Showing posts with label গোঁসাই. Show all posts
Showing posts with label গোঁসাই. Show all posts

Tuesday, November 14, 2023

ভাবি বুঝি আমায় ছুঁলে

     ব্যাথায় না বাজলে, ব্যথা বোঝা যায় না। 

    গোঁসাই স্টেশানের একদম প্রান্তে বসে। অন্ধকারে। রাত হয়েছে। ফাঁকা স্টেশান। গ্রামের স্টেশান। স্টেশানের নামের উপর পাশের বটগাছের ছায়া দুলছে। আকাশ ভর্তি জুঁইফুলের মত মালা, তারার মালা। গোঁসাইয়ের পাশে বসলে এক সুগন্ধ আসে। শান্তির সুবাস। ভালোবাসার সুগন্ধ। 

    একতারাটা পাশে রাখা। ওই তারেতেই গোঁসাইয়ের প্রাণের সুর বাঁধা। গোঁসাইয়ের আঙুলের টানে তারে টান পড়ে। একতারা বেজে ওঠে। গোঁসাইয়ের গলায় পদাবলী জেগে ওঠে। 

    গোঁসাই বলল, দেখো, সুখ বড় বেদরদী। ব্যথা দরদী। কেমন ব্যথা বলো তো ক্ষ্যাপা….যে ব্যথায় অবগাহন করা যায় সেইরকম ব্যথা। যে ব্যথায় পায়ের পাতা ডোবে, কি হাঁটু, কোমর ডোবে সে ব্যথা নয়। যে ব্যথায় ডুব দিয়ে তল পাওয়া যায় না, সেই ব্যথা। সে ব্যথা মানুষকে দরদী করে। তাই রাধা বলেছিল কৃষ্ণ তোদের মুখের কথা, কৃষ্ণ আমার অন্তরের ব্যথা। আমার ব্যথাই আমার গোবিন্দ। গানে শুনেছ না?... “পরাণে লাগলে ব্যথা ভাবি বুঝি আমায় ছুঁলে, বধূ আমার”.....  দুঃখ মানুষকে মানুষ বানায়। দুঃখকে যদি আড়ালে রাখলে জগতের কেন্দ্র থেকে গেল আড়ালে। 

    কিন্তু এ দুঃখ বিলাসিতা নয়? 

    গোঁসাই হাসল। বলল, খিদে যখন খাবারের পছন্দ অপছন্দে ঘোরায় তখন সে খিদে বিলাসিতা….কিন্তু খিদে যখন পোড়ায় তখন সে বিলাসিতা কি ক্ষ্যাপা? 

   বললাম, মানুষ দুঃখ থেকে বাঁচবে বলেই তো এত দৌড়াদৌড়ি করে…bএত ব্রত-অনুষ্ঠান-উপবাস করে। তুমি বলছ সেই দুঃখই মানুষকে মানুষ করে?

     গোঁসাই একতারাটা হাতে নিল। টোকা দিল। টুং করে বেজে উঠল। বলল, মানুষকে ঘোরায় অহং…. ছোটো আমি… কাঁচা আমি…. যে মানুষকে বোঝায় কলাটা মুলোটা ঠাকুরের থানে দিলে সব অভাব-দুঃখ-রোগব্যধি থেকে মুক্তি পাবে…. ছোটো বুঝের ছোটো কথা… ছোটো যুক্তি….. তাই কি হয় ক্ষ্যাপা….


    তবে গোঁসাই মানুষ ঈশ্বরের কাছে যাবে না…. শরণাগত হবে না? কি আশায় যাবে তবে? 

   গোঁসাই বলল, দুঃখ থেকে ত্রাণ পেতে না ক্ষ্যাপা…দুর্গতি থেকে ত্রাণ পেতে….. সংসারে সব দুর্গতির মূল বেদরদী হওয়া…. দুঃখ ছাড়া তোমায় দরদী বানাবে কে গো? হাট করে দরজা খুলে দাও… জগত আসুক সব দুঃখ নিয়ে…. কেড়ে নিয়ে যাক সব…. দরদে জাগো…দরদে পোড়ো….


      বললাম, গানটা শোনাও গোঁসাই….


        আর কতকাল থাকব ব’সে দুয়ার খুলে, বধূ আমার!

