তেনারাও আসলে জয়া বিজয়া মায়ের দুই সখী।

আরাধ্যা গম্ভীর হয়ে বলল, তবে তো এটা দুর্গা নয় দেখছি!

আমিও বললাম, তাই তো দেখছি, আচ্ছা ঠকালো তো আমাদের!

আরাধ্যা বলল, তা নয়, ওই দেখো সিংহ তো আছে!

যাক। মা এ যাত্রায় সিংহের জন্য মুখরক্ষা করলেন।

ওদিকে মণ্ডপের পাশে একটা উঁচু জায়গায় ঢোলটোল নিয়ে বসে সব। চা খাচ্ছেন তেনারা। একজনকে দেখলাম হঠাৎ করে তেলের শিশি বার করে মাথায় বেশ করে তেল মেখে নিলেন।

কিন্তু কথা হচ্ছে দুর্গা গারদের ভিতরে কেন?

একজন হাফপ্যান্ট পরা বয়স্ক কর্তা বললেন, মায়ের গলায় অনেক গয়না তো… তাই… একটু পরেই খুলে দেওয়া হবে। গয়না নয়, তালা।

বুঝলাম মায়ের গয়নার ভার এনার। তা খানিকবাদে খুলেও দিলেন। তালা।

আমি আবার এসে বেণীমাধবের সামনে দাঁড়ালাম। শিল্পীদের কাজ দেখছি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। একটা বাচ্চা ঠাকুর্দার সঙ্গে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো।

আমি তখন পাশে ঝোলানো বড় করে লেখা ডেঙ্গুর সতর্কতা পড়ছি। হঠাৎ শুনলাম নাতি জিজ্ঞাসা করছেন, ওটা কি দাদু?

আমি নাতির খুদে আঙুলের ইশারার দিকে নজর গড়িয়ে দেখলাম বসে থাকা নন্দীর পিছনে একটা গোলাপী অংশকে সে দেখাচ্ছে। সদ্য করা রঙ। বেশ জ্বলজ্বল করছে। আমিও ভাবলাম, কি ওটা। একটু পরে বুঝলাম ওটি হয় তো নন্দীর অণ্ডকোষ। শিল্পীর তুলির টানে এমন অপূর্ব রঙে রাঙিয়েছে।

দাদু বললেন, ভালো দেখতে পাচ্ছি না, চলো দুর্গা দেখে আসি।

======

দুই পা এগোলেই শ্মশান। দোকানিরা মাঝে মাঝেই রাস্তায় ঝাঁটা হাতে নেমে খই সরাচ্ছেন। সংসারে কিছুই নিত্য নয়। অন্তিমযাত্রায় যে দুটো খই ফেলে যাচ্ছে সেও হারিয়ে যাচ্ছে পলকেই। যা হোক, কয়েকজন শ্মশানযাত্রী আকণ্ঠ সোমরসে চুবে বাবার এদিকে আসছেন। আর ঠিক তখনই দুর্গামণ্ডপ থেকে কাড়ানাকাড়া বেজে উঠল। সঙ্গে সানাইয়ের মত কি একটা, তার আওয়াজ না তো সানাইয়ের মত, না শিঙ্গার মত। ব্যস, বাবার চেলাদের আর পায় কে? একে সদ্য জাগা শ্মশান বৈরাগ্য, দুই সোমরসের দাপট! তারা দৌড়ে গিয়ে মণ্ডপে নাচতে শুরু করল। সেকি নাচ! এক্কেবারে কমলায় নেত্য করে থমকিয়া, থমকিয়া! কেউ কেউ ক্যামেরা বার করলেন। ব্যস, আগুনে ঘি পড়ল। যে নাচ উত্তেজনার শুধু ছিল, সে নাচ এখন হল তুঘলকি শিল্প। দেখাতে হবে না? কালের কাছে মুখ থাকবে নইলে?

