সুধা ফেলে বিষপানে মত্ত অতিশয়
বিষ ত্যাজি সুধা খাও ওহে মহাশয়
বন্ধু বলল, ঘোষপাড়ার সতীমায়ের মেলায় যাওয়া
যেতে পারে? পারে না আবার! নিশ্চই পারে। মনকে বার করব। ঘর
থেকে। নিজের থেকে। মেলার চেয়ে উত্তম সুযোগ আর কি হতে পারে!
রাত এগারোটায় স্টেশানে দাঁড়ালাম। ছ'জন বন্ধু
মিলে ক্ষুদ্র মেলা বসল স্টেশানে। চক্ষু চড়কগাছ হল কল্যাণী লোকাল দেখে। এত্ত
মানুষ!!! থিকথিক করছে লোক। উঠে কোনোরকমে দাঁড়ালাম। আবালবৃদ্ধবনিতা, রকমারি পোশাকে চলেছে মেলায়। কারোর কপালে চন্দনের ফোঁটা। কারোর উদাস চোখ এত
ভিড়ে একলা হারিয়ে। কারোর চোখে ভাবের খেলা। এরা কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই কর্তাভজা সম্প্রদায়টি কি সে ইতিহাসের বিস্তারে যাব না। সংক্ষেপে
এইটুকু বলি, আউলচাঁদ এই মতের প্রতিষ্ঠাতা। আঠারোশো শতাব্দীর
মধ্যভাগে এর সূচনা। ওনার এক শিষ্য রামশরণ। রামশরণের স্ত্রী সতীমা নামে পরিচিতা।
এঁদের ছেলে দুলালচাঁদ, মানুষের বিশ্বাস, ইনি শ্রীচৈতন্যদেবের অবতার। জাতিভেদ নাই। মূলত বৈষ্ণব পথ। মানুষকে
গুরুরূপে ভজাই পথ। সে ভাবে কোনো ধর্মগ্রন্থ নাই। উপরে উল্লিখিত গানটি এই
সম্প্রদায়ের একটি লক্ষণগীত। বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর মানুষের
আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে এই ধর্মমত। আজও তারাই এর প্রাণকেন্দ্র।
ট্রেন থামল ঘোষপাড়ায়। স্টেশান প্লাবিত হল জনসমুদ্রে। লক্ষ লক্ষ
মানুষ। সার বেঁধে হেঁটে চলেছে। আমরাও পা মেলালাম। ঘড়ি বলছে রাত বারোটা, চোখ বলছে না। বলছে, এ তো সকাল, এতগুলো মানুষের মধ্যে জাগা, সে কি রাত হতে পারে!
পায়ে পায়ে পৌঁছলাম মেলা প্রাঙ্গণে। মাইকে হারানো মানুষের উদ্দেশ্যে
ঘোষণা - "বেচারাম পাল, আপনি মেলায় হারিয়ে গেছেন। আপনার
ভাই কেনারাম পাল আমাদের কাছে অপেক্ষা করছেন".... "মাখনবালা দাসী আপনি
মেলায় হারিয়ে গেছেন....."
ভাবলাম, এ কেমন মেলা যেখানে হারিয়ে গেলেও
জানতে পারা যায় না! চারদিকে থৈ থৈ করছে ভিড়। রাস্তাটাকে দু'ভাগ
করে দাঁড়িয়ে ওই মানুষের সার কেন? দণ্ডী কাটা চলছে। বাচ্চা,
মহিলা, পুরুষ দণ্ডী কেটে কেটে চলেছেন। ভেজা
কাপড়। মহিলারাই বেশি। সারা গা জলে ভিজে। শুনলাম হিমসাগর নামে এই মেলাপ্রাঙ্গণে যে
পুকুর আছে, সেই পুকুর থেকে স্নান সেরে সতীমায়ের মন্দিরে
চলেছেন দণ্ডী কেটে। মনস্কামনা পূর্ণ হবে, রোগ ভাল হবে,
এমনটাই বিশ্বাস।
বিস্ময়ে দেখছি- সারা শরীরে পথের ধূলো মেখে কি নিমগ্নতায় শুয়ে পড়ছেন
পথে, এগিয়ে চলেছেন সবার পায়ের সাথে মিশে মিশে। কি পাবেন জানি
না, তবে এত নীচু হওয়া যে বিশ্বাসে সে বিশ্বাস শুধুই কি কামনা?
না, কামনা মানুষকে নীচু করে না এভাবে। এ
প্রার্থনা। নিজের ইষ্টের কাছে অভীষ্টের প্রার্থনা।
হিমসাগরের দিকে এগোলাম। প্রচুর জোরালো আলোতে আলোকিত চারদিক। একজন
প্রতিবন্ধী ছেলেকে দেখলাম। সারাটা মুখচোখ গভীর আবেগে উদ্বেল। একটা গামছা জড়িয়ে
স্নান সেরে উঠে এল। ওর প্রতিবন্ধকতা যাবে? জানি না। তবে জানি
ও সামনের বছর আবারও আসবে। এমনই গভীর আবেগে স্নান করবে। প্রতীক্ষা করবে অলৌকিক
সুস্থতার বর। হয়তো হবে না। একদিন সে মেনে নেবে এই প্রতিবন্ধকতা। সেদিন হয় তো শুধুই
স্নান করবে, কিম্বা হয়তো করবেই না। ততদিনে হয় তো ওর চোখে
পড়বে মনের হাজারও প্রতিবন্ধকতা চারপাশে। মন্দিরের দরজায় সেদিন বসবে, প্রার্থনায়। আরোগ্যের জন্য না, আলোর জন্য।
হতাশ করল বাউলের দল। আত্মরঞ্জন না, এ যেন
লোকরঞ্জনের পসরা সাজানো। বাউল মনে না জন্মালে কি আর গানে জন্মায়? আধুনিক সাংগীতিক যন্ত্রপাতির দাপটে বাউলের গান এসে দাঁড়িয়েছে বাজারে। যেন
ঝরণাধারা পুকুরে এসে ঠাঁই গেড়েছে। ঝড়ের হাওয়ার তৃষ্ণা কি আর পাখার হাওয়ায় মেটে!