তোমার বিশ্বকাজে আমারে কি রইলে ভুলে, বধূ আমার।

বাহিরে উষ্ণ বায়ে মালা যে যায় শুকায়ে,

নয়নের জল, বুঝি তাও, বধূ মোর, যায় ফুরায়ে।

শুধু ডোরখানি হায় কোন পরাণে তোমার গলায় দিব তুলে, বধূ আমার।

হৃদয়ের শব্দ শুনে চমকি’ভাবি মনে,

ঐ বুঝি এল বধূ ধীরে মৃদুল চরণে;

পরাণে লাগলে ব্যথা ভাবি বুঝি আমায় ছুঁলে, বধূ আমার।

বিরহে দিন কাটিল, কত যে কথা ছিল,

কত যে মনের আশা মন-মাঝে রহিল;

কী ল’য়ে থাকব বলো তুমি যদি রইলে ভুলে, বধূ আমার।।


    ট্রেন চলে গেল। গোঁসাইকে নিয়ে চলে গেল। ফাঁকা স্টেশানে বসে আমি। আমি কোনদিকে যাব গোঁসাই। আমার প্রাণে একতারা কবে বাজবে গোঁসাই? আমার প্রাণে সে হাজার তারের কোলাহল। সুর নেই। কোলাহল আছে। 

   একজন এসে বসল পাশে। মদের গন্ধে ম ম করে উঠল। বলল, বিড়ি আছে? 

    গা গুলিয়ে উঠল গন্ধে। ভাবলাম উঠে যাই।

    বললাম, নেই। 

   সে বলল, ঘেন্না হচ্ছে? 

    তার গলায় ভেসে এলো গোঁসাইয়ের গলার সুর….. ঘেন্না করো ক্ষ্যাপা? ঘেন্না? সহ্য না হয় উঠে এসো… ঘেন্না কোরো না…. সে অধিকার নেই…. সে প্রশ্রয় আছে… সে  হাওয়ায় ভেসো না ক্ষ্যাপা…. হাল ধরো….

    কে বলল? 

   গোঁসাই বলল, দরদ বলল…...ব্যথা কই তোমার ক্ষ্যাপা? শুধুই সুখ জমাও….সে তো শুধুই ফাঁকি! এত অভাবে বাঁচবে কি করে ক্ষ্যাপা?

Friday, October 20, 2023

মাধুর্যের মাধুকরী

নাম মানে দিশা। এই যেমন যে হরিদ্বারে যাবে বলে ট্রেনে উঠল, সে ট্রেনে খায়-দায়, গল্প করে, এদিক-ওদিক দেখে কিন্তু তাও সে জানে, প্রতি মুহূর্তে জানে সে যাচ্ছে হরিদ্বারে। তেমনই নাম। নাম মানে দিশা।

দূরের থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে। আজ সপ্তমী। গঙ্গার ধারে কাশের বন ফুলেফেঁপে উঠেছে। যেন সাদা চাদর পেতে রেখেছে কেউ। নৌকা পারাপার করছে।

গোঁসাই জলে নেমেছে ঘট ভরতে। সন্ধ্যে হব হব। সূর্য ডুবছে। আলো থেকে অন্ধকারের দিকে বাইরের প্রকৃতি যখন যায়, মানুষের ভিতরের প্রকৃতিতেও তার ছায়া পড়ে।

আশ্রমে এই সময়টা লোক কম আসে। গোঁসাই মন্দিরে ঢুকল। আমায় বলল, তুমি খানিক বেড়িয়ে এসো। আমি ক'টা কাজ সেরে নিই।

আমি গঙ্গার ধার ধরে হাঁটছি। কোথাও যাওয়ার নেই। কিছুক্ষণ মানে কতক্ষণ গোঁসাই? হাঁটি। নিশ্চয়ই মন-ই বলে দেবে। মনের নিজের একটা ঘড়ি থাকে, নিজের তুলাযন্ত্র থাকে। নির্ভুল নয় যদিও। তবু একেবারে অচলও নয়।

বটগাছের নীচে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বসে। কি নিয়ে একটা বেশ গম্ভীর আলোচনা হচ্ছে। স্ট্রীটলাইটের আলোয় যতটুকু বোঝা যাচ্ছে সবার মুখই বেশ গম্ভীর।

"আরে নিজের চোখে দেখেছি। পদা, অফিস থেকে এসে স্নানধান করে যেমন রোজ ফোন নিয়ে এ রাস্তায় হাঁটে তেমনই হাঁটছে। আমি গরম লাগছে বলে বাইরে এসে… ওই ঢিবিটার উপর বসে গঙ্গার দিকে মুখ করে বসে বিড়ি টানছি। বেশি খাওয়া হয়ে গেছে তাই পেটটা আঁইঢাঁই করছে। পদা বলল, কি জ্যাঠা ঘুম আসছে না…..