======

ত্রিবেণীর সব চাইতে পুরোনো পুজো নাকি ভটচায্যি পাড়ার জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন প্রবর্তিত পুজো। গেলাম।

জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মূর্তি দেখলাম রাস্তার পাশে। ১৬৯৪ সালে জন্মেছিলেন, ১৮০৭ সালে মারা যান। বিশেষ পণ্ডিত ও শ্রুতিধর ছিলেন। উইকিপিডিয়ায় বেশ সুখ্যাতি আছে দেখলাম। এখন উইকিপিডিয়া যাকে চেনে সে-ই আন্তর্জাতিক। যা হোক, তিনিই নাকি এ পুজো প্রবর্তন করেন। সব চাইতে প্রাচীন পুজো। বেশ সুন্দর পরিবেশ। মায়ের মূর্তিটিও বেশ। বহু বয়স্ক মানুষ আসছেন টোটো, রিকশা, গাড়ি করে দেখলাম। যা প্রাচীন পুজো, এই বয়স্কদের অনেকেরই ছোটোবেলা, যৌবনবেলার স্মৃতি হয় তো এই প্রাঙ্গণজুড়ে। আবার এসেছেন, সব একই আছে কিনা দেখতে। নাকি মা একই আছেন কিনা দেখতে।

সামনে বড় মাঠ, সেখানে মঞ্চ বাঁধা। হয় তো কোনো অনুষ্ঠান হবে বা হয়েছে। বাচ্চারা বাজিতে, ফুচকায়, খেলনায় ব্যস্ত। মহিলারা কেউ কেউ দেখলাম পাশে ছোটো-ছোটো ঘরে তরকারি কাটছেন। বাইরে অনেকেই সেল্ফি তুলতে ব্যস্ত। যেমন আজকাল হয় আরকি চারদিকে।

একজন বয়স্ক মহিলা, একাই এতক্ষণ চেয়ারে বসেছিলেন। হঠাৎ কি মনে হল ফুচকার স্টলের সামনে গিয়ে বললেন, দে তো বাবা দুটো।

অবাধ্য নতুন শাড়িটাকে বাঁ হাতের শাসনে দুই পা জড়ো করে, তার মধ্যে চেপে ধরে শান্ত করলেন, ধমকে বললেন যেন, চুপ করে থাক।

তারপর জল টলটলে ফুচকাটাকে হাতে ধরে, সামনের দিকে জাপানীদের মত ঝুঁকে, এমনভাবে মুখে পুরলেন যেন মনে হল প্রথম গুলিটার হাত থেকে রক্ষা পেলেন। এবার দ্বিতীয় গুলির জন্য প্রস্তুতি। প্রতিবার খেয়াল করছেন শাড়িতে যেন না পড়ে। তারপর বস্তুটা যখন মুখের মধ্যে চলে যাচ্ছে, দাঁতহীন মাড়িসর্বস্ব পেষণ পদ্ধতিকে বাগে আনতেও বেশ কসরত করছেন, সঙ্গে তেঁতুলের জল আর ঝালে দুটো বন্ধ চোখ। আমার দেখতে দেখতে মনে হল ঠাকুমার গালে দুটো চুমু দিয়ে আসি। আট বছরের অভিব্যক্তি আশির গালে ধরা দিলে যেমন দৃশ্যসুখ হয় আরকি!

