Showing posts with label বইকথা. Show all posts
Showing posts with label বইকথা. Show all posts

Wednesday, February 21, 2024

গরজের ভাষা। মাতৃভাষা।


আজ মাতৃভাষা দিবস। আজ আমার গল্প করতে ইচ্ছা করছে ওমপ্রকাশ বাল্মীকিকে নিয়ে। আয়ুষ্কাল ছিল ১৯৫০ থেকে ২০১৩ সাল। জন্ম উত্তর প্রদেশের এক দলিত বস্তিতে। মৃত্যু দেরাদুনে, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী, এবং সর্বোপরি এক বিখ্যাত লেখক, নাট্যকার, কবি হয়ে। 


   আজ কেন বাল্মীকিকে নিয়ে গল্প করতে ইচ্ছা করছে? কারণ, ওর মরণপণ নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা। সেই ভাষাকেই অস্ত্র করে দলিতদের হয়ে লড়াই করা। নিজের ভাষার আলোতেই বিশ্বকে চিনতে চাওয়া। নিজেকে আবিষ্কার করা। 


       কিন্তু এত অল্প পরিসরে এতবড় জীবনকে লেখা সম্ভব? 


   ঠিক আছে শুরু তো করি। আসলে আমি ঠিক জীবনী লিখতে চাইছি না, ওমপ্রকাশের সঙ্গে ওর ভাষার নাড়ির যোগটা বলতে চাইছি। আমি এখন থেকে ওমপ্রকাশ না বলে, ওর ভীষণ গর্বের উপাধি “বাল্মীকি”-ই বলব। যখন উনি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, কিন্তু দলিত বলে নানা জায়গা থেকে নানাভাবে অপমানিত, বঞ্চিত হচ্ছেন, তখন অনেকে ওকে বলে, আপনি আপনার এই বাল্মীকি উপাধিটা ত্যাগ করুন না। কি দরকার সবাইকে জানিয়ে আপনি দলিত। কিন্তু ওমপ্রকাশ কোনোদিন সে মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তিনি হাজার অপমান সহ্য করেছেন, রুখে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু নিজের সত্য পরিচয় গোপন করেননি।


======


    বাল্মীকি জন্মালেন বস্তিতে। কবির মন নিয়ে। সংবেদনশীল মন নিয়ে। যে জাতপাত প্রথা, যে অচ্ছুৎ হয়ে থাকাকে আশেপাশে সবাই ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিল, বাল্মীকির তা মানতে অসুবিধাই হল। চারদিকে শুয়োরের পায়খানা, জমাজল, কাদা, নোংরা, দুর্গন্ধ। ওরই মধ্যে মানুষ জন্মাচ্ছে, বড় হচ্ছে, বিয়ে হচ্ছে, তাদের বাচ্চা হচ্ছে, উৎসব-পার্বণ হচ্ছে, অসুস্থ হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। সবই ওই নারকীয় পরিবেশে। জাত, “চুহড়”। কোথাও পশু মরলে তার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়, কোথায় কোন দেবীর পুজোয় শুয়োর বলি দিতে হয়, তাই বাড়িতে শুয়োর পালন করতে হয়, আবার সেই সব উচ্চবর্ণের বাড়িতে গিয়ে তাদের বলি দিতে হয়। সেই বাচ্চা শুয়োরের রক্তে দেবীর পুজো হয়। কিন্তু তাদের জাতের কাজ ওই বলি দেওয়া অবধি। তাদের জাতের দেবদেবী নিজস্ব। মদ আর শুয়োরের মাংসে পুজো হয়। কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে টোটকা। আরো বেশি হলে বিশেষ মানুষদের আনা হয়, যাদের উপর দেবতার ভর পড়ে। মানে দলিতদের দেবতার। সে বিধান দেয়। মানুষগুলো বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।


  এরকম একটা পরিবেশে বাল্মীকি জন্মালেন। বাবা চাইলেন ছেলে পড়ুক। প্রথমে একটা অস্থায়ী পাঠশালায় পাঠ শুরু হল, কিন্তু তারপর সে সব উঠে গেল। কদিন পর সরকার থেকে প্রাথমিক স্কুল খোলা হল। অনেককে বলে কয়ে সে স্কুলে ভর্তি হলেন বাল্মীকি। কিন্তু ক্লাসে বসা যাবে না। একটা কোণে নিজের বাড়ি থেকে আনা চট পেতে বসতে হবে। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে মরে গেলেও কেউ জল দেবে না। তার উপর অনেক শিক্ষকের চক্ষুশূল হলেন, দলিত হয়ে অক্ষরজ্ঞান! যাও, ক্লাস করতে হবে না, সারা দুপুর মাঠ পরিষ্কার করো, পায়খানা পরিষ্কার করো। 


   একদিন বাল্মীকির বাবার চোখে পড়ল, ছেলে ক্লাসে না বসে মাঠ ঝাঁট দিচ্ছে। ব্যস, বাবার মাথায় আগুন খেলে গেল। অনেক তাণ্ডব হল। শেষে গিয়ে পড়াশোনা শুরু হল। শারীরিক, মানসিক, আত্মিক নিপীড়ন চলতেই থাকল। সে সবের বর্ণনা পাতার পর পাতা লিখে গেছেন বাল্মীকি। সঙ্গে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে পাচ্ছেন প্রেমচাঁদ, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের বই। পড়ছেন। ওই বস্তিতে বসেই পড়ছেন। যে বস্তিতে একটু বেশি বর্ষায় মাটির দেওয়াল ধসে যায় বাড়ির, চাল ভেঙে পড়ে। চারদিকে যেখানে মারামারি, অশ্রাব্য গালাগাল, মাতলামি চলছেই সেখানে বসে কিশোর বাল্মীকি পড়ছে শরৎচন্দ্র। মাকে শোনাচ্ছেন। মা উনুনে ঘুঁটে আর কাঠের আঁচের সামনে বসে বসে শুনছেন। মা আর ছেলে দুজনেরই চোখ ভিজে আসছে। কি অপূর্ব বর্ণনা করেছেন বাল্মীকি। 


