Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Tuesday, March 19, 2024

সাবজেক্ট কম্বিনেশন

 মাধ্যমিক শেষ হয়ে গেছে। এখন উচ্চমাধ্যমিক পড়ার মরশুম শুরু হয়ে গেছে। কোনো কোনো স্কুল নাকি উচ্চমাধ্যমিক পড়াতেও শুরু করেছে বা পড়ানোর কথা ভাবছে এমনও শুনছি। 

       এই সময়টা মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকের দিকে আসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এক অস্থিরতা দেখি বিষয় নির্বাচন নিয়ে। যার বেশিরভাগটাই খুব অগভীর, পরিকল্পনাহীন, "ভালো স্কোরিং", "ওটা পড়তে ভয় লাগে", "এটা ভীষণ সোজা" ইত্যাদি অবৈজ্ঞানিক ভাবনাচিন্তা থেকে আসে। 

     যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কী নিয়ে পরে পড়তে চাও? 

  বেশিরভাগেরই উত্তর অজানা। আপাতত একটা সাবজেক্ট কম্বিনেশন হলেই হল। যে সকালে কেমিস্ট্রি নিচ্ছে, সে বিকেলে সেটাকে ছেড়ে নিউট্রিশান নিচ্ছে। যে আজকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে দুদিন পড়ে এলো, সে তারপর বায়োলজি নিয়ে নিল। কেউ ইকনমিক্স আর বায়োলজি নিচ্ছে। আরো সব অসঙ্গত কম্বিনেশন। 

   কম্বিনেশনে বৈচিত্র্য আসুক। সেটা ভালো। কিন্তু সেটা যদি এটা পড়তে সোজা লাগে, আর ওটা পড়তে কঠিন লাগে, শুধু এইটুকুর উপর নির্ধারণ করে হয়, তবে সেটা সম্পূর্ণভাবেই ভুল দিকে নিয়ে যাবে। আমাকে তো ঠিক করতে আমার আগ্রহ কোনদিকে, কোন বিষয়টা নিয়ে আমি ভবিষ্যতে পড়তে চাইছি।

     উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষা সেমিস্টার অনুযায়ী করা হবে। ভালো। কিন্তু কাদেরকে নিয়ে করা হবে? যাদের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরাই জানে না তারা ভবিষ্যতে কি করতে চাইছে। কোনো যথাযথ কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে আপাত ভালোলাগা, না-লাগাকে ভিত্তি করে সাবজেক্ট ধরা ছাড়ার প্রক্রিয়া তো আছেই। গোটা বিষয়টাই ভীষণ অব্যবস্থিত। 

      আমি বিজ্ঞান পড়াই বলে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা আছে। সেই থেকেই বলছি, বাংলা বোর্ডের ছেলেমেয়েদের মধ্যেই কিন্তু এই সমস্যাটা বেশি। সিবিএসই, আইসিএসই র ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই সমস্যাটা এত প্রবল নয়। 

   বাংলায় ছেলেমেয়েদের কাছে ডাক্তারি পড়তে পারাটাকে মহার্ঘ্য। ইঞ্জিনিয়ারিং তারপর। আর বাদবাকি সব “ওগুলো আমার দ্বারা হবে না” বলে আসা। এর ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কিন্তু তার সংখ্যাটা কম। আমরা প্রতি বছর পড়ছি, কলেজে অনেক সিট ফাঁকা থাকছে, ভর্তি হচ্ছে না। সায়েন্স পড়ার ছাত্রছাত্রী কমে যাচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিং এর সিট ফাঁকা থাকছে।

    আমার একান্ত অনুরোধ আপনারা যারা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত তাদের কাছে। কতগুলো বিষয়কে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই।


১) বিজ্ঞান বিষয়টা একে অন্যের উপর নির্ভরশীল বলে আমার বিশ্বাস। কেউ অঙ্ক ছাড়া ফিজিক্স টেকনিক্যালি নিতেই পারে। সেক্ষেত্রে অঙ্কটা আলাদা করে তাকে শিখে নিতে হবে। কিন্তু কতজন সেটা করে? পাঁচটা বিষয় নিয়ে স্কুল আর টিউশান পড়তে পড়তে অনেকের বেলাতেই খুব কম সময় বা আগ্রহ থাকে যে আলাদা করে অঙ্কটা শিখি। 

      তেমনই কেমিস্ট্রি আর বায়োলজিও। খুব বেশি নির্ভরশীল না হলেও অনেকটাই নির্ভরশীল। বেশ কয়েকটা অধ্যায় পড়াতে রীতিমতো বেগ পেতে হয় যাদের কেমিস্ট্রি না থাকে তাদের। তাদের শুধু মুখস্থের উপর পড়ে যেতে হয়।


২) বিজ্ঞানের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। আর আছে নিজস্ব যুক্তির পরিকাঠামো। অঙ্ক তার কেন্দ্রগত। কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, বায়োলজি তারই উপর দাঁড়িয়ে। অন্তত এইটাই আমার বিশ্বাস। অনুভব। আমাকে বিজ্ঞানের ছাত্র হতে গেলে আমাকে বিজ্ঞানের এই যুক্তির পরিকাঠামো আর ভাষার সঙ্গে পরিচিত থাকতেই হবে। যদি বিষয়টা নিয়ে আমি সিরিয়াস হই। যদি আমি আমার পড়াশোনার গতিপথ নিয়ে সিরিয়াস হই।


 ৩) এইখানেই সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস। অনেকেই বর্তমানে অদ্ভুত সব অসঙ্গত কম্বিনেশানে বিজ্ঞান পড়ে। সেটা না হচ্ছে বিজ্ঞান, না হচ্ছে আর্টস। কারণ সে সেই বিষয়ের “ঘরানা”টার সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে না। সে বিষয়টার অন্দরমহলে প্রবেশের ক্ষমতা অর্জন করতে শিখছে না। 


 ৪) বৈচিত্র্য আর গভীরতা কি একে অন্যের পরিপূরক হতে পারে? জ্যাক অব অল ট্রেড হতে গেলে সে মাস্টার অব নান হতে হয়, সেটা খুব কাজের? 

   আমি বলছি না বৈচিত্র্যপূর্ণ কম্বিনেশান থাকবে না। থাকুক। আমি দর্শন আর ডাক্তারি একই সঙ্গে পড়াই না কেন, কিন্তু সেই পরিকাঠামো, সিলেবাস কি পাচ্ছি? সেটা কতটা বাস্তবসম্মত? আমি তর্কের খাতিরে বলতেই পারি অমুক দেশে হচ্ছে, তবে এদেশে হবে না কেন? কিন্তু অন্য কোনো একটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামোর সঙ্গে কি আমাদের দেশ মেলে? 

   যা হোক সে তর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু আমার উদ্বিগ্নতার জায়গাটা হল অন্য। এই যে আমরা একটা জগাখিচুড়ি মার্কা কম্বিনেশনে পড়িয়ে দিচ্ছি, তারপর কি হবে? যখন তারা গ্র‍্যাজুয়েশানের দিকে যাচ্ছে তখন আবার আরেক নতুন কম্বিনেশানের নিয়মের মধ্যে এসে পড়ছে। যে অঙ্ক আর ফিজিক্স ছাড়া কেমিস্ট্রি পড়ে এলো এগারো বারো ক্লাসে, তাকে বিভিন্ন কলেজ বলে দিচ্ছে এই কম্বিনেশানে কেমিস্ট্রি নিয়ে স্নাতক হওয়া যাবে না। এইবার? অর্থাৎ তার দু বছর পড়ার আদতে কোনো মূল্য নেই? তার কেমিস্ট্রিতে প্রাপ্ত মান যাই হোক না কেন, এরপর তাকে সে এনে শূন্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।


৫) অনেকে বলবেন, দারুণ সব নাম্বার তো পাচ্ছে। 

       আমার উত্তর, পাচ্ছে। এবং যদি ধরে নিই এই প্রাপ্ত নাম্বারের ভিত্তিতেই আমরা তাদের আহরিত জ্ঞানের একটা সোজা সরল সমীকরণ বানিয়ে ফেলেছি, তবে সে নিতান্তই অগভীর, অনভিজ্ঞ সরলতা। নাম্বার বাড়ানো আর কোনো বিষয়ে নিজের গভীরতা বাড়ানো অনেক সময়েই এক আসনে বসে না। আজকাল তো আরো বসে না। ছাত্র নিজের নাম্বার দেখে নিজেই চমকে যায়, এত পেলাম কি করে! এ ঘটনাও আজকাল বেশিই ঘটছে।

    অনেক অনেক নাম্বার। তারপর সেই নাম্বারের ভিড় ঠেলেঠেলে নিজের পছন্দের বিষয় আর কলেজ খোঁজা, ভীষণ কঠিন কাজ। এবং যদি শুরুর দিকে আমার কথাটা মনে রাখেন, যে অনেকেই জানে না তারা কি নিয়ে পড়বে, অগত্যা একটা যা হোক পাওয়া যাচ্ছে সেটা নিয়েই পড়লে হবে, এই হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ। যারা যে কম্বিনেশনে উচ্চমাধ্যমিক পড়ল, পরে জানল সেই কম্বিনেশনে কোনো বিশেষ এক বিষয়ে অনার্স পাওয়া যাবে না। এবার? 


৬) এখান থেকেই আমার মনে হচ্ছে, এই যে বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ, এটা এই অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক কম্বিনেশানের জন্য নয় তো? আসলে তো সে এমন একটা বিষয় পড়ছে, যার বেশ কিছুটা সম্বন্ধেই তার ধারণা অস্পষ্ট হয়ে থাকছে কারণ সেই বিষয়টা বোঝার জন্য সাপোর্টিভ সাবজেক্টে তার জ্ঞান নেই বলে। এর দায় কার?


৭) বাংলা স্কুলগুলো ধুঁকছে। এ বলাবাহুল্য। এখনও মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চতর শিক্ষায় বিজ্ঞানশিক্ষা বাস্তবায়িত নয় আমাদের দেশে। এরই মধ্যে আরেক ধরণের ছাত্রদের মধ্যে ইংরেজিতে অনীহা নিয়ে বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার প্রবণতা থেকে যাচ্ছে। 

   বাস্তবটা হল, উচ্চতর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বাংলা পরিভাষা ভীষণ দুর্বল। এর মধ্যে বেশ কিছু বই ছাপানো হচ্ছে যেখানে বাংলা পরিভাষার পাশাপাশি ইংরেজি টার্ম দেওয়া থাকছে না। এবং ইদানীং নজরে এলো বাংলা বোর্ডের ইংরেজি মাধ্যমের জীবনবিজ্ঞান বইতে কি ভীষণ সব ভুল বানান আর বাক্য ছাপানো হচ্ছে। কিছুই কি প্রুফ সংশোধন হচ্ছে না? জানি না। 

    বাস্তবটা স্বীকার করে আমি এখনও অন্তত উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রীদের শুধু বাংলা পরিভাষায় পড়াতে স্বস্তি বোধ করি না। কারণ সামনেই একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, সেখানে শুধুমাত্র বাংলা পরিভাষায় উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান, বিশেষ করে বায়োলজি পড়ে গেলে যে কি বিপদ সে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষই জানেন। যদিও অনেকের আপত্তি শুনি, “আপনি শুধু বাংলাতেই পড়ান না”। অভিভাবকদের থেকে আসে এ সাজেশন। হয় তো আমার মফঃস্বলে থাকার জন্য এটা হয়, আর্থসামাজিক কারণে। কিন্তু সব সময় তা নয়ও। কিন্তু বিশুদ্ধ বাংলা পরিভাষায় বিজ্ঞান পড়ানো কি করে যায় আমি এখনও জানি না।


৭) অভিভাবকদের অতিসক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তা। এই দুটোই ভীষণ ক্ষতিকারক। 

   অতিসক্রিয়তা। 

     এক, কোনো বিষয়ে একদিন, দুদিন ক্লাস করেই বোঝা যায় না সেটা কঠিন না সোজা। তার জন্য ধৈর্য লাগে। দুই, সোজা-কঠিনটা ভীষণ আপাত। আমার আগ্রহ আর কতটা ডিটারমাইন্ড সে ক্ষমতার উপর সেটা নির্ভর করে। সব চাইতে বড় কথা, আমি একই সঙ্গে সব হতে পারব না। আমাকে বেছে নিতে হবে। সে বাছাটা যতটা রিজিনবল হয়ে তত মঙ্গল। নইলে এমনও তো দেখছি, যার পড়াশোনা শূন্যের কাছাকাছি, সে মেধার কারণেই হোক, কি অনাগ্রহের কারণে, তাকেও মা-বাবা ডাক্তার করার জন্য শিক্ষক থেকে জ্যোতিষী সবার কাছে দৌড়াচ্ছেন। অবশেষে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বিকল্প রাস্তার জন্য দৌড়াচ্ছেন। 

   নিষ্ক্রিয়তা। 

      যা ইচ্ছা করুক। এটা কোনো কাজের কথা নয়। ঠিক তেমনই যেমনটা কোনো একটা বিষয় চাপিয়ে দেওয়াও কাজের কথা নয়। বর্তমানে যে ভয়ংকর আত্মধ্বংসী কম্বিনেশান পদ্ধতি চলছে, সেখানে একটা ঠিকঠাক কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা দরকার। স্কুলের সঙ্গে যুক্ত অনেক সহৃদয় শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন যারা এ কাজটা খুব আগ্রহের সঙ্গে করেন। তাদের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। অথবা ইন্টারনেট ঘেঁটে নিজেকে এই ব্যাপারে কিছুটা আলোকিত করে তুলতে হবে। যদি সেটা সম্ভব না হয় তবে সঠিক মানুষের কাছে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। অবশ্যই সেখানে স্কুলের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক শিক্ষিকারা আছেন।


    যুগ বদলেছে। দ্রুত বদলাচ্ছে। আমি আর কোনো বিষয় নিয়ে বলার যোগ্যতা রাখি না। শুধু বিজ্ঞান নিয়ে বলি। দয়া করে বিজ্ঞান নিয়ে এই ছেলেখেলাটা করবেন না। অসঙ্গত কম্বিনেশনে বিজ্ঞান পড়াবেন না। হয় অন্ধকার, নয় আলো। আধাজ্ঞান ভীষণ ভয়ানক। আমরা যা করি একটু দূরের দিকে তাকিয়ে যদি করি আমার মনে হয় ভালো হয় সেটা। অবশ্যই অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা আছে যারা এর মধ্যে থেকেও নিজেদের রাস্তা বার করে নিচ্ছে। আমার উদ্বিগ্নতা তাদের নিয়ে নয়। আমার উদ্বিগ্নতা “যে জন আছে মাঝখানে” তাদের নিয়ে। তাদের সংখ্যাটাই তো বেশি। একটু সিরিয়াসলি ভাবব না আমরা?

