প্রতিদিনের মত সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছি। ফাঁকা একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি এমন সময় দুজন
ভদ্রমহিলার কথোপকথনের খন্ডাংশ কানে এসে পৌঁছাল -
"ভাই, যে কোনো পরিস্থিতিতেই মানুষ নিজের চলার রাস্তাটুকু করেই নেয়। তা সে যেমনই হোক। সংসারে কোনো অবস্থাতেই মানুষ নিজের চলাকে থামাতে পারে না।"
আমি বিস্মিত হলাম। ফিরে তাকালাম যিনি বললেন কথাগুলো তাঁর মুখের দিকে। তাঁর বয়স আন্দাজ ষাটের কোঠায়, আর যাঁকে বললেন তাঁর আনুমানিক তিরিশ। রাস্তার দু'ধারে দু'জন দাঁড়িয়ে।
আমার ভিতরে ভিতরে আলোড়ন তৈরী হল। এগিয়ে গেলাম। যে মানুষটা এই কথা কটা উচ্চারণ করলেন, এই নির্জন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে, এ কি পরম সাহিত্য না? যা মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা আর বোধ পরস্পর মিশে তাকে রসসিক্ত করে প্রকাশ করে? হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চই তাই। অন্তত আমার মত মানুষের কাছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ 'এই যে কালো মাটির বাসা' পৃথিবীর বুকে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে নিয়েই তো সেরা সাহিত্য রচনা করেছে। অবশ্যই নিজের বোধ অনুযায়ী।
সাহিত্যের অনেক -ইজম আমি শুনি। বুঝি না। তা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট পাওয়ার বিষয় হতে পারে। আমার হৃদয়ের সামগ্রী না। যার দু'বেলা খাওয়ার চিন্তা নেই, তাকেই টেবিল ম্যানার্স, খাওয়ার সময় হাতের বুড়ো আঙুল তর্জনী ছোঁবে কি না, নাকি কনিষ্ঠ আঙুলটি মধ্যমাকে ছুঁয়ে থাকবে ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। যার খিদেতে পেট জ্বলে, সে হাতের কাছে ভাত পেলে হুমড়ি খেয়ে, পড়ি মরি করে ভাতগুলো গলাধঃকরণ করে প্রাণে বাঁচে।
সে সাহিত্যই আমি বুঝি। আমার চোখ, কান ওই মানুষগুলোর সাথেই ফেরে যে দু'বেলা ভাতের সন্ধান করছে, যে মানুষটা অত্যন্ত ভালোবেসে ব্যর্থ হয়ে ওই যে গলায় দেওয়ার দড়ি খুঁজছে, যে রমণী সংসারে সব দিয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে জীবনের প্রান্তদেশে এসে মরার উপায় খুঁজছে। কত বলব। এরাই চারদিকে। আমার হতভাগ্য দৃষ্টিতে ভালো কিছু পড়ে কই?