আমি বললাম, না রে…..

সে উত্তরটা না শুনেই হাঁটতে হাঁটতে ওদিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে দেখি গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে করতে ছুটে আসছে….. আমার কাছে এসে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শুয়ে পড়ল…. বলল, জ্যাঠা…. ভূত… ভূত….. কাকলিদি…. গঙ্গার দিকে মুখ করে বসে….

কাকলির নামটা শুনে আমার হাড় হিম হয়ে গেল। দড়ি কেটে তো আমিই নামিয়েছিলাম। মনে আছে তোমাদের নিশ্চয়ই…..

আমি বললাম, চল তোকে ঘরে দিয়ে আসি… ওকে ঘরে দিয়ে আমি আবার এখানে এসে বসলাম। পৈতেটা ভালো করে পেঁচিয়ে আঙুলে জপ কর‍তে লাগলাম… ভয় কই? হ্যাঁ…. ভয় কই?"

======

গোঁসাই, এও তো নাম করা। ভয়ের থেকে বেরোনোর জন্য। একি দিশা দেয়?

গোঁসাই বলল, দিশা সেকি চায়? সে তো চায় তাৎক্ষণিক একটা ফল। ভয়ের থেকে দূরে যাবে বলে। ভয় একটা বিকার।

বললাম, তবে তুমি ভূতে বিশ্বাস করো না?

আমার বিশ্বাসের উপর যে জিনিস আছে সেকি খুব কাজের বস্তু রে?

তোমার ঈশ্বর তোমার বিশ্বাসের বস্তু না?

ভূতে বিশ্বাস আর গোবিন্দে বিশ্বাস এক? ভূতে বিশ্বাস না, ও ভয়ের বিকার। যা মানুষের ভয় তৈরি করে সে বিকার। দেখো, মানুষের মন কল্পনাশূন্য হয় না। কল্পনায় যদি ভয়, হিংসা, লোভের ইন্ধন লাগে তবে সে বিকার জাগায়। আর যদি ভালোবাসার ইন্ধনে জ্বলে তবে সে প্রিয়তমকে সৃষ্টি করে। সে যাকে ভালোবাসে সে বিশেষ হয়ে ওঠে। সে যেভাবে তাকে দেখে আর পাঁচজন তাকে সেভাবে দেখে কই? কারণ সে তার নিজের সৃষ্টি। তার ভালোবাসার সৃষ্টি।

তোমার গোবিন্দ?

আমার গোবিন্দও আমার শূন্যতার কল্পনায় অনন্তের মাধুকরী। সে একদিকে অনন্ত, আরেকদিকে শূন্য। একদিকে নিরাকার, আরেকদিকে সাকার। একদিকে নশ্বর, আরেকদিকে অবিনশ্বর। যে যাকে ভালোবাসে তাকেও সে গোবিন্দের রঙেই দেখে। সে একই সঙ্গে সাকার, নিরাকার। ধরা - অধরা। ভালোবাসা যত পাকা হয় এ পরিচয় তত নিবিড় হয়। অসীমের আসন পাতা হয় সসীমের বুকে। মাধুর্যের মাধুকরী হয়ে আসে সে।

======

মণ্ডপে আরতি চলছে। আমার টোটো ধীরগতিতে চলছে ভিড় ঠেলে স্টেশানের দিকে। এই যে এত এত মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে…. এই যে ঢাকের আওয়াজ, কাঁসরের আওয়াজ, শাঁখের আওয়াজ, উলুধ্বনি… এসবে মিশে যে ছবি আঁকা হচ্ছে সে কি?

মন, তোমার কল্পনায় কার ইন্ধন? লোভের, না ভালোবাসার? তোমার চিত্তপটে কিসের চিত্র? বিকারের, না সুন্দরের…..

"কি সুন্দর সাজিয়েছে না দাদা? মনটা একদিন কি আনন্দে যে ভরে থাকে….. মা চলে গেলেই সবটা ফাঁকা…. এই তো আপনাকে নামিয়েই মেয়েটাকে নিয়ে বেরোবো…. সেজে বসে আছে…"

আমি বললাম, আজ আর বেরোবে না?

টোটোওয়ালা হাসল। বলল, সে যদি বেরোতে দেয় তো…..

 

Wednesday, September 6, 2023

আমারও কাজ ছিল রে

পুজোর মন্ত্র কি?

কান্না।

কান্নার উৎস কি?

ভালোবাসা।

ভালোবাসার উৎস কি?