Wednesday, March 13, 2024

স্বচ্ছতা

 চিন্তা করে কেউ পায় না। বিশ্বাস করেও না। পায় তাকিয়ে। খোলা চোখে তাকিয়ে। তাকায় না। ভয় পায়। যা দেখবে তার সঙ্গে তার ইচ্ছা মিলবে না। তাই তাকায় না। বেশিরভাগ মানুষই তাকায় না। তাকানোর ভান করে থাকে। তাই দেখে, যা ইচ্ছা করে দেখতে। কিন্তু তবু তাকাবে না।

      একবার যদি চারদিকটা তাকিয়ে দেখত, তার ধর্ম, তার বিজ্ঞান, তার টাকাপয়সা, তার রাজা-মন্ত্রী, চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীরা কী কাণ্ড করে বসে আছে। একবার যদি তাকিয়ে দেখত মানুষ। 

     সত্য ভাবনার জিনিস না। তাকানোর জিনিস। আপেল মাটিতে পড়েছিল। নিউটন তাকিয়ে দেখেছিলেন। তারপর নিজের ভিতরে তাকিয়েছিলেন, ভাবার তত্ত্ব খাড়া করেননি। তাকিয়ে দেখেছিলেন নিজের যুক্তির দিকে। একের পর এককে রেখেছিলেন পাশাপাশি। কিন্তু যদি ভাবতেন, তবে হয় তো একটা গল্প ফাঁদতেন। পৃথিবীর মধ্যে এক বড় রাক্ষুসী আছে। সব কিছুকে সে নিজের পেটের মধ্যে টানছে। 

     আমাদের দেশে সব পাঁজি অনুযায়ী হয়। পুজো-আচ্চা, ভিতপুজো, অন্নপ্রাশন থেকে বিয়ে, এমনকি গর্ভাধান। পাঁজিতে সবের বিধান আছে। চাঁদের পৃথিবীকে আবর্তন আর পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে এই ছোট্টো ভুখণ্ডের উপর যে যে ঋতু-মাস যায়, সে সব অনুযায়ী পবিত্র-অপবিত্র, ঠিক-ভুল সবের হিসাব হয়ে যায় আমাদের। এইভাবেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিজেদের খেয়ালের দাসত্ব করেছে, বাইরের জগতটাকে নিজের বুদ্ধির চোখে খোলা চোখে তাকিয়ে দেখেনি। 

     আমাদের বুদ্ধির খোলা চোখ আজও নেই। আজও লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নরনারী সকাল ঘুম ভেঙে চোখ খুলে থেকে ঘুমাতে যাওয়া অবধি 'সংস্কার', 'ঐতিহ্য' মেনে চলে। যার উপর তার আর তার গত চোদ্দোগুষ্ঠি আর আসন্ন চোদ্দোগুষ্ঠির 'ভালো' নির্ভর করছে। আসলে আমাদের মজ্জাগত এসব। আমরা হাত পাততে ভালোবাসি। স্বনির্ভর হতে হবে, এ কথাটাও আমাদের দেশে স্লোগান হয়ে হাওয়ায় ভাসে। সেটাও আমাদের শেখাতে হয়। আমার কী কর্তব্য আছে সমাজের কাছে, দেশের কাছে বড় কথা নয়, প্রথম কথা নয়। আসল কথা আমি কী কী পেতে পারি? আমার ভাগ্যের কাছ থেকে, দেব-দেবীর কাছ থেকে, গ্রহ-নক্ষত্রের কাছ থেকে, পাথর-শিকড়বাকড়ের কাছ থেকে, পঞ্চায়েত কি মিউনিসিপালিটির মেম্বার থেকে প্রধানমন্ত্রী অবধি সবার থেকে কী পেতে পারি সেটাই আমার প্রধান বিবেচ্য। আমার কর্তব্য শুধু 'ভক্ত' হয়ে থাকা। আমার ওইটুকুই শুদ্ধভাবে করতে হবে। কার কখন কতটা ভক্ত হয়ে থাকলে আমার আখেরে লাভ হবে সেটাই আমার প্রধান ভাবনার জায়গা। এমনকি যারা বিজ্ঞানের ছাত্র, কি গবেষক, তাদেরও এই একই কৃষ্টিপন্থী ভাবধারা দেখে অবাক হতে হয়। যতক্ষণ বিজ্ঞানের ক্লাসে, কি পরীক্ষাগারে, ততক্ষণ প্রথাগত যুক্তির অনুসারী। যেই বাইরে, অমনি সমাজের নানা বিধিনিষেধ, নিয়মকানুন যা যুগান্তরের অন্ধবিশ্বাসে লালিত, তার কাছে নতিস্বীকার হয়ে গেল। কারণ ওতে আমার লাভ। আমার সুখের জীনের সুরক্ষা। আমার বিলাসের নিরাপত্তা। 

     তবু তাকাবে না। তবু নিজের বুদ্ধিটাকে স্বচ্ছ করে, স্পষ্ট করে তাকিয়ে দেখবে না কী হচ্ছে চারদিকে। সাধু থেকে নেতা, শিক্ষক থেকে বুদ্ধিজীবী কী সাংঘাতিক দ্বিচারিতায় ভরা, সে দেখবে না। সে শুধু ভক্ত হবে। ওইটাই আমার জীবনের লক্ষ্য। আমি যে কোনো প্রভাবশালীর ভক্ত হতে পারি, তুমি শুধু বলো যে সে টিকে থাকবে। আমার ওই একটাতেই ভয়। টিকবে তো? আমার তাই এত দেবদেবী, কে কখন কতদিন টিকে থাকবে কে বলতে পারে? আমার বিশ্বাস আমার স্বার্থবুদ্ধির সঙ্গে মিশে আমায় এমন বহুমুখী করে রেখেছে যে এক-একসময় আমি আমার নিজের মুখই চিনতে পারি না।

     আজ সে রাস্তাতেই হাঁটছি, আর আমাদের এ স্বভাব আরো পাক্কা হচ্ছে। আমাদের রঙ আরো পাক্কা হচ্ছে। কেন আমরা ভক্ত হতে চাই? কেননা আমাদের যে করেই হোক শান্তি চাই। আমি জানি না আমাদের মত করে এত ভীষণ করে শান্তি আর কেউ চায় কিনা। যে কোনোভাবেই আমি এক জড়তায় পৌঁছে গেলে আমার শান্তি। যেখান থেকে আর সামনে এগোতে হয় না। এই জড়ত্বলাভকে আমরা শান্তিলাভ বলি। যে ভাবেই হোক আমি এই জড়ত্বলাভ করতেই চাই। বুদ্ধির জড়ত্ব।

     জীবনের ধর্মই হল বাধাবিপত্তি কেটে সত্যের রাস্তা খোঁজা। তার মধ্যে অনেক ভুলভ্রান্তি। অনেক অপূর্ণতা। অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি। কিন্তু আমি একটা 'পবিত্র', 'পূর্ণ', শান্তিময় স্থিতি চাইছি। পড়ুন আমি একটা জড়ত্বের অবস্থা চাই। এমন এক জড়ত্ব অবস্থা যেখানে আমার বুদ্ধি পর্যন্ত এমন অবশ হবে যে সেও কোনো প্রশ্ন করা থেকে বিরত হবে। এ এক অদ্ভুত মানসিকতা। আর যুগান্তর ধরে আমরা এই 'সেটল্' হওয়ার রাস্তাই খুঁজে যাচ্ছি। একদিন 'রায়বাহাদুর' হয়ে, কোনো রকমে একটা অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করে 'শান্তিময়' জীবন কাটানোর। আজও সেই প্রথা চলছে। আমাদের দেশের শতকরা প্রায় একশোভাগ ছেলেমেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে, কারণ ওতে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে। চাকরি পেতে সুবিধা হয়। তাই আমাদের এখানে যত ছেলেমেয়ে বিজ্ঞান শাখায় পড়াশোনা করে, যত সংখ্যক ছেলেমেয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শাখার নানা পদে চাকরি করে, সে তুলনায় বিশ্বের দরবারে গবেষণায় আমাদের পদচিহ্ন কই? কারণ বিজ্ঞান আমার জীবিকার উপজীব্য, প্রাণের খাঁটি প্রশ্ন বা সাধনা তো না। আমাকে সত্য খুঁজতে হবে না, আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মানপত্র পেলেই হবে। ওতে আমার সামাজিক জীবনকে একটা মর্যাদাময় স্থিতিতে এনে দিলেই সে শান্ত।

     ওই যে বললাম, আমরা জানি না খোলা চোখে তাকাতে। যে মানুষ অতীতকে ধ্রুব, ত্রুটিহীন জেনে রাস্তায় নেমেছে, সে কেন খোলা চোখে সামনের দিকে তাকাবে? আমরা ধর্ম থেকে ধর্মান্তরে যাই। এক ডগমা থেকে আরেক ডগমায় যাই। কিন্তু গোটাগুটি সব ডগমা ছেড়ে সত্যিকারের প্রাণের ধর্মে কোনোদিন আমরা হাঁটব কিনা কে জানে? আজও আমরা পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের সবটুকু রস শুষে তাদের খাঁটি সাধনা, তাদের সততাকে দূরে ফেলে 'সংস্কারি' সমাজের কথা ভাবছি। যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে খোলা চোখে তাকিয়ে দেখতে চাইছি না, বুঝতে চাইছি না যে, গোটা বিশ্বে মানুষের জাত একটাই। সে হাজার হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে রূপে, আকারে, আকৃতিতে, সংস্কৃতিতে আলাদা আলাদা হলেও মূলে আদতে এক। কেউ কোনো কিছু ধ্রুব, ত্রুটিহীন আবিস্কার করিনি। বুদ্ধির জড়ত্বকে যদি আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করে তুলি, তবে যে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, গ্লানির মধ্যে দিয়ে যাব, তাতে আমার কোনো গৌরব নেই। কিন্তু তাতে আমার কি? আমার না তাকিয়ে দেখলেই হল খোলা চোখে।

Saturday, March 9, 2024

তার্কিক যুক্তি আর কাব্যিক যুক্তি

 তার্কিক যুক্তি আর কাব্যিক যুক্তি। তার্কিক যুক্তি ততটা নিজের জন্য নয়, যতটা অন্যের জন্য। সে ভীষণ নিটোল। শিকলের পর শিকল বেঁধে এগিয়ে যাওয়া। শিকলে ঘেরাও নিজেকে। আর আছে কাব্যিক যুক্তি, সে সম্পূর্ণ নিজের জন্য। 


       সংসারে জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বিষাদ এর দ্বন্দ্বে চলতে চলতে হৃদয় কোথাও একটা এ সবের মানে খুঁজতে চায়। কিন্তু সে মানে তার্কিক যুক্তির গম্য নয়। সে চায় কাব্যিক সত্যকে। তার্কিকের সত্য তো তথ্য, সে শুষ্ক। কাব্যের সত্য রসসিক্ত। তাকেই চায় সে। শুধু করুণ রসে নয়, ভয়াল রসেও। তখনই তার মানসলোকে জন্মায় নটরাজ। নৃত্যরত নটরাজ। ধ্যানরত শিবে সবটা ব্যাখ্যা হয় না। সে শান্তরস। কিন্তু নটরাজের নৃত্যে আছে প্রলয় আর সৃষ্টি একই সঙ্গে। যা সৃষ্ট হয়েছে তা ধ্বংস হবে এই তো নিয়ম। 


    রবীন্দ্রনাথের লেখায় নটরাজের উল্লেখ আজীবন। সে নাটকে হোক, কি গানে, কি কবিতায়। রুদ্রকে দেখেছেন নটরাজে। নৃত্যের তালে তালে। “মোর সংসারে তাণ্ডব তব কম্পিত জটাজালে।” 


    সংসারে তাণ্ডব নৃত্য দেখেছি তো। শ্মশানে দাঁড়িয়ে থেকে, দাহ করে ফিরে এসেছি হৃদয়ের এক একটা টুকরো তো কতবার তো আমিও। রবীন্দ্রনাথের অক্ষরের দীক্ষায় নটরাজকে দেখছি জগত জুড়ে। নিজের প্রাণে। মৃত্যুও তো কবির কাব্যিক যুক্তিতে নটরাজেরই নৃত্য। নিষ্ঠুর নৃত্য। 


   একটা কবিতা, বড় নির্মম, বড় উদাস করা, অথচ ভীষণভাবে আত্মশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া মনে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথের। গতকাল সারারাত জুড়ে মনে পড়েছে। আজীবন হয় তো মনে পড়বে। যখনই সংসারকে একটু দূর থেকে দেখার দরকার হবে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন মৃত্যুর কয়েক মাস আগে। ১৯৪১ সালের, ফেব্রুয়ারী মাসে।


"বিরাট সৃষ্টির ক্ষেত্রে

আতশবাজির খেলা আকাশে আকাশে,

সূর্য তারা ল'য়ে

যুগযুগান্তের পরিমাপে।

অনাদি অদৃশ্য হতে আমিও এসেছি

ক্ষুদ্র অগ্নিকণা নিয়ে

এক প্রান্তে ক্ষুদ্র দেশে কালে।

প্রস্থানের অঙ্কে আজ এসেছি যেমনি

দীপশিখা ম্লান হয়ে এল,

ছায়াতে পড়িল ধরা এ খেলার মায়ার স্বরূপ,

শ্লথ হয়ে এল ধীরে

সুখ দুঃখ নাট্যসজ্জাগুলি।

দেখিলাম, যুগে যুগে নটনটী বহু শত শত

ফেলে গেছে নানারঙা বেশ তাহাদের

রঙ্গশালা-দ্বারের বাহিরে।

দেখিলাম চাহি

শত শত নির্বাপিত নক্ষত্রের নেপথ্যপ্রাঙ্গণে

নটরাজ নিস্তব্ধ একাকী।"

Friday, March 8, 2024

সময়ের এক খন্ড

 আজকে তোমাকে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করার দিন। যে তোমার সারাটা জীবন গেল সংসার সামলাতে সামলাতে। ছেলেমেয়ে মানুষ করতে। আজকে তুমি যদি খবরের কাগজ পড়ো, দেখবে তুমি ভীষণভাবে ব্যর্থ। কারণ তুমি তোমার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারোনি। তুমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নও। তুমি একটা জীবনে স্বামী নির্ভর। পরের জীবনে সন্তানের উপার্জনের উপর নির্ভর। তোমার কোনো উচ্চাকাঙ্খা নেই। তোমার স্বাধীনতা নেই। তুমি ব্যর্থ।


     অথচ আমার সমস্যা হল আমি তোমাকেও দেখেছি। ট্রেনে, বাসে, রাস্তায়ঘাটে। পরিবারের সঙ্গে। একাও। কোনো অফিস-কাছারি-ব্যবসা ইত্যাদিতে যাচ্ছ না। যেখানে গেলে আলোচনা হয়, গৌরবের ছটা এসে পড়ে মুখেচোখে। তুমি হয় তো বাজারে যাচ্ছ, তুমি হয় তো কোনো অসুস্থ আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবকে দেখতে যাচ্ছ, কিম্বা পুজো দিতে যাচ্ছ। আমি তোমাকে দেখেছি। অনেকবার দেখেছি। বেশি বেশি দেখেছি। ব্যর্থ তোমাদের দেখেছি। 


   তোমরা ভীষণভাবে ব্যর্থ। কারণ তোমাদের নিয়ে আলোচনা করা যায় না। তোমাদের নিয়ে আলোচনা তখনই হতে পারে যদি তোমরা স্বামী-পুত্র-শাশুড়ি-শ্বশুর-দেওর ইত্যাদি দ্বারা অত্যাচারিত হও। তোমরা যদি পরকীয়ায় জড়াও। তোমরা যদি আত্মহত্যা করো। তখন তোমরা মানুষের আলোচনার ভাষায় স্থান পাও। নইলে তো তোমারা নেই। মাটির মত নেই। আকাশের মত নেই। যতক্ষণ না মাটিতে জন্মায় ঢিবি, হোঁচট খেয়ে পড়ি। যতক্ষণ না আকাশ ঘিরে আসে কালবৈশাখীর মেঘ, বৃষ্টিতে ভিজে মরি, কী বাজের ভয়ে মরি। 


    তোমাদের ওই সঙ্কীর্ণ গলিখুঁজি জীবনে যে কোনো স্বাভাবিক সুখ আছে, মর্যাদা আছে আজকের দিনে আমাদের বিশ্বাস হয় না। পরিবারের মর্যাদা শুধু অর্থ উপার্জনে, অথবা তার বিনিময়ে গায়েগতরে খেটে পুষিয়ে দিয়ে। আরো খারাপ কথাও শুনেছি। আদিরসের ইঙ্গিতপূর্ণ। থাক। বলতে ইচ্ছা করল না। কারণ তার মধ্যে আমার মা, ঠাকুমা শুধু না, আমার এত এত আত্মীয় পড়বেন যাদের কোলেপিঠে আমি মানুষ হইছি। যাদের স্নেহতে এই পৃথিবীর আলো, মাটি, বাতাস, ঈশ্বর মধুময় হয়েছে। যাদের হাত ধরে এই এত বড় বিশ্বের মুখোমুখি হয়েছি। যাদের সুখ, আত্মমর্যাদার বোধ, আনন্দের আঁচল আমাকে এতদিন অবধি মানুষের উপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছে। সেকি কয়েকজন মৃত মহান মানুষদের বাণী পড়ে হয়েছে গো? একদম না। আমি ঘরে বাইরে যে শক্তির জোরে হেঁটেছি সে তাদের দেওয়া শিক্ষার জোরে। হীনমন্যতায় ভোগা মানুষের কি কাউকে আলোর রাস্তা দেখানোর ক্ষমতা থাকে? না তো। 


   কিন্তু এ সব কথা বলার নয় আজ। আজ পরিবারের কথা বলতে নেই। আজ পরিবারকে গৌণ করে নিজেকে মুখ্য ভাবার দিন। তবেই তুমি সার্থক। আসলে আমি স্কিম অতটা বুঝি না। আমি বাস্তব বুঝি। এত এত সহস্র সহস্র তোমরা, যারা পরিবার নিয়ে সুখে আছ, আত্মমর্যাদায় বেঁচে আছ তাদের যখন উপেক্ষা করে একটা কর্পোরেটমার্কা কৃত্রিম উৎসবের হইহই হয়, আমার মনে হয় কোথাও একটা বড় মিথ্যা কিছু হচ্ছে। একটা বড় অংশের মানুষকে একদম এক রেখার টানে উপেক্ষা করা হচ্ছে। গৌরবহীন করে দেখা হচ্ছে। একপেশে গল্পের মোড়কে পুরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখানো হচ্ছে।


     সব সমাজের একটা নিজস্ব ধারা আছে। সে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু তাকে ধরেবেঁধে অন্য একটা সমাজের রীতিনীতির মত করে গড়ে তুললেই কি তার আধুনিকিকরণ হয়? নিজস্বতা হারিয়ে অন্যকে অন্ধের মত অনুকরণই কি আসলে উন্নতির রাস্তা?


