Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts

Wednesday, January 3, 2024

দেখে এলেম তারে

 


সূর্য তো পুবাকাশে ওঠে, তাই বলে কি সূয্যি পুবাকাশের হয়ে যায়? 

    কবি বললেন, শ্রীরাধা জন্মালেন বরসনায়। সে বরসনায় গেলাম আজ। সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে উঠলাম। টিলার উপরে মন্দির। বেশ চড়াই। কবির হৃদয়ে যিনি জন্মালেন তাঁকে কি বাইরের মন্দিরে পাওয়া যায়? তবু মন্দিরে গেলে সুখ হল। কেন বলো তো? 

    এই যেমন ধরো স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। কেউ এসে জিজ্ঞাসা করল, হ্যাঁ গা, ওই যে দুটো কাঠের পাটাতন হাতে দাঁড়িয়ে, ওরাই কি ক্রিকেট?  তুমি বললে, না। সে বলল, তবে ওই যে এদিক ওদিক কিছু লোক গোল হয়ে, মাঠের কেন্দ্রে দুপাশে তিনটে করে কাঠি পোঁতা ফাঁকা জায়গার দিকে তাকিয়ে, ওই ক্রিকেট?  তুমি আবার বলবে, না না। সে বলবে, তবে এই যে এতলোক ভিড় করে মাঠের চারদিকে বসে, ওই যে একটা লোক টুপি পরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাঝখানে, হাতের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করছে, ওই তবে ক্রিকেট? তুমি হাল ছেড়ে বলবে, আরে ভাই না না... সবটা মিলিয়েই ক্রিকেট। 

    শ্রীরাধার মন্দির, রাধারমণের মন্দির সেইরকম স্টেডিয়ামের মত। মিলনক্ষেত্র। রামকৃষ্ণদেব বলেন মাধুর্য আর ঐশ্বর্যের কথা। ঐশ্বর্যের অনেক হিসাবনিকাশ, তর্কবিতর্ক। মাধুর্যের সে দায় নেই। আকাশে কালো মেঘ করে এলে, ঝোড়ো বাতাসে গাছপালা দুলে দুলে আসন্ন বর্ষাকে অভিনন্দিত করলে তোমায় প্রাণে যদি মিঞামল্লার কি গৌড়মল্লারের তান ওঠে, তবে কেন উঠল এ তর্ক উত্থাপনের কোনো মানে হয় না। 

     রাধারমণের মন্দিরে গান হচ্ছে। "সব হর লিও মেরে মোহনা"। এক যুবতী মন্দিরের কোণে বসে নিজের মুখটা ওড়নার আড়ালে রেখে কাঁদছে। জানি না তার বৃন্দাবন কোথায়? তবে কাঁটা যে ফুটেছে সে তো বোঝাই যাচ্ছে। বৃন্দাবন আসার আগে দিল্লির নিজামুদ্দিনের দরগায় গিয়েছিলাম। আমির খসরুও আছেন পাশাপাশি। নিজামুদ্দিনকে দেখে লিখেছিলেন শুনেছি, "ছাপ তিলক সব ছিনি মো সে নয়না মিলাইকে।" বৈষ্ণব কবি গেয়েছিলেন, "আমা হইতে জাতিকূল নাহি গেল রাখা.... দেখে এলেম তারে সখী..... দেখে এলেম তারে...."। 

    ভাবুক ভক্ত বলে রাধারমণের দিকে চেয়ে থাকলে তাকে নিত্য নতুন ভাবে লাগে। এ সত্য। ভালোবাসার মানুষকে নিত্য নতুন তো লাগেই। যদি  ভালোবাসা মাধুর্যের মকরন্দ হয়। যদি না সে সুগন্ধি মোড়কে স্বার্থের আঁশটে গন্ধ হয়। 

    মন্দিরে ধুপ জ্বলে। দীপ জ্বলে। ভালোবাসা সুগন্ধী আর উজ্জ্বল বলেই যে না। বুদ্ধ রহস্য করে বলেন, ফুলের গন্ধ হাওয়ার দিকেই শুধু বয়, শুদ্ধ হৃদয়ের সুবাস বাতাসের বিপরীতেও বয়। 

   রাধাকুণ্ডের পাশে সিঁড়ি ঝাঁট দিচ্ছেন তিনি প্রায় চল্লিশ বছর হল। স্বামী মারা যাওয়ার পর, না শ্বশুরবাড়ি নিয়েছে, না বাপের বাড়ি। ময়লা সাদা শাড়ি, ময়লা একটা সোয়েটার, গলা মাথা প্যাঁচানো শতচ্ছিন্ন মাফলার। বলল, এই বেশ আছি। একজন অল্প বয়েসী ছেলে হঠাৎ তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। বলল, তীর্থে যাচ্ছি ঠাকুমা। আশীর্বাদ করো। বাবার সঙ্গে আসতাম যখন তখন থেকে তোমায় দেখছি। 

    বৃদ্ধা রাধাকুণ্ডের সিঁড়িতে বসে পড়লেন। "এত অল্প বয়সে এসব কেন? বিয়ে করো, সংসার করো।"

   যুবক বলল, এই বয়সেই করে নিই, বয়েস হলে পারব না। 

  যুবক হাসল। প্রণাম করে চলে গেল। বৃদ্ধা ঝাঁটা আর বালতি হাতে বসে রইল সিঁড়ির উপর। মুখের উপর বিকেলের আলো। এমনভাবে বসে যেন যুগযুগান্ত আর কোনোদিন উঠবে না। উঠে কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? সব সম্পর্কের শান্তি ভিত হয় না তো। যে সম্পর্ক শান্তির ভিতে জন্মায় না, জল পায় না সাহচর্যের সে সম্পর্ক থাকে কতদিন? অল্প ঝড়েই উপড়ে যায়। সব উপড়ে ছিন্নভিন্ন। 

     যমুনার তীরে এলাম আবার বৃন্দাবনে ফিরে। হাতের পাঁচ আঙুলে সেঁকছি গরম চায়ের কাপের তাপ। ফেরার সময় আসছে। একজন এসে দাঁড়ালো পাশে। জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলবেন? সে বলল, হ্যাঁ দাদা, বাঁদরে চশমা নিয়ে গেছে। দেখছি না চোখে। আপনি একটা ফ্রুটি কিনে ওকে দিলেই ও দিয়ে দেবে। এই নিন টাকার ব্যাগ। এখান থেকে টাকাটা নিয়ে নিন। 

     বৃন্দাবনে এ এক বিরাট সমস্যা। হাজার হাজার বাঁদর সর্বত্র। টুপি, মাফ্লার, ফোন আর সর্বোপরি চশমা, ক্ষণমাত্র অসতর্ক হলেই ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।  এখানে সব বাড়ির ছাদে জাল দেওয়া। বাগান সব লোহার জালে ঘেরা। স্থানীয় লোকের জীবন বাঁদরের বাঁদরামিতে নাজেহাল। কিন্তু কোনো কিছুই কেউ করছে না। উদাসীন সব। আমি নিজেই চশমা পকেটে নিয়ে ঘুরছি। চোখে রাখা যাচ্ছে না রাস্তায় বেরোলে। এখানের লোক যার জন্য সব সময় এক্সট্রা চশমা বানিয়ে রাখে। আর শুধুমাত্র ফ্রুটি দিলেই ফেরত দেবে, নইলে নয়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও হয়ে গেছে বৃন্দাবনে এসেই পরেরদিন  সকালে।

   ভদ্রলোক চশমা পেলেন ফ্রুটির বিনিময়ে।

   একাই আসেন? 

   হ্যাঁ, আমাদের পারিবারিক বিগ্রহ আছে, গোপালের। আমাদের বাড়ি এমনিতে শিয়ালদার পাশে। আমাদের অনেক আগের প্রজন্মের একজন স্বপ্ন পেয়েছিলেন, এখানে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে। তখন রেল ছিল না। নৌকা করে আনা হয়েছিল। আমরা গোপালেরই সেবায়েত। 

    "রাধে রাধে" বলে যমুনার তীর ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। আমার ইচ্ছা হল একবার যাই। জিজ্ঞাসা করি, দেখতে দেবেন? 