ভালোবাসাহীনতার বোধ।

শুষ্ক হয়ে আছি। ভালোবাসাহীন হয়ে আছি। কান্না নেই। আনন্দ নেই। বড় ভার গোঁসাই। বড় ভার।

গোঁসাই বলল, ভালোবাসা মানে কি বোঝো?

বললাম, বুঝি না গোঁসাই, তবে মনে হয় হঠাৎ আসা শীতল হাওয়া। হঠাৎ আসে। হঠাৎ যায়।

গোঁসাই বলল, হাওয়া না গো। জল। দরদ বোঝো? ভালোবাসা মানে শীতল জল। দরদ। যত ডুববে তত শান্তি। এ জলে ডুবলে মানুষ মরে না। অমর হয়।

বললাম, আজ জন্মাষ্টমী, তুমি আশ্রমে ফিরবে না?

গোঁসাই বলল, অনুষ্ঠান? ও আমার জন্য আটকাবে না রে। কিন্তু আমাদের রান্না করে যে মালতী, ওর জ্বর, ওর ছেলেটার জ্বর, ডাক্তারকে নিয়ে ওদের বাড়ি যাব। রাতে ওখানেই গোপালের জন্য রাঁধব, ভোগ দেব, কাল ঠিক থাকলে ফিরে আসব।

তোমার জায়গায় আর কাউকে পাঠালেও তো হত গোঁসাই।

গোঁসাই হাসল। বলল, সে হত, কিন্তু কি জানিস অত ভিড়ের মধ্যে মন বসবে না। সবাই আসবে অথচ আমার মন পড়ে থাকবে এখানে, সে কেমন মিথ্যাচার হবে না….. চল…. ওই সামনের বাড়ি।

গোঁসাই আমায় ওদের বাড়ির দরজায় ছেড়ে নিজে ডাক্তার আনতে চলে গেল।

=====

মা-ছেলে দুজনেই বিছানায়। ছেলেটার বয়েস সাত-আট বছর হবে। মালতী জলপট্টি দিচ্ছে শুয়ে শুয়েই। আমাকে দেখেই উঠতে গেল। আমি বললাম, আপনি বিশ্রাম নিন, আমি দেখছি।

মালতী আশ্রমে রান্না করে। আমায় চেনে। আমিই চিনি না ঠিক করে। আমায় না চিনলে আমায় দেখে এই জ্বর শরীরেও উঠতে যায়? জানে আমার স্বভাবে শহুরে শিক্ষাদীক্ষার অহংকার আছে। না মান দিলে মুখে না বললেও, মনে মনে ক্ষুণ্ণ হতাম।

আমি জলপট্টি দিচ্ছি, মিনিট দশেক পর ডাক্তারকে নিয়ে গোঁসাই ঢুকল। ডাক্তার দুজনকে বেশ কিছুক্ষণ দেখল। বলল, গোঁসাই কাল একটা রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে মনে হচ্ছে, যা ডেঙ্গু হচ্ছে এ বছর।

গোঁসাই বলল, বেশ, তুমি লোক পাঠিয়ে দিও।

ডাক্তার ওষুধ লিখে বসল আমাদের সামনে এসে। আমি আর গোঁসাই মাটিতে মাদুরে বসে। মা আর ছেলে চৌকিতে শুয়ে। ঘরে একটা সিএফএল বাল্ব জ্বলছে।

গোঁসাই আমায় বলল, চা করো দেখি। ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা একটু চা মুড়ি খা…. কি ডাক্তার, খেতে পারবে তো?

ডাক্তার বলল, রুগী ডাক্তার সবাই পারবে……

======

চা হল। মালতী উঠে বসে, ছেলেটাকে কোলে ঠেস দিয়ে বসিয়ে চা আর মুড়ি খাওয়াচ্ছে। নিজেও খাচ্ছে।

গোঁসাই বলল, জোর করে খা রে…. রাতে কি খাবি?

মালতী বলল, ডালেচালে বসাবে গোঁসাই?

ডাক্তার বলল, ডাক্তারও সেবা পায় তবে…. হবে নাকি?

গোঁসাই বলল, বড় নোলা হে তোমার….

মালতী বলল, ইস, কি যে বলো না গোঁসাই…. না না আপনি গরীবের বাড়ি….

ডাক্তার বলল, ওসব মন্ত্র পড়লে চলে যাব কিন্তুআর আমি থাকছি এ পাগলের সঙ্গ করব বলেনইলে এমন গোঁসাই কোথায় পাব বলোজন্মাষ্টমীর দিন রাতে আশ্রম ছেড়ে রাঁধুনির কাজ করে….