     আরো ভয়ংকর কথা বলি। আরো ভয়ংকর। আমি তো তোমাকেও দেখেছি যে কোনোদিন বাইরে কাজে আসতে চাওনি। কি ভয়ংকর না? কি ভীষণ পিছিয়ে যাওয়া, ধিক্কার জানানো মানসিকতা না? ছি!! হ্যাঁ আমিও ওদের সঙ্গে একটা “ছি” লিখে দিলাম। 


    লিখব নাই বা কেন? সারাটা বিশ্ব যখন মেয়েদের স্বনির্ভর হতে শেখাচ্ছে, কে না চায় অর্থনৈতিক স্বনির্ভর না হতে? এ তো শুধু নারীত্বের অপমান না, মনুষ্যত্বেরও অপমান।  


   কিন্তু তবু দেখেছি তোমাকে, যে “বাধ্য” হয়ে কাজ করতে বেরিয়েছ। যার মন লাগে না পরিবারের বাইরে। যে শুধু উপায় খোঁজে আবার কী করে আগের জীবনে ফিরে যাওয়া যায়। আমি তোমাকেও দেখেছি। বর্তমানের ট্রেণ্ডের হাওয়া গায়ে না লাগা তোমাকেও দেখেছি। অজস্রবার দেখেছি। 


      আসলে কী জানো, স্বাধীন চিন্তা একটা শব্দ। বাস্তব না। আমাদের স্বাধীন চিন্তা মানে বৈষয়িক লাভের চিন্তা। গ্ল্যামারের চিন্তা। ট্রেণ্ডে গা ভাসানো চিন্তা। মানুষের ইচ্ছার মর্যাদাই যে স্বাধীন চিন্তার ভূমিতল, সেটা ভুলে যাই। তোমার ইচ্ছা যদি আমার ইচ্ছার অনুকূল না হয়, তবে তুমি ব্যর্থ। আবার আমার চিন্তা যদি ভীষণভাবে সেলিব্রেটেড হয়, তবে তো তোমার অবস্থা আরো করুণ। কারণ সেলিব্রেশান ঠিক করে যে মার্কেটিং এর মানদণ্ড, সেখানে ইচ্ছার মর্যাদার চাইতে স্ট্যাটেসটিকস’এর কদর বেশি, হাততালির কদর বেশি, সেখানে আলোড়ন তুলতে না পারলে তুমি ঘিনঘিনে এক ঘেঁয়ে। আলোড়ন তোলাই সেখানে জীবনের সেলিব্রেশানে একটা দিক। 


     আজ শিবরাত্রি। তোমাদের মত ব্যর্থ প্রাণেরা স্বামীপুত্রর জন্য না খেয়ে উপোস করো। ছি ছি। শিবলিঙ্গে জল/দুধ ঢালো। (যে দুধ ঢালা আরেকটা আলোড়ন জাগানো বিতর্কের বিষয়, এখানে সে আলোচনা নয়।)  তোমাদের দেখে আমরা লজ্জা পাই। তোমাদের উপর আমাদের উপেক্ষার পর্দা ঢাকি। আমরা সেই সব প্রজন্মের মানুষ যেখানে আমরা প্রতি মুহুর্তে নিজস্বতায় বাঁচি। পরিবার আমাদেরও আছে। আমাদেরও শখ আহ্লাদ আছে। আমাদেরও স্বামী-সন্তান নিয়ে সময় কাটানোর ইচ্ছা হয়। তবে তার জন্যে তোমাদের মত গোটা জীবনটাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বসি না। দাসত্ব করি না কারো। তোমার ও মর্যাদা, তোমার ও সুখ সব পুরুষতন্ত্রের উচ্ছিষ্ট। তুমি তাতেই সুখী, দেখে আমার ঘেন্না হয়। আমাদের এই প্রজন্মকে তোমরা বুঝবে না। আমাদের দেখে তোমাদের নিশ্চয়ই দীর্ঘশ্বাস পড়ে, ঈর্ষায় বুক জ্বলে যায়, নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের এই মা-ঠাকুমা-দিদিমার প্রথাগত জীবন বাঁচতে বাঁচতে, “প্লেইন হাউজওয়াইফ” পরিচয়ে বাঁচতে বাঁচতে, বাড়ির হাজার গঞ্জনা-লাঞ্ছনা সহ্য করতে করতে আত্মগ্লানির শেষ ধাপে বেঁচে আছ? অন্তত আমি তো জানি এ সত্যি। আমি জানি কোনো ক্রাইসিসে কী ভাবে তোমরা ভিখারির মত স্বামী-সন্তানের কাছে হাত পাত। ছি! আজকের দিনটা অন্তত আমাদের লজ্জা দিও না প্লিজ। আজকের দিনটা অন্তত নিজেকে আড়ালে রাখো। কাল থেকে এ নিয়ে আর আলোচনা হবে না। কে শুধু পরিবারের পাঁকে বসে ব্যর্থ জীবন বাঁচে আর কে সাফল্যের মিনারে বসে আলোকিত জীবন বাঁচে সে নিয়ে আলোচনা হবে না। 


       চারপাশের এই গ্ল্যামারহীন, খবরের কাগজে ছাপার যোগ্য জীবনযুদ্ধহীন, সাধারণ, অতিসাধারণ জীবনগুলোর নিত্য জীবনের যে ছোটো-ছোটো লড়াই, ছোটো-ছোটো লাভ-ক্ষতি, জন্ম-মৃত্যু, উৎসব-বিষাদে ঘেরা জীবন, সবকে অর্থহীন বলি, এতবড় অর্থ জীবনে খুঁজে পেয়েছি? আমি তো পাইনি। সত্যকে সব সময়েই দুই চূড়ান্তের মধ্যখানে ক্ষীণ স্রোতের মধ্যে বয়ে যেতে দেখেছি। আমার প্রণাম সেখানেই গিয়ে মিশেছে। কারণ আমি নিজেকে প্রণম্য ভাবি না। সফল ভাবি না। আবার ব্যর্থ, “লুজারও” ভাবি না। আমি আছি সময়ের এক খণ্ডে, যেখানে ভাগ্য আর বাস্তবের সঙ্গে নিজের বোধের তালমিল খুঁজে চলেছি। এ কি এতটাই হেয়?

Thursday, March 7, 2024

নরম চটি

পায়ে নরম চটি পরলে ব্যথা হয় না পায়ে। এ আমিও জানি, আমার পা-ও জানে। পায়ের তলায় নুড়ি পড়লে, মন উল্লাসে নেচে ওঠে, যেন প্রতিশোধ নেওয়া গেল। হাঁটতে হাঁটতে বলি, দেখ কেমন লাগে। ব্যথা দিতে পারলি? পারলি না তো!


   সগর্বে এগিয়ে যাই। রাস্তার ঢেলা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, দেখছি পরের দিন আয়। 


      আসলে সংসারে যাদের ব্যথা দেওয়ার ক্ষমতা থাকে তাদের উপর আমাদের একটা অদ্ভুত আকর্ষণ থাকে। মন বারবার বলে, কী এমন ক্ষমতা আছে ওর, কী করে পারে?  


     নরম চটির তলায় নুড়ি পড়ে। পায়ে অনুভব হয়। কিন্তু ব্যথা লাগে না। বিজয়ীর আনন্দ মনে। রাস্তা পড়ে আছে সামনে অনন্ত, কিন্তু মন পড়ে আছে নুড়ির খোঁজে। কী রহস্যময় মন।


    যুধিষ্ঠিরকে নারদ বলেছিলেন, সংসারের রাস্তায় কাঁটাময় পথ। সন্তোষের চটি পরে হাঁটো। কাঁটা ফুটবে না। 

     

   সন্তোষ সাধনার ফল। আঘাতে বিষাদ জন্মায়। প্রত্যাঘাতের ইচ্ছার উষ্মা সরিয়ে সন্তোষ জন্মায় কই? 


  জগন্নাথ মন্দিরের বাইরে এলাম, চটি নেই, কোথায় খুলেছি মনে নেই। চারদিকে কাজ হচ্ছে রাস্তায়। উঁচুনীচু, এবড়োখেবড়ো। হাঁটতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। এত আকুলভাবে জগন্নাথকে ডাকিনি মন্দিরে এই খানিক আগে, যতটা আকুলতা নিয়ে চটি খুঁজছি। 


  বেশ খানিকবাদে পেলাম। উফ! শান্তি, শান্তি, শান্তি। চটির রঙ না, চটির ব্র‍্যাণ্ড না, চটির অবস্থা না, কিছুই দেখার নেই তখন। সে আমাকে ব্যথার হাত থেকে বাঁচাবে, ব্যস, এতটাই। রাস্তার নুড়িপাথরকে তো বলতে পারি না, সরে যাও। কিন্তু চটিকে বলতে পারি, কাছে এসো। 


    আকুল হয়ে একদিন এমনিই একটা অদৃশ্য চটি খুঁজব। একদিন বুঝব নুড়িপাথর, এবড়োখেবড়ো রাস্তা শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু ওই চটিটা চাই। যেমন চটিটা না চাইলেও পায়ে চটিটাকে গলিয়ে নিই, আঁকড়ে থাকি পায়ের সঙ্গে, যেন ছিটকে না যায়। তখন যারা ব্যথা দেয় তাদের প্রতি আর কোনো আকর্ষণ নেই। ব্যথাকে অনুভব করব, নরম চটির তলায় নুড়ির মত, কিন্তু তাকে ঘরে ডেকে তুলব কেন? ব্যথা কি কখনও নিজের হয়?

Tuesday, March 5, 2024

ডিএনএ সূত্রে বাঁধিয়াছি সকল মানব

 


ধর্ম রচনা করা যায় না। ধর্ম রচিত হয়। মানুষকে বেঁধে রাখার জন্য ধর্ম লাগে না। মানুষ বোধের স্বচ্ছতায় এসে পৌঁছালে নিজে থেকেই সবার সঙ্গে ধরা পড়ে। একসূত্রে। তাই কোনো আলোকিত, উদারচেতা মানুষ হিংসার কথা বলেননি আজ অবধি, এবং এও সত্য, কোনো বাণী, বা কোনো পবিত্র বই, বা কোনো পবিত্র মানুষ নির্ভরও নয় ধর্ম। ধর্ম স্ব-প্রকাশ। স্বচ্ছ বোধের কাছে একমাত্র। 


     'স্বচ্ছতা' আর 'স্পষ্টতা'র মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। আমি কিভাবে একটা জাতকে ধ্বংস করে দেব প্রতিষ্ঠিত কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ বিশ্বাসের জন্য, যাকে প্রচলিত ভাষায় ধর্ম বলে, সে বিষয়ে আমার স্পষ্ট ধারণা থাকতে পারে। কিন্তু তা আমার স্বচ্ছ চেতনার মাপকাঠি নয়। অথচ ইংরেজিতে দুটো শব্দেরই অর্থ, 'ক্ল্যারিটি'। 


     মানুষের মধ্যে সেই বড় আমি'টাই স্বচ্ছতা। তার ছোটো আমি'টা সমস্যা। ছোটো আমি যখন বড় আমি'কে কল্পনা করে, তখন সে ভাবে তার দশটা হাত, তার অমানুষিক শক্তি। সে তখন ‘বিগ ব্রাদার’ সিন্ড্রোমের শিকার। তার একজন বড়দা আছে। যাকে তুষ্ট করে চললেই জগত তুষ্ট হয়। তখন সেই ছোটো আমি যাতে সে নিজে তুষ্ট, তারই পরিমাণ বড় করে, তার কল্পনার বড় আমি'কে তুষ্ট করতে যায়। তাই তার সব কিছুই আড়ম্বরপূর্ণ। সরল, সহজ কিছু নেই। 


     কিন্তু যদি কোনোদিন, কোনো শুভপ্রেরণার বশে সে নিজের ক্ষুদ্রত্ব সেই বড় আমি'র পায়ে সমর্পণ করতে চায়, তখনই সে অনুভব করে স্বচ্ছতা কাকে বলে। অভয় কাকে বলে। ভালোবাসা কাকে বলে। কারণ সে সব দিক থেকে স্বার্থবুদ্ধিরহিত তখন। একি একেবারে সম্ভব? নয়, কিন্তু যতটা পারি, ততটাতেই আমার লাভ। “তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূন্য করে” কান্নাও তাই সত্য সেখানে। 


     আজ ইতিহাস বিজ্ঞানের দরজায় এসে নিজেকে আরো প্রসারিত করেছে। আমি বিজ্ঞান অর্থে বিজ্ঞানই বলছি। যদি পদার্থ বিজ্ঞান অর্থে কেউ বলে যা দিয়ে পারমাণবিক বোম বানানো যায়, কিম্বা কম্পিউটার সায়েন্স মানে যা দিয়ে ডিপফেক বানানো যায়, সে বিজ্ঞান নয়। 


     ইতিহাসের অন্বেষণ বিজ্ঞানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষ নিজের উৎস খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেছে পৃথিবীতে সব মানুষই আদতে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে আফ্রিকা থেকে বেরোনো মানুষেরই বংশধর। সবারই উৎস এক। তার ওয়াই ক্রোমোজম আর মাইটোকন্ড্রিয়ার ক্রোমোজম সেই সাক্ষ্যই বহন করছে। 


     কিন্তু এই জ্ঞান কি আমাদের হিংসা, দ্বেষ কমাতে বিন্দুমাত্র সাহায্য করেছে? আজও আমার জাত, আমার ধর্ম, আমার শিল্প-সাহিত্য তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার লড়াই চলছে। চলবেও। এর কারণ আমাদের মধ্যে সেই আদিকাল থেকেই একটা ছোটো আমি আছে। আগে লোহায় মরচে পড়ত না, আজকাল পড়ে বলা যেমন অজ্ঞতা, ঠিক তেমন আগে মানুষ সব সভ্য ছিল, আজকাল সব বর্বর হয়েছে বলাও ঠিক তেমন। 


      মানুষের ক্রোমোজমের মধ্যে নিহিত যে একত্বের সূত্র, তার থেকেও গভীরের সূত্র তাই মানুষের আত্মায় নিহিত একত্রের সূত্র। আত্মা অর্থে কোনো বস্তু না। আত্মা এই চিত্তের স্বচ্ছতা। তাই তাকে আগুন দহন করতে পারে না। অস্ত্র আঘাত করতে পারে না। জল সিক্ত করতে পারে না। কিন্তু লোভ-ক্রোধ তাকে ঢেকে ফেলতে পারে। বিদ্বেষের উন্মাদনা কালবৈশাখীর মেঘ যেমন নির্মল নীল আকাশকে ঢেকে দেয়, তেমন ঢেকে দিতে পারে। 

     

     এ স্বচ্ছতাতে উপনীত হতে গেলে কি সাধনা করতে হয়? প্রশ্নটাই ভুল। তাই এর সব উত্তরগুলোও ভুল। স্বচ্ছতাতে উপনীত হওয়া যায় না। নিজের মধ্যের মলিনতা গেলেই সে আপনি নিজেকে প্রকাশ করে। মরমী কবি বলেন চোখের জলে সে আসে। অবশ্যই সত্য। আজ যে যুদ্ধের পৈশাচিকলীলা দেখছি, তা দেখে যাদের চোখে জল আসার কথা আসছে না বলেই এ থামছে না। নইলে যুদ্ধ থামার কত তত্ত্ব, যুদ্ধ চলার কত কারণ পাতার পাতা লেখা হচ্ছে, বই ছাপা হচ্ছে, তার মার্কেটিং চলছে, পুরষ্কার দেওয়া নেওয়া চলছে। কত শক্তিশালী ছোটো আমি'র বোধ ভারতের মাটিতেই বিয়ের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উল্লাসে মাতছে, যেখানে কয়েক কিলোমিটার দূরে শিশুর রক্তে ভিজে আছে মাটি। হা ঈশ্বর! এতটাই নির্লজ্জ আমরা। আর আমাদের শিক্ষা-সভ্যতার গর্ব। 


     বড় আমি'তে থিতু হওয়া মানে সমাধিতে যাওয়া না, অতীন্দ্রিয় অনুভবের মাদকতায় ডুবে যাওয়া নয়, নানা অলৌকিক দর্শন আর ক্ষমতার ভুলভুলাইয়ায় হারিয়ে যাওয়া নয়। বড় আমি'তে থিতু হওয়ার অর্থ অন্যের যন্ত্রণা নিজের যন্ত্রণায় অনুদিত হওয়া। তারপর তার প্রতিকারের জন্য সরব হওয়া। এটাই ধর্মের অন্তিম স্টেশান। আত্মলাভ। আত্মসাক্ষাৎকার। সেই স্বচ্ছতায় স্থিতিলাভ করা।


     অ্যানার্কিজম একটা বড় কথা। যাকে অনেকভাবে ব্যবহার করা যায়। যার একটা বড় অর্থ, সমাজের এই নানা ভ্রষ্ট অথোরিটি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস। সত্যজিৎ তার শেষ তিনটে সিনেমায় যা বলতে চেয়েছিলেন। ওই তিনটে সিনেমা আমার কাছে ততটা সিনেমা না যতটা এক দার্শনিক অন্বেষণ। গণশত্রুতে ধর্ম আর তাকে ঘিরে রাজনীতির অথোরিটি। শাখা প্রশাখাতে সমাজের বড় বড় মাথাদের অথোরিটি। আর সব চাইতে চূড়ান্ত তর্ক হল, আগন্তুক, যেখানে আধুনিক সমাজের এক কপট নিরীহতার মুখোশের অথোরিটির বিরোধ। যেখানে শেষ দৃশ্যে আদিবাসীদের কাছে ফিরে দাঁড়াচ্ছে আধুনিক সমাজ। নব্বই সালে একটা দার্শনিক তর্ককে ঘিরে সিনেমা হচ্ছে, হয় তো ভাবা যায় না! 