======


    ক্রমে বড় স্কুলে গেলেন। কিন্তু অপমান পিছন ছাড়ল না। নিজেদের গ্রাম থেকে বেশ কিছুদূরের একটা গ্রামে গিয়েছিলেন। মাষ্টারের পরিবারের কাছে। সঙ্গে বন্ধু। সাইকেলে চড়ে গেলেন। তারা খেতে দিল। কিন্তু তখনও জানত না তারা দলিত। যখন জানল মারতে মারতে বার করে দিল। দুজন সাইকেল চড়ে অতটা ত্রাস নিয়ে। অতটা অপমান নিয়ে। লাঞ্ছনা নিয়ে। রাস্তায় গরুর গাড়ির সঙ্গে সাইকেলে ধাক্কা লাগল। সাইকেল গেল তুবড়ে। টানতে টানতে সে সাইকেল নিয়ে পৌঁছালো এক সাইকেলের দোকানে। সাইকেল সারানো হল। কিন্তু একটাও পয়সা নেই। যাবে কিভাবে এত রাতে? হঠাৎ মনে পড়ল এই সামনের বাস স্ট্যাণ্ডে এক পূর্ব পরিচিত শিক্ষক আছেন। ক্লার্কের কাজ করেন এখানে এখন। 


   তাকে পাওয়া গেল। একজনের মাত্র ব্যবস্থা উনি এই এত রাতে শেষ বাসে করতে পারবেন, কিন্তু বাকিটা রাত আরেকজনকে এখানে কাটিয়ে ভোরের বাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন জানালেন। 


   তাই হল। বন্ধু সাইকেল বাসের মাথার উপর উঠিয়ে চলে গেল। বাল্মীকি থেকে গেল। কিন্তু রাতটা কাটাবে কোথায়? 


   সেই শিক্ষক তাকে একটা রুটি আর চা খাওয়ালেন। তারপর নিজের শোয়ার জায়গায় নিয়ে গিয়ে বললেন, রাতটা এখানেই কাটিয়ে দে। 


  আর রাত! দেড়টা নাগাদ দরজায় খটখট। এক নারীকে নিয়ে এক পুরুষ দাঁড়িয়ে। কি কথা হল দুই পরিণত বয়স্ক পুরুষে কানাকানিতে, একটু পর শিক্ষক এসে বললেন, চল, তুই আমি বাইরে শোবো। 


      বাল্মীকি বাইরে এসে শুলো। এক আকাশ তারার নীচে। ঘরের ভিতর থেকে মহিলা কণ্ঠের অদ্ভুত আওয়াজ। কিশোর বাল্মীকি লিখছেন একটু পর সে পুরুষ বেরিয়ে এলো। শিক্ষক গিয়ে ঢুকল ঘরে। আবার সেই এক আওয়াজ। মড়ার মত পড়ে আছে বাল্মীকি। বুঝতে দেওয়া যাবে না সে জেগে আছে। 


   খানিকবাদে স্যার বেরোলো। দুজনে গল্প হচ্ছে। সেই আগন্তুক পুরুষ হাসতে হাসতে বলছে, বলেছিলাম না খাসা মাল….এই বাচ্চাটাকেও পাঠিয়ে দে, চেখে আসুক! 


    বাল্মীকির মনে এ ঘটনা তীব্র হয়ে বেজেছিল। এরকম বহু অপমান বাল্মীকির মনে সুকঠোর হয়ে বেজেছিল। বাল্মীকি সে সবকে জমিয়ে জমিয়ে বড় হচ্ছিল। যা পরে তার নানা লেখায় ভাষার শরীর নেবে। 


======

 

    বাল্মীকির কলেজ আসার আগে বাল্মীকির এক বিধবা বৌদির কথা বলে নিই। বাল্মীকির পড়া যখন প্রায় থেমে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল সেই শুরুর দিনগুলোতে, সেই বৌদি নিজের স্বল্প কিছু সঞ্চয় শাশুড়ির হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, মা, ওর পড়া যেন বন্ধ না হয় দেখো। 


  নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে এক পাষণ্ড উচ্চবর্ণের মানুষ আর নিজের অলস পাষণ্ড কাকার জন্য ওই কিশোর বয়সে বাল্মীকিকে, যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ছে, যে শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ে কাঁদছে, তাকে মৃত গরুর ছাল ছাড়াতে হয়েছিল একা। ফিরে মাকে জড়িয়ে ভীষণ কেঁদে কেঁদে বলেছিল, মা, আমাকে এ কাজে আর পাঠাস না রে। মা কেঁদেছিল। বৌদি কেঁদেছিল। দুজনেই বাড়িতে তুমুল অশান্তি করে বলেছিল, বাল্মীকিকে কেউ ওইসব কাজে আর পাঠাবে না। তাতে যদি আমাদের চূলা না জ্বলে, তো না জ্বলবে! 