তবে একটা ঘটনায় মন চোখ আটকালো। মাঝবয়েসী একজন মহিলাকে হুইলচেয়ারে নিয়ে দুজন তরুণ তরুণী এলো। বোঝা যাচ্ছে হুইলচেয়ারে যিনি আছেন তিনি স্বাভাবিক নন মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে। কিন্তু যে দুজন সঙ্গে করে এনেছেন তাকে তাদের আচরণ কি স্বাভাবিক তার সঙ্গে। কোনো করুণার আতিশয্য নেই, অতিরিক্ত সতর্কতা নেই। তাকে নিয়ে সেল্ফি তুলছে। তার পিছনে তাকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলছে। হুইলচেয়ারে বসা মানুষটার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত। ভালোবাসার ভাষা কে না বোঝে! কি সহজ যেন সবটাই। তার নতুন লাল জামাটায় তাকে কি সুন্দর লাগছে। কোনো অভিযোগ নেই, বিষাদ নেই কারোর মুখে। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে এমন স্বাভাবিকত্ব তাদের, যেন মা'ই বিবশ হচ্ছেন, যেন লজ্জা পাচ্ছেন। এমন ভাগ্যকেও তারা জয় করে ফেলেছে, কিসের জোরে? শুধুই ভালোবাসা!

=====

এবার ফিরব। এতক্ষণ বাইরে থাকা তো যাবে না। বাড়িতে আমারও তো অসুস্থ মানুষ রেখে আসা। মাঝে দাঁড়িয়ে চা খেতে হবে একটু।

দাঁড়ালাম। আরাধ্যার বাবা-মা আছে, আমার আরো কয়েকজন বন্ধু আছে। আমি গেলাম আরাধ্যার জন্য মিষ্টি কিনতে।

মিষ্টির দোকানটা খুব সাধারণ। কয়েকজন দেবদেবী দেওয়াল জুড়ে আছেন। দোকানি নেই। আমি দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, একজন বয়স্ক মহিলা এলেন। কি মিষ্টি খাবে? এই ব্যাপারে আমার বুদ্ধি খুব একটা দড় না। আমি আরাধ্যার মাকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে দেখিয়ে চলে গেল। দোকানি রোগা মানুষটা কি যত্নে একটা সাদা কাগজ ঠোঙার মধ্যে পেতে, তার উপর দুটো মিষ্টি তুলছেন। চোয়াল দুটো বসে গেছে। সিঁদুরের মাথাজুড়ে থাকা দীর্ঘদিনের অভ্যাসে সাদাচুলে লালের আভা। কিন্তু তবু সব মিলিয়েও অদ্ভুত শ্রী মানুষটার মুখে। কিছু মানুষ হয় না, মুখের দিকে তাকালেই মনে একটা প্রশান্তি আসে… ইনি তেমন ধরণের মানুষ। আমি বললাম, আসলে বাচ্চা খাবে তো….

উনি হাইপাওয়ারের মলিন চশমার কাঁচের ওপার থেকে দুটো স্নেহময়ী চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার মেয়ে?

পাশে একজন এসে দাঁড়ালো… ও মাসিমা গুজিয়া দাও… কাল পুজোয় দেবে….

ভদ্রমহিলা আমায় ফেরত দেওয়ার জন্যে টাকা গুনছেন…. সে মানুষটার দিকে তাকিয়ে বললেন, বৌমাকে দেখলাম না কেন রে…..

সে বলল, বাপের বাড়ি গেছে আজ সকালে… রাতেই চলে আসবে…..

আমি ভেবে চলেছি আমি কি উত্তর দেব…. ওকি আমার মেয়ে? কি বলব, বন্ধুর মেয়ে?

চারদিকে আমার চেনা তো কেউ নেই। আমি একা দাঁড়িয়ে। ওরা দূরে চায়ের ওখানে আছে। কি হবে যদি মিথ্যাই বলি?

বললাম, হ্যাঁ আমার মেয়ে।

মিষ্টিটা নিয়ে ফিরছি। পাশেই গঙ্গা। এতবড় মিথ্যা বললাম? এত লোভ মন তোমার! এত লোভ!

তারপর মনে হল, হ্যাঁ মিথ্যাই যে না হয় হল। যদি দশভূজা ওই মূর্তি মেয়ে হতে পারে, মা হতে পারে শুধু ভক্তির দাবীতে…. আমার ভালোবাসায় এতটুকুই কি দাবী নেই…..

তবু মিথ্যাই তো বললাম… মহাসপ্তমীর মহামিথ্যা…..