     ডেভিড গ্রেবিয়ার আর ডেভিড ওয়েংরোর আলোড়ন জাগানো লেখা, ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ যে অ্যানার্কিজম-এর কথা বলে, নোম চোমস্কি যে অ্যানার্কিজম এর কথা বলে, সে ধ্বংসলীলায় মেতে সব লণ্ডভণ্ড করে দেওয়া না। বরং নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে যা মিথ্যা, যা তথ্য আর পরিসংখ্যানের চাতুরী তার মুখোশ খুলে ফেলা। সত্যজিৎ রায় অনেকটা এই ধরণের ইঙ্গিতই দিচ্ছেন, কি হবে না দাদুভাই? কূপমণ্ডূক। যত এক্সপ্লয়েটিভ অথোরিটেটিভ অ্যাটিচিউড, তাই এক কূপমন্ডুকতাতেই জন্মায়। কারণ কুয়োর মধ্যে এক তামসি নিশ্চিন্ততা আছে, আশ্বাস আছে। কিন্তু স্বচ্ছতা নেই। স্পষ্টতা আছে। আবারও মনে করিয়ে দিই, দুটোর অর্থই ইংরাজিতে 'ক্ল্যারিটি'। অনেক সময়েই স্পষ্টতা দিয়ে স্বচ্ছতাকে ঢেকে দেওয়া হয়। যেমন বর্তমানের এক পণ্ডিত ব্যক্তি স্টিভেন পিঙ্কার স্ট্যাটেস্টিকস-এর স্পষ্টতা দিয়ে বর্তমান যুগকে সুখের স্বর্গ প্রমাণ করে, যাবতীয় বাকি যা কিছুকে ঢেকে দিয়েছেন। 


     আমাদের ওয়াই ক্রোমোজমে পিতৃপক্ষের একত্বের সূত্র থাক, আমাদের মাইটোকন্ড্রিয়ায় মাতৃপক্ষের একত্বের সূত্র থাক, কিন্তু বোধের স্বচ্ছতায় না এলে সব অর্থহীন। 


     আফ্রিকাগত সেই মানবগোষ্ঠীর এক অংশ এই ভারতের মাটিতে একদিন অনুভব করেছিলেন এই সত্যকে। বলেছিলেন, 


     অয়ং নিজঃ পর বেত্তি গননা লঘুচেতসাম।

     উদারচরিতাং তু বসুধৈব কুটুম্বকম।।


     ক্ষুদ্রচিত্তের কাছে 'আমি' আর 'তুমি'র ভেদ। কিন্তু উদার চিত্তের কাছে গোটা বিশ্বই এক আত্মীয়তার সুতোয় বাঁধা।

   

     এর পরের শ্লোকের উপদেশ, সব সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মের মধ্যে পরম স্বাধীনতায় থিতু হও। 

  

     ব্রহ্ম অবশ্যই কোনো অতীন্দ্রিয় শব্দ নয় এখানে, একটা বোধের নির্দেশ, যা নিজেকে সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত করলেই পাওয়া যায়।


(ছবি আন্তর্জালতন্ত্র)

Thursday, February 29, 2024

বাঙালির দিনবদল

 পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কঠিন সময় এখন। কোনদিকে যাবে, কার দিকে ভরসায় তাকাবে, এ ভেবে আকুল, বিশেষত ভদ্রকূল। 


     সবাই জানেন, বঙ্গে ‘ভদ্রলোক’ বলে এক বিশেষ শ্রেণী আছে। বাঙলার তথা বিশ্বের যাবতীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসাবে যাদের এককালে খ্যাতি ছিল। এখন খ্যাতি হারিয়েছে, যে যা খুশী এসে বলে যাচ্ছে বাইরে থেকে। মায় ঘরে ঢুকে বলে যাচ্ছে। ভদ্রশ্রেণী প্রতিবাদ করছে। কিন্তু আওয়াজ পাশের পাড়া অবধি পৌঁছাচ্ছে না।


     তো কথাটা হল, ভীষণ সংকটের সময়ে দাঁড়িয়ে বঙ্গ। বঙ্গে রাজনীতিতে একটা বড় মুদ্দা হল, সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতি কি ওরা বোঝে? ইত্যাদি। বেকারত্ব নয়, দুর্নীতি নয়, স্বাস্থ্য নয়। যতবারই ভোট আসে ততবার এই একটা জিনিস নিয়েই বাঙালি গেল গেল রব তোলে, সেটা হল তার সংস্কৃতির গর্ব। সে যতই এখন 'জলসাঘর’ সিনেমার ছবি বিশ্বাসের মত অবস্থায় পড়ুক না কেন, তবু গর্ব আছে। আমাদের সত্যি অর্থে এখন সংস্কৃতি সে অর্থে নেই, কিন্তু তার জীবাশ্মটা আছে। আর মাঝে মাঝে সেই জীবাশ্মে আমাদের বাৎসরিক দীপ-ধুপ দেখানোর রেওয়াজও আছে। 


     এখন বাঙালি সমাজে অনেক আয়রনির মধ্যে দুটো আয়রনি ভীষণ প্রবল। 


     এক, বাঙালি দুর্গা অন্ত প্রাণ। তাই দেখা যায় অবাঙালি যত সিনেমা-সিরিয়ালে বাঙালিদের দেখায় বাড়িতে দুর্গাপ্রতিমা, পাড়ায় পাড়ায় দুর্গামন্দির ইত্যাদি। 


     আরেকটা হল, বাঙালির রাজনীতি অবসেসান। কথাটা হল আমাদের মধ্যে রাজনীতি বিশেষজ্ঞ যে মাত্রায় আছে, সে মাত্রায় সক্রিয় রাজনীতির লোক কোথায়?


     বাংলায় অনেক বদল এসে গেছে। সমাজে। একদিন বাংলায় রাজনীতে বাম আদর্শে বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে এসেছিল। বাঙালির একটা নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছিল। তার ছাপ সঙ্গীতে, সিনেমায়, সাহিত্যে পড়েছিল। তাই হয়। কোনো সামাজিক পরিবর্তনই একমাত্রিক হয় না। ভালো-মন্দ দু'দিকেই তার প্রভাব পড়ে। পড়েওছিল তাই। 


     ক্রমে দিন বদলালো। সে আদর্শের উপর তরুণ তরুণীর আস্থা বা রোম্যান্টিসিজম আগের মত আর থাকল না। কেন থাকল না তার জন্য একটা বিশদ আলোচনা হতে পারে। অনেক অনেক ফ্যাক্টর কাজ করল। কিন্তু যে পরিবর্তনই হোক না কেন, শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের ছেলেমেয়ে আর আগের মত সক্রিয় রাজনীতিতে এলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডীর মধ্যে অনেক কিছু হল, কিন্তু সে আর পরিণত রাজনীতিতে এলো না। আমাদের মানসিকতা তখন ঝুটঝামেলা এড়িয়ে, একটা নিশ্চিত জীবনে বাস করার উপর। বছরে দু' কি একবার বেড়াতে যাওয়া, মাঝারি মাপের নার্সিংহোমে চিকিৎসা করাবার মত আর্থিক সঙ্গতি, আর কিছু বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, যেমন রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা, দুর্গাপুজো, কালীপুজো ইত্যাদি। 


     ক্রমে আইটিমুখী তরুণ প্রজন্ম হল। আরো সহজ হল মধ্যবিত্তীয় জীবনধারাকে কায়েম রাখা। যেহেতু আরো সহজ হল, আরো তথাকথিত গ্লোবাল মার্কেটে যাতায়াত হল, তত ‘সংস্কৃতির’ উপর টান কমল। রইল কিছু মধ্যবিত্তীয় বিলাস, শখ। কিন্তু এর মধ্যে রাজনীতি নিয়ে তর্কাতর্কি বন্ধ হল না। সে চলতেই থাকল। যদিও তরুণ প্রজন্মের এক বৃহৎ অংশ এই ব্যাপারে উদাসীন। 

  

     এখন সমস্যা হল আমি রাজনীতি নিয়ে উদাসীন হলে কি হবে? রাজনীতি তো আমাকে নিয়েই। আমি ডিঙিই চালাই, কি বিলাসবহুল বজরা, নদীর স্রোতের গতি আমাকে প্রভাবিত তো করেই। সেটার উপর উদাসীন থেকে আমি নিজেকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারি? 


     এখন সারা বিশ্বে এক দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান হচ্ছে। কেন হচ্ছে, তার ব্যাখ্যাও এক-এক দেশে এক-এক রকম। যে কারণে মার্কিন মুলুকে দ্বন্দ্বটা বাইডেন বনাম ট্রাম্প হয়ে এসেছে। সে অবস্থাও খুব আশাপ্রদ নয় তাদের সমাজেও।


     এখন ভারতের এক-এক রাজ্যে রাজনীতির রসায়ন এক-এক সমীকরণে চলে। বঙ্গে দীর্ঘদিন বামপন্থী রাজনীতি একটা কাঠামো তৈরি করেছে। তারপর তৃণমূল এসেছে। যতটা নতুনের আগমনের সমাজ উৎফুল্ল হয়েছিল, তার থেকে বেশি আমোদিত হয়েছিল পরিবর্তনে। কিন্তু যে সময়ে এই পটভূমিকা বদলাচ্ছে তার কয়েক দশক আগে থেকেই শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম সক্রিয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। কোনো আদর্শগত ভাবধারা দিয়ে বাঙালি সমাজ তখন পুষ্ট নয়। সবটা ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। 


     এমন সময় কেন্দ্রীয় সরকার আর রাজ্য সরকারের সংঘাত। যা কোনো সাংগঠনিক ইস্যু নিয়ে নয়। সবটাই দুর্নীতি নিয়ে। করাপশন নিয়ে। 


     এইখানে বাংলার সমাজের সঙ্গে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় ভাবধারার একটা বড় অমিল। বাঙলায় ধর্মের ব্যাপারটা অন্য ধারার। বেশ কয়েক বছর ধরে হিন্দিভাষী তরুণদের মধ্যে একটা বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। তারা পোশাকে, আচার-আচরণে, সাজে অনেক বেশি হিন্দু সেন্টিমেন্টের কাছাকাছি আসছে। যেমন তারা পায়জামা, পাঞ্জাবি পরে রিল বানাচ্ছে, মন্দিরে বেশি বেশি যাচ্ছে, মিডিয়াখ্যাত নানা সাধু, বাবাজী, গুরুদের আশীর্বাদ নিচ্ছে, নানা বিষয়ে নিজের অধ্যাত্ম বিশ্বাস, চিন্তাকে প্রকাশ্যে ব্যক্ত করছে। হয় তো একেই প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ভারতীয় তরুণ প্রজন্ম হীনমন্যতা ছেড়ে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে। 


     কিন্তু এই কাজটার সঙ্গে বাঙালির ভাবনার পার্থক্য আছে। এক, বাঙালির দেশাত্মবোধ আর হিন্দুত্ব সেন্টিমেন্টের বোধ এক সমীকরণে বসে না। বাঙালির দেশাত্মবোধে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী, চিত্তরঞ্জন প্রমুখের উপস্থিতির জন্য তার সেণ্টিমেন্টটা অনেকটা সেক্যুলার। দেশকে মা বললেও, তাকে চণ্ডীর আদ্যাশক্তির সঙ্গে এক করে দেখে না। 

   

     দ্বিতীয়, বাঙালির ধর্মবোধ কোনো কেন্দ্রীয় গ্রন্থে গ্রথিত নয়। যেটা হিন্দীভাষীদের ক্ষেত্রে রামচরিতমানস। তার দোঁহা সে দিকে ভীষণ জনপ্রিয়। লোকের মুখে মুখে জীবন্ত। আমি ধর্ম বলতে সেন্সাস বলছি না, সক্রিয় ধর্মের অনুষ্ঠান বলছি। বাঙালি সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় গ্রন্থের অনুশাসনে নেই। নানা গুরুতে বন্টিত সমাজ। রামকৃষ্ণ, অনুকূল ঠাকুর, লোকনাথবাবা, হরিচাঁদ, চৈতন্যদেব প্রমুখদের নানা গোষ্ঠী আছে। এবং কথামৃত আর চৈতন্যচরিতামৃত বাদ দিয়ে সে অর্থে তেমন কোনো গ্রন্থও বাঙালি সমাজকে প্রতিষ্ঠিত ধর্মের দিক দিয়ে প্রভাবিত করেনি।


     আরেকটা কথা হল, হিন্দিভাষী সমাজের অধ্যাত্মিক তৃষ্ণা যেমন তুলসীদাস মিটিয়ে চলেছেন, বাঙালি সমাজের সে তৃষ্ণা তেমন মিটিয়ে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার গান দিয়ে। কিন্তু সে তো কোনো প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত না যা দিয়ে লোককে বাঁধা যাবে।

   

      শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজকে তাই রাজনীতির কোনোদিকই আজ আর আকর্ষণ করে না। না, বাম আদর্শ। না তুলসীদাসের ধর্মীয় আবেগ। এই শূন্যস্থানকে কতদিন আর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিনোদনমঞ্চের কলাকুশলীদের দিয়ে কাজ চালানো চলবে? বাঙালির স্বপ্ন এখন আগের মধ্যবিত্তীয়তা থেকে যেভাবে ঊর্ধ্বগামী, যেখানে এসি থেকে, গাড়ি, আইফোন তার হাতের নাগালে সেখানে আচমকা ‘সর্বহারা’ ইত্যাদি, সম্পদের সমবণ্টন ইত্যাদি বড় কানে শোনায়। ধর্মের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, বিশেষত হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু বলে সহজে পার পাওয়াও দিনে দিনে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে? 


     তবে একটাই রাস্তা পড়ে থাকল, সংঘাত। ভায়োলেন্স। আদর্শ না। শিক্ষিত মানুষের ইস্যু বা মুদ্দাকেন্দ্রিক সাংগঠনিক তর্কবিতর্ক নয়। জোর যার মুলুক তার। ভায়োলেন্স সব সময়েই মিথ্যা থেকেই জন্মায়। মিথ্যা থেকে ভয়। ভয় থেকে ভায়োলেন্স। এই আদি পথ। তাই সবাই আজকাল জোর গলায় বলে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটে যা ভায়োলেন্স হয়, তা দেশের আর কোথাও হয় না। 


     কথাটা সত্যি। কিন্তু এটা লক্ষণ। কারণ আমরা। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের সাবধানী করে বিদেশে পাঠাচ্ছি, দক্ষিণভারত, পশ্চিমভারত পাঠাচ্ছি। জানি সেখানে সব “সিকিওর”। এখানে কি আছে? বলে হাপিত্যেশ করছি। কিন্তু তার দায় যে আমাদেরও, সেটা কি ভেবেছি? এখন আমরা তুলসীদাসের ভাবাবেগকে আপন করব, না বর্তমান সরকারকে আধাবিশ্বাসে মেনে নেব, না আর কোনো বিকল্প ভাবব? চণ্ডীমণ্ডপে বসে রাজনৈতিক তরজাতেই শিক্ষিত তরুণ সমাজ থাকবে, না কি সংসদে প্রবেশের লড়াইয়ে নামবে? বড্ড দেরি হয়ে গেছে না?

Sunday, February 25, 2024

খাঁটি ভ্রম, না বাজারি ভ্রম?