মাকে দেখেছি অন্যের দুঃখে কেঁদেছেন। সাহায্য করেছেন সাধ্যাতীত। প্রতারিত হয়েছেন তার চেয়ে বেশি। সেদিন ক্ষোভ ছিল আমার। আজ নেই। আজ বুঝি মা প্রতারিত হয়েছেন মানুষের ক্ষুদ্রতার কাছে। মানুষের যে মহান মানবিকবোধ সেখানে তিনি প্রতারিত নন। সেখানে তিনি মনুষ্যত্বে উত্তীর্ণা, সার্থক তাঁর জীবন।
জীবন নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে, ওই যে যারা অর্ধনগ্ন হয়ে বাঁচার রসদ খুঁজছে আমি ওদের ওখানে যেতে চাই। পারছি না। আমার পায়ে দামী জুতো। দামী জামা-প্যান্ট আমার গায়ে। এদের খুলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ওদের কাছে আমায় যেতেই হবে। যাঁকে প্রণাম করি, তাঁর চরণ দুখানি ওই নদীর মাঝখানে। ওদের পাশে। আমার প্রতিটা প্রণাম ব্যর্থ হয়ে আমায় ব্যঙ্গ করছে। করবেও যতদিন না আমি ওদের কাছে পৌঁছাতে পারি।
লোকে বলে উগ্রপন্থীরা শুধু এক প্রজাতিরই হয়। আরে ভাই নানক, কবীর, যীশু, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী ইত্যাদি উগ্রপন্থীদের কথা কেন বলে না? এমন উগ্রভাবে ভালোবাসার কথা বলা কোনদেশী ভালো লোকের কাজ? যে-ই এঁদের পথে পা বাড়িয়েছে জীবন ছারখার হয়েছে। তবে বিষে না, প্রেমে। তবে সে প্রেমের ঝাঁঝ বিষের চেয়ে শতগুণ বেশি।
তাই বলছিলাম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য আমার কাছে ওঁনারাই রচনা করেছেন যাঁরা মানবাত্মার বুকে মুখ রেখে তার দীর্ঘশ্বাস আর প্রেম দুটোকেই অনুভব করেছেন। মানুষের কাছে এনেছেন। আমরা কেঁদেছি, ভেবেছি, বাঁচতে শিখেছি। শিখছি। শিখবও।
"ভাই, যে কোনো পরিস্থিতিতেই মানুষ নিজের চলার রাস্তাটুকু করেই নেয়। তা সে যেমনই হোক। সংসারে কোনো অবস্থাতেই মানুষ নিজের চলাকে থামাতে পারে না।"
আমি বিস্মিত হলাম। ফিরে তাকালাম যিনি বললেন কথাগুলো তাঁর মুখের দিকে। তাঁর বয়স আন্দাজ ষাটের কোঠায়, আর যাঁকে বললেন তাঁর আনুমানিক তিরিশ। রাস্তার দু'ধারে দু'জন দাঁড়িয়ে।
আমার ভিতরে ভিতরে আলোড়ন তৈরী হল। এগিয়ে গেলাম। যে মানুষটা এই কথা কটা উচ্চারণ করলেন, এই নির্জন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে, এ কি পরম সাহিত্য না? যা মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা আর বোধ পরস্পর মিশে তাকে রসসিক্ত করে প্রকাশ করে? হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চই তাই। অন্তত আমার মত মানুষের কাছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ 'এই যে কালো মাটির বাসা' পৃথিবীর বুকে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে নিয়েই তো সেরা সাহিত্য রচনা করেছে। অবশ্যই নিজের বোধ অনুযায়ী।
সাহিত্যের অনেক -ইজম আমি শুনি। বুঝি না। তা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট পাওয়ার বিষয় হতে পারে। আমার হৃদয়ের সামগ্রী না। যার দু'বেলা খাওয়ার চিন্তা নেই, তাকেই টেবিল ম্যানার্স, খাওয়ার সময় হাতের বুড়ো আঙুল তর্জনী ছোঁবে কি না, নাকি কনিষ্ঠ আঙুলটি মধ্যমাকে ছুঁয়ে থাকবে ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। যার খিদেতে পেট জ্বলে, সে হাতের কাছে ভাত পেলে হুমড়ি খেয়ে, পড়ি মরি করে ভাতগুলো গলাধঃকরণ করে প্রাণে বাঁচে।
সে সাহিত্যই আমি বুঝি। আমার চোখ, কান ওই মানুষগুলোর সাথেই ফেরে যে দু'বেলা ভাতের সন্ধান করছে, যে মানুষটা অত্যন্ত ভালোবেসে ব্যর্থ হয়ে ওই যে গলায় দেওয়ার দড়ি খুঁজছে, যে রমণী সংসারে সব দিয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে জীবনের প্রান্তদেশে এসে মরার উপায় খুঁজছে। কত বলব। এরাই চারদিকে। আমার হতভাগ্য দৃষ্টিতে ভালো কিছু পড়ে কই?