     জিজ্ঞাসা করলাম না। আসলে চার দেওয়ালের মধ্যে দেখার ইচ্ছা হচ্ছে না। এ যমুনার তীরেই আসুক সে। এসেছিল তো। জোড়াসাঁকোর ঘরে। মেঘলা দিনে উপুড় হয়ে শুয়ে এক বালক লিখেছিল তো "গহন কুসুমকুঞ্জ মাঝে"। গোটা বাংলা ভেসে গেল সুরে। আজও ভাসছে। রবীন্দ্রনাথ শেখান কিভাবে বরসনা খুঁজতে হয়। আজও শেখাচ্ছেন। 

  




  (কেউ কেউ যমুনার ছবি চেয়েছেন। দিলাম এখানে। আর দিলাম বরসনার মহলের দেওয়ালে আঁকা কিছু ছবি। আমি ছবি তুলি না। আসলে আমার বাইরে এলে মোবাইলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই হেলায় তোলা কিছু ছবি দিয়ে রাখলাম। ক্ষমা করবেন আমার এই সাদামাটা ছবি পোস্ট করার জন্য। যদিও আশা করছি ভালো কিছু ছবি পাব, আমার কয়েকজন চিত্রগ্রাহক অনুজ সঙ্গে এসেছেন যে। রাধে রাধে!)




Monday, July 24, 2023

গুঁড়ো গুঁড়ো

 



সন্ধ্যে হব হব, ঈশ্বরগুপ্ত সেতুর উপর দাঁড়িয়ে, শ্রাবণের আকাশ তখন বারবার ওয়ালপেপার সেট করতে ব্যস্ত। কোনোটাই যেন মনের মত হচ্ছে না। হঠাৎ এক ঢেউ খেলানো কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল লাল টকটকে সূর্য। আনমনা হলাম। মনে হল যে মা দাঁড়িয়ে সামনে। কালো ঘন মাথা ভর্তি চুলের ঠিক নীচে লাল টকটকে সিঁদুর।

হাঁটতে শুরু করলাম। ওই যে দেখা যাচ্ছে মন্দিরের চূড়া, হংসেশ্বরী মন্দির। চূড়া তো ওই জন্যেই এত উঁচুতে থাকে, যাতে নগরের যে কোনো প্রান্ত থেকে চোখে পড়ে, দিক ঠাহর করে আসা যায়…, আমার এক বন্ধু বলল। ভালো লাগল কথাটা।

মন্দিরে ঢোকার আগে জুতো রাখার জায়গা। গলায় কণ্ঠি, হাতে লাঠি, এক মধ্যবয়েসী মহিলা বললেন, এইদিকে আসুন… ওই… ওইখানে রাখুন….

লাঠি দিয়ে জুতো রাখার জায়গা দেখাচ্ছেন, কিন্তু মন অন্যদিকে, পাশেই বাচ্চা কোলে করে এক মহিলা দাঁড়িয়ে, সঙ্গে তার পরিবারের আরো কেউ কেউ… লাঠি হাতে মহিলা বাচ্চাটাকে বলছেন, আমায় কিন্তু বিয়ে করে নিয়ে যেতে হবে দাদুভাই…. কিচ্ছু না, খালি পেট পুরে খাবার দিলেই হবে….., আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যান যান… মন্দির খোলা আছে যে…..

=======

মন্দির খোলা। মায়ের একি সাজ! কিন্তু সে কথা পরে হবে, ওদিকে ভিড়, কি হচ্ছে?

একজন মহিলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বড় একটা থালা থেকে প্রসাদ দিচ্ছেন সবাইকে। আমি গেছি একদম শেষে। থালায় পড়ে এক কণা লুচি আর নাড়ুর এক ছোট্টো কণা…. হাতে তুলে দিয়ে মৃদু হেসে বললেন, দেরি করে এলেন।

আমিও হাসলাম। কি বলি? তবু তো কিছু পেলাম! একেবারে শূন্য হাতে তো ফিরলাম না।

এক বাচ্চা মেয়ে, পা দুটো ছড়িয়ে, ফোনে দাদুর সঙ্গে গল্প করছে…., জানো দাদু… মন্দিরে এসেছি…. মা-বাপির সঙ্গে…. বাইকে…. মালা পরেছি... মাথায়…. দেখবে?

তার মাথায় লাল লাল ফুল দেওয়া গোল রিং একটা…. দাদু ভিডিও কলে দেখছে…. নাতনি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দাদুকে দেখাচ্ছে…. কি তার আনন্দ… কি তার হাসি!

খানিক দূরে এক বাচ্চা ছেলে বাবা-মায়ের পাশে বসে বেড়ালের মাথায় হাত বোলাচ্ছে। বাবা-মা আলোচনায় মশগুল। সে বেড়ালে মশগুল। বেড়াল তার আদরে। চারদিকে থিকথিক করছে মানুষ। এখনি মন্দির বন্ধ হবে। একে একে দোকান সব বন্ধ হচ্ছে। পুজোর ডালা, বেলুন, সাজের সামগ্রী --- সব গোটানো হচ্ছে। মাথার উপর আধখানা চাঁদ, মেঘের পাতলা চাদরে ঢাকা।

আবার মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়ালাম। এই যে চারদিকে শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ…. মা তাঁর আটপৌরে সাজে সবার মধ্যে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে যেতে লাগলেন। প্রসাদের ক্ষুদ্র কণার মত হয়ে। সাধারণ মানুষই তো সব! একবার এক যুবতী ছাত্রী নোম চোমস্কিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি যখন বৃদ্ধা হব… আমি যখন আমার নাতি বা নাতনির হাত ধরে হাঁটব… তখন যেন মনে না হয় এই অসুস্থ পৃথিবীটার জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি…. আমি কি করতে পারি? আমি তো সাধারণ মানুষ একজন…. অতি সামান্য…

নোম চোমস্কি বলেছিলেন, তাঁর স্বভাবসিদ্ধ শান্ত, দৃঢ়স্বরে বলেছিলেন, আজ অবধি যা পরিবর্তন হয়েছে তা সাধারণ মানুষ জেগেছে বলেই হয়েছে…. মার্টিন লুথার কিং অবশ্যই বড় মানুষ… কিন্তু শয়ে শয়ে মানুষ তাঁর ডাকে সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বলেই পরিবর্তন এসেছে….. সব সাধারণ মানুষের জন্যেই তো…..

অন্ধকার নেমে এসেছে গঙ্গার উপর। ঈশ্বরগুপ্ত সেতু পার হচ্ছি….. চারদিকে অসংখ্য মানুষ… সাধারণ মানুষ…. একবার আলোর দিকে ফিরলে…. একবার জেগে উঠলে….. সব আবর্জনা ধুয়েমুছে পরিষ্কার….. কালবৈশাখীর ঝড়ের বাতাসও তো এই সাধারণ বাতাসের ঘুর্ণীতেই তৈরি….. আমরা শুধু জানি না কবে সে ক্ষণ আসবে…. কিভাবে আসবে…. যে জানে… সে কি মহামানব….? "ওই মহামানব আসে….", সে কি কেউ একজন… নাকি গর্জে ওঠে ওই প্রসাদের কণিকার মত সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই কেউ….. যে বলে ওঠে আর সহ্য করব না…. অনেক অনেক হয়েছে!......

 

(ছবি: Debasish Bose)

 

Monday, April 24, 2023

সব কি আর এমনি এমনিই

 



সন্ধ্যে হব হব। ত্রিবেণীর শিবমন্দিরের চাতালে বসে আছি। হয় তো আরতি হবে একটু পর। এক একজন করে মহিলা আসছেন। মন্দিরঘেরা চাতালে বসছেন। গল্প করছেন। সংসারের নানা খুঁটিনাটি, সুখদু:খের গল্প। সব গল্প চেনা। যেন আমারই বাড়ির গল্প। একজন বয়স্ক মানুষ নাতির হাত ধরে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের সামনে। মহাদেবের জন্য ততটা নয়, যতটা নাতির ঘন্টা বাজানোর জন্য। দাদু নাতিকে শক্ত করে ধরে কোলে তুললেন। নাতি দড়িটা হাতে নিয়ে ঢং ঢং করে বাজাতে লাগল। পাশে মহিলাদের মধ্যে একজন গলা উঁচিয়ে বললেন, ও দাদা, মেয়ে কদ্দিন থাকবে?