"একটাও বৃক্ষকে উৎপাটিত না করে, অরণ্যকে ধ্বংস করে ফেল। অরণ্য হতেই ভয়ের উৎপত্তি হয়"। 

                                        - বুদ্ধ


     শূন্যস্থান বলে কিছু কি রাখা যায়? যায় না। বাড়ি দীর্ঘদিন ফাঁকা রেখে গেলে ঝুল, পোকামাকড়ে ভরে থাকে। তেমনই আমাদের মন-বুদ্ধি। যেটা ধরো স্পষ্ট করে বুঝল না, অমনি সেই ফাঁকা জায়গাটাকে কল্পনায় ভরে নেবে। তার জন্য যে একটা সচেতন চেষ্টা করতে হবে তা নয়। নিজের অজান্তেই করে নেবে। আমি নিজেও স্পষ্ট করে বুঝব না কতটা আমার সত্যিকারের জ্ঞান আর কতটা কল্পনা। কল্পনা বলো, অনুমান বলো, সবই এক। 


      এখন দেখো, এই কাজটা তো আমাদের স্বভাবসিদ্ধ কাজ। এমন তো নয় কোনো বিশেষ রাজার আদেশে, কিম্বা কোনো সরকারের নির্দেশে, কিম্বা বিশেষ কোনো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আমাদের এমনটা হয়। এ আমাদের জন্মলব্ধ ব্যাপার। তাই সেই আদিকাল থেকে আমরা যেটাই স্পষ্ট জানতাম না, স্পষ্ট বুঝতাম, অথচ আমাদের সেই ক্ষেত্রে একটা জানার, বা বোঝার তাগিদ এসেছে, আমরা কি করতাম, ফস করে কল্পনা করে নিতাম। এক্কেবারে সত্যিকারের মত করেই। 


   দিন যত এগোতে লাগল, মানে এই আমাদের পৃথিবীতে থাকার দিন আর কি, সেটা যত এগোতে লাগল, আমাদের দেখা-শোনা বাড়তে লাগল, সেই সাথে আমরা “ভাষা” বলে একটা বেশ লেখা-বলার ব্যাপার দাঁড় করিয়ে ফেললাম, হিসাবনিকাশ করতে শিখলাম, তত আমাদের জ্ঞানের জমি বাড়তে লাগল। আর কল্পনার জমি কমতে লাগল। শুরুতে শুরুতে পৃথিবীর কয়েকটা জায়গায় অবশ্যি এই নিয়ে বেশ মারামারিও হয়েছিল। মানে কল্পনার লোকেরা নিজেদের কল্পনাটাকে এমন সাধারণ সত্য মানতে শুরু করেছিল যে তার বিরুদ্ধে যেই না সত্যজ্ঞানের লোকেরা কিছু বলতে গেল, ব্যস, অমনি হাঁইহাঁই করে তেড়ে গেল। একে তাকে মেরে, কারাগারে বন্দী করে কি সব ছ্যা ছ্যা কাণ্ড করে বসল। গ্যালিলিও, ব্রুনো এদের নাম আছে না? 


    আমি একটা কথা ফস করে লিখে ফেললাম দেখলে, ‘সাধারণ সত্য।’ কিরকম বলো তো, এই যেমন ধরো আমার বর্ণান্ধতা আছে। আমি একটা বিশেষ রঙ দেখতে পারছি না। সে রঙটাকে বলছি, নেই তো! কথাটা মিথ্যে নয়। রঙটা সত্যি সত্যিই আমার কাছে নেই। সেটা আমার ব্যক্তিগত সত্য। কিন্তু সাধারণ সত্য তো নয়! মানে সবার সত্য তো নয়। এই যেমন যদি বলি বাংলা ভাষাটাই সব চাইতে মিষ্টি ভাষা। কথাটা সত্য। কিন্তু সে আমার কানের জন্য, প্রাণের জন্য সত্য। সাধারণ সত্য তো নয়। তেমন আমি যদি বলি, এই ধরো, কৃষ্ণই হল একমাত্র ভগবান, কি আল্লাহ হল একমাত্র, বাকি সব মিথ্যা, সে-ও হল তেমন নিজের নিজের জন্য সত্য, কিন্তু তাকে সাধারণ সত্য বানাতে গেলেই ভুল হবে। বড্ড ভুল। ওই রামকৃষ্ণদেব বলছেন না, “সবাই ভাবে আমার ঘড়িটাই ঠিক চলছে। বাকি সবারটা ভুল।” কি দামী কথা ভাবো। আবার বলছেন, “সবাই নিজের নিজের মতটাকেই বড় করে বলেছে।” এও কী খাঁটি ঠিক কথা। 

  

   এই আমি আবার কোথায় চলে এলাম। দাঁড়াও আবার শুরুর কথাটায় যাই। তো যেটা বলছিলাম। আমাদের দেখা-শোনা, ভাষা নির্ভর যুক্তিবুদ্ধি-অঙ্কেটঙ্কে যত মাথা খুলতে লাগল, তত  আমাদের কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের ঠাঁই ঠাঁই লাগতে লাগল। তো এমন সময় একজন মানুষ জন্মালেন না? সক্রেটিস। কি পদবী ছিল মনে নেই। ঘোষ, কি মুখুজ্যে, কি বারুই, পাল তো হবে না। কিছু একটা ওদের দেশের হবে। তো, সেই মানুষটা বলল, এই দেশে আমিই একমাত্র জ্ঞানী। কারণ, এক আমিই জানি যে আমি কিছুই জানি না।  


  এইখানে আবার এই সক্রেটিসের সঙ্গে আমাদের রামকৃষ্ণ ঠাকুরের খুব মিল। দুজনেই একই কথা বল তো। আসলে আমাদের অহমিকা যখন বলে আমি এটা, কি সেটা জানি না, তার সঙ্গে একটা দু:খ থাকে। ইস, ও জানে, বিশ্বশুদ্ধ লোক জানে, আর আমি জানি না! কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞা যখন নিজের সীমানাকে জেনে বলে, আমি কিছুই জানি না, তার মধ্যে দুঃখ, রাগ, ক্ষোভ কিছুই থাকে না। সে কথা সে আনন্দের সঙ্গেই বলে। কারণ ওটাই সত্যজ্ঞান। 


   তো সক্রেটিস আমাদের এই এক ছটাক সত্যজ্ঞানের সঙ্গে কয়েক বালতি কল্পনা-অনুমান মেশানো কেসটা বুঝতে পেরেছিল। তাই যখনই সক্রেটিস প্রশ্নবাণে সামনের “আমি সব জানি” মার্কা লোকগুলো কোনঠাসা করে দিত, তারা পালাবার পথ পেত না। সক্রেটিস আমাদের কল্পনা-অনুমানকে প্রশ্নের ফুঁ দিয়ে দিয়ে এমন জ্বাল দিত যে অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যেত একটা ভুল তথ্যের উপর কল্পনার মেঘ জমিয়ে সে বাঁচছিল।


    তো ভ্রমটা তবে কী? কল্পনা, আর অনুমান কি ভ্রম তবে? 


 না। ভ্রম হল কল্পনা-অনুমানকে সত্যজ্ঞান হিসাবে জানার অবস্থা। সে অবস্থাটা বাইরে থেকে যতটা সরল মনে হয়, আদৌ তো তা নয়। আমাদের কত ধ্রুবজ্ঞান যে এই সংকরে তৈরি তা কেউ-ই জানি না আমরা। 


    দেখো, কল্পনা-অনুমানের একটা সুবিধা হল সে আমার ইচ্ছার পরোয়া করে। কিন্তু বাস্তব সেটা করে না। বাস্তব মানে সাধারণ সত্য। এখন বর্তমানে আমাদের এই স্বভাবের দোষটা নিয়ে ভীষণভাবে ছেলেখেলা করছে মিডিয়া। আমি নিন্দা করতে চাইছি না। কিন্তু তাদের অনেকেই ভয়েই হোক, কি আর কোনো স্বার্থের জন্যেই আমাদের আধপাকা গল্প, অর্ধসত্য গিলিয়ে যাচ্ছে। আমি নিন্দা করছি না, কিন্তু একটা চালাকি তো ওরা করছেই না! সব মানুষেরই দুর্বলতা থাকে নিজেকে ক্ষমতাবান ভাবার। আমি যা জানি সঠিকটা জানি, সত্য আমার দিকেই, এরকম একটা ভাব থাকা মানে তো একটা ক্ষমতার কথাই হচ্ছে নাকি! নলেজ ইজ পাওয়ার। কথাতেই তো আছে না? তো এরা সবাই মিলে এমন একটা গল্প আমাদের বোঝাতে চাইছে, যে আমরা স্পষ্ট করে বুঝতেই পারছি না। 


   এখানে একটা খেলা অবশ্য আছে। যখনই দেখবে কেউ তোমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করছে, মানে তুমি যাই প্রশ্ন করো, সে শুধু তোমাকে যে করেই প্রত্যয় জাগানোর চেষ্টা করছে, তখনই বুঝবে কোথাও কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। কারণ একটাই, জগতে শতকরা একশোভাগ কনভিন্সড হওয়ার মত ব্যাপার প্রায় কিছুই নেই। স্কেপটিক না হলে সত্যের ধারেকাছেও যাওয়া যায় না। অনেক স্পষ্ট কথার মধ্যে অস্পষ্ট সত্যের একটা আভাস থাকে, সেই আভাস নিয়েই আমাদের চলতে হয়। অন্তত আশু আর কোনো উপায় আমরা জানি না। অনেক জ্ঞানী মানুষ এই জন্যে গোটা জগতকে ছলনার জাল ইত্যাদি বলেছেন। কিন্তু যো হ্যায় সো হ্যায়। এই নিয়ে কান্নাকাটি করে কি হবে? 


    আর একটা কথা বলেই থামি। ভ্রম দাদা অনেক আছে। জগত জোড়াই ভ্রমের কারাখানা। কিন্তু ভ্রম আপনি জন্মানো, আর ভ্রমকে বেশ কায়দা করে জন্ম দেওয়ানোর মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। বাঁচার উপায় কি? সক্রেটিস। প্রশ্ন করতে শেখা। সব উত্তরকে প্রশ্ন করতে শেখা। সব ধ্রুবকে প্রশ্ন করতে শেখা। সব নিশ্চিতকে প্রশ্ন করতে শেখা।


   এত কথা বললাম, কারণ মিডিয়ার বাজার এখন গরম। যত ভোটের দিন এগোবে আরো গরম হবে। এখন তো আবার ইউটিউব খুললে অনেক স্বনির্ভর, স্বাধীন মিডিয়াও আসছে। ভালোই কাজ করছে তারা অনেকেই। বেশ অল্প বয়েসী ছেলেমেয়েরাই করছে। তো এই সময় আমাদের প্রশ্ন করার অভ্যাসটাকে আবার করে ঝালিয়ে নিতে হবে। কোনটা স্বয়ম্ভু ভ্রম আর কোনটা বাজারি ভ্রম, সেটা বুঝে নিতে হবে।

Monday, February 19, 2024

মেলা আর ফেরা

অবশেষে কী চায় মানুষ? অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে, অনেক ঝড়জল, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসে কী চায়? যদি তাকে তার ভাগ্য মানসিকভাবে সুস্থ রাখে শেষদিন অবধি, তবে সে কী চায়? মুক্তি? স্বর্গ? 

   সব ডাঁহা মিথ্যা কথা। চায় ছুটি। যে ছুটি মানে শান্তি। মানে আনন্দ। সে শান্তি মানে কি স্বর্গীয়, অধ্যাত্মিক শান্তি? সেও ডাঁহা মিথ্যা কথা। যদ্দিন মনে নানা আশা থাকে, যদ্দিন মনে রঙবেরঙের স্বপ্নের ফুলঝুরি ফোটে তদ্দিন ওসব অধ্যাত্মিক শান্তি, পুজোপাঠ, তীর্থ, জপতপ, প্রার্থনা, শুচি-অশুচি, আমি শুদ্ধ, তুমি অশুদ্ধ, আমি ঠিক, তুমি ভুল - ইত্যাদি ইত্যাদি করে দিন কাটায়। ওসবই ফক্কাবাজি। মনে হয় কিছু একটা হচ্ছে। আসলে কিচ্ছুটি হচ্ছে না। 

  কেমন জানো? মানে যেন সে একটা বড় মেলায় এসেছে। সেখানে নানা ধরণের খেলা। আমোদ। যার যেমন রুচি সে তেমন নাগরদোলায় চড়ে বসেছে। এটা ওটা চেখে দেখছে। একবার ভালো লাগছে, একবার ভালো লাগছে না। তিতা-মিঠা, মান-অপমান, ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ সব এই মেলার গণ্ডীর মধ্যে। ওই ধম্মকম্মো, রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষাদীক্ষা, জগত উন্নয়ন, আত্মউন্নয়ন ইত্যাদি ইত্যাদি যা বলো না কেন, সব এই মেলার চৌহদ্দির মধ্যে।

    তারপর? দেখোনি, একটা বাচ্চা, যে মেলায় এসে নানা খেলায় মেতেছিল, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনোদিন এই মেলা ছেড়ে সে যেতে চাইবে না, যেন এইখান থেকে গেলেই সে মারা যাবে, সেও একসময় সব নাগরদোলা থেকে নেমে কেঁদেকঁকিয়ে বলে, মায়ের কাছে যাব। 

    ওই, ওই, ওই হল অবশেষে যা চায় মানুষ। মুক্তি নয়, স্বর্গ নয়, চায় শুধু ফিরতে। কোথায়? যে ছবিটা সে বুকের সব চাইতে তলার কোঠরে নিজের অজান্তেই এদ্দিন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে, সেথায়। তার ছোটোবেলার কাছে। তার মায়ের কাছে। তার যাবতীয় সুখের খনি সে ছোটোবেলা। যত পা ক্লান্ত হয়, যত সে পশ্চিমপ্রান্তের দিকে আসে, তত সে বোঝে তার বুকের সেই ভিত্তি কোঠরের মধ্যে তার প্রাণভোমরা গুনগুন গান শুরু করেছে। “ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে, কী সঙ্গীত ভেসে আসে”। সে লক্ষ-কোটি স্বপ্ন, বাসনাকামনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। তারপর বেলায় রোদ উঠে কেটে যাওয়া কুয়াশার মত ধীরে ধীরে সে সব ফিকে হতে শুরু করে। সে চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে নিজেকে, আমি কোথায়? কার কাছে ফিরব? আবার সে পিছনের দিকে তাকায়। নিজের শৈশবের দিকে তাকায়। সেই তার স্বর্গ, সেই তার মুক্তি, সেই তার আদর্শ। 

    কিন্তু সবার ভাগ্যে এ উপলব্ধি আসে না। ভাগ্য ভীষণ নিষ্ঠুর হয় অনেকের জীবনে। সে মেলায় ঢোকে বটে। কিন্তু সে মেলার গভীরে নানা মানুষের ব্যবহারে, শোষণে নিষ্পেষিত হতে হতে ক্রমে বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে বসে। পাগল হয়। এমন মানুষ অনেক দেখলাম সংসার প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার হাত ধরে পার করে দেওয়ার কেউ নেই। ফ্যালফ্যাল চোখে, শূন্য দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে। তার শান্তি-অশান্তি, সুখ-দুঃখ কিছুই নেই। কারণ সে নিজেই নেই। যদি তুমি তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করো, তুমি কী চাও? সে তোমার হাত দুটো শক্ত করে ধরবে। আঁকড়ে। সভয়ে। তার সব গেছে। সব তার কাছে অস্পষ্ট। অস্বচ্ছ। সংসার পিষে দিয়েছে তাকে। অতিমূল্য চুকিয়েছে সে সংসারে। কিন্তু কেন চুকাতে হয়েছে তা সে নিজেও জানে না। 

  তাই, যদি তুমি অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এসে থাকো সংসারে। যদি দেখো তারপরেও তোমার বোধ-বুদ্ধি কাজ করছে, তবে ভাই নিজেকে ধন্য মনে কোরো। সংসারে এর চাইতে বড় পাওয়া কিছু নেই। শেষদিন অবধি বোধবুদ্ধি সজাগ থাকা ছাড়া বড় অ্যাচিভমেন্ট সংসারে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। যাওয়ার আগে অন্তিমবার এই ধরিত্রীর মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বোলো, এই যে এসেছিলাম, আর এই যে ফিরছি, এই এতটা রাস্তা যে আমি আমাকে হারাইনি, এই আমার কাছে পরম পাওয়া। 

  আর একটা কথা জানো তো, ওই সব হারানো মানুষগুলো, মানে বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোর কাছে দাঁড়িয়েও যদি একবার কানে কানে বলো, মায়ের কাছে ফিরবে? কিম্বা তার ছোটোবেলার স্মৃতির কোনো তন্ত্রীকে যদি ছুঁয়ে ফেলতে পারো, দেখবে ওই অগোছালো বোধবুদ্ধির ভিতর থেকেও তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠবে। আমি দেখেছি। বহুবার দেখেছি। এত কিছু মধ্যেও ওটা হারায়নি সে। তার ছেলেবেলার স্মৃতি। 

     তাই মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, যদি শেষদিন অবধি এই বোধবুদ্ধি নিয়ে যেতে পারি, সে-ই হবে আসল যাত্রা, সার্থক জীবনযাত্রা। আর যদি হারিয়ে ফেলি, তবে ব্যর্থ বলব না, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক তো অবশ্যই। দুর্ভাগ্যও তো বাস্তব। কিন্তু তাকে দুর্ভাগ্য হিসাবে বোঝার মানুষটা আর নেই, এইটুকুই যা সান্ত্বনা।