মালতীর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বলল, ছি ছি গোঁসাই…. একি পাপ করালে আমায় দিয়ে গো…. দোহাই ঠাকুর, তুমি আশ্রমে যাও.. আজ জন্মাষ্টমীআমার একদম মনে ছিল নাতাই তো দিদির বাড়িতেও তো পুজোআমি আজকের রাতটা কাটিয়ে নেব।

কারেন্ট গেল। বাইরে বৃষ্টি নামল।

আমি মোবাইলের টর্চ জ্বাললাম। গোঁসাই হ্যারিকেন ধরাতে ধরাতে বলল, বাজে বকিসনি তো…. আজ জন্মাষ্টমী বলেই তো সে বলল, আজ আমি বড় ব্যস্ত থাকব গোঁসাই, তুমি আজ বরং ছুটি নাওযেখানে দরকার সেখানে যাও….. তাই তো এলাম…..

মালতী দেওয়ালে হেলান দিয়ে, ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, কথায় তোমার সঙ্গে কি আর পারি গোঁসাই!….

মালতীর গলা বুজে এলো। ডাক্তার বলল, না গো এই ভালো…. তোমার গোপালেই পুজো দিক….

মালতী দেওয়ালের ঠেস থেকে সরে এসে বলল, আমার তো গোপাল নেই ডাক্তারবাবু

ডাক্তার বলল, তবে?

মালতী কিছু বলার আগেই ছেলেটা বলল, মা হিসি পাচ্ছে…..

গোঁসাই আমায় বলল, ছাতাটা নিয়ে বাইরে ওকে হিসি করিয়ে নিয়ে এসো….

======

খিচুড়ি রাঁধা হল। গোঁসাই একটা ছোটো প্লেটে একটু খিচুড়ি আর দুটো আলুভাজা সাজিয়ে ছেলেটার মাথার কাছে গিয়ে বসল। বলল, ওঠ বাবাখেয়ে নেতারপর ওষুধ আছে না ডাক্তার?

ডাক্তার বলল, হ্যাঁ গোঁসাই। আমার ব্যাগে আছে।

গোঁসাই বলল, তুই মা খেয়ে নে….

মালতী বলল, তা হয় না গোঁসাইআগে তোমরা খাও….

ডাক্তার বলল, সেই ভালোআমরা একসঙ্গে বসে যাব গোঁসাই…. ওকি আমাদের আগে খেতে পারে নাকি…. ও তুমি বুঝবে না।

======

মালতী অল্প একটু খেয়ে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি থেমেছে। আমি আর গোঁসাই ডাক্তারকে এগিয়ে দিয়ে আবার মালতীর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।

গোঁসাই বলল, এসো, এদিকটায় বসি….

চণ্ডীমণ্ডপ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভয় হল, যদি সাপটাপ থাকে।

গোঁসাই পা ছড়িয়ে বসল। আমিও বসলাম পাশে। দুজনেই চুপ। অথচ মনে হচ্ছে বুকটা কত কথায় ভরে আছে। গোছানো কথায় ভরে। তাই এত আনন্দ। বিরোধী কথায় ভরে থাকলেই অশান্তিরাজ্যের অশান্তি।

কি শান্তি চারদিকে। মেঘ কেটে গেছে। আকাশ পরিষ্কার। তারা উঠেছে।

গোঁসাই গাইছে। বিদ্যাপতি পদ। ভরা বাদর। মাহ ভাদর। সুর রবীন্দ্রনাথের না। অন্য সুর। গোঁসাই চারবার গাইল, শূন্য মন্দির মোর…. তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই তো বলছিলে না? সব শূন্যশুষ্ক? দেখো বিদ্যাপতিও গাইছেশূন্যতাকে ভয় কিসের গো…. শূন্যতার এক অহংকার আছে…. সে নেশা না ধরলেই হল….

বুঝলাম না গোঁসাই…..

শূন্যতার অভিমান…. সে ভালো না। শূন্য হবে যখন গোটাগুটি হবে। দরদ আসবে আবার। কিন্তু শূন্যতাকে নিয়ে অভিমান কোরো না। সহ্য করবে, কিন্তু অভিমানী সিদ্ধান্ত নেবে না। দেখবে আবার সব ঠিক হবে।

এভাবে ভাবিনি গোঁসাই আগেঠিকপ্রাণ শূন্য হলে অভিমান জন্মায়….

ওইতেই ক্ষতি হয়….