মাকে দেখেছি অন্যের দুঃখে কেঁদেছেন। সাহায্য করেছেন সাধ্যাতীত। প্রতারিত হয়েছেন তার চেয়ে বেশি। সেদিন ক্ষোভ ছিল আমার। আজ নেই। আজ বুঝি মা প্রতারিত হয়েছেন মানুষের ক্ষুদ্রতার কাছে। মানুষের যে মহান মানবিকবোধ সেখানে তিনি প্রতারিত নন। সেখানে তিনি মনুষ্যত্বে উত্তীর্ণা, সার্থক তাঁর জীবন।
জীবন নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে, ওই যে যারা অর্ধনগ্ন হয়ে বাঁচার রসদ খুঁজছে আমি ওদের ওখানে যেতে চাই। পারছি না। আমার পায়ে দামী জুতো। দামী জামা-প্যান্ট আমার গায়ে। এদের খুলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ওদের কাছে আমায় যেতেই হবে। যাঁকে প্রণাম করি, তাঁর চরণ দুখানি ওই নদীর মাঝখানে। ওদের পাশে। আমার প্রতিটা প্রণাম ব্যর্থ হয়ে আমায় ব্যঙ্গ করছে। করবেও যতদিন না আমি ওদের কাছে পৌঁছাতে পারি।
লোকে বলে উগ্রপন্থীরা শুধু এক প্রজাতিরই হয়। আরে ভাই নানক, কবীর, যীশু, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী ইত্যাদি উগ্রপন্থীদের কথা কেন বলে না? এমন উগ্রভাবে ভালোবাসার কথা বলা কোনদেশী ভালো লোকের কাজ? যে-ই এঁদের পথে পা বাড়িয়েছে জীবন ছারখার হয়েছে। তবে বিষে না, প্রেমে। তবে সে প্রেমের ঝাঁঝ বিষের চেয়ে শতগুণ বেশি।
তাই বলছিলাম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য আমার কাছে ওঁনারাই রচনা করেছেন যাঁরা মানবাত্মার বুকে মুখ রেখে তার দীর্ঘশ্বাস আর প্রেম দুটোকেই অনুভব করেছেন। মানুষের কাছে এনেছেন। আমরা কেঁদেছি, ভেবেছি, বাঁচতে শিখেছি। শিখছি। শিখবও।
সাহিত্য, আমার খুব কাছের একজন। কেন? কারন যাকে আমি অনুভব করতে পারি, তার সাবলীল ভাব প্রকাশের মাধ্যমে, সেইতো আমার আপন। এটাই সাহিত্যের সার্থকতা। একজন প্রকৃত সাহিত্যিক কোনভাবেই বিমূর্ততাকে আশ্রয় করতে চান না। তার বিষয়বস্তুর বিশুদ্ধতা, চিন্তা-চেতনার স্বচ্ছতা, তীক্ষ্ণ উপলব্ধিই পর্যাপ্ত তার অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য।
ReplyDeleteজীবন থেমে থাকে না।কিন্তু সেটা কি সবার জন্যে? বোধহয় না।
অনেকেই পথের ইতি টানে, 'পাথেয়' তার অন্যতম কারন। সত্যিই, জীবন আর বোধের মেল-বন্ধনের ঘটানোর জন্যে পুঁজির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
"যেখানে বেঁচে থাকার পুঁজি খুঁজি" ঠিক তেমনি এক সাহিত্যকর্ম। এইখানে প্রতিটি শব্দ জীবনবোধের আধার। প্রয়োজন আর আয়োজনের ভারসাম্যগত তারতম্য কিভাবে সমাজকে তথাকথিত সভ্য-অসভ্যে বিভক্ত করে, কিভাবে মোড়কে মোড়া সাহিত্য টবে রাখা 'বনসাই'কে মহিমান্বিত করে বাহবা কুড়ায়, খুবই সুচিন্তিতভাবে চিত্রায়িত। নম্র উগ্রপন্থীদের ভালবাসার প্রভাব, মানুষের মহান মানবিকতাবোধের কাছে ক্ষুদ্রতার আত্মসমর্পণ, সারাটা জীবন দিয়ে জীবনকে জানা, সর্বশান্ত হয়ে 'আমরা সবাই রাজা...তাঁর রাজ্যে', বলার তাগিদ - এ সবই বেঁচে থাকার রসদ, আমাদের পুঁজি।