Saturday, February 10, 2024

একটি মৃত্যু ও একটি ঘটনা


“আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।”


     রবীন্দ্রনাথ এ লাইনটা লিখছেন ১৯১১ সাল নাগাদ। ছেলেটা মারা গেল কদিন আগে। আত্মহত্যা করল। একটা চিঠি লিখে আত্মহত্যা করল। বাবা, মা সবার কাছে ক্ষমা চাইল। কেউ কেউ হয় তো পড়েছেন। না, কোটা সিন্ড্রোমে আত্মহত্যা না। সেটা সমাজের আরেকদিক। আরেক ব্যাধির দিক। এ আত্মহত্যা সে ধরণের আত্মহত্যা নয়। ছেলেটা স্নাতকস্তরে পড়ছিল। গভীর অবসাদে চলে যাচ্ছিল, চারদিকে এত দুর্নীতি, ধর্ষণ, ধর্মীয় খেলায় রাষ্ট্র থেকে নাগরিকের উন্মাদনা, বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ইত্যাদি এই সব নিয়ে। 

     না, খুব একটা আলোচনা আমাদের এই সমাজমাধ্যমেও আমার অন্তত চোখে পড়েনি। কারণ এ প্রশ্ন, “হার্ড কোয়েশ্চেন”, “আনকম্ফোর্টেবল কোয়েশ্চেন” এর মুখোমুখি হতে আমরা অস্বচ্ছন্দ বোধ করি। ভাইরাল হতে গিয়ে, খবরের কাগজে প্রথম পাতায় থাকতে হলে যে ক'টা “ইজম” এর আওতায় পড়তে হয়, এ আত্মহত্যা সে ধরণের কিছু নয়। ফলে ফেমিনিজম থেকে নানা ধরণের রাজনৈতিক-ইজম তেমন মাথা ঘামায়নি। 

    ক'দিন আগে “টাইমস অব ইণ্ডিয়ায়” একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। বিষয় ছিল আত্মহত্যার পরিমাণ কমানো। সেখানে বলা হয়েছে, আমাদের মধ্যে একটা ধারণা হল, আমরা ধরে নিই যারাই আত্মহত্যা করছে তারাই মানসিকভাবে দুর্বল। ফলে সে নিয়ে গভীরে আলোচনা করতে আমরা অনীহা বোধ করি। সংসারে হিরোদের নিয়ে যে আলোচনা সম্ভব, “লুজার”দের নিয়ে সেই মাত্রায় সিরিয়াস আলোচনা কি সম্ভব? না। অবশ্যই না।

    কিন্তু ছেলেটা মারা গেল। একজন মেধাবী ছেলে সমাজের অবক্ষয়ে অবসাদে ডুবে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিল। কারণ সে দুর্বল ছিল বলে নয়। ভীষণ সংবেদনশীল ছিল বলেই। না, এই সিদ্ধান্ত আমি টানতে চাইছি না যে সংবেদনশীল হলেই আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নিতে হবে। আমি কাম্যুর অ্যাবসার্ডিজমে আদৌ বিশ্বাসী নই যে জীবনে প্রতি মুহূর্তে আত্মহত্যা না করার কারণ খোঁজাটাই একটা বড় কাজ। না, আমি এ সবে বিশ্বাসী নই। যে ছেলেটি মারা গেছে তার প্রতি আমার হৃদয়ের গভীরতম অংশ থেকে সমবেদনা থাকলেও আমি তার সিদ্ধান্তকে কখনওই সমর্থন জানাই না।

   এখন স্ট্যাটেসটিকস অনুযায়ী এ মৃত্যুকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দেখাই যায়। কিন্তু যদি না দেখতে চাই? মৃত্যুর থেকেও কম ভয়ংকর নয় - মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে, সম্পূর্ণভাবে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকা। তার নিদর্শনও কি কম চারপাশে? 

  ব্যক্তিগত জীবনে নানা চ্যালেঞ্জ, ব্যর্থতা আর অসাম্য-দুর্নীতিতে ভরা সমাজ, কোনোটাই নতুন নয়। কিন্তু অবসাদ কেন বাড়ছে এত? আমাদের শিক্ষায়, আকাঙ্খায়, বেড়ে ওঠায় কোন জিনিসটার অভাব আমাকে এমন দুর্বল করে দিচ্ছে? 

    আমার মনে হয় আমাদের শিক্ষায়, বেড়ে ওঠায় একটা নির্মম ইনসুল্যেশান ফ্যাক্টর ভীষণভাবে দায়ী এর জন্য। আত্মকেন্দ্রিকতা চিরকাল আছে আমাদের মনের গঠনে। কিন্তু তাকে ড্রাইভিং ফোর্স হতে বাধা দিয়েছে আমাদেরই নানারকমের সামাজিক, ধর্মীয় শিক্ষা। হ্যাঁ, ধর্মীয় বলতে আমি বলছি সেই উপাসনা গৃহের কথা, যেখানে বসে এক গভীর তত্ত্বদর্শী, মরমদর্শী কবি গাইছেন “বসিয়া আছ কেন আপনমনে, স্বার্থ নিমগন কি কারণে? চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয়প্রসারী/ ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি / প্রেম ভরিয়া লহ শূন্য জীবনে”। যে অবসাদ ক্লিনিকাল, আমি তার কথা বলছি না। তার জন্য চিকিৎসা অবশ্যই কাম্য। কিন্তু যে অবসাদ আমার ভুল বিশ্বাস, আমার ভুল আকাঙ্খা, আমার ভুল ভালোবাসা তৈরি করে, আমি তার কথা বলছি। ভুল সফলতার, ভুল শিখরকে ছুঁয়ে যে গর্বোদ্ধতভাব, আর ভুল বিফলতা আর তার ভুল আত্ম-ধিক্কারের যে অবসাদভাব, আমি তার কথা বলছি।

     একটা সময়ে পাশ্চাত্য দর্শনে মন টেনেছিল। ফরাসি দার্শনিকদের আধুনিকোত্তর দার্শনিকতা মনকে নানা কৌতুহলে আবিষ্ট করেছিল। একদিন সে মোহ কাটল। ভারতীয় নানা দর্শনের আবেশও কাটতে শুরু করেছে ততদিনে। সদ্য কলেজ পেরিয়ে উপার্জনক্ষম হওয়ার লড়াই শুরু হব হব। শুরু হল আমার পরিবারে একের পর এক দুর্যোগ। আত্মজীবনী লেখার কোনো ইচ্ছা নেই আমার, কিন্তু আমার নিজের উপলব্ধ সত্যকে জানাতে হলে এটুকু ভূমিকা দরকার। আমায় ক্ষমা করবেন যদি মনে হয় আত্মকথনের ছুতো খুঁজছি। 

   সেদিন আমার বাইরের জগতে চূড়ান্ত দু:সময়, আর আমার অন্তরের জগতে গভীর শূন্যতাবোধ। ওই যে বললাম, মোহ আর আবেশ দুইই কেটেছে তখন। জীবনবোধের গভীর জিজ্ঞাসা পাগল করে দিচ্ছে। কিন্তু বাইরের নানা ঝঞ্ঝায় সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একটা সময়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা আমিও ভেবেছিলাম। আমার সেদিনের সে সব ডায়েরি আজও তার সাক্ষ্য বহন করছে। মনে হয়েছিল গোটা জীবন একটা প্রহসন বই কিছু নয়। 

   এমনই একটা দিনের বিকেলে আমি উত্তরপাড়া স্টেশানে বসে। ট্রেনের অপেক্ষা করছি। সঙ্গে নিজের জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নেওয়ার উপযুক্ত সময়েরও অপেক্ষায়। এমন সময় চোখে পড়ল এক বুড়িকে। আমি ইচ্ছা করেই বুড়ি লিখলাম, বৃদ্ধা নয়। ভিখারি সে। তার বোঁচকাবুচকি নিয়ে ঘুমাচ্ছিল। ঘুম ভেঙে উঠে বসল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল। তার আচার আচরণে কোথাও পাগলামি নেই। শান্ত স্থিরভাবে চারদিক তাকিয়ে দেখছে। কি প্রসন্ন দৃষ্টি। একটু পর উঠল, উঠে চায়ের দোকানের সামনে এলো। এক ভাঁড় চা নিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে কি সন্তোষে চারদিক দেখতে লাগল। 

   আমি যে সে বুড়িকে এতক্ষণ ধরে খেয়াল করছি, আমি নিজেও জানতাম না। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। স্টেশানের মধ্যে যে পাখিদের বাসা তারা হইহই করতে করতে ফিরে আসছে, আমার ট্রেন অ্যানাউন্স হল। হঠাৎ আমার মনে হল, আমি কি এতই দরকারি? আমার স্বপ্ন, আমার কেরিয়ার যা সব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, ওগুলো ছাড়া কি আমার অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই? এই বুড়িটার চাইতে কি আমি খুব কিছু মূল্যবান? কিছু বই পড়েছি বলে আর কিছু ডিগ্রি আছে বলে? 

   বিশ্বাস করুন, সব বদলে গেল। সব। আমার চারদিকে আবার সব কেমন নিজের জায়গায় এসে স্থির হয়ে গেল। মন বলল, যাই ঘটুক, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মত কিছু ঘটেনি। আর হা হুতাশ করে বাঁচার মধ্যেও কোনো মানে নেই। শান্তিতে বাঁচব। সুখ আসুক, চাই না আসুক জীবনে। 

      প্রায় পঁচিশ ছাব্বিশ বছর হয়ে গেল। কিন্তু সেদিনের সে বিকেল আমার কাছে আজও স্পষ্ট। স্বচ্ছ। তারপর থেকে আরো আরো দুর্যোগ, দু:সময় পার করেছি। এটুকু বুঝেছি, ঘরে খিল টেনে, অন্যকে তাড়িয়ে, শুধু নিজেকে নিয়ে বাঁচা এক বিশুদ্ধ আত্মহত্যা বই কিছু নয়। বাঁচতে গেলে নিজের বাইরে আসতেই হবে। আমাকে অনেকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার গল্পে শুধু এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষের কথা আসে কেন? কারণ একটাই, ওখানেই আমি আমার বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে পাই। পোস্টমডার্নিজম দর্শনে না, মিস্টিসিজমের মধ্যেও না। মহাত্মা গান্ধী একটা রক্ষাকবচ দিয়েছিলেন, ইংরেজিতে যাকে বলে, talisman, সেটি হল -

     

"I will give you a talisman. Whenever you are in doubt, or when the self becomes too much with you, apply the following test:”


"Recall the face of the poorest and the most helpless man (woman, child) whom you may have seen and ask yourself, if the step you contemplate is going to be of any use to him (her). Will he be able to gain anything by it? Will it restore him to a control over his own life and destiny? … Then you will find your doubts and yourself melting away.”


     এই কথাই স্বামীজির বিখ্যাত কবিতা “সখার প্রতি” তে আছে। যে কবিতাটা কাশীর সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠার মূল প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। যে কবিতাটা স্বামীজির উপলব্ধির প্রধান সুর বলা যায়। 


“পক্ষহীন শোন বিহঙ্গম, এ যে নহে পথ পালাবার

বারংবার পাইছ আঘাত, কেন কর বৃথায় উদ্যম?

ছাড় বিদ্যা জপ যজ্ঞ বল, স্বার্থহীন প্রেম যে সম্বল;

দেখ, শিক্ষা দেয় পতঙ্গম—অগ্নিশিখা করি আলিঙ্গন।

রূপমুগ্ধ অন্ধ কীটাধম, প্রেমমত্ত তোমার হৃদয়;

হে প্রেমিক, স্বার্থ-মলিনতা অগ্নিকুণ্ডে কর বিসর্জন।

ভিক্ষুকের কবে বল সুখ? কৃপাপাত্র হয়ে কিবা ফল?

দাও আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।

অনন্তের তুমি অধিকারী প্রেমসিন্ধু হৃদে বিদ্যমান,

‘দাও’, ‘দাও’—যেবা ফিরে চায়, তার সিন্ধু বিন্দু হয়ে যান।”


   এ কথাগুলো ভীষণ ক্লিশে মনে হতে পারে। কিন্তু দর্শনের হাজার লক্ষ শব্দের ঘানি টেনে সুস্থ বেঁচে থাকতে, এই উপলব্ধিতেই ফিরতে হয়। “স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ/ বৃহৎ জগত হতে, সে কখনো শেখে নি বাঁচিতে”, রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধিই কি সারা জীবনের তপস্যা ছিল না? 

      আমি যা পেয়েছি, তা হারাতে মুহূর্ত লাগে না। স্বাস্থ্য, সম্পদ, সম্পর্ক - ভেঙে যাওয়ার আগে কোনো আগাম নোটিস দিয়ে আসে না। জীবনের বাঁচার পরিসর কমিয়ে এনে, সঙ্কীর্ণ করে নিজেকে যতই সুরক্ষিত সফল ভাবি না কেন, সে উপলব্ধি ভুল। ভ্রম। কোনো জটিল তাত্ত্বিক দর্শন না, কোনো মিস্টিসিজমের আলোছায়া রাস্তা না, যুগে যুগে এই একটা রাস্তাই সুস্থ, স্বাভাবিক বেঁচে থাকার উপায়। নান্য পন্থা বিদ্যতে। 

   মাঝে মাঝে আবারও ঘোরে পড়ি। তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়াল জগতের হাতছানি, নামযশের জগতের হাতছানি, নানা ব্যর্থতার, অবসাদের কুহেলিকার কুটিল পরামর্শ কানে এসে বাজে। “আবার এরা ঘিরেছে মোর মন, আবার চোখে নামে আবরণ” দশা হয়। আবার বেরিয়ে আসি সে ফাঁদ কেটে। যেখানে জীবন, যেখানে উৎসাহ, যেখানে মহাজীবন সাগরে লক্ষ-কোটি ঢেউ উঠছে পড়ছে সেখানে এসে দাঁড়াই। আবারও বেঁচে যাই।

Thursday, February 8, 2024

বইমেলা ও আনটাচেবিলিটি

আত্মপ্রচারসর্বস্ব "আমাকে দেখুন" বইমেলা শেষ হল, "ভ্যানিটিব্যাগ" সদৃশ বহু বই বিকিকিনি শেষ হল, বহু "নর্দমায় আছাড়ামারার যোগ্য" হুজুগে পাঠকের বার খেয়ে তোলা লেখকরাও বাড়ি ঢুকে গেল।   

    মেলায় রোদ বাড়ছে। শীত যাচ্ছে। ফেসবুকে প্রতিবাদ হচ্ছে। এক বিশাল অংশের নেটিজেন নিন্দুক-প্রতিবাদী, এই দুই পক্ষের পোস্টেই "দারুণ বলেছেন" বলে লাভ / কেয়ার ইত্যাদি ইমোজি দিয়ে আসছেন। 

    এখন এমন তো শিশু নই যে বেশ কিছু মানুষের ব্যবহারে সততা, ইন্টিগ্রিটি, দায়বদ্ধতা ইত্যাদি দেখছি না বলে হাহুতাশ করে মরব। 

           আপনারা মানুন, না মানুন, আমার আম্বেদকরের একটা কথা খুব মনে হয়। ভারতে আমাদের রক্তে শ্রেণী সচেতনাটা মারাত্মক। আমাদের বেদ-বেদান্তে যাই লেখা থাকুক না কেন, আমাদের মনীষীরা যাই বলে থাকুন কেন, আমাদের বর্ণাশ্রম-জাত-কাস্ট এর ফ্রেমওয়ার্কের ধারণাটা মজ্জাগত। আম্বেদকর যাকে বলতেন, "স্টিলের ফ্রেম"। আমরা এক একটা গোষ্ঠী বানিয়ে, তার একটা হায়ারার্কি মনে মনে ছকে নিই। এগুলো কোনোটাই সচেতনভাবে আমরা করি না। কিন্তু করি। এগুলোতে যে কোথাও মনুষ্যত্বের প্রাথমিক শর্তগুলোকে অবমাননা করছি, সেও আমাদের মনে হয় না। রেলকলোনিতে বড় হয়েছি। সেখানে আউটহাউস বলে, কোয়াটার্সের বাইরে, একটা করে ঘর-বারান্দায় বাস করা কাজের লোকেদের জন্য বাড়ি থাকত। এখনও আছে। অফিশিয়ালি থাকার কথা না। তবু আছে। আমি দেখতাম তাদের কেউ যদি কোনো দামী শাড়ি পরে কোনো অনুষ্ঠানে যেত, অমনি কোয়াটার্সের "মালকিন" রা সেই জাতের শাড়ি আর পরতেন না। নাক কুঁচকিয়ে বলতেন, ইস, ও ওই ধরণের শাড়ি পরেছে। আমিও পরব? ওরা ওই রেস্টুরেন্টে যায়, আমরাও যাব? কেন আমাদের একটা জাত নেই? 