আশেপাশে ঘুমন্ত অজস্র মানুষ। তারই মধ্যে বিভিন্ন ঠেকে চলছে গান।
গানের ভক্তগণের কাছাকাছি গেলে ঘ্রাণে টের পাওয়া যাচ্ছে, অনেকেরই
তুরীয় অবস্থা। গানের মাদকতার সাথে আছে পা টলানো পানীয়র দাপট। গান চলছে কর্ণপটহকে
রীতিমত 'রণং দেহি' গোছের হুংকার দিয়ে।
উদ্দাম আছে, শান্তি নেই। আবেগের চড়া রস আছে, উপলব্ধির শান্তরস নাই।
তবে এ ম্লানতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে এ লক্ষ মানুষের উদ্দীপনের সমুদ্রে।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে নেচে উঠছে মেলা, তরঙ্গায়িত হচ্ছে উচ্ছ্বাসে,
আনন্দে। মাটির সরায় সাজানো পূজার উপকরণ, অনাড়ম্বর।
সার সার দোকানে, হরেক মাল দশটাকা থেকে নানারকম উৎকৃষ্ট
খাদ্যের প্রতিশ্রুতিবহ প্ল্যাকার্ড যুক্ত অস্থায়ী দোকান।
আবার মাইকে ঘোষণা। 'এ মেলা আপনার আমার...
আপনারা এ মেলাকে সুন্দর করে তুলুন... কেউ পকেট মারবেন না....'
এ হেন উপদেশোচিত ঘোষণা জীবনে বড় একটা শোনার সুযোগ হয়নি যদিও,
তবে যাদের উদ্দেশ্যে বলা, তাদের বোধদয় হল কি
না জানি না, বিপরীতপক্ষ সচেতন হবেন এতটা আশা রাখা যায়। ভাল
কৌশল।
ঘুরতে ঘুরতে রাত বাড়ল। ফেরার পালা। মেলার বাইরে এসে দেখি এক বুড়ো
মানুষ দোকান গোটাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, ফিরবেন?
বললেন, নাহ, আর বোধায়
বিক্রিবাট্টা হবে না।
- কোত্থেকে আসছেন, জিজ্ঞাসা করলাম।
- কাটোয়া, বয়েস ওনার মতে ছাপান্ন থেকে আটান্ন'র মধ্যে, আমার মনে হল আরো দু'বছর
বাড়নো যেতে পারে।
ওনার বিক্রির সামগ্রী বলতে, বাঁশি আর ডুগির মত
কিছু দেখলাম। বললাম, আর কিছু নাই? বললেন,
আছে তো - একতারা।
বোঝো! মেলার বাইরে মেলার মূলসুরটিকে বুকে নেওয়ার বাজন। বললাম,
দেখাও দেখি।
সে ব্যাগ খুলে দিল হাতে একতারা। সুর বাজল। সুরই বাজল বটে। সে
অপুত্রক বৃদ্ধ, বৃদ্ধাকে নিজের "সেয়ানা" ভাইপোর
হাতে রেখে বেরিয়েছে পেটের টানে। একতারার সুর বেচতে। বললাম, বাড়ি
যাবেন? বললেন, না গো, এ মেলা শেষ হলি তারপর। জানতে চাইলাম, একা? হাসলে বৃদ্ধ।
- না গো সঙ্গীসাথীরা সব মেলায় আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
ফেরার পথ ধরলাম। ঠিকই বলেছেন, সঙ্গীসাথীরা সব
মেলায় আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ঘুমন্ত কল্যাণী শহরের বুক চিরে চলছে আমাদের ভ্যান।
বসন্তের মত্ত ফুলের গন্ধ আমোদিত করে রেখেছে চারধার। বুকের মধ্যে কিঞ্চিৎ মন
খারাপের সুর। মেলা যে রইল পিছনে। হাতের একতারাটায় টোকা লাগল। সুর বাজল। সব সুরের
মুল সুর, প্রধান সুর - একের হৃদয়ে একা জন্মিয়ে যা বিশ্বময়
হয়ে মেলা তৈরি করে - ভালোবাসা - মিলবার তৃষ্ণা... মেলার তৃষ্ণা!
(ছবিগুলোর এই অপূর্ব কোলাজটি বানিয়ে দিয়েছে Debasish,
আর ঐতিহাসিক তথ্যাবলীতে সাহায্য করেছে Suman.
দুজনের কাছেই আর নতুন করে কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। ওরা ভাল থাকুক,
আরো ভাল কাজ করুক এই প্রার্থনা।)

No comments:
Post a Comment