নাতির ঘন্টা বাজানো কাঁপা কাঁপা শরীরটা দুই শীর্ণ হাতের বেড়ে আটকে বললেন, দেখি… মনে হয় কালই চলে যাবে…

হাই পাওয়ারের চশমার ভিতর দিয়ে যে কষ্টটা ঠিকরে শিবের গায়ে লাগল, ওটা ‘যেতে নাহি দিব’ কষ্ট। একজন মহিলা বললেন, দাদা মেয়ের বাড়ির নাতি-নাতনির এই এক জ্বালা… আমারটাও তো….

সংসারের গল্পের এই এক সুখ। কথা শাখা-প্রশাখা বেয়ে কোনদিকে যে বয়ে চলে! কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। অববাহিকা বলতে ছাতি। আর তার মধ্যে পোষা ভালোবাসার ছটফটানি।

দাদু নাতিকে কোল থেকে নামিয়ে, পাঞ্জাবির হাতায় কপালের ঘাম মুছে বললেন, আসি….

মহিলাদের দু-একজন বললেন, আসুন… সাবধানে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। দাদু নাতিকে কোল থেকে নামাতে চাইছে না। নাতিও কোলে থাকতে চাইছে না। সে বারেবারে বলছে, নামি… নামি…..

দাদুর সেই অসহায় জেদ… যেতে নাহি দিব… কাল সকালেই তো চলে যাবি…. থাক না… আরেট্টু…. সে নেমেই ছাড়ল।

খানিক দূরেই ত্রিবেণী শ্মশান। দেহের পর দেহ আসছে। কালো ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে সন্ধ্যের আকাশে। খোলে নামসংকীর্তন বেজেই যাচ্ছে, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ….

তবু যেতে দিতে হয়। দিতেই হয়।

======

"আপনারা কি বডি নিয়ে এসেছেন?"

চমকে তাকালাম। মূল শিবমন্দির ঘিরে দু-ধারে আরো কয়েকটা ছোটো ছোটো শিবমন্দির। তার উপরে বসে একজন মহিলা। মলিন পোশাক। চুল উসকোখুসকো। কিন্তু মুখের পেশীর মধ্যে একটা তীক্ষ্ম দৃঢ়তা। যেন ভাগ্য কাবু করেছে, জব্দ করতে পারেনি।

না না, এমনি বেড়াতে এসেছি বন্ধুরা….

ওহ্‌… সরি… আমি না জেনে… ভালো করেছেন…. ও বেলি… মা কেমন আছেন?

একজন কিশোরী। হেঁটে আসছে। তাকে জিজ্ঞাসা করছেন। সে মেয়ে বলল, মা ভালো আছেন পিসি…

উনি আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, থার্মালের দিকে যান… ওখানে খুব সুন্দর ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের আশ্রম আছে… খুব শান্ত… যান…

যাই। বলার মধ্যে যেন আবদার। যাও না, বসে আছ কেন? রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছ যখন যাও। থেমে থেকো না।

বাইক স্টার্ট দেওয়া হল। আসি তবে?

উনি বললেন, দুগ্গা… দুগ্গা….

কিছু মানুষের ভালোবাসা এমন ঘাসের মত, দেখেছি সংসারে। পায়ে দলে যাওয়াও যায়, আবার হাত বোলানোও যায়, আদরে। যা খুশী।

এই এক জটিল হিসাব সংসারে। সব কিছু করার স্বাধীনতা আছে। কাউকে আঘাত করার, অত্যাচার করার, ভালো ব্যবহার করার, না করার। সব কিছুর স্বাধীনতা আছে জগতে। কিন্তু অধিকার কি আছে? এই প্রশ্নের উত্তর যার পাওয়া হয়ে গেছে তার কাছে অনেক কিছু সহজ হয়ে গেছে। স্বাধীনতা দেওয়া আছে যা কিছু করার, কিন্তু অধিকারবোধটাকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়… করব কি?

=====

জায়গার নাম ফাঁসিতলা। একটা পুরোনো বড় লোহার গেট। তার পাশ দিয়ে লোহার গোল চাকতি লাগানো দরজা। একজন একজন করে ঢুকে গেলাম। গঙ্গার পাশে অনেকটা জায়গা নিয়ে আশ্রম। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। খুব মধুর স্বরে নামসংকীর্তন ভেসে আসছে।

গঙ্গার ধারে দাঁড়ালাম। তারপর মন্দিরের দিকে এগোলাম। সুর আসছে যেখান থেকে। ফাঁকা মন্দির। বিরাট হলঘর। সামনে কয়েকটা মূর্তি। অনেক সন্ন্যাসীর। ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের। মা কালীর। মহাপ্রভুর। রামানুজের।

একজন সন্ন্যাসী বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে নাম গাইছেন। ডাকছেন। ডুবে আছেন। ডুবতে বলছেন। এসো বসো।

কি গাও? কাকে ডাকো? এত বড় শূন্য জগতে তোমার গাওয়া নাম পৌঁছাচ্ছে কোথায় সন্ন্যাসী?

এই যে এখানে… চন্দন আঁকা বুকে… দেখো… ডুবে দেখো… বাইরে অনেক আছে…. ভিতরে এক….

সে সাড়া দেয়?

আমার ডাকই তাঁর সাড়া… এই নামই আমার তৃষ্ণার জল…. তৃষ্ণা তিনি… জলও তিনি…. এত একা কেন? এত দূরে কেন? এত আঘাতে আঘাতে এ তীর, সে তীর ভেসে বেড়ানো কেন? চুপটি করে বসো। তর্ক থাক। বিচার থাক। চুপ করো। সুরে ডোবো।

"প্রসাদ নিয়ে যাবেন।"

একটা কাগজের বাটিতে মুড়কি, বিস্কুট আর বাতাসা দিয়ে গেলেন।

গঙ্গার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। মুড়কি মিষ্টি। বাতাসা মিষ্টি। কানের মধ্যে দিয়ে নাম মিষ্টি সুরে মনের উপর প্রলেপ দিয়ে যাচ্ছে। এবার ফিরতে হবে। একজন কি পরম আকুতিতে ডাকছেন, আমি তোমারই…আমি তোমারই… আমি তোমারই…. তুমি আমারই… তুমি আমারই… তুমি আমারই….

তর্ক নয়। যুক্তি নয়। একজন মানুষ কাউকে, কোনো সত্যকে পরম জেনে নিজেকে সমর্পণ করছেন। গদগদ ভাষে বারবার বলছেন, আমি তোমারই… আমি তোমারই…

সে দিচ্ছে না পার্থিব সুখ… বা অমরত্বের আশ্বাস…. না সুখের আশ্বাস… সে কি দিচ্ছে তবে?

সে দিচ্ছে সমস্ত ভালোবাসাকে মোহনায় নিয়ে যাওয়ার সুখ। নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সুখ। হারিয়ে যাওয়ার সুখ।

======

ফেরার পথ। চা পিপাসা। চায়ের দোকান মহাতীর্থ। সব ধর্মের মানুষ। গতকাল গেল ঈদ। আজ অক্ষয়তৃতীয়া। পাশাপাশি। কারোর মাথায় ইসলামি টুপি, কারোর কপালে শিবের ত্রিশূল আঁকা টিপ। ওই তো একটু উঁচুতে উঠলে দরগা। ওই তো এগোলে আরেকটু, জগন্নাথ মন্দির। সব আছে। স্বমর্যাদায়। তুমি আমি কে? মহাকালের বিন্দুর বিন্দু। মর্যাদা রাখলে সব থাকে। মাঝির নৌকা ডোবানোর স্বাধীনতা তো আছেই। চাইলেই পারে। কিন্তু পারে নিয়ে যাওয়াই তার কর্তব্য। তাকে অধিকার দেওয়া হয়েছে শুধু ওইটুকুরই। এটা বোঝো মন… বোঝো…. নত হও… নত হও…. যেখানে নত হবে সেখান থেকেই শুরু…. সুরের… মিলনের…. সব কি আর এমনি এমনিই… পাগল!