   এরকম কত মা, কত দিদি, কত বোন, কত বৌদির গল্প আমরা জানি না, সে ঈশ্বরই জানেন। সবাই তো বাল্মীকির মত লেখেন না। 


    বাল্মীকি কলেজে এসে প্রথম আম্বেদকরের বই হাতে পান। ব্যস, চারদিকে সব বদলে যেতে শুরু করল বাল্মীকির। কই এতদিন তো এই মানুষটার নাম কেউ বলেনি! বাল্মীকির ভিতরে যে সত্তা ভাষাকে ভালোবেসেছিল এতদিন, সে এবার তার নিজস্ব গতিপথ পেল। সে বুঝল তাকে কি লিখতে হবে। কিন্তু লেখার আগে নিজের চিন্তাকে তো সাজাতে হবে। শুরু হল গোগ্রাসে পড়া। তর্ক। আলোচনা। সঙ্গে নানারকম শোষণ, পীড়নের সম্মুখীন হওয়া। এমনকি বিজ্ঞানবিভাগের অধ্যাপকদেরও তার জাত নিয়ে অসুবিধা। তার হাতের জল খেতে অসুবিধা। তাকে নীচ দেখানোর, ছোটো দেখানোর চেষ্টা সেখানেও। তবে এই বাল্মীকি বদলে যাওয়া বাল্মীকি। বাল্মীকি যা শিখছে, তা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজের গরজ করে পাওয়া শিক্ষা। তাকে সে বহন করবে না, বাহন করবে। করলও তাই। 


 =======


   এর মধ্যে বাল্মীকির জীবনে দুটো বড় পরিবর্তন হল। এক, পড়াশোনা মাঝপথে থামিয়ে দেরাদুনে অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে অ্যাপ্রেনটিস হয়ে জয়েন করা, দুই, পরিবারের অনেক পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে নিজের চিন্তাধারার পার্থক্য তৈরি হওয়া। 


   অ্যাপ্রেনটিস হওয়াতে আর্থিকভাবে সচ্ছল হল বাল্মীকি। স্কুলে, কলেজে নিজের পোশাক নিয়ে কম লাঞ্ছিত তো হতে হয়নি! কিন্তু ঘরে বাইরে কি ভীষণ লড়াইয়ের সামনে এসে পড়ল বাল্মীকি। মেধা যে উচ্চতায় ওড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে তাকে, যেখানে মানুষের চিন্তার, ভাবের যে উৎকর্ষতা, স্বাধীনতা, মর্যাদাবোধের সঙ্গে তার পরিচয় হচ্ছে, তার সঙ্গে তার আত্মার ভাষা মেলে। কিন্তু বাইরের মানুষের আঘাত তো আছেই। কিন্তু তার নিজের “জাত” এর মানুষদের মেরুদণ্ডহীন মানসিকতা? আর মেরুদণ্ডেরই বা দোষ কি? শতাব্দীর পর শতাব্দী অত্যাচারিত হতে হতে তারা ভুলেই গেছে নিজেদের মনুষ্যত্বের কথা। ভুলেই গেছে প্রাথমিক অধিকারগুলোর কথা। 


    বাল্মীকির লেখা ক্রমে ধারালো হতে শুরু করল। কিন্তু সে স্বল্প পরিসরে প্রচারিত। এর মধ্যে বাল্মীকি জব্বলপুর হয়ে মুম্বাইতে প্রতিষ্ঠিত। বিয়ে হয়ে গেছে। সঙ্গে চলছে লেখালেখি। দলিতদের নিয়ে পত্রিকায় লেখা বেরোচ্ছে। প্রায় ভারতের সব জায়গা থেকে। অনেকে বলছেন, তুমি তোমার এই প্রবল সাহিত্য প্রতিভা শুধু দলিত সাহিত্য লিখে নষ্ট করবে? এমনকি যখন এই আত্মজীবনী “ঝুঠন” লিখছেন, তখনও অনেকে বলেছেন, একি করছেন, আপনাকে কবি হিসাবে সারা দেশ এত সম্মান করে, আপনি এইসব লিখলে আপনি প্রতিষ্ঠা হারাতে পারেন!  


    বাল্মীকি শোনেননি। আসলে “টলারেন্স” শব্দটাকে আমি আবার নতুন করে শিখতে শুরু করলাম বাল্মীকিকে পড়তে গিয়ে। যখন ফাইনালি দেরাদুনে উচ্চপদে ট্রান্সফারড হয়ে গেলেন, এক মাসের উপর লাগল মাথা গোঁজায় জায়গা পেতে। শ্বশুরবাড়ির দুটো ছোটো ঘরে কাটাতে হয়েছিল সে ক'টা দিন। আর মুম্বাই থেকে আসা সব আসবাবপত্র বাক্সবন্দী হয়ে স্টেশানে। এক একটা বাড়িতে বাড়িওয়ালার কাছে নিত্যনতুন অপমান। কি শান্তভাবে সহ্য করেছেন বাল্মীকি। কিন্তু সে আগুন ভাষা পেয়েছে লেখনীতে। 


    একটা ঘটনা। একবার অফিসে যাচ্ছেন, দেখেন একটা জায়গায় বেশ কিছু মানুষের ভিড়। কি হয়েছে? জানলেন, গতকাল রাতের বৃষ্টিতে এই মাটি ধসে চাপা পড়ে মারা গেছে কিছু শ্রমিক। ওই যে লাশ বিছানো রাস্তার ধারে। উন্মুক্ত। মাছি বসছে মুখে। কারা ওরা? আরে ওই যে হস্টেল বানানো হচ্ছিল না, তাদের অফিসেরই তো। সেই ঠিকাদারের লোকজন, কয়েকটা অস্থায়ী ঝুপড়ি বানিয়ে ছিল ওই মাটির ঢিবির উপর। ওরাই। 


   পুলিশ নেই। কোনো আধিকারিক নেই। গেলেন থানায়। তারা জানালো বড়বাবু না এলে তাদের কিছু করার নেই। তবু অনুরোধ উপরোধে তারা লাশগুলো অন্তত সরানোর ব্যবস্থা করল। অফিসে গেলেন। বাম, ডান শ্রমিক সংগঠন বলল, ওরা তো বাইরের, ঠিকাদারের। আমাদের কি? 