========

গোঁসাই পরেরদিন বিকেলে চলে এসেছে আশ্রমে। মালতীর এক দিদি যে বাড়ির গোপাল পুজোর জন্য আসতে পারছিল না সে চলে এসেছে।

আশ্রমে অনেকে অভিমান করে বলল, এমন উৎসবের দিন আপনার না থাকা ঠিক হয়নি…. কত দূর দূর থেকে ভক্তেরা এলো….

গোঁসাই হাসল। বলল, আমায় দেখতে, না গোপালকে দেখতে এসেছিল রে?

তারা বলল, ছল কোরো না গোঁসাই…. উত্তরটা তুমিও জানো…..

গোঁসাই বলল, শূন্যতার অভিমান ভালো না রে…. বরং বিনম্র অপেক্ষা ভালো…. তারা অপেক্ষা করেনি….

তাদের কাজ ছিল…..

গোঁসাই বলল, আমারও তো তাই ছিল রে….. কাজ…. গোপালের সেবা।

Friday, June 9, 2023

তন্ময়

বাসন্তীর পা ডুবে ছিল গঙ্গাজলে, হাত দুটো জড়ো করে রাখা ছিল কোলের কাছে। কার উদ্দেশ্যে হাত দুটো জড়ো করা, না জানে বাসন্তী, না জানে বাসন্তীর অন্তরাত্মা। গঙ্গার ওপার থেকে কালো মেঘ বাচ্চা ছেলের মত হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে আকাশ ছেয়ে ফেলছে তখন। বাসন্তী জানে এখনি উঠতে হবে, উঠোনে কাপড়গুলো মেলা, বড়ি শুকোতে দেওয়া। বাসন্তী একাই থাকে। সারাজীবন কত পুরুষের সঙ্গ হয়েছে, বাসন্তী গোনে না আজকাল। ওতেই পেট চলেছে, জীবন চলেছে। এখন বাসন্তী একা।

বৃষ্টি শুরু হলো। বড় বড় ফোঁটা মাথায় পিঠে কাঁধে পড়তে শুরু করলো। বাসন্তী উঠতে যাবে, ফিরে দাঁড়াতেই পা লাগলো গোঁসাই'এর পায়ে। বাসন্তী চমকে উঠে বলল, আমি খেয়াল করিনি ঠাকুর, তুমি কখন এসে বসেছ, আমি সত্যিই দেখিনি ঠাকুর।

গোঁসাই হাসলো, বলল, আমরা তো খেয়াল করিই না রে, সে কখন এসে পাশে বসেছে অপেক্ষা করছে গায়ে পা ঠেকার…..

বাসন্তী গোঁসাইকে প্রণাম করে একটু দূরে গিয়ে সিঁড়ির একটা কোনায় বসল। শাড়ি ভিজুক, বড়ি ভিজুক, ঘর বাড়ি উঠান সব ভিজুক, বাসন্তীর আজ বড় সৌভাগ্যের দিন, গোঁসাই এসে বসেছে পাশে।

বাসন্তী বললো, তুমি এখানে ঠাকুর?

গোঁসাই বলল, তুই বা হাত জোড় করে বসে ছিলি কেন? বলেই হো হো করে হেসে উঠে বলল, আরে না না, এমনিই এদিকে এসেছিলুম, তোকে তন্ময় হয়ে বসে থাকতে দেখে মনে একতারার ছড় বাজল... মনে হল তুই কোন একতারার সুর তুলে একা বসে আছিস শুনি... তাই আড়ি পাততে এসেছিলাম।

বাসন্তীর চোখ উপচে জল এলো, তা বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে সিঁড়ি বেয়ে গঙ্গার দিকে গেল নেমে। বাসন্তী বলল একতারা আর পেলাম কই ঠাকুর? হাজার জনের সুরে বাজতে বাজতে শরীর নষ্ট, মন নষ্ট, আত্মা নষ্ট... গোটা জীবনটা বাঁচতে গিয়ে নষ্ট হলাম ঠাকুর।

জোরে বৃষ্টি নেমেছে। গোঁসাই বলল, সংসার পেলি না, সন্তান পেলি না, নিজেকে ক্ষইয়ে ক্ষইয়ে এই যে একা হয়ে গেলি সংসারে, সে কি তোর একার পাপে?... গোটা সমাজের আর কোনো মানুষের কোনো দায় নেই? কেউ সাদা নয় রে মা কেউ না….