 

(ছবিঃ Suman Das)

Monday, February 6, 2023

খিচুড়ি পায়েস আর চাঁদের আলো

 


মেলায় চারদিকে দেখি কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। উঁহু, বইমেলা নয়, গাজীর মেলা। চারদিকে ধানক্ষেত। মাঝে গাজীবাবার সমাধি। তারপাশে বিরাট প্রকাণ্ড এক গাছ। চারদিক থেকে ক্ষেতের আল দিয়ে, ক্ষেতের সব্জী তছনছ করে, ক্ষেতের সরু তারের বেড়া দুমড়ে মুচড়ে সার দিয়ে লোক যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে কেউ যাচ্ছে না। শর্টকাট হল আলের পথ। ফুলকপিগুলো ছড়িয়ে এদিক ওদিক। জায়গা? ওই কল্যাণী আর মদনপুরের মাঝে।

মেলায় নানারকমের খাদ্যসামগ্রী। মানুষ খাচ্ছে। ওদিকে গাজীবাবার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধায় খিচুড়ি আর পায়েস দেওয়া হচ্ছে। বিনা পয়সায়। যে যা হাতের কাছে পাচ্ছে, তাতে করেই সে সব নিচ্ছে, খাচ্ছে, আবার যাচ্ছে। বাবার দরগার উপর বসে, কেউ মাটিতে দাঁড়িয়ে দরগায় খিচুড়ি, পায়েস রেখে খেয়ে যাচ্ছে। ওদিকে দরগায় লাইন দিয়ে মানুষ আসছে, মুড়ি আর ফুল ছোটো ছোটো মাটির সরায় করে নিয়ে আসছে। শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। একজন আলখাল্লা পরা মানুষ তাদের সবার মাথায় চামর দিয়ে বুলিয়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যে হল। মাইকে ঘোষণা চলছে, কেউ বাঁশি বাজাবেন না দরগায়। আল ধরে যারা আসছেন সাবধানে আসবেন, পড়ে যাবেন না।

বাঁশি? কাগজের বাঁশি। ছেলেরা ফুঁ দিলেই কান ফাটানো আওয়াজ। কে আর ঘোষণা শোনে। যে যার মত এন্তার সে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এইসবের মধ্যেও মাঘীপূর্ণিমার চাঁদ উঠল পুবদিকে। চারদিকে ধানক্ষেত মুহূর্তে সাদা ধবধবে হয়ে গেল। গাজীবাবার সমাধির কাছে এসে দাঁড়ালাম। কে ছিলেন ইনি, জানি না। চারদিকে হিন্দু-মুসলমান সব মিলিয়েই তো দেখছি। পুলিশ চারদিকে আছে। পরিবেশ শান্ত। বেশ হইহই হচ্ছে চারদিকে। আনন্দের হাট। মেলা যখন থাকে না। তখনও আনন্দের হাট। অন্য আনন্দ। শান্তির আনন্দ।চারদিক তখন জন কোলাহল মুক্ত। শুধু পাখির আওয়াজ। শ্যালোর আওয়াজ। আর মাঝে মাঝে দূর দিয়ে ট্রেন যাওয়া শব্দ। তখন শুধুই নির্জনতা। তার মধ্যে শান্ত গাজীবাবার দরগা।

মেলায় দুটো জিনিসই দেখলাম। এক খিদে। দুই, আলো। যে মানুষ মোমবাতি জ্বালছে, প্রদীপ জ্বালছে, সে-ই খিচুড়ি আর পায়েসও খাচ্ছে। মাটিতে উবু হয়ে, সাইকেলের ক্যারিয়ারে রেখে, হাতে ধরে। মা ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছে। ঠাকুমাকে নাতি খাইয়ে দিচ্ছে। এক বুড়ি চাঁদের আলোয় লাঠি হাতে ওই এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা দিয়ে মেলার দিকে এগোচ্ছে। তারও আলো চাই, চোখে। খাবার চাই পেটে। এখানে তর্ক নেই। হিংসা নেই। মতবিরোধ নেই। ভরা পেটে আলো নিভিয়ে দিলেই যত গোল। এ বলে আমি, ও বলে আমি। ব্যস, লেগে গেল কোন্দল।

মেলা থেকে একটু দূরে এসে দাঁড়ালাম। চাঁদের আলো ধানক্ষেতের উপর পড়েছে। চারদিকে তাকালে শুধু আকাশ আর আকাশ। এসব দেখতে কি ভুলে যাব আমরা? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম? এই যে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে "আমাকে দেখো… আমাকে দেখো" বাতিক আমাদের রক্তে ঢুকে পড়ছে, পরবর্তী প্রজন্মেতেও চারিয়ে যাচ্ছে। এতে কি হচ্ছে? আরো অসন্তোষ বাড়ছে। মানুষ নিজেকে দেখিয়ে আর নিজেকে নিয়ে মেতে কবে সুখ-শান্তি পেলো। সুখ-শান্তি তো নিজেকে ছাড়িয়ে গেলে। কিন্তু এই সোশ্যালমিডিয়াকে আহাম্মকের মত আমরা যে অর্থে ব্যবহার করছি, সে তো খালি একপেশে। এতে সুখশান্তি কোথায়?

সুখ মানে, পেটে খিচুড়ি পায়েস, শান্তি মানে, আলো। বাকি যা তো মানুষ বানিয়েই নেয়। অশিক্ষা আর প্রাচুর্যের সমন্বয় পরমাণু বোমার চাইতেও ভয়ঙ্কর। গাজীবাবা এত এত মানুষকে ডেকেছেন। আজও ডাকছেন। বড়রা ডাকেন। নি:শব্দে ডাকেন। কানে কানে বলেন, ক্রমে তুমি শুধরে নেবে নিজেকে, আরো ভালো হবে, আরো ভদ্র হবে। এইটুকুই তো ধর্ম। ভালো হও, ভদ্র হও। একটু বুঝদার হও। হৃদয় দিয়ে বোঝো। দেখো সব সোজা। চাঁদের আলোর মত সোজা। সফেদ। আনন্দময়। বিষাদ কই?











Tuesday, January 31, 2023

শান্তিনিকেতন, আর মা তারা এক্সপ্রেস

তিনি মানুষ নন, তিনি মানুষ হয়ে আসেন।

টোটো এসে দাঁড়ালো শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীতে। বাড়ির নাম "ধ্রুবতারা"। আপাতত দু'দিনের জন্য এই আমার বাসা।

একটু পরে দেখা হবে অবসরপ্রাপ্ত বিশ্বভারতীর একজন বরিষ্ঠ চিত্রগ্রাহক, শ্রদ্ধেয় সমীরণ নন্দী'র সঙ্গে। তাঁর ছুটি শুধু প্রতিষ্ঠান থেকে হয়েছে, ছবি তোলা থেকে কি করে হবে? সে তো তাঁর অস্তিত্বের প্রাণকেন্দ্র। তাঁকে জানিয়েছি, আসছি। শুধু অনেকগুলো বছর পর আসছি তাই নয়, একটা যুগের মহামারী পেরিয়ে আসছি। বেঁচে আছি এখনও, আজও, এ-ই আজ অনেক বড় কথা।

পরকে আপন করিবার শক্তি থাকা চাই, গুরুদেব লিখেছিলেন। সে শক্তি না থাকলে অপেক্ষা কিসের? দাদা এলেন। আলিঙ্গনাবদ্ধ হলাম। গল্প হল। তারপর শুরু হল হাঁটা। বাড়ির পর বাড়ি। এই ভাঙা বাড়ি, একদিন এই বাড়িতে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। এই সাজানো বাড়ি, এইখানে ছিলেন নীলিমা সেন। গল্প হতে হতে, এগোতে এগোতে এসে পড়লাম কিংবদন্তী মানুষ, শ্রদ্ধেয় সুনীতি পাঠকের বাড়ির দরজায়। ঢুকব? স্পর্ধা হবে না! সমীরণদাকে স্নেহ করেন। সেটুকু প্রশ্রয়ে পায়ের কাছে বসা যাবে না?

সমীরণদা জানলায় মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, দাদা আছেন….

ভিতর থেকে স্নেহসিক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, আরে সমীরণ, তোমার কথাই হচ্ছিল... এসো এসো….