  পরেরদিন কাগজে বেরোলো, বৃষ্টিতে অনেক ভবঘুরে ওই ঝুপড়িগুলোতে আস্তানা গেড়েছিল। মরেছে ওরাই। 

 

    বাল্মীকির অসহায় যন্ত্রণা ফেটে পড়ল কবিতায়। ছাব্বিশে জানুয়ারি পাঠ করলেন অফিসের অনুষ্ঠানে। শ্রমিকরা দাঁড়িয়ে হাত তালি দিল। বাল্মীকি অনুভব করলেন তবে এ যন্ত্রণা এতগুলো মানুষের মধ্যেও চাপা ছিল! ভাষা জুড়ে দিল সেতু! 


    এরপর বাল্মীকির শ্রমিকদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ হল অনেক জায়গায়। অফিস থেকে নানা ষড়যন্ত্র হল। এমনকি বাল্মীকির বই যাতে ছাপতে না পারে সে ষড়যন্ত্রও হল। কিন্তু বাল্মীকির জেদের কাছে, আত্মবিশ্বাসের কাছে সব খুড়কুটোর মত ভেসে গেল। এনসিআরটির সিলেবাসে বাল্মীকির লেখা ছাপা হল। সেই নিয়ে তাণ্ডব হল সংসদে। বাল্মীকি তবু থামলেন না। 


======


   এই হল বাল্মীকির গল্প। আরো অনেক অনেক কথা লেখা হল না। বাল্মীকির আর ওঁর স্ত্রীর প্রায় ছুটির দিনগুলো দলিত বস্তিতে কাটানোর কথা, তাদের সুখদুঃখের কথা শোনা। মাটির ভাষার কাছাকাছি থাকার প্রয়াসের কথা। চেয়েছিলেন এক শান্ত পরিবেশ, যেখানে বসে নিজের সাহিত্য সাধনা করে যেতে পারবেন। আরো আরো কথা যা বলা হল না, প্রখ্যাত মানুষদের সঙ্গে ওঁর আলাপ আলোচনার কথা। এখানে উল্লেখ্য, ওঁর বিখ্যাত লেখা, আত্মজীবনী 'ঝুঠন' এর দ্বিতীয়ভাগ ওঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। 


   এ জীবন ছিল ভাষার সঙ্গে পথ চলার গল্প। নিজেকে আবিস্কারের গল্প ভাষা দিয়ে। মাতৃভাষা দিয়ে। কিন্তু মাতৃভাষা মানে কি শুধুই অক্ষর? যে ভাষায় আমি আমার প্রাণের আলো পাই, সে সবই আমার মায়ের ভাষা। আমার অক্ষরে সেগুলোকে আত্মীয় করে তোলা আমার দায়িত্ব। মহা দায়িত্ব। বাল্মীকি অবশেষে দলিত সাহিত্যিক হয়ে রয়ে গেলেন, এ আমাদের দুর্ভাগ্য। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। আজ সে কথা থাক। আজ বাল্মীকির সেই আত্মবিশ্বাস, মর্যাদাবোধের প্রকাশ নিজের ভাষায়, সেই কথাই স্মরণে আনি। আমার প্রণাম জানাই। 


    ভাষা সেতু। পুরাণে যেমন আছে, নিরাকার ব্রহ্ম মানুষের শরীর ধারণ করে, তেমনই নিরাকার হাজার ভাব ভাষার শরীর ধারণ করে কি যাদুতে, সে এক বিস্ময়। নোম চমস্কি বলেন, এই একটা জায়গায় মানুষের বিস্ময়। মাত্র কটা শব্দ আর সংখ্যা দিয়ে এতবড় বিশ্বের এত এত রহস্যকে সে কি করে অনুবাদ করে ফেলছে? বুঝে ফেলছে! 


  এ আমরা কোনোদিন বুঝব কিনা জানি না। তবে সেই সব মাতৃভাষায় নিবেদিত প্রাণেদের আমার শ্রদ্ধা জানাই। আর বাল্মীকির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনেই আজ আমার একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হোক।




Thursday, December 21, 2023

বাংলায় বৌদ্ধধর্ম এবং ঝুটন


      এমন স্বল্প পরিসরে এতটা গভীরে লেখা যায় এ ভাবলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। 

      বইটা প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম ২০০২ সালে। লেখক লিখছেন "এই ক্ষুদ্রগ্রন্থ প্রচুর পরিশ্রমের ফল। আশা করি সহৃদয় পাঠকরা বইটি পড়ে খুশি হবেন। নইলে এটাকে আমার বৃথা পণ্ডশ্রমই মনে করব"। 

       বইটার উপর নজর পড়ল মায়া মজুমদারের লেখা 'নদীয়া জেলার লোকসঙ্গীতে বৈষ্ণবপ্রভাব' বইটা পড়তে গিয়ে। বাংলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায় নিয়ে কিঞ্চিৎ বলেছেন সেখানে। আমি খুঁজতে শুরু করলাম কোনো বই যা এই নিয়ে কিছু লেখা থাকবে। খুঁজতে খুঁজতে পেলাম এই বইটা। লেখক সাধনকমল চৌধুরীর লেখা আগে পড়েছি, ভীষণ সুখপাঠ্য লেগেছে আমার ওঁর লেখা, এই বইটাও তাই লাগল। এত অল্প পরিসরে বৌদ্ধধর্ম, পাল-সেন বংশের প্রভাব, তন্ত্রের উদ্ভব, পদবীর ইতিহাস, সনাতন ধর্ম, ইসলাম ধর্মের প্রভাব বৌদ্ধদের উপর। আরো নানাদিক নিয়ে চুম্বকে চুম্বকে লিখে গেছেন। চট্টগ্রাম, মহাত্মা ও আম্বেদকরকে দিয়ে শেষ করছেন লেখাটা। 