  আমাদের ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে এই “জাত” শব্দটা ভীষণ ধ্রুব। একটা স্বত:সিদ্ধান্ত। আম্বেদকর এই সত্যিটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আজীবন হিন্দুধর্মের, তথা সমাজে এই বিষযন্ত্রটাকে থামাতে চেয়েছিলেন। না পেরে অবশেষে বৌদ্ধধর্ম নিয়েছিলেন। সঙ্গে হাজার হাজার মানুষকেও নিয়ে গিয়েছিলেন। 

   আমাদের রক্তে রক্তে এই “আনটাচেবেলিটির” বীজ আছে। কেন, রমাপদ চৌধুরীর “বাড়ি বদলে যায়” মনে নেই? শেষে যখন নিজেদের বাড়ি হল, তারা নিজেরা বাড়িওয়ালা হল, মানুষটা বলল, ভাড়াটাদের জাতটাই এরকম হয়। 

  একবার ভেবে দেখবেন আমাদের ভাবনা, চিন্তা সব কিছু কি সাংঘাতিকভাবে এই “জাত” শব্দটা দিয়ে প্রভাবিত। এটা যে অন্যায়, এ বোধটাও আমাদের আসে না। এই হাজার হাজার বছরের অভ্যাসে এতটাই এই বিষয়ে অসংবেদনশীল হয়ে আছি আমরা। 

     বইমেলাতেও তাই বইমেলার মত করে “আনটাচেবিলিটি” শব্দটা আছে। নইলে একজন অমন ক্ষমতাসম্পন্ন লেখিকার মনে এত বিদ্বেষ, এত ঘৃণা, এত তাচ্ছিল্য জন্মায় কেন? কারণ আমাদের “আনটাচেবেলিটি” ধারণার মধ্যে একটা বিবেকীয় লেজিটিমিটি আছে। আমরা জানি আমাদের এই বোধটা ধর্মসম্মত। ওর “ওউকাত” এর বাইরে ও যাবে কেন? 

    বর্ণাশ্রমের বিষটা বহু হাজার বছর আগে খুব নিষ্পাপ মুখোশে, সংজ্ঞায় আমাদের সমাজে জন্মেছিল। তারপর বর্ণ মানে জাত নয় - ইত্যাদি সুক্ষ্ম তর্কে আরো কায়েমি হল। তারপর সে বিষ শুধু ধর্ম না, পুজো-আচ্চা না, আমাদের সব বিচার, আচারে, সামাজিকতায় ঢুকে পড়ল। আমাদের মধ্যে এক নতুন ধরণের “আদারিজম” চালু হল। এক নতুন ধরণের “আনটাচেবিলিটি”। 

   বইমেলা নিয়ে পোস্টে আমার কিছুই মনে হয়নি। বিখ্যাত লেখিকা প্রমুখদের পোস্টেও আমার কিছুই মনে হয়নি। কিন্তু যখন আমার বন্ধুতুল্য বেশ কিছু মানুষকে দেখলাম ব্যথা পেয়েছেন, প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, আমার মনে হল আমিও আমার ভাবনাটা রাখি। বলি যে, রোগের বীজ অনেক গভীরে। আমাদের এখানে গ্রহণের চাইতে বর্জনের দামামা বেশি জোরে বাজে। আমাদের এখানে হাত বাড়ানোর চাইতে, হাত গুটিয়ে নেওয়া ঘেন্নায় অনেকে সহজে করা যায়। আমাদের যুগান্তরের অভ্যাস এ। আমাদের ধর্ম শিখিয়েছে। 

     শুধু আম্বেদকর নয়, হরিচাঁদ ঠাকুর-গুরুচাঁদ ঠাকুরও এ বিষের খবর পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সমাজে তাদের কথা কোনোদিন গ্রাহ্য হবে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। কিন্তু এনারা তো ইতিহাস এখন। কিন্তু “জাত” নিয়ে আমাদের নিজেদের মত করে “আমরা - ওরা” গড়ে তোলার খেলা চলতেই থাকবে। পৃথিবীর সব দেশেই এটা আছে কমবেশি। কিন্তু ভারতেই একমাত্র এই অমানবিক আচার শাস্ত্রের সমর্থন পেয়েছে। যুগ যুগ ধরে আমাদের কাউকে মহান, কাউকে তুচ্ছ করার অদ্ভুত সমীকরণ শিখিয়েছে। আজও চলছে। অন্যভাবে। তার একটা উদাহরণ এই বইমেলা ঘিরে পোস্টগুলো। এগুলো চলবেই। হতাশ হবেন না। বরং যতটা পারা যায় আমাদের মধ্যে থাকা এই কুলীনতার বিষাক্ত বীজটাকে মারা যায়, সে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

Wednesday, February 7, 2024

মোহনায় আসা উদাসীনতা

 


মুখের উপর সকালের রোদ এসে পড়েছে। ভোরের রোদের সঙ্গে কথা বলে প্রশান্ত। ভোরের রোদের সঙ্গে ছোটোবেলার যোগাযোগ আছে। চোখটা বন্ধ করে আছে। তবু বন্ধ চোখের পাতার উপর দিয়েও আলোকে অনুভব করা যায়। সামনে পুকুর থেকে হাঁসেদের ডাক আসছে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। শীত যাবে। যাক। কে-ই বা থাকে! সে নিজেও কি থাকবে?


    প্রশান্তর অনেক ঝুটঝামেলা সামলাতে হয় রাতদিন। সংসারে। কাজের জায়গায়। সে সব নিয়ে মাথা ভার হয়ে যায়। হাঁসফাঁস লাগে। কিন্তু মনের গভীরে কোথাও জানে, এ সব বেশিদিন থাকবে না। কিছুই বেশিদিন থাকে না। এটা ভাবতে ভাবতেই সব বদলে যায়। মানুষ চীৎকার, দেওয়ালের রঙ, পাখা ঘোরার শব্দ, রাস্তার গাড়িঘোড়ার আওয়াজ, সব বদলে যায়। এই সাধারণ কথাটা অনেক কিছু দিয়েছে প্রশান্তকে। অনেক কিছু হারিয়ে এই কথাটাকে শিখেছে। অনেক ভালোবাসা, অনেক স্বপ্ন হারিয়েছে। ক্ষোভ নেই আর। শান্ত হতে শিখেছে প্রশান্ত। অকারণে দৌড়াদৌড়ি করে লাভ নেই। 


   নিজের মাথার মধ্যে যখন জট পাকিয়ে যায় সব, কোনটা সত্যি, কোনটা আসল বুঝে উঠতে পারে না, তখন একটা খেলা খেলে প্রশান্ত। নিজেকে একটু দূরে নিয়ে যায় সবার থেকে। একটা চারাগাছ খোঁজে। যে গাছটা কয়েকটা গাঢ় সবুজ পাতা মেলে, সদ্য বীজ থেকে বেরিয়ে, মাথা তুলেছে আলোয়, আকাশের দিকে। প্রশান্ত হাঁটু মুড়ে বসে সেই গাছের সামনে। তারপর নিজের দিকে তাকায়, মনে মনে। গাছটাকে কি বলতে ইচ্ছা করছে তার? কি বলতে প্রাণটা আটুপাটু করছে? কোন কথাটা সব চাইতে দরকারি? চারাগাছটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথার মধ্যে সে কথাটা স্পষ্ট হয়ে আসে। ওইটাই আসল কথা। বাকি যা, সে সব এলোমেলো কথা। অসামঞ্জস্যের কথা। সামঞ্জস্য না থাকলে সংসারে কিছুই নেই। সামঞ্জস্য মানেই সত্য। 


    প্রশান্ত খানিক আগেই এ খেলাটা খেলেছে। মাথাটা স্পষ্ট হয়ে আছে। দিন যাবে। আবার গুলিয়ে যাবে সব। আবার অস্থিরতা বাড়বে। এ নিয়ম। কিন্তু সেটাই বড় কথা নয়। আবার সব গুছিয়ে আনতে হবে। গুছিয়ে আনতে নিজের মধ্যে সব কিছু। আবার সবার থেকে দূরে গিয়ে বসতে হবে। আবার একটা চারাগাছ খুঁজতে হবে। 


==========


    প্রশান্ত চোখ খুলল। পুকুরে কোনো হাঁস নেই। ওরা রোদে বসে আছে ওই দক্ষিণদিকে। সে বসে আছে পশ্চিমপাড়ে। পূর্ব পাড় থেকে সূর্য উঠেছে এই সবে। চারাগাছটা মাঘের শীতল হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে। হাওয়ার ধাক্কা সামলাতে শিখছে। 


    যে সব মুখ মনে করলে মনটা বিষিয়ে যায়, এই সময় তাদের মুখ মনে করতে নেই। ওরা থাকবে। সেও থাকবে। হাওয়ায় ভাসা ঝরা পাতার মত কে কখন কার পাশে আসে, কতক্ষণ থাকে তার কোনো ঠিক আছে? কেউ জানে না। জানার দরকারও নেই। খুব শান্ত হলে মাথাটা, গোটা সংসারের মধ্যে একটা শ্বাসপ্রশ্বাস শুনতে পাওয়া যায়। কে যেন অনন্তকাল ধরে সবটুকুকে নিয়ে নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে সৃষ্টি করছে, আবার গুটিয়ে নিচ্ছে নিজের মধ্যে। কিচ্ছু হারায় না। তৈরি হয়, আবার মিলিয়ে যায়। ঢেউয়ের মত।


      মা, বাবার পাশে বসে পুরীর সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে মিষ্টি খেয়েছে, কত ছোটো তখন। মনে হত গোটা সংসার মিষ্টিই খাচ্ছে শুধু। এত মারামারি, এত হানাহানি, এসব বুঝতে বুঝতে, বড় হতে হতে, পাশ থেকে মা বাবা মিলিয়ে গেছে। ঢেউয়ের মত। আরো কত কি মিলিয়ে গেল। যেন গোটা ছোটোবেলার ঘরটা সব খেলনাপাতি নিয়ে বানের জলে ভেসে গেল। থেকে গেল শুধু রোদ। ছোটোবেলাকার রোদ। আজও আছে। থাকবেও। গোটা সংসার ঢেউয়ের মত হচ্ছে, ভাঙছে। মিষ্টি খেতে খেতে দেখার জিনিস নয় এ। নোনতা জলে একে বুঝে নিতে হয়। সমুদ্রের জলের মত নোনতা চোখের জলে। 


===========


   প্রশান্ত উঠে দাঁড়ালো। মাথাটা হালকা। সাইকেলে উঠল। ফিরতে হবে। পৌঁছাতে ঘন্টা খানেক লাগবে। চা খেতে হবে। মিনিট পনেরো চালিয়ে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালো। সদ্যই খুলেছে মনে হল। একদিকে কচুরি ভাজার আয়োজন চলছে। আরেকদিকে চা। বেশ কয়েকজন খদ্দের এসেছে দোকানে। 


  প্রশান্ত এক কাপ চা নিয়ে, স্ট্যাণ্ড করা সাইকেলটার পাশে এসে দাঁড়ালো। চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখল একটা অল্প বয়েসী বউ কচুরী ভাজতে বসল। চা করছে যে সে কি শ্বশুর তবে? প্রশান্তর চোখে দুবার চোখ পড়ল বউটার। মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল। হাসল কি? আবার তাকাবে কি সে?


    পিছন ফিরে রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়ালো প্রশান্ত। লরি যাচ্ছে সাঁ সাঁ করে। বড় রাস্তায় ঝুঁকি অনেক। কিন্তু এ ঝুঁকি, না লোভ? প্রশান্ত নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল। মাথাটা ঠাণ্ডা। এ লোভ। লোভ অবিবেচকের মত ঝুঁকি নেয়। এ ভয় নয়, আতঙ্ক। লোভের ভয়ে আতঙ্ক কাজ করে, আশঙ্কা নয়। অশান্ত মনে ভয় জন্মায়। সে ভয় আতঙ্ক, না আশঙ্কা? জীবনে কর্তব্য অনেক। ঝুঁকি না নিয়ে জীবনের কোন কর্তব্যের মোড় পার করা যায়? কিন্তু কর্তব্যের ঝুঁকিতে বুদ্ধি হাতুড়ির মত বিপদের শেকল ভেঙে ভেঙে এগোয়। এ ঝুঁকি নয়। এ লোভের হাতছানি। শরীরের লোভ শরীরকে ডেকে আনে খেলায়। শেষে সব শূন্য, শুষ্ক। যদি ভালোবাসা না থাকে। 


  কিন্তু তার জীবনে যে ভালোবাসা এসেছিল? উদ্দাম যৌবনের সাগরে ডিঙির মত তার আর জুঁইয়ের শরীর ঢেউ ভেঙে ভেঙে এগিয়েছিল! সেদিন শরীরকে আলাদা করে শরীর বলে কই মনে হয়েছিল? শরীর যেন একতারা। জুঁইয়ের ছোঁয়ায় সহস্র তার হয়ে উঠেছিল। স্বর্গ থেকে গন্ধর্ব, অপ্সরা সবাই এসে যেত তাদের খেলায়। ওই চার দেওয়ালের মধ্যেই পারিজাত ফুটত। আমোদিত হত মন। 


  কিন্তু জুঁই বিয়ে করল না তাকে। জুঁইয়ের মন বদলে গেল। ওদের বাড়ির সামনে দামী গাড়ি দাঁড়াত। সে গাড়িতে উঠে যেত। তখন জুঁইয়ের ফোনে তার নাম্বার ব্লক। জুঁইয়ের বাড়ি সে কোনোদিন যায়নি। দূর থেকে দেখেছে। জেনেছে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। প্যাণ্ডেল হতে দেখেছে। দূর থেকে। ছেলেটার নাকি বিরাট ব্যবসা। 


    ভালোবাসায় যতটা আত্মবিশ্বাস থাকে, অধিকারবোধের ততটা থাকে না। সব সময়েই মনে হয় আমি কি যোগ্য? প্রশান্ত নিজের মনকে উল্টেপাল্টে কতবার দেখেছে। খুঁত পেয়েছে। অভাব পায়নি। সীমাবদ্ধতা পেয়েছে। সঙ্কীর্ণতা পায়নি। কিন্তু সব খামতি কি ক্ষমার যোগ্য? কেন মেনে নেবে জুঁই তাকে? তার সব সীমাবদ্ধতাকে? ভালোই করেছে।


     চোখের কোলে জল। শীতের হাওয়ায় ব্যথা দিল। ঘুরে তাকালো। যে কচুরী বেলছিল সে বউয়ের মুখের দিকে তাকালো। কই সে বিদ্যুৎ আর? একটা মায়া জন্মালো। মাধুর্য মাখা মায়া। ভালোবাসা সদ্য জন্মানো চারাগাছের নিষ্পাপ মাধুর্যের মত। নিষ্পাপ মনের এক ক্ষমতা থাকে। নির্মল যে সত্য, তাকে খুঁজে দেওয়ার, তাকে সহ্য করার ক্ষমতা দেওয়ার। জুঁইয়ের উপর ভালোবাসা সে চারাগাছের মত। এখন আর লোভ কাছে ঘেঁষবে না। এখন তাকে ঘিরে থাকবে নদীর মোহনায় আসার মত উদাসীনতা। চারদিক বড় নিটোল এখন। লোভ বড় ছদ্মবেশী। 


     প্রশান্ত ফিরছে। খানিক ব্যথা, খানিক সুখ, খানিক আনন্দ, খানিক ভরসা, খানিক কুয়াশার মত অজানা আশঙ্কা মোহনার জলে চিকচিক করছে। থাকবে না কিছুই। তবু যেতে হবে সবটা রাস্তা পেরিয়ে। যতটা রাস্তা মাপা তার জন্য। 


  প্রশান্ত জিভে সেই মিষ্টি স্বাদটা আবার পাচ্ছে। যেন পুরীর সমুদ্রের ধারে বসে আবার। বালির উপর জন্মে চারাগাছ। তাকে বলছে, আমি তো আছি!