আর কি। এই তো দরজা খুলে গেছে। এই তো সেই বৌদ্ধশাস্ত্র মন্থনকারী ধী। সমীরণদা পরিচয় করিয়ে দিলেন। দরকার ছিল না। সমীরণদার পিছনে পিছনে এসেছি মানেই আমিও তাঁর আপনজন। প্রণাম করতেই মাথাটা টেনে নিয়ে নিজের মাথার সঙ্গে ঠেকিয়ে নিলেন। বসলাম পায়ের কাছে। কি কথা বলব? ছেঁড়া ছেঁড়া কথা হল। কথা হাতড়ালাম। নেই। ভাষা স্তব্ধ।

ফিরে এলাম। এবার একা একা ঘোরার পালা। দাদার সঙ্গে সাক্ষাৎ আবার কাল।

=========

খোয়াইয়ের হাট বসেছে। গাড়ির পর গাড়ি ঢুকছে। কেউ ছবি আঁকছে, বিক্রি করছে। কেউ কাপড় জামায় নানা ছবি এঁকে, কল্কা এঁকে বিক্রি করছে। কত সাজসরঞ্জাম। ওদিকে সাঁওতাল নাচ হচ্ছে। মোবাইল ক্যামেরা, এমনি ক্যামেরা তাক করে শয়ে শয়ে। আমি কোথায় যাই?

আমি বরং হাঁটি। এখন শান্তিনিকেতনে অনেক শাসন। এখানে সেখানে লাল ফিতে, এদিকে সেদিকে দরজা বন্ধ। ছাতিমতলা, ওই যে দূরে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখো। তাই দেখি। মিউজিয়াম আছে। তাও দেখেছি। বুদ্ধি উত্তেজিত হয়েছে, বিস্মিত হয়েছে। কিন্তু হৃদয়? সে হাঁটবে। তাই তো রাস্তায়। যে রাস্তায় মহাজন হেঁটে গেছেন সে রাস্তায়।

চওড়া রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। গতকালের কথা মনে পড়ছে। এই সময় ছিলাম জয়রামবাটি, কামারপুকুরের মাটিতে। সেখানেও হেঁটেছি। রাস্তার ধুলো, গাছপালা, আকাশ সব স্পর্শ করেছি। কল্পনায়।

তিনি তো সচ্চিদানন্দ, সৎ-চেতনা-আনন্দ, তিনি তো মানুষ নন, কিন্তু তিনি মানুষ হয়ে আসেন। যেমন মল্লার কখনও রবিশঙ্করের সেতারে, কিম্বা কিশোরী আমোনকরের কণ্ঠে নেমে আসে, তেমন।

রামকৃষ্ণদেবের নতুন শাস্ত্র, মানবী শাস্ত্র। তিনি সব হয়েছেন বটে, তবে যেখানে "তিনি আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি", সেখানে তিনি বিশেষ করে হয়েছেন, আমার আনন্দের জন্য এসেছেন। গোটা জয়রামবাটি কেন, গোটা বিশ্বকেই ছাতিমতলা করে নিতে পারে যে ভালোবাসা, সে ভালোবাসাই মা সারদা। জয়রামবাটি কামারপুকুরের মাটি, যেখানে হেঁটেছেন, অপেক্ষা করেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন, কেঁদেছেন পুত্রহারা মায়ের সঙ্গে, হেসেছেন বাচ্চা মেয়েটির মত। বারবার বলেছেন, দোষের উপর দোষ সাজিয়ে চারদিকে পাঁচিল না তুলে দিতে। ভালোটা দেখতে, ভালোটা খুঁজতে, ভালোটা করতে। ভালো মানে কি? এই ধুলো।

মোহরদির বাড়ি ঘুরে এলাম। সেখানে একটা বড় কিছু করার পরিকল্পনা চলছে দেখে এলাম। ভালো লাগল। হারিয়ে যেতে দেবো কেন? "তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব, ছেড়ে দেব না"। মোহরদির বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যুগ যুগ এখানেই তো দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই তো সেই ঝরণাতলা। যেখানে আজীবন বসে আছি। স্নাত হচ্ছি। প্রতিটা রোমকূপে প্রবেশ করে যাচ্ছে গীতবিতান। সঞ্জীবনী।

=======

সন্ধ্যায় এক বন্ধুর বাড়ি গেলাম। বোলপুর। ব্যস্ত শহর। এই প্রথম এলাম। কে বলবে এই প্রথম এলাম! যেন কতবার এসেছি। বন্ধু, আত্মীয়, সুহৃদ।

ফিরে আবার সেই শান্ত ডেরায়। নিঝুম চারদিক। শান্ত। খেয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। একটু হাঁটা যেতেই পারে। মন শান্ত বসন্তের পাতার মত বুকের উপর পড়ে। উদাসীন।

কি চাই? এমন কিছু যেখানে আমার মস্তিষ্ক আর হৃদয় দুই-ই এক হয়ে যায়। এমন এক দীঘি। যেখানে ডুবলে কোনো দ্বন্দ্ব নেই আর। যেখানে মস্তিষ্ক আর হৃদয় এক হয়ে যায় সেখানেই তো মুক্তি। অমৃত। আনন্দ। সেখানে যাই কিসে। কিভাবে?

রাত ভোর হল। সারাটা সকাল দাদার সঙ্গে ঘুরে বেড়ালাম। কথা শুনলাম। কাজ দেখলাম। কিভাবে ছবি, ছবি তোলার মানুষ এক হয়ে যায়, দেখলাম। গাছের পাতা, ফুল, সাঁওতাল মানুষ, বাচ্চা-বুড়ো সবার সঙ্গে আলাপ তাঁর। এমনকি জঙ্গলের বুকে গোপন কথার মত জেগে থাকা লাল দগদগে সূর্যশিশির অবধি তাঁর চোখ এড়ায় কই? দাদাকে প্রণাম জানিয়ে হোমস্টেতে ফিরলাম।

এবার ফিরব।

=======

ফেরার কোনো গল্প হয় না। তবু হয়ে যায় কখনও। মা তারা এক্সপ্রেস। ভিড় ভীষণ। রিজার্ভেশান নেই। দাঁড়ালাম কোনোরকমে। ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে বোলপুর।

হঠাৎ এক মহিলার চীৎকার শুনে ফিরে তাকালাম। বয়েস বছর পঁচিশেক হবে। কপালে অনেকের মত তারও তারাপীঠের সিঁদুর। সে চীৎকার করে বলছে, আমার মেয়ের মধ্যে মা তারা আছে… তোকে ঠিক দেখে নেবে…. ওকে কাড়বি!...

আমার সামনে বসে ছ'জন যুবক। তারা গত রাতে তারাপীঠে খাওয়া মদের আসরের গল্প বলছে। কে খেয়ে লাট হয়েছিল… কার হিসু দিয়ে এখনও মদ বেরোচ্ছে… এই সব আলোচনা, হাসি-মজা চলছে।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরা একজন মাঝবয়েসী মানুষ। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি অবস্থা না?

দেখলাম তার কপালেও সিঁদুর। বললাম, আপনিও কি তারাপীঠ থেকে ফিরছেন?

উনি বললেন, হ্যাঁ, এই রটন্তী কালীপুজোতে আসি, সপরিবার।

দেখলাম একজন মহিলা আর একটা বাচ্চা বসে, ঘুমাচ্ছে।

বললাম, পরিবেশ?

মা যাকে যেমন রুচি দিয়েছেন…

মা তারা… একটু সরে দাঁড়াবেন?

সেই মহিলা। কানে ফোন। অনর্গল শাপশাপান্ত করতে করতে টয়লেটের দিকে এগোতে লাগলেন।

মনে মনে বললাম, এই ভালো, যা মনে থাকে বেরিয়ে যাওয়াই ভালো… দিক শাপ…একদিন তো থামবে… অনেক শাপশাপান্ত, অভিযোগ, ষড়যন্ত্র করার পর কোথাও গিয়ে একজন মানুষ হয় তো ক্লান্ত হয়। থামে। বোঝে এ সব না করলেও হয় তো বা হত। ভালোই হত।

একজন বৃদ্ধ নাতিকে নিয়ে এগিয়ে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এই ট্রেন কি নৈহাটি দিয়ে শিয়ালদা যাবে? ওখান থেকে হাওড়ার বাস পাব?