     কোনো ধর্ম - একজন প্রবক্তা, একটা বা কিছু নির্দিষ্ট 'পবিত্র' বই, কিছু প্রথা-বিশ্বাস - এই নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তারপরে সমাজ আর কালের গতিতে তার নানা রূপভদে হয়, মিশ্রণ হয়, বিকার হয়, বিকারের থেকে ওঠার জন্য আলোড়ন হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার ব্যক্তিগত আগ্রহের বিষয় থাকে এই সমাজের সঙ্গে কোনো একটা বা অনেকগুলো বিশ্বাসের সমীকরণে আসার লড়াইটা। যা সমষ্টিগত অবচেতন মনের কি অসামান্য কারসাজি। কার্ল ইয়ুং এর মত মরমী মনোবিদ ভারতে না জন্মালেও ভারত নিয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর বিস্তর। কাজও করেছেন তাই। ভারতে এসেওছেন। কিন্তু সে অন্য গল্প। 

   একজন মানুষের যেমন অবচেতন মন থাকে, যা তার জ্ঞাত চেতনের নাগালের বাইরে, কিন্তু যা তার সমস্ত সজ্ঞান চেষ্টার পটভূমি, চালক ও গুপ্ত নিয়ন্ত্রক, তেমন একটা জাতেরও সমষ্টিগত অবচেতন স্তর থাকে। সেখানের ভাঙাগড়া আমাদের শিক্ষা-অভিজ্ঞতার বোধের বাইরে। কাকে সে রাখে আর কাকে সে ফেলে তা ডারউইনের মত “প্রকৃতির খেলা” বলা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। নেপথ্যে সে-ই ঘটিয়ে চলে সমাজের নানা পরিবর্তন। আমরা যার হাতে পুতুলমাত্র। বাইরের প্রকৃতি আর ভিতরের প্রকৃতি - এই দুইকে হাতে নিয়ে খেলছে সময়, মহাকাল। আমরা আটকে তার মধ্যে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “তোমার খণ্ডকালের ছোটো ছোটো পিঞ্জরে”। 

     মানুষ অস্ত্র দিয়ে যত না আঘাত করে মানুষকে, তার থেকে সহস্রগুণ আঘাত করে তার অহমিকা দিয়ে। যে অহমিকার নানা রূপের মধ্যে থাকে তার উন্নাসিক ধর্মবিশ্বাস, উন্নাসিক চামড়ার রঙে বিশ্বাস, তার উন্নাসিক সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প ইত্যাদি সব দিয়ে আরেকজনকে কোণঠাসা করার আসুরিক প্রবৃত্তি। 

    ঝুঠন, ওমপ্রকাশ বাল্মিকীর লেখা তেমনই এক অত্যাচারিত হওয়ার রক্তাক্ত লেখা। ইংরাজিতে যাকে বলে, “ডিস্টার্বিং” লেখা। দীর্ঘশ্বাস আর কান্না পাতায় পাতায় পাঠকের মনে জাগতে বাধ্য যদি তার স্ব-বর্ণের কল্পিত মাহাত্ম্যর প্রতি অশ্রদ্ধা জন্মে থাকে। অসহ্য বর্ণনা। 

     ক'দিন আগে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর জীবনী পড়তে গিয়ে পড়লাম, জীবনীকার লিখছেন তিনি নাকি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে এক আসনে অব্রাহ্মণ বসলে বিরক্ত হতেন। অথচ যৌবনে তিনিই পৈতে ত্যাগ করে নিজেকে মানুষ হিসাবে সবার সমান, এক আসনে রেখেছিলেন। সাধন করে তিনি অনুভব করলেন বর্ণাশ্রম না টিকলে নাকি ভারতের সমাজ টিকবে না। এ শুধু বিজয়বাবুর মত না, সেই সময়ে নব্য সনাতনী সাধক ও প্রচারকদের সবার মধ্যেই এ বিশ্বাস জেগেছিল কমবেশি। রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে বিজয়কৃষ্ণকে নিয়ে লিখতে গিয়ে লিখছেন, “তিনি সত্যে স্থিতি লাভ কর্ত্তে পারেন নি, তিনি মত্ততা লাভ করেছিলেন”। কথাটা কঠিন, হয় তো রূঢ়ই বা। কিন্তু এই অদ্ভুত বর্ণাশ্রমে বিশ্বাস যে কি ভয়ংকর ছুঁৎমার্গী ব্যাধি সমাজে ঢুকিয়েছে তার সামনে যে কোনো কঠিন ভাষাই কম হয়ে যায়। আমি যে মুহূর্তে এই লেখাটা লিখছি ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতের কোনো না কোনো প্রান্তে কোনো এক মানুষ তার নিম্নবর্ণে জন্মানোর মাশুল দিচ্ছে নিজের মর্যাদা, অধিকার, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সবটুকু খুইয়ে। কটা খবর কাগজে বেরোয়? যে মথুরা-বৃন্দাবন ভারতের মরমীসাধকদের এত বড় পীঠস্থান, তার থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরেই হাথরাস। ভুলে গেছি কি হয়েছিল সেখানে? 