বাসন্তী হাসল, বলল, কিন্তু আমিই হলাম দাগী।

গোঁসাই বলল, দাগী বলেই তো গোবিন্দের দরজায় যেতে তোর কোনো বাধা নেই।

বাসন্তী দীর্ঘস্বাস ফেলল, বলল, মনে কোনো সুখ জন্মায় না গোঁসাই... আশা ভরসা কিছু জন্মায় না।

গোঁসাই বলল, তারও উপায় আছে।

বাসন্তী ডান হাতের চেটোয় বৃষ্টি ভেজা মুখটা পরিস্কার করে, গোঁসাইয়ের মুখের দিকে এই প্রথম সোজাসুজি তাকালো। গোঁসাইয়ের চোখ বন্ধ, বৃষ্টির জলে স্নান করে যাচ্ছে গোঁসাই... তার জন্য উপায় আছে? এখনো আছে!

গোঁসাই বললো, এমন একজনের কথা ভাব যাকে তুই সর্বান্তকরণে ভালোবেসেছিলি... যে তোর হয়নি... কিন্তু তুই তার হয়েছিলিস... মনে প্রাণে কোথাও বাধা ছিলো না।

বাসন্তী গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বলল, এগারোটা বছর হলো... আজই তার চলে যাওয়ার দিন ঠাকুর... আমি শ্মশানে গিয়েছিলাম সেদিন, দূর থেকে তাকে দেখেছিলাম, সবাই ফিরে যাওয়ার পর একমুঠো ছাই ঘরে এনে, পিতলের ঘটিতে রেখে, আমার নতুন শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে ঘটির মুখ বন্ধ করে খাটের নীচে রেখেছিলাম ঠাকুর... আজও আছে...

গোঁসাই বললো, ওই তোর গোবিন্দ... আমরা বলি ভগবান সবার মধ্যে আছেন... কথাটা ভুল বলি রে... সবার মধ্যে যে আছে... সবার মধ্যে যাকে দেখিস... যাকে অনুভব করিস... সে'ই ভগবান... তাই সে বাঁধে না, মুক্ত করে। তোর সে মানুষটাকে তুই তো আজ আকাশে বাতাসে সর্বত্র অনুভব করিস... তার জন্যই তো হাত জোড় করে বসেছিলি... সে'ই তোর ভগবান।

গোঁসাই চলে গেল বাসন্তীর মাথায় হাত রেখে, যাওয়ার আগে বলে গেল, তন্ময় হতে শিখেছিস, আর কি চাই রে মা... গোটা জীবনের একটাই তো স্বাদ... আনন্দ... তন্ময় হতে পারা।

তখন গোটা গঙ্গা তন্ময় হয়ে বৃষ্টিস্নানে। বাসন্তী কেঁদে উঠল। তার অন্তরাত্মা বলল, বাসন্তী বাড়ি চল।

Tuesday, May 16, 2023

মহা-আপন

ঝড় উঠল। গোঁসাই ফিরছে আশ্রমে। একতারা আর ধুতি সামলাতে সামলাতে গোঁসাই আশ্রমের দরজায় এসে বলল, কখন এলে গো…..

আমি হাত থেকে একতারাটা নিয়ে বললাম, এই তোসারা গা-মাথা ধুলোয় ধুলো দেখি….

গোঁসাই 'হো হো' হাসতে হাসতে কলপাড়ে গেল…. পা ধুতে ধুতে বলল, তা তুমিও তো কম ধুলো পেরিয়ে আসোনি দেখছিমুখখানা অমন অন্ধকার কেন?

বললাম, কোনো বিশেষ কারণ কি লাগে গোঁসাই সংসারে?…. সুর চড়ে থাকবে সংসারে এমন মন কি পেয়েছি…. আঘাতে ধাক্কায়…. সুর কখন নেমে যায় বুঝি না…. যখন দেখি নামতে নামতে গোঙানিতে এসে ঠেকেছে….

কথা শেষ করতে পারলাম না…. গলা বুজে এলো…..

আরতি শুরু হল। পঞ্চপ্রদীপের আলোয় শ্রীবিগ্রহের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ঝড়ে কারেন্ট গেছে। আজ আর আসবে বলে মনে হয় না। গোঁসাই খালি গায়ে টানটান হয়ে বসে। খুব সম্ভবত চোখ বন্ধ। কিম্বা খোলা, শান্ত দৃষ্টি। ঝিনুকের খোলে বৃষ্টির জলে যেমন আকাশের ছবি জমে ওঠে, গোঁসাইয়ের চোখে ভালোবাসা জমে তেমন দৃষ্টি।

======

গঙ্গার ধারের দিকে ঘরে এসে বসলাম। বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

