ইতিহাসে পড়েছিলাম, সেই
আদিম যুগে, মানুষ - বিদ্যুৎ, ঝড়, বন্যা এইসব ঘটনায় ভাবত দেবতারা রুষ্ট হয়েছেন। তাই
নানা রকম আচার অনুষ্ঠান করে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করত। সেই থেকে ডিপার্টমেন্ট অনুযায়ী
দেব-দেবীদের নামকরণ ও দায়িত্ব নির্ধারণের একটা কল্প-গল্প মানুষের মনে তৈরী হয়েছিল।
বলা বাহুল্য বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সে ধারণা পাল্টাল।
কিন্তু একদিকে এখনো সেই অন্ধকার থেকেই গেছে অনেকখানি।
মনের বিকার ও তার কারণ সমূহ। মনের যে অস্বাভাবিক অবস্থাগুলো সমাজের সুস্থতার পক্ষে
এক একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, সে ঘরেই হোক
- পাড়াতেই হোক - রাজ্যেই হোক - দেশেই হোক - কি বিশ্বেই হোক, তার কারণ অন্বেষণ ও গবেষণা
সাধারণ মানুষের বোধগম্য করাটা খুব জরুরী মনে হয়। অন্যভাবে মানুষকে বৈজ্ঞানিক পন্থাতে
আত্ম-বিশ্লেষণের পথে এগোবার শিক্ষায় শিক্ষিত করাও খুব আবশ্যক। সন্দেহ প্রবণতা, মিথ্যা
বলার প্রবণতা, চুপ করে সয়ে যাওয়ার কপট মহত্ব, খুঁতখুঁতেমি, বদরাগী, হতাশা, অবসাদ -
এরকম আরো গভীর মনোবিকারের তালিকার সাথে আরো অল্প বয়সে পরিচিত হওয়া, বর্তমান সমাজের
পক্ষে ভীষণ জরুরি। কবীর দাস সুস্থতার লক্ষণ হিসাবে কত আগে তাঁর দোহাতে বলছেন,(WHO বলার
বহু আগে) - যে মানুষ পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিকারমুক্ত, সেই সুস্থ।
আমাদের পাঠ্যে (উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে) কিছুটা এইসব নিয়ে
লেখা শুরু হয়েছে যদিও, তবু মনে হয় অনেক অভাব এখনো আছে। মন নিয়ে কাজ করার আগ্রহ, সুযোগ
আরো বাড়াতে হবে। তার সাথে এও মনে হয়, প্রতিটা বিদ্যালয়ে কমপক্ষে মাসে একবার করে, অন্তত
একজন করে মনোবিদদের আসা, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ তৈরী করা, এসব
খুব আবশ্যিক। কারণ আমরা যদি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রাথমিক অবস্থাতেই সচেতন হতে পারি,
তবে কোনো বিকার অভ্যাসে রূপ নেওয়ার আগেই তাকে সম্পূর্ণ বা অনেকাংশে নির্মূল করা যাবে।
দেখেছি বয়ঃসন্ধিতে কত রকমের সংশয়, কুণ্ঠা, অপরাধবোধ, হীনমন্যতা
ইত্যাদি তাদের অচেতন মন ঘিরে থাকে। না পারে নিজেকে বুঝতে, না পারে বোঝাতে। কি অসহায়
অবস্থা! এই সময় যদি তারা মনের কথা খুলে বলার মত কাউকে পায়, যিনি একাধারে বন্ধুর মত
কথা বলবেন, আবার বিজ্ঞানসম্মত সুপরামর্শও দেবেন। কি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে স্কুলের পরিবেশ।
শুধু বাগান, ক্লাসরুম পরিস্কার না; ছাত্রছাত্রীদের অন্তঃকরণটাও শুদ্ধ হবে বিজ্ঞানের
আলোতে। নিজেকে চেনা, বোঝাটা আরো সহজ হয়ে উঠবে তার কাছে। আরো ভালো নাগরিক হয়ে ওঠাটা
আরো সহজ হবে না তার কাছে?
শুধু স্কুল না। কর্মক্ষেত্রেও মনোবিদদের উপস্থিতি দরকার।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুনেছি আছে। তবে অনেকাংশেই দেখি তা নাম মাত্র। প্রতীক স্বরুপ।
তবে শুধু রোগের না, রোগ না আসার পথও মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার
আরেক দিশা। যে অসুস্থ সেও যেমন, যে সুস্থ সেও তেমন গবেষণার বিষয় হওয়া উচিৎ বলে আমার
মনে হয়। যে সুস্থ, সে কিভাবে সুস্থ আছে, সেও বুঝতে হবে ('Positive Psychology' যা নিয়ে
কাজ করে)। আরো গভীরে যাও..... এ ছাড়া গতি নেই। কারণ ছাড়া কার্য্য হয় না, এবং মনের প্রতিটা
পরিবর্তনের পিছনেই যে ন্যায্য কারণ আছে, সে তত্ত্ব গৌতম বুদ্ধ বহু আগে তাঁর কার্য্য-কারণ
তত্ত্বে বলেছেন। তাঁর মত করে সমাধানের পথও বলেছেন।
আমাদের বর্তমানে দরকার আরো আরো বেশি করে কারণ খোঁজা, কারণের
কারণ খোঁজা। সমাধান সে পথেই আসবে। আমাদের জানতে হবে, আমার মনের বিকারগুলো নিয়ে হতাশ
হওয়ার কারণ নেই, তার নির্দিষ্ট কারণ আছে ও সাম্ভাব্য প্রতিকারও আছে। কোনোটাই অমূলক
বা এমনি এমনি হয় না।
No comments:
Post a Comment