    বুদ্ধ, মহাপ্রভু নিজেদের মত করে এর মূলে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনের বৌদ্ধ আর সেদিনের বৈষ্ণব আজকের দিনে অনেক অনেক পরিবর্তনে সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের কিছু। সবাই নয় যদিও। তবু মূলস্রোতে তো তাই। অসংখ্য শাখাপ্রশাখায় ভাঙতে ভাঙতে মূলে পৌঁছাতে আজ কালঘাম ছুটে যায় গবেষকের। 

   সাধনকমল চৌধুরীর লেখাটা পড়ার জন্য অনুরোধ জানালাম। করুণা প্রকাশনীর এই বই মাত্র ১২০ পাতার, দাম চল্লিশ টাকা। জানি না বইটা কদ্দিন আর পাওয়া যাবে। এ বই হারিয়ে যাওয়া মানে সত্যিই ক্ষতি। আর ঝুঠন লেখাটাও (যার ইংরাজি অনুবাদও পাওয়া যায়) পড়তে পারেন। অত্যাচারিতের প্রতি দরদে লেখা আর অত্যাচারিতের নিজের ভাষায় লেখার মধ্যে তো পার্থক্য থাকেই না?




Wednesday, May 24, 2023

প্ররকৃতিং পরমাং

 


মা সারদাদেবীকে নিয়ে বই অনেক আছে। এই বইটা বহু আগে প্রকাশিত হয়, রামকৃষ্ণ মঠ থেকে নয়, ব্যক্তিগত উদ্যোগে, ১৯৯২ সালে, ২৫শে অক্টোবর। লেখক স্বামী অব্জজানন্দ।

বইটার দ্বিতীয়খণ্ড আমি হাতে পাই, এক সুহৃদের অনুগ্রহে, অবশ্যই পুরোনো বই। পড়তে শুরু করি। বইটার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় মহাশয়। অসামান্য লেখনী। যেন রামচরিতমানসের মত সারদাচরিতমানস বলা যায়। তুলসীদাসজী লিখছেন, এই রামচরিতরূপ মানসসরোবরে মানুষের মন যেন হংসের মত ভ্রমণ করে আত্মানন্দের সুখে। এই বইটাতেও সেই একই সরোবর রচনা করেছেন স্বামী অব্জজানন্দ। পড়তে পড়তে মনে হবে যেন সেই সময়ের সাক্ষী আমি নিজেও। বইটাতে দর্শন, ঘটনা, তত্ত্ব, তার বিশ্লেষণ সব থাকা সত্ত্বেও রামচরিতমানস যেমন সুখপাঠ্য, এও তেমন।

আমি আমার পুরোনো বইটা পড়তে পড়তে ভাবতাম এই বই হারিয়ে যাবে? তবে তো সত্যিই বিরাট ক্ষতি। কিছুতেই কি পাওয়া যায় না! এমন সময় জানলাম রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্বোধন প্রকাশনী থেকে এই বইটা প্রকাশিত হয়েছে। গতকালই। কি যে আনন্দ হল বইটা হাতে পেয়ে!

বইটার সঙ্গে মায়ের একটা চিঠি আছে। আগের প্রকাশনীতে চিঠিটা একটা পাতায় ছাপা থাকত। এবারে বইটার মধ্যে একটা খামে করে চিঠিটা আলাদা করে দিচ্ছেন ওঁরা। তার মাধুর্য আরো অন্যরকম। যেন আপনার হাতে মায়ের চিঠি এসে পড়েছে।

মা সারদার জীবনীর উপর যদি আগ্রহ থাকে তবে আমার মনে হয় এ বইটা অবশ্যই সংগ্রহ করে রাখতে পারেন।

 

মূল্য ৬৫০/-, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫১৬।





Thursday, January 19, 2023

জাস্টিস



সেই আদিযুগে মানুষ প্রশ্ন করেছিল, জাস্টিস কি? আজও উত্তর খোঁজা চলছে। মাঝে কত ছোটো বড় স্টেশানে ট্রেন দাঁড়ালো। কিন্তু শান্তি পেল না। উত্তর পেল না। আবার যাত্রা শুরু হল। ধ্রুব তৃষ্ণা। এই তো জীবন। মেধার রাস্তা। আকবর বলেছিলেন, রাহে আকল... যুক্তির রাস্তার কথা। সেকুলার ভারতের কথা। সেকুলার বিশ্বের রাস্তা খুঁজছেন অমর্ত্য। জাস্টিস কি? মঙ্গল কিসে? ন্যায় কি? সেদিন ভারতে ন্যায়ের আরেকটা প্রতিশব্দ ছিল, ধর্ম। ধর্ম মূল ঠিক থাকলেই অর্থ-কাম-মোক্ষ টিকবে। নইলে সব ধসে যাবে। আমরা যখন বলি, ধম্মে সইবে না। তখন তো ন্যায়ের কথাই বলি। জাস্টিসের কথাই বলি।

     আজ ঘটনাক্রমে এই দুটো বই পাশাপাশি খাটে ছিল। তখনই মনে হল, মানুষের কত যুগ ধরে চলে খুঁজে চলা প্রশ্ন, এইভাবে পাশাপাশি বসে, শীতের রোদে। চমক লাগল। 

Monday, January 2, 2023

দেশ - সঙ্ঘজননী

 


'শতরূপে সারদা'য় আশাপূর্ণাদেবীর প্রবন্ধ পড়েছিলাম। আজ 'দেশ' পত্রিকায় মা সারদাকে নিয়ে লিখলেন আপনি, Yashodhara Ray Chaudhuriআমার যে বন্ধু মা সারদার সংখ্যাটি নিয়ে এলো, সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে, সেই ছবিতে মাটির ক্যানভাস। "হাতে পায়ে দিনগত পাপক্ষয়ের মাটি লাগানো আছে"। আপনি লিখলেন। পড়তে গিয়ে চমকে গেলাম সিমোন ক্যারোলের উল্লেখে।