সে এসেছে বিহার থেকে। দূরে বৃদ্ধা স্ত্রী বসে। অসুস্থ। স্বপ্নে মা ডেকেছেন। ঠিক হয়ে যাবে মায়ের কাছে এলে। দুটো চোখে এত বিশ্বাস। এত যন্ত্রণা। বললাম, ডাক্তার দেখাচ্ছ? কি হয়েছে?

শুনে বুঝলাম, হাঁপানি। চিকিৎসা চলছে। বললাম, পুজো দেওয়া হল?

উদ্ভাসিত চোখে বলল, হাঁ দাদা।

মেয়েটা ফিরছে। চোখ মুছতে মুছতে। চোখের কাজল ঘেঁটে গেছে। সিঁদুর থেবড়ে গেছে। চুলগুলো এলোমেলো। সবাই রাস্তা করে দিল।

সে সিটে এসে বসল। মাথাটা নীচু করে দিল। তার সারা শরীর কাঁপছে। ডবলু এপি সেভেন ইঞ্জিনের টানে না, কাঁপছে হৃদয় নামক বিচিত্র ইঞ্জিনের ধাক্কায়। মানুষের জীবনে হৃদয়ের চাইতে বেইমান আর কে আছে?

কখন বর্ধমান পেরিয়ে গেছে খেয়াল করিনি। যুবকদের মধ্যে একজন ডেকে বলল, কাকু বসুন… অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে….

সে উঠে দাঁড়ালো। আমার সঙ্কোচ লাগল। তাকে দাঁড় করিয়ে বসব।

একটু জায়গা দেবেন?

দেখলাম একজন বাইশ-তেইশ বছরের মেয়ে। পরিপাটি সাজ। যত্ন করে টানা ভুরু।

সরে দাঁড়ালাম।

খুব স্মার্টলি বলল, ওটুকু জায়গায় তো হবে না….

ঠোঁটে হাসিটা দুষ্টুমির। কে হে তুমি, এমন বিব্রত করো! অগত্যা বসে পড়লাম। যুবককে ঠেলে সে তরুণী এগোতে এগোতে বলল, আসছি এখনি… জ্যাম করে রেখো না আবার….

ট্রেন ব্যাণ্ডেলে ঢুকবে। লম্বা লাইন তৈরি হয়ে গেল। সেই লাস্যময়ী তরুণী একটা বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে। তার সামনে একজন মহিলা। তার দিদিই মনে হল।

দিদি বলল, ঘুমিয়ে পড়ল? দেখবি?

সে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ন্যাকামি কোরো না তো….. এটাও ন্যাকা হবে…. জামাইবাবু যেমন ছিল…..

তার দিদির মুখটা ফ্যাকাসে হল মুহূর্তে। যেন কি বলতে গিয়েও গিলে ফেলল।

ছিল?! ভালো করে তাকালাম। শাঁখাসিঁদুর তো নেই।

ট্রেন দাঁড়ালো। সবাই নামছে।

যে মেয়েটা খুব চেঁচাচ্ছিল, সেও একটা পিঠব্যাগ নিয়ে এগোচ্ছে। কি ক্লান্তি সে এগোনোতে।

ট্রেন ছাড়ল। বৃদ্ধ বিহারি এগিয়ে এসে বললেন, আমায় শিয়ালদার থেকে হাওড়ার বাসে তুলে দিবেন?

কিন্তু আমি তো নৈহাটি নেমে যাব।

সে বিহ্বল হয়ে তাকালো। ট্রেন ফাঁকা। সেই পায়জামা পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এসে বললেন, আমি যাব… আমি তুলে দেব।

ট্রেন গঙ্গা পার হচ্ছে। চারদিক অন্ধকার নেমে আসছে। আমি জিজ্ঞাসা করছি গঙ্গাকে, কোথাও কি সান্ত্বনা আছে?

বৃদ্ধা ক্লান্ত মাথাটা বৃদ্ধের কাঁধে এলিয়ে। ঘুমাচ্ছেন। তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে নাতি। সেও ঘুমাচ্ছে। জেগে আছে বৃদ্ধ। ভালোবাসা।

এবার নামব আমি। ট্রেন নৈহাটি ঢুকল যে।

 


Sunday, January 29, 2023

তারকেশ্বর

সে ভালোবাসা জাগলে পাঁচিল ভাঙে। সংসার ভেসে যায়। এদিকটা আমার, এরা আমার, ওদিকটা তোমার, ওরা তোমার… বলার লোক কই? গুটি কেটে প্রজাপতি উড়ে গেছে…. ওই….

শেওড়াফুলি ট্রেন ঢুকল। শীতের আবেশে ঘুম কাটছে না। চাদরে, মাফলারে জড়িয়ে-মড়িয়ে বন্ধ চোখ এদিক ওদিক। ভিড় বেশি নেই।

চা খাওয়াবা?

সংসার ছাড়লে কেন?

খাটের থেকে পাখা, মাঝে মানুষটা, ঝুলছে, খাটের থেকে পা এই চার আঙুল ফাঁক…. তাকান… এই… এই চার আঙুল…..

কি হয়েছিল?

জায়ের সঙ্গে ঝগড়া…. বিধবা ছিল বৌদি…. এটা-ওটা নিয়ে লেগেই থাকত….ও বলত বৌদি ওকে মন্ত্র পড়ে বাঁজা করেছে….

শোকে ছাড়লে….. ওটি কে?

তারা…. ওরও কেউ নেই…. ছেলে খেদিয়েছে…..

তাই গেরুয়া…..

পেট…. বড় বালাই… মনে দেওয়াল নেই…দেওয়াল তুলি সে ইচ্ছাও নাই… তারা আর আমি ভাসতে ভাসতে পাশে এলাম… বাবার ইচ্ছাই হবে…. লীলা…. চললাম…. বাঁধাবাঁধি নেই….

এও কি ভালোবাসা?

হ্যাঁ গো…. শোকের বুকে এক ভালোবাসা জন্মায়…শোক পিচুটি কাটায়… সংসার বিবাদ, দ্বন্দ্ব আর বিষাদের ছই দেওয়া…. ছায়া হয়ে থাকে… আলো নেই…. এই ভালোবাসা আলো না হলে জন্মায় না….

======

স্টেশানে ট্রেন ঢুকল। তারকেশ্বর। নামতেই ধুতি পরা কয়েকজন এগিয়ে এলো। আসুন আসুন… বাড়ি আছে… ঘর আছে… সব রেখে মন্দিরে যাবেন… পুজো দিয়ে নিয়ে আসব…. ঘরের ভাড়া লাগবে না….

আমাকে কাউকে বাছতে হল না। একজন নিজেই বেছে নিল। বলল, আসুন। কোঁকড়া চুল। বয়েস তিরিশের ঘরে। রোগা ছিপছিপে শরীর। আসুন…, বলে সেই যে হাঁটা লাগালো আর পিছনে তাকানো নয়…. চলছে আর চলছে…. গলি রাস্তা দোকানপাট পেরিয়ে চলেছি। ধর্মস্থান। তীর্থ। ইতিহাস জিজ্ঞাসা করো কেন? সব তো জীবন্ত। রাস্তাঘাট, বাড়ি-ঘরদোর, ল্যাম্পপোস্ট, খেলার মাঠ --- সব জীবন্ত।

কত টাকার পুজো দেবেন?

পুজো তো দেব না। জুতো রাখব। মন্দিরে যাব।

ও… আসুন তবে… কিন্তু বাবার জায়গা…. কিছু তো দিতে হয়… বাড়ির লোকের কল্যাণের জন্য…

কেউ নেই…. চলুন….

দাঁড়ান আর কয়েকটা পার্টি আসুক।

বসলাম। সামনে কয়েকটা কুকুর। দোকানে দোকানে ভিড় জমছে। জুতো রাখছে। ডালা বাছা হচ্ছে। একুশ… একান্ন… একশো এক…. পাঁচশো এক…. চুল দেবেন?.... তবে তো আটশো…..