গোঁসাই বলল, সুর নেমে যায়…. কিন্তু সেই নেমে যাওয়াটা যে বুঝতে পারো.. এই গোবিন্দের কৃপা…. নইলে কতজনে তো সেই নামা সুরেই বিশ্বকে বাঁধতে চায়…. বাঁধে নাতখন ভিতরে বাইরে অভাবে-অভিযোগে নিজের প্রাণসক্কলের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তোলে গো

গোঁসাই হেসে উঠল। করুণ হাসি। আপন মনে বলল, সুখের ক্ষেতে মনের গরু…. চরছে তো চরছেই…. ঝড় এলে…. যাবেই বা কোথায়…. গোবিন্দের বাঁশি শোনার অভ্যাস নেই যে…… তাই ফেরার পথও পায় না…..

বললাম, মন তো এমনই গোঁসাই…..

গোঁসাই উঠে জানলার কাছে দাঁড়ালো। বলল, দেখ্গঙ্গা দেখতে পাচ্ছিস? বৃষ্টি দেখতে পাচ্ছিস….?

বললাম, না।

আরেকটু তাকিয়ে থাক।

তাকিয়ে থাকলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠল। গঙ্গার বুকের বৃষ্টির ধারা মুহূর্তে দেখলামআবার সব অন্ধকার।

গোঁসাই বলল, দেখলি রে…. এমনিই দেখ্, কান পাতলে বৃষ্টির আওয়াজ, গঙ্গার জলের পাড়ে লাগার ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ শোনা যায়। তেমন বুকের মধ্যে একটা 'আমি আমি' শোনা যায়…. ভাবনার অন্ধকারে সে 'মহাআমি' চাপা পড়ে থাকে। হঠাৎ কোনো বড় দু:খেকি আঘাতে…. বিদ্যুৎ চমকে যায়…. বুকের ভিতরে সে 'মহাআমি'কে দেখা যায়…. আছে না রবি ঠাকুরের গানে….. আমার প্রাণে গভীর গোপন মহা আপন সেকি…. অন্ধকারে হঠাৎ তারে দেখি….. যবে দুর্দম ঝড়ে আগল খুলে পড়েকার সে নয়ন পরে নয়ন যায় গো ঠেকি…. মহা আপন সেকি…."

গোঁসাই গাইছে। উদাত্ত গলায়। প্রদীপ কেঁপে কেঁপে উঠছে বাদল বাতাসে। আমার চারদিকে জুড়ে হঠাৎ কিরকম সব জমাট বাঁধা অর্থপূর্ণ কিছু হয়ে উঠল। কে আমি? কিচ্ছু নইআমার চোখ ভেসে যাচ্ছেঅনির্বচনীয় আনন্দে না দু:খে জানি না…. নিজেকে সামলে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কে গোঁসাইকে?

গোঁসাই কাছে এসে, আমার মাথার উপর হাত রেখে বলল, ভাবনার স্রোত গো…. ভাবনার স্রোত

থামে না….

সময় হলেই থেমে যায়…. কান্নায়…. গভীর আকুতিতে সব থেমে যায়….. ভাবনা থামালে যে থাকে সে…. শুধু সে-ই থাকে….. সে আমি নই…. তুমি নও….. সে সময় নয়…. বাহির ভিতর কিছুই নয় সে…. সে সব…. মহা-আপন…. তখন গোটা সংসার জুড়ে শুনবে 'আমি আমি' ধ্বনি…. সে আমি'র বাইরে কেউ নয়…..

আমি বললাম, তোমার গোবিন্দ…..

গোঁসাই হাসল। বলল, বাইরের গোবিন্দ বাইরে তুমি…. ভিতরে এলে আমি….. তাই না সে রাধার সুখ!….. গোবিন্দ সুখ…. বাইরের তুমি'কে ভিতরের আঙিনায় আমি করে পাওয়ার সুখ….. যেন চাঁদের আলো তোমার ঘরের জানলা দিয়ে এসে তোমার সিংহাসনে রাখা ঘটের জলে পড়েছেবিচ্ছুরিত হচ্ছে…. সে আলোয়সারা ঘর আলোয় আলো….

======

ফিরছি। স্টেশানে বসে। মেঘ কেটে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। স্টেশান, রেললাইন সব চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে। একই আলোএকই বাতাসএকই আকাশ…. বুকের ভিতর একই কান্না গোঁসাই….. কি করে দিলেসব শান্তসব স্নিগ্ধ…. এই তো সুরে বাজছে সব গোঁসাই…. এই তো সুরে বাজছে।