প্রবন্ধটি বোধে, বিশ্লেষণে, অনুভবে হৃদয়কে ছুঁয়ে গেল। সংগ্রহে রাখার মত। যেমন আশাপূর্ণাদেবীর প্রবন্ধটি। মহাশ্বেতাদেবী একবার মা সারদা প্রসঙ্গে টিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছিলেন, "মা" একটা মন্ত্র হয়ে গেল জীবনে।

রবীন্দ্রনাথ মন্ত্র মানে বলেছিলেন, যা দিয়ে নেমে যাওয়া তানপুরার তার আবার বেঁধে নেওয়া যায়। সংসারে নানা আঘাতে, দুঃখে, হতাশায় তার বারবার নেমে যায়। সুর হারিয়ে যায়। সে সুর আবার তুলে যা দেয় সে-ই মন্ত্র। মা সেই মন্ত্র। মায়ের জীবনের ছোটো ছোটো ঘটনাকে তুলে এনে আপনি আপনার প্রদীপকে তিনটে শিখায় দেখালেন। ভক্তির আরতি বোধের আরতিতে মিশল আমার চেতনায়।

এইবার বলি একটা ব্যক্তিগত কথা। আপনার লেখা পড়তে পড়তে আপনার মায়ের মুখটা মনে পড়ল। মনে পড়ল মায়ের কণ্ঠে স্তবগান। যা আপনি কয়েকবার আমাদের শোনার সৌভাগ্য করে দিয়েছেন। স্নিগ্ধ, শান্ত, দৃঢ় প্রত্যয়ে গড়া আপনার মুখের ছবিটা। এ লেখা পড়তে পড়তে যা স্মরণে এলো। আমার মনে হয় আমাদের চেতনায় মাতৃত্বের একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সে শব্দটা পুরুষ নারী লিঙ্গভেদে যায় না। নইলে গৌতম বুদ্ধের শব্দবোধ এত দুর্বল নিশ্চয় ছিল না যে উনি সারা জগতকে "মায়ের মত" ভালোবাসার কথা বলবেন। ওই সে বললাম, আমাদের বোধে একটা মাতৃত্বের ধারাবাহিকতা আছে বলে আমার মনে হয়।

এ লেখা আপনাকে আমার খোলা চিঠির মত। আপনি কদিন আগে আপনার টাইমলাইনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কি পড়তে চাই এ বছরে। সেখানে উত্তর দিইনি কিছু। এখানে লিখলাম, ইচ্ছা হয় আপনার মায়ের কথা জানি। পড়ি। ওই স্তব উচ্চারণের পিছনে দাঁড়ানো মানুষটার বোধকে স্পর্শ করি।

মা সারদার ছবিতে অনেকে নিজের মায়ের ছবি দেখতে পান। নিজের চোখেও দেখেছি। বেলুড় মঠে মায়ের মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে এক বাচ্চা তার মাকে জিজ্ঞাসা করছে, মা তোমার ছবি কেন ওখানে?

বাচ্চাটার ছোটো আঙুলের ইঙ্গিত মা সারদার পটের দিকে।

সে মা লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, বলতে নেই... ছি ছি।

কিন্তু সে বলে তো ফেলেইছে। চণ্ডীতে আছে দাবানল ইত্যাদি নানা ভয়ংকর বিধ্বংসী সব কিছুর মধ্যে যিনি রক্ষা করছেন তিনি মা। এত যুদ্ধ, এত হানাহানি, ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও যে জগতটা চলছে, প্রাণপণে কি এক শক্তি আবার সব কিছু গুছিয়ে তুলে রাখতে চাইছে, সে তো মায়ের শক্তিই। যা রাখতে চায় সে-ই মা।

অপূর্ব লাগল আপনার লেখাটা। আমার বন্ধুদের বলব সংগ্রহ করে নেওয়ার জন্য এই সংখ্যাটা।

আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানবেন।




Thursday, December 29, 2022

কবীর ও পুরুষোত্তম আগরওয়াল



এক সময়ে বাঙালির কবীরকে নিয়ে আগ্রহ ছিল। হয় তো তার জন্যে কিছুটা দায়ী রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের আজীবন আগ্রহ। ক্ষিতিমোহন সেনের কবীরের দোঁহার সংগ্রহ। আজ কতটা আছে জানি না।

আমার বারবার মনে হয় লালনের মত কবীরের অনুভবের সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার। কবীরের দর্শনে এমন অনেক কথা আছে যা আজকেও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই দর্শনকে শুদ্ধভাবে নিয়ে আসার কাজ যিনি আজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করে চলেছেন তিনি আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ Purushottam Agrawal তাঁর শেষ প্রকাশিত বই কবীর (ইংরেজিতে) আমার মত বহু কবীর অনুরাগী মানুষকে মুগ্ধ করেছে। তার আগে আরেকটা বই ছিল কবীরজীকে নিয়ে হিন্দিতে, "অকথ কাহানি প্রেমকি" হাজারিপ্রসাদ দ্বিবেদির লেখা কবীরের বইটার উপর এই বইদুটো মনে হয় ভীষণ অথেন্টিক।

এখনও তিনি অক্লান্ত কাজ করে চলেছেন কবীরকে নিয়ে। কবীরকে নিয়ে লেখা একটি বই যা ১৯২৮ সালে প্রকাশিত, সেটাকে আবার নতুন করে পরিমার্জন সংশোধন করে হিন্দির রাজকমল প্রকাশনের মাধ্যমে আমাদের সামনে আনছেন। কি পর্বতপ্রমাণ কাজকে উনি কি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করলেন অবশেষে।