দরদাম হল। জনা দশেক মানুষ। অবাঙালি। আমি এলেবেলে।

আসুন দুধপুকুরে….

জলে নামুন। কেউ মোজা খুলছে। কেউ জুতো। কেউ পায়ের প্যাণ্ট গোটাচ্ছে।

আসুন…. লাইন করে আসুন…

জলে জলে পিচ্ছিল রাস্তা। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। অবাঙালি দলের লোকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। বাচ্চার মানতের জন্য এসেছে সব। দাদু-দিদা, ঠাকুমা-ঠাকুর্দা, মা-বাবা, খুব সম্ভবত মাসি-মেসো। বাচ্চাটা বাবার কোলে।

আসুন আসুন…. সামনেই স্নানের জায়গা….

সোজা গিয়ে বাঁদিকে স্নানের ঘাট। পাণ্ডা ছেলেটা বলল, নিন নিন… স্নান করে নিন… তাড়াতাড়ি... একটু পর আরতি… তারপর পুজো…. মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে…. তাড়াতাড়ি…

আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি তো স্নান করবেন না…. যান মন্দিরের দিকে যান…. প্রণামী যা দেবেন আমার হাতে দেবেন…. নাম কি? সেকি! ব্রাহ্মণ তো…. গোত্র?

======

মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কাশীর বিশ্বেশ্বর, নাসিকের ত্র‍্যম্বকেশ্বর, দেওঘরের বৈদ্যনাথধাম যাওয়া হয়েছে। বাড়ির কাছেই আসা হয় না। ভিড় করে সামনে দাঁড়াচ্ছে ভক্তেরা। বেশিরভাগ মানুষই এই ঠাণ্ডায় স্নান করে ভিজে কাপড়ে। কাশীতে যেমন "হর হর মহাদেব" বলে মাঝে মাঝেই হুঙ্কার দেওয়া হয়, এখানে তেমন কিছু কানে আসছে না। পূজারি আরতির সরঞ্জাম সাজাচ্ছেন। আমার পিছনের দিকে নাটমন্দির মনে হল। সেখানে শিঙ্গা, ঢাক, কাঁসর, ডম্বরু নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল কয়েকজন। কয়েকজন পূজারি মন্দিরের সামনে রক্ষীর মত দাঁড়িয়ে। তাদের হাতেই কেউ কেউ প্রণামী দিচ্ছেন। তারা মন্দিরের ভিতরে গিয়ে পুজো দিয়ে ফুল নিয়ে বাইরে আসছেন, হাতে দিচ্ছেন, চোখের বন্ধ পাতার উপরে, কপালে জলে ভেজা আঙুল ছুঁইয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, প্রণামী দাও... এটা পুজোর পারিশ্রমিক। কেউ কেউ মালা হাতে ঘুরছেন। মালা পরাও বাবাকে। এই নাও। হাত পেতে মালা নাও। পুরোহিতকে দাও, উনিই পরিয়ে দেবেন।

=======

আরতি শুরু হল। সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক সাধু এসে দাঁড়ালো সামনে। সারা গা ছাই মাখা। এত এত মানুষ কারুর দিকে তাকালেন না। তাকালেন মন্দিরের গর্ভগৃহে। আমার পিছনে, নাটমন্দির থেকে ঢাক কাসর শিঙ্গা ডম্বরু বাজছে। মন্দিরের সামনে ঘন্টা বাজাচ্ছেন দু'জন পূজারী।

ভাব কি? আবেগের এক তুঙ্গ অবস্থা। ভীষণ একাগ্র। চোখে জল আসে। মনের সব স্থূল অনুভব সে আবেগে, চোখের জলে কিছুক্ষণের জন্য নিস্তেজ। যেন কোনো দুঃখ নেই, শোক নেই, ক্ষোভ নেই। সব পরিপূর্ণ আনন্দময়। সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম আমার সেই ট্রেনের সহযাত্রী দু'জন। চোখ বন্ধ। দু'জনের চোখেই জল। 'সংসার-দুঃখগহন জগদীশ রক্ষ।' আর্তি। আকুলতা। রক্ষা করো… রক্ষা করো….। কি আশ্চর্য, একই ধর্মের দর্শন বলছে, রক্ষা করার কিচ্ছু নেই.. তুমিই সেই অজেয়, অমর, অদাহ্য, অবধ্য সনাতন আত্মা। ভয় কিসের? আবার সেই ধর্মেই সেই দর্শনের গাতা শঙ্করাচার্য গাইছেন 'ভজ গোবিন্দম…"... ব্যাকরণ তোমায় রক্ষা করবে নাগতিস্ত্বং গতিস্ত্বং ত্বমেকা ভবানি।।'…. জগদীশ রক্ষ…. মহাপ্রভু দু'হাত আকাশে তুলে নীলাচলের তীরে ছুটছেন…. রাম রাঘব, রাম রাঘব, রাম রাঘব রক্ষমাং….. রক্ষা করো..    

কিসের থেকে রক্ষা? মৃত্যু? না। পাপের থেকে রক্ষা করো। দুঃখের থেকে রক্ষা করো। দুর্গতি থেকে রক্ষা করো। যুক্তি নির্ভুল নয়। আবেগ নির্ভুল নয়। অনুভব নির্ভুল নয়। বিশ্বাস নির্ভুল নয়। বোধ নির্ভুল নয়। কিচ্ছু ধ্রুব নয়। সব সরে সরে যাচ্ছে। আমার ক্ষমতা কতটুকু? ওগো জগদীশ্বর… তুমি তরিয়ে দাও…. তুমি তারকেশ্বর…. তুমি ডাকো আমায়… আমার সব ভুল…. সব সব সব…. আমায় এত এত ভুলের থেকে রক্ষা করো…. আমায় অসত্য থেকে সত্যে নিয়ে যাও…. কি সত্য? যে সত্য তুমি। যে সত্যে আমি ঢেউ, তুমি সাগর। যে সত্যে আমি খণ্ডকাল, তুমি মহাকাল। যে সত্যে আমি চঞ্চল, অধ্রুব, শোকতাপে জর্জরিত, তুমি স্থির, চিরপ্রশান্ত, আনন্দময়।

=======

আরতি শেষ। খানিকক্ষণের জন্য সব কিছু জীবন্ত হয়ে গিয়েছিল। মন্দিরের দেওয়াল, মেঝে, পাঁচিল, লোহার গারদ --- সব। সব জীবন্ত। এই ক্ষণস্থায়ী আবেগ কি সে-ই ভালোবাসা? যার কথা সহযাত্রী বলছিল। ভালোবাসায় কি সব জীবন্ত হয়? ভয়েও তো হয়। নইলে রজ্জুতে সর্পভ্রম হয় কেন?

আবেগ স্তিমিত হল। পাণ্ডার পাওনা মিটিয়ে ফিরছি। আবার মুখোমুখি হলাম সেই সহযাত্রীদের। মহিলার মাথা যতবার দেখেছি ঘোমটায় ঢাকা। এবার দেখলাম মুখটা। বলিরেখায় ভরা মুখ। দৃষ্টিতে এক উদাসীনতা। যেন গোটা জগতকে স্বেচ্ছায় প্রশ্রয় দিয়েছে তাকে দুঃখ দেওয়ার। চাইলেই সব ছেড়ে যেতে পারে। আমায় বলল, সামনেই আমাদের চটি…. দুপুরে দুটো খেয়ে যান…. ব্রাহ্মণের শরীর শুনলাম…. আমরাও প্রসাদ পাই…..

ফেরার তাড়া আছে। ইচ্ছা আছে একটু কামারপুকুর যাই। আসা তো হয় না। সময় কম। যতটা ঘুরে যাওয়া যায়।

মহিলা এমন তাকিয়ে যেন আমার এই সব উত্তরগুলো আগে থেকেই জানা ছিল। চাইলেই আমি যেতে পারি, তবু যাচ্ছি না। আমার সঙ্কোচ। কিসের সঙ্কোচ জানি না। শিক্ষা? সংস্কার? সামাজিক পার্থক্য? রুচি? যাই কারণ হোক সেটা যে উদার নয় তার জন্য বৃথা তর্ক লাগে না।

বলল, তবে আসুন…. তবে আবার যদি আসেন… ওনার নামটা বললেই হবে….