Friday, January 26, 2024

ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে



বাস্তবতা আর ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। ধরা যাক আমার শরীরে কোনো রোগ ধরা পড়ল। সেটা ঘটনাপ্রবাহ। কিন্তু সেই রোগের সঙ্গে আমি কিভাবে লড়ব, সেটা আমার বাস্তব। বাস্তবটা ব্যক্তিগত। ঘটনাপ্রবাহ নৈর্ব্যক্তিক। একই ঘটনাপ্রবাহে এক একজনের বাস্তবটা এক এক রকম হয় তাই। বাস্তবটা সাবজেক্টিভ। ঘটনাপ্রবাহটা অবজেক্টিভ। 

    লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখ সাবজেক্টিভ। ভীষণভাবে বাস্তব। কিন্তু এগুলো যে যে ঘটনাপ্রবাহজাত, সেগুলো অবজেক্টিভ। নৈর্ব্যক্তিক। আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। এই পার্থক্যটা দেখেই হয় তো ভারতীয় দর্শনে একদিন পুরুষ - প্রকৃতির ধারণা হয়েছিল। পুরুষ সাবজেক্টিভ। প্রকৃতি অবজেক্টিভ। পুরুষ ভোক্তা। প্রকৃতি নিত্য ঘটমানা। আরো বলা হল, এই দুই-ই নিত্য। পাশ্চাত্যের স্টোয়িক দর্শনও তার মত করে এই দুটো করে আলাদা করে বলতে চাইল, নির্বিকার থাকো। নিরাসক্ত থাকো। বাস্তব হোক পুকুরের স্থির জলের মত। ঘটনাপ্রবাহ হোক তার উপর অবিরাম বয়ে চলা ধারাবাহিক প্রতিচ্ছবির মত।

     বলা সোজা। ভাবা সোজা। কিন্তু জীবনে রূপদান করা কঠিন। কঠিন মানে যতটা সিরিয়াসনেস, সময় আর মনোযোগ লাগে, আমি আমার স্বাভাবিক রুচি অনুযায়ী দিতে রাজি নই। যতক্ষণ না বাধ্য হচ্ছি। মরমী সাধক বললেন, ‘'জিন্দেগী কি ভোগ হি ভোগতে সবকো হোয়ে/ জ্ঞানী ভোগত জ্ঞান সে, মূরখ ভোগত রোয়ে।”

     ঘটনাপ্রবাহ আর বাস্তবতার এই পার্থক্যটা, বা আরো ভালো ভাষায় বললে দ্বন্দ্বটা পশুদের নেই। তাদের সবটাই ঘটনাপ্রবাহ। সে নিজেও। সে বর্ষা নিয়ে অভিযোগ করে না। মাথার ঘা নিয়ে অভিযোগ করে না। কষ্টে কাঁদে। অন্য সময় স্ফূর্তিতে বাঁচে। মরবার সময় অনায়াসে মরে। 

  মানুষের সে ভাগ্য নেই। যত বুদ্ধিমান হয়, যত চিন্তা সুক্ষ্ম হয়, তত তার মধ্যে এই পার্থক্য প্রবল হয়। সে ঘটনাপ্রবাহর চাপে মরে না। নিজের বাস্তবতার চাপে মরে। আসন্ন বিপদ, আসন্ন মৃত্যুকে অনুমান করে। ভয় পায়। আশঙ্কিত হয়। ছটফট করে। প্রার্থনা করে। আরো এটা সেটা করে। অবশেষে মরে যায়। বাস্তব শূন্য হয়। ঘটনাপ্রবাহ চলতেই থাকে। 

 এ অভিশাপ। আবার এই আশীর্বাদ। একটা তার এনে যদি কেউ বলে, এতে সুর তোলো তো দেখি। অরসিকের কাছে সে এক আপদ। কিন্তু সুর রসিকের কাছে সে এক সাধনা। চ্যালেঞ্জ। সে ধাতুতে সুর তুলবে। 

  দ্বন্দ্ব না থাকলে প্রাণ অসাড়। প্রাণ অসাড় হলে আমি অসাড়। রবীন্দ্রনাথের “ঝুলন” কবিতাটা মনে করা যাক। কেন হঠাৎ নিশীথরাতে অমন মরণখেলা খেলবার ইচ্ছা হল? কারণ প্রাণ অসাড় হয়ে এসেছিল। সুখের আলসে।

   কিন্তু আমি তো রবীন্দ্রনাথ নই। আমার সে টেম্পারামেন্ট নেই। মানুষে মানুষে পার্থক্য তো এই টেম্পারামেন্টে। টেম্পারামেন্ট তৈরি করে বাস্তবতা, ঘটনাপ্রবাহ ছেঁচে। কেউ কাঁদে। কেউ হাসে। 

    উপায় কি? গোটা সংসার এর একটাই উপায় চিরটাকাল বলেছে - বৈরাগ্য। রাগ মানে রঙ। রঙ লাগুক, কিন্তু কোনো রঙই পাকা হতে দিও না। কিন্তু সংসারে আমার যে এত অনুরাগ? উত্তর এলো, ভালো তো। যদ্দিন অনুরাগের সুখে হাসছ, অনুরাগের তাপে কাঁদছ, চালিয়ে যাও না ভাই। কেউ বারণ করেনি। কিন্তু যদি কোনো সময় মনে হয়, আর তো ভাল্লাগছে না। কিম্বা এমন একটা আঘাত খেলে যে এ খেলা থেকেই মন উঠে গেল, তখন শুনবে ঘটনাপ্রবাহ আর বাস্তবতার ফাঁক দিয়ে আসা এক টুং টাং একতারার সুর। ডাকছে তোমায়। কান পেতে কবি শোনে, “ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে….কেন কারাগৃহে আছিস বন্ধ, ওরে ওরে মূঢ়, ওরে অন্ধ, ভবে সেই সে পরমানন্দ, যে আমারে ভালোবাসে/ কেন ঘরের ছেলে পরের কাছে পড়ে আছিস পরবাসে”।

     একি মিছে সান্ত্বনার কথা? ফাঁকা আশার কথা? না হে না। তীর থেকে তরী ভাসালে বোঝা যায় সাগর শুধু ডোবায় না, ভাসায়ও। ডোবার ভয়ে এতদিন যে তীরে তীরে কাটালাম, সে ভয়টুকুর আসলেই কোথাও কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রতিদিন চিতায় লক্ষ মানুষ পুড়ছে, প্রতিদিন মাটিতে লক্ষ মানুষ কবরে যাচ্ছে….আমিও যাব। ভয়ে চোখকান বন্ধ করে রাখলেই কি রক্ষা পাব? কবি গাইছেন, “দুদিন দিয়ে ঘেরা ঘরে তাইতে যদি এতই ধরে, চিরদিনের আবাসখানা সেই কি শূন্যময়, জয় অজানার জয়/ কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়, ও তোর পার হতে সংশয়”।


( ছবি Debasish Bose)

Thursday, January 25, 2024

সৎ সাহিত্য মূল্যবোধকে চাপিয়ে দেয় না, অন্বেষণ করে


ধর্ম কখনও মূল্যবোধ শেখায় না। কখনও কখনও মূল্যবোধের বহিরাবরণ গড়ে দিতে সাহায্য করে। তাও বাস্তবে খুব কমক্ষেত্রেই। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় অন্তঃসারশূন্য বহিরাবরণ নিয়ে এত মোহ, এত দলাদলি। 

   মানুষ মৃত্যুতে ফুরিয়ে যায় না। মূল্যবোধহীন হলে বেঁচে থাকতেই ফুরিয়ে যায়। মূল্যবোধ জন্মায় যন্ত্রণায়। খিদের মত, তেষ্টার মত যন্ত্রনায়। একটা সময় সব কিছুর উপর বিশ্বাস হারিয়ে, উদ্দেশ্যহীন হয়ে, একে তাকে, সব ঈশ্বর-দেবতাকে প্রশ্ন করে ক্লান্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে, তবে দাঁড়াই কোথায়। বাইরের কাউকে না, নিজেকে জিজ্ঞাসা করে। আর তখনই ভিতর থেকে নির্দেশ আসে এক অনাদিকালের মূল্যবোধের উপর - শ্রদ্ধা। জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা। বাকি যা কিছু ভালো সেখান থেকে শুরু। সেই শ্রদ্ধাকে হারিয়ে ফেললে সব ফাঁকি। যত ঢক্কনিনাদ করি না কেন, যতই দলবল নিয়ে এসে সময়ের চাকা ঘোরাতে চাই না কেন, যতই কথার চাতুরীতে ভুলাতে চাই না কেন। অবশেষে সব মিথ্যা। যদি জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাটা না থাকে। জীবনের কোনো ধর্ম হয় না। জীবন থেকে ধর্মবোধ জন্মায়। তাই সনাতন ধর্মের সংজ্ঞা বুদ্ধ দিচ্ছেন, বৈরিতা দিয়ে বৈরিতাকে জয় করা যায় না, বৈরিশূন্যতা দিয়েই বৈরিতাকে জয় করা যায় - এই সনাতন ধর্ম। 

   আমি শত্রুতা ছাড়লে শত্রুতা নাশ হয় না। কিন্তু আমার ভিতর শত্রুতা শূন্য হলে আমি জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাকে গ্রহণ করি। সেই আমার মূল্যবোধ। সেই থেকেই যা কিছু সত্য, মঙ্গল। তার নাম যদি দিই ঈশ্বর, তবে সে সত্যিই অবিনশ্বর। কারণ এ মূল্যবোধ অবিনশ্বর। জীবন যত বড় ঘূর্ণিতেই ফেলুক না কেন ধ্রুবতারা তো এই, জীবনের উপর শ্রদ্ধা, তাই যে করেই হোক আবার সেদিকে ফেরার রাস্তা খুঁজে বার করতেই হবে। জীবনই একটা শব্দ, যেখানে আমি তুমি থেকে শুরু করে দুর্বলতম প্রাণীটকেও যুক্ত করে নিই। 

  সৎ সাহিত্য এই কাজটাই করে। সৎ সাহিত্যের কাজ মূল্যবোধকে চাপিয়ে দেওয়া না। সৎ সাহিত্যের কাজ মূল্যবোধকে আবার নতুন করে অন্বেষণ করা। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি ঠিক সেইখান থেকেই খোঁজা। সে প্রাচীন থেকে নবীন, ধর্ম থেকে শিল্প যা-ই হাতের কাছে পায় নেড়েচেড়ে দেখে। খোঁজে কোথাও পথের কোনো সূত্র আছে কিনা। যতটুকু পায়, রাখে। যতটুকু না পায়, সরিয়ে দেয়। 

  মূল্যবোধ যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এক সময় প্রয়োজনবাদ বা utilitarianism সে কথা বলতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। আসলে মানুষের মূল্যবোধ মানুষ হিসাবে পূর্ব নির্ধারিত। কিসের উপর নির্ধারিত তা আমরা জানি না। কিন্তু জানি না বলেই সেই ক্ষুব্ধ অহংকারে তাকে আমার সৃষ্টি বলে দাবী করা মূঢ়তা। মানব সভ্যতার যাত্রাপথ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা তৈরি হয়নি শুধু, তার গভীরে থাকা মনুষ্যত্ববোধই আসল কারিগর। যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু যা দিয়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করা যায় সদর্থে। 

  সৎ সাহিত্যের কাছে ঋণ আমাদের তাই অপরিসীম। কোনো মূল্যবোধকেই চাপাতে চায়নি। বারবার খোঁজ করেছে বলেই। যার মূল সুর জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা। 


   আজ কৃষ্ণা সোবতির মৃত্যুদিন। আশাপূর্ণা দেবী থেকে কৃষ্ণা সোবতির এই অন্বেষণ আমাদের দীর্ঘদিন সঞ্জীবিত রাখবে। বারবার বলবে, শুধু একটা স্বচ্ছ দৃষ্টিই দরকার। আলো দেখা যাবেই।

Saturday, January 13, 2024

সিন্ধু, না বিন্দু?

আন্তরিক হলে হবেই হবে। 

   দক্ষিণেশ্বরের সকাল। কুয়াশা কুয়াশা গঙ্গা। ওপার দেখা যাচ্ছে না। একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। আন্তরিকতায় ভর করে দাঁড়িয়ে। কোনো কৌশল না। কোনো গুপ্ত তন্ত্রমন্ত্র না। কোনো দল সম্প্রদায় না। বলছেন, আন্তরিক হও, সব ভুল শুধরে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। 

   উপায় কি? এ জীবন বড় জটিল। যা ভাবি, যেমন ভাবে হবে ভাবি, কিছুই হয় না। কোনোদিকে দিশা পাই না। আমিও বদলে যাচ্ছি। আমার চারপাশও বদলে যাচ্ছে। কি হবে? উপায় কি? 

    উত্তর, আন্তরিক হও। 

    আন্তরিক হতে গেলে অন্তরকে দেখতে হয়, জানতে হয়। আমার রাগ-হিংসা-ঈর্ষা-অভিমান আন্তরিক। আমার অভিশাপ আন্তরিক। কিন্তু আমার ভালোবাসা? আমার সহ্যক্ষমতা? আন্তরিক কি? মতলবী মানুষ কি আন্তরিক হয় ঠাকুর? আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মতলব। আমি কি চাইলেই আন্তরিক হতে পারি? 

   নিজেকে একটু আলগা দাও। মাকে দেখো। এত বড় সংসার। তোমাদের মত শিক্ষিত মানুষের ঢল। গ্রামের ওই পড়াশোনা না জানা, তোমাদের মত শহুরে আদবকায়দা না জানা মানুষের ঢল। সব সামলে দিচ্ছেন। কি করে? কি মন্ত্রের জোরে? ওই আন্তরিকতা। আন্তরিক, কিন্তু আসক্ত নয়।

   নহবতে মা আছেন। এই একটা শব্দেই সব বলা হয়ে গেল। মা আছেন। বলছেন, কায়দায় ফেলে মানুষকে দিয়ে কিছু করানো যায় না। 

     কিন্তু মানুষকে ব্যবহার করেই তো আমাদের জগত। আরো ভালো করে বললে অপব্যবহার করে। ঠকিয়েই আমার লাভ। আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিতে এই বুঝেছি। সৎ হতে গেলে সব ঠকিয়ে যায়। বিপদে পড়তে হয়। 

   তাই কি?

   জানি আমার এ ভ্রান্তি। লাভের পথ আর শান্তির পথ আলাদা। লাভের নেশায় নীতি-দুর্নীতির খেয়াল থাকে না। কিন্তু শান্তি আন্তরিক না হলে পাওয়া যায় না। জানি। কিন্তু সাহস নেই। আন্তরিক হওয়ার সাহস নেই। তাই আনুষ্ঠানিক হই। যেখানে আন্তরিকতা যত কম আনুষ্ঠানিকতা তত বেশি। আমার গোটা জীবন আনুষ্ঠানিক। আমার স্বপ্নও আর আগের মত অকৃত্রিম নয়। স্বপ্নও লোভী। স্বপ্নও মতলবী।

   স্বামীজি জানেন। “যত উচ্চ তোমার হৃদয়, তত দুঃখ জানিও নিশ্চয়…… লৌহপিণ্ড সহে যে আঘাত, মর্মর মুরতি তাকি সয়?... হৃদিবান নিঃস্বার্থ প্রেমিক… এ জগতে নাহি তব স্থান। হও জড় প্রায়। অতি নীচ। মুখে মধু। অন্তরে গরল। তবে পাবে এ সংসারে স্থান।”

    স্বামীজি জানতেন। আন্তরিক হলে জীবন দুঃসহ হয়ে যাবে। মানুষ ঠকিয়ে যাবে। আঘাত করে যাবে। অন্তরকে যদি দাও, ক্ষতবিক্ষত করে যাবে। তবে আর আন্তরিক কেন হব? তার চাইতে হিসাবি হই। মেপে পা ফেলি। মেপে কথা বলি। দাবার চালের মত গোটা জগতকে দেখি। কিন্তু দাবার শেষে তো শুধুই হারজিৎ। জীবন কি শুধুই হারজিৎ? তাতে ভরে উঠবে জীবন? লাভের অঙ্ক ভরবে। জীবন না। 

    কুয়াশা কাটছে। ওপার স্পষ্ট হচ্ছে। রোদ উঠছে। শূন্য গঙ্গাতীর। কেউ নেই। হিমালয় গলা জল সামনে দিয়ে যেতে যেতে প্রশ্ন করছে, শুধুই কি জাল ফেলে বসে থাকবে? ভাসবে না? যাবে না সাঁতরে মোহনার দিকে? নাকি সময় ফুরালে জড়ের মত ভেসে থাকবে জোয়ারভাটায়। 

     কিন্তু আমি তো সাঁতার জানি না। 

     জল বলল, সব জানো। জলে নামো। আন্তরিক হও। হাতে পায়ে জাগবে ছন্দ। সাঁতরে যাবে। আঘাত পাবে। ঝড় পাবে। ঘূর্ণি পাবে। কিন্তু ডুববে না। শুধু আন্তরিক মোহনার দিকে এগোবে চলো। নিজের জালে নিজেই আটকে বসে থেকো না। সময়ের জালে বাঁধা পড়বে যে!!

     ওপারে কুয়াশা কাটা আলোয় দাঁড়িয়ে কে? আকাশে বাতাসে ঠাট্টার সুরে প্রশ্ন ছুঁড়ছে.....শেষে কি দৃষ্টিকানা, কানে কানা হলি? অনুভব মেলে দাঁড়া। মস্তিষ্ক যা পারে না, হৃদয় পারে। "ভিক্ষুকের কবে বলো সুখ। কৃপাপাত্র হয়ে কি বা ফল। দাও। আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল। অনন্তের তুমি অধিকারী। প্রেম সিন্ধু হৃদে বিদ্যমান। দাও দাও - যেবা ফিরে চায়, তার সিন্ধু, বিন্দু হয়ে যান।"

    সিন্ধুতে সাঁতার দিতে চাস, না বিন্দু ঘিরে হতাশ্বাস রে?