কয়েকজন মানুষকে দেখলে ভীষণ আফসোস হয় জীবনে এদের শিষ্যত্ব পেলাম না বলে। নিজেকে বড় বেশি অভাগা মনে হয়। পুরুষোত্তমজী অন্যতম তাঁদের মধ্যে। মনে হয় যদি সম্ভব হত ওঁর শিষ্য হতে। এমনভাবে কবীরের অন্বেষণে ওঁর চেলা হতে।

কবীরের ভারত উদার, মুক্ত দর্শনের কথা বলে। সে বাণীকে সবার সামনে পরিশুদ্ধভাবে আনার দায়িত্বকে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে আমার মনে হয়। বিশেষ করে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে।

উনি নিজের কাজটা নিয়ে নিজে কি বলছেন সেটাও তুলে দিলাম ওনার টাইমলাইন থেকে---

 

"कबीर-ग्रंथावली में कबीर की रचनाओं का सबसे प्राचीन रूप मिलता है, अध्येता कबीर के अध्ययन का मुख्य आधार इसी को मानते हैं।ग्रंथावली नाम 1928 में श्री श्यामसुंदर दास ने दिया था, नागरी प्रचारिणी सभा ने इसे प्रकाशित किया।पांडुलिपि पढ़ने में चूक या प्रूफरीडिंग में लापरवाही के कारण इसमें भयानक भूलें छूट गयीं हैं। ताज्जुब है कि इतनी महत्वपूर्ण पुस्तक के प्रकाशन में नागरी प्रचारिणी सभा ने कतई सावधानी नहीं बरती। ताबड़तोड़ संस्करण प्रकाशित होते गये और अर्थ का अनर्थ करने वाली भूलें बनी ही रहीं। ऐसी सैकड़ो भूलें हैं जिनका अहसास सहज बोध से ही हो जाता है। सैकड़ों ऐसी भी जिनका पता सभा संस्करण के पाठ का आदिग्रंथ, रज्जब और गोपालदास की सर्वंगियों, पंचवाणियों तथा अन्य संकलनों के साथ मिलान करने से लगता है।ताज्जुब यह भी है कि पूरी सदी होने को आई किसी अध्येता ने कबीर अध्ययन के इस आधारभूत स्रोत का पाठ दुरुस्त करने की नहीं सोची। चालीस-पैंतालीस बरस पहले कबीर पर काम शुरु करते हीग्रंथावलीके पाठ से मुझे खीझ होती रही कि इस पाठ का संशोधन या परिमार्जन करने की ओर किसी अध्येता ने ध्यान क्यों नहीं दिया। लेकिन, किसी तरह काम चलायासहज बोध के सहारे या आगे चल कर प्रकाशित या अप्रकाशित पांडुलिपियों से तुलना करके।

अब यह मेरी व्यक्तिगत समस्या तो नहीं रही लेकिन सही पाठ तक पहुँचने के लिए विविध कबीर-संकलनों की तुलना और पांडुलिपियों से उनका मिलान, ज़ाहिर है कि हर पाठक के लिए संभव नहीं। सो, खीझ तो बनी ही रही, जिस पर Suman Keshari ने दो-एक बार अपने स्वभाव के अनुसार दो टूक कह भी दिया, “ ख़ुद क्यों नहीं करते, यह ज़रूरी काम?”

कोई तीन बरस पहले, इसी खीझ को सुनते हुए Rajkamal Prakashan Samuh श्री अशोक महेश्वरी ने भी यही बात कही, “ आप स्वयं कीजिए ग्रंथावली के पाठ का परिमार्जन,ज़रूरी संशोधन…”

और भी काम लगे ही रहते हैं, लगे ही हुए हैं, लेकिन वक्त अब कम बचा है, ऐसे में प्राथमिकताएँ स्पष्ट होनी चाहिएँ, लगा कि यह काम अब और नहीं टाला जा सकता। कब तक बस खीझता रहूँगा? कब तक छात्र और अन्य पाठक ग़लतियों से भरपूर संस्करण से काम चलाते रहेंगे? सो, सारी व्यस्तताओं के साथ ही इस काम में लग गया। कोई डेढ़-दो साल की मेहनत के बाद अब पाठ संशोधन पूरा हो चला। आधार रहीं हैं पंचबानियाँ, सर्वंगियाँ, आदिग्रंथ औेर फतेहपुर पांडुलिपि। डॉ. श्यामसुंदर दास, डॉ. रामकुमार वर्मा, डॉ. माताप्रसाद गुप्त को कृतज्ञता के साथ याद करते हुए; डॉ. शुकदेव सिंह और विनांद कैल्वर्त, डेविड लोरेंजन जैसे पाठ ( टेक्स्ट) आधारित काम करने वालों विद्वानों के काम में कुछ जोड़ पाने का अहसास लिए काम लगभग पूरा हो जाने का संतोष है। मैं अपना वर्क इन प्रोग्रेस आम तौर से सोशल मीडिया के जरिए आपके सामने नहीं रखता। अभी भी मेरा ध्यान कुछ ही देर पहले सुमन के खींचे हुए फोटो पर गया, अच्छा ही है कि मित्रों को सूचना मिली।

अगले सप्ताह पांडुलिपि राजकमल प्रकाशन के हवाले होगी एक लंबे से प्राक्कथन के साथ, जो आशा है आपको रोचक, विचारोत्तेजक लगेगा। उम्मीद है कि कबीर-ग्रंथावली का यह संस्करण कुछ ही महीनों में आपके सामने होगा।"

আমার শ্রদ্ধা প্রণাম আপনাকে, এই অনলস সাধনার জন্য, যা ভাবী প্রজন্মকে আপনার কাছে ঋণী রাখবে।