কি নাম?

পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠল, সুশীলের চটি বললেই হবে…..

আচ্ছা, বলে হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে ফিরেছি…. মহিলা বললেন, কিছু খেয়ে নেবেন…. বেলা হয়েছে….

চোখটা, নাকটা চড়চড় করে উঠল। গলায় কি যেন আছে। আবার ফিরে তাকালাম, হাসলাম। বললাম, বেশ, স্টেশানে খেয়ে নেব।

স্টেশানে এলাম। গোঘাট লোকাল দেরি আছে মিনিট কুড়ি। চপ আর মুড়ি কিনে এনেছিলাম। তাই নিয়ে বসলাম। আমার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজন পাণ্ডা। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি গায়ে। হাওড়া থেকে আসা তারকেশ্বর লোকাল ঢুকল। ভিড় নামছে। দৌড়ে গেল পাণ্ডারা। দুই সত্য। জ্ঞানও সত্য, খিদেও সত্য। অসীমও সত্য, সসীমও সত্য। একের দোরে এসে আরেক নিত্য দাঁড়ায়। অন্নপূর্ণার সামনে মহাকাল তাই আসেন ভিক্ষাপাত্র নিয়ে। এই নিয়েই জীবন। এই নিয়েই তো সবটুকু। রামকৃষ্ণদেবের ভাষায় বেলের বিচি, খোল সব নিয়েই বেল। শুধু শাঁসটুকু নেব বললে হয়?

Sunday, September 18, 2022

"আও"



মঙ্গলের উপর আস্থা হয় তো মানুষের একসঙ্গে থাকার প্রাথমিক আস্থা। এত অমঙ্গল, এত ক্ষয়ক্ষতির পরও মানুষ বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে, ভালো হবে। অবশেষে সব ঠিক হয়ে যাবে। এ বিশ্বাস হারিয়ে যাওয়া মানে মানসিক অসুস্থতার দিকে চলে যাওয়া। অবসাদ, বিষাদ। সে সব মানে অবশেষে আস্থা হারানো জীবনে।

এই মঙ্গলের উপর আস্থায় মানুষ মনে মনে এক মঙ্গলময়ের মানবিক রূপের ছবি আঁকে। সে ছবি এতটাই প্রবল যে এতবড় একটা অতিমারিও তাকে ম্লান করতে পারেনি। ক'দিন আগে পড়ছিলাম এবারে নানা ধর্মস্থানে মানুষের ভিড় রেকর্ড সংখ্যা ছাড়িয়েছে।

না, এত লক্ষকোটি মানুষের আস্থাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেব, এতটা স্পর্ধা আমার নেই। একি পরীক্ষিত সত্য? অবশ্যই নয়। তবু এ কল্পনার সত্য। মঙ্গলের প্রতি আস্থাটুকু হারালে তো সবই হারালো। আর কিসে যে মানুষের মঙ্গল সে উত্তর নিশ্চিতভাবে কার কাছেই বা আছে? নেই যখন তখন অন্যের শ্রদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা রাখাকেই শ্রেয় বলে মনে হয়।

আজ গঙ্গার ঘাটে এসে জানলাম আজ 'জিতিয়া'। বিহার, উত্তর প্রদেশের উৎসব এটা। মায়েরা উপোস থাকেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়। নানা উপাচার নিয়ে খালি পায়ে আসেন নদীর তীরে পুজোর জন্যে। সন্তানের মঙ্গলের জন্য।

এর কি ইতিহাস সে গল্প থাক। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে যা অনুভব করছিলাম তা এক নম্র শ্রদ্ধা। কোথাও কোনো উদ্ধতভাব নেই। মা সন্তানকে ভিড়ের মধ্যে বসে স্তনপান করাতে করাতে ব্রতকথা শুনছেন। ছোটো ছোটো হাতপাখা নিয়ে বাচ্চাদের মাথায় হাওয়া দিচ্ছেন। মোবাইলে ছবি উঠছে। সেল্ফি উঠছে। গান হচ্ছে একসঙ্গে।

পিচের রাস্তার উপর সার দেওয়া খালি পা। খালি পা আমাদের সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর উপায়। মন্দিরে খালি পায়ে ঢুকতে হয়। পৃথিবী তখন সেই মুহূর্তে পবিত্র। রোগশোক, ভয়, দুঃখ --- সব আছে। কিন্তু সবার উপর আছে আমার সে সব মাড়িয়ে যাওয়ার তৃষ্ণা। আমার সে সব মাড়িয়ে এগোবার স্পৃহা। এ কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। পারবেও না। নইলে এত এত ভয়ংকর উগ্রপন্থীর হামলার পরেও মানুষ রাস্তায় নামত না। যদি বলো সে কাজের তাগিদে? তবে বিনোদনের জায়গাগুলোয় এত মানুষ কেন? না, মানুষ কোনো সিসিটিভি-র ভরসায়, হাজার একটা নানা উপায়ের সিকিউরিটি চেক ইত্যাদির ভরসায় বাইরে বেরোয় না। মানুষ অদম্য বলেই বাইরে বেরোয়। ভয় মানুষকে চিরকালের জন্য দমিয়ে রাখতে পারে না বলেই মরণশীল মানুষ অমর আত্মার কল্পনার স্পর্ধা দেখায়। নইলে মানুষই তো একমাত্র প্রাণী যে জ্ঞান হওয়া থেকেই জানে সে মরণশীল। ভয়ে কুঁকড়ে বাঁচে না কেন সে? কারণ মানুষের আত্মায় চিরকালই ভীরুতার উপর এক তীব্র ঘৃণা আছে, 'না' আছে।

মানুষ বিশ্বাসে হাঁটে, যুক্তিতে ভাবে, ভালোবাসায় আর ভয়ে কল্পনা করে। সে ভাবনাকে করার দিকে এগিয়ে দিতে বিশ্বাসের হাত ধরতে লাগে। মানুষের পবিত্রতম বিশ্বাস, মঙ্গলের উপর আস্থা। একজন ঠাকুমা নাতির হাত ধরে কাঁপতে কাঁপতে উঠছেন সিঁড়ি দিয়ে। মাথা ভিজে। গঙ্গা স্নান করেছেন। নাতির বয়েস দশ পেরোয়নি। কিন্তু ঠাকুমা সে-ই হাতেই তাঁর আস্থা রেখে উঠছেন। আমি একটু উপরে দাঁড়িয়ে। আমার থেকে দুটো সিঁড়ি আগে একবার মনে হল মাথাটা ঘুরে গেল ওনার। পাশের দেওয়াল ধরে দাঁড়ালেন। ক্ষণিকের জন্যে চোখ বন্ধ করেই আবার খুললেন। আমার চোখে চোখ পড়ল। হাসলেন। কি অপূর্ব সে হাসি। ওনার মাথার পিছনে গঙ্গার ওইপারে সূর্য ডুবছে। ওনার জীবনও পশ্চিমের দিকে ঢলে। জীবন যে সচ্ছল ছিল না, আজও নেই সে ছাপ স্পষ্ট।

আমি এগিয়ে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলাম, ঠিক আছেন?

উনি একগাল হেসে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছি।

হাতটা এগিয়ে বললাম, উঠে আসুন।

উনি আরেকবার হেসে, উদ্বিগ্ন খুদে মুখটার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যে নাতি আছে।

নাতি আবার তার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে ঠাকুমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, আও।

আমার সামনের সব কিছু মুহূর্তে ঝাপসা হল। "আও"-এ আস্থার ডাক। বিশ্বাসের ডাক। ভালোবাসার ডাক।

মানুষের যুক্তি, বিশ্বাস, কল্পনা সব থাকুক, ভালোবাসার হাত ধরে। ভালোবাসা না থাকলে বিজ্ঞানও কুসংস্কারের মতই ধ্বংসাত্মক। মঙ্গলের তৃষ্ণা না থাকলে সত্যও তথ্যের প্রাচীরে আবদ্ধ হয়ে অচল। আমার আভূমি প্রণাম মানুষের সমস্ত মঙ্গলের ইচ্ছায়, যেখানে মানুষ হাত বাড়িয়ে বলছে, "আও"।