পথ পাচ্ছিল না মানুষটা। তার জাগতিক সুখ কিছু অপ্রাপ্ত হওয়ার কথা নয়। রাজার ছেলে
সে। তবু কেমন গোলমাল হয়ে গেল সব কিছু। বার্ধক্য রোগ শোক মৃত্যু - এসবের কোনো একটা
অর্থ তো থাকবে? সবই এমনি এমনি? মিছিমিছি। এতবড় সৃষ্টি শুধুই কিছু অন্তঃসারশূন্য
অভিনয়ের জন্য? এ হতে পারে? কিছুতেই হতে পারে না।
লোকটার মাথার মধ্যে শিরা-উপশিরাগুলো ছিঁড়ে ফেটে পড়বে মনে হতে লাগল। যেন শত সহস্র
হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে মাথার ভিতরের দেওয়ালে। সে পাগলের মত অস্থির হয়ে উঠছে।
রাজপ্রাসাদের কোনায় কোনায় উত্তর খুঁজল, পেলো না। ভোগে উত্তর খুঁজল, পেলো না।
সংসারের কোনো কোনায় তার জন্য উত্তর অপেক্ষা করছে সে জানে, কিন্তু কোথায়?
একে
একে এক-একজন বিখ্যাত সব ধর্মপুরুষের কাছে উপস্থিত হল। সবাই কৌশল নিয়ে ব্যস্ত। কেউ
উত্তর দিচ্ছে না। মূল প্রশ্নটা এড়িয়ে যাচ্ছে সবাই - এসবের অর্থ কি? এত আয়োজন সব
বৃথা? শুধু ছলনা? মিথ্যার আশ্বাস সব? কই ভগবান? এত এত প্রাণ অঙ্কুরে নষ্ট হয়ে
যাচ্ছে। অভুক্ত, পীড়িত, রোগগ্রস্থ, কাতর, অসহায় এই লক্ষকোটি প্রাণকে রুদ্ধ
কারাগারে নিক্ষেপ করে যে ঘুমাচ্ছে অঘোরে সে দয়াময়? সে ভগবান? সে সৃষ্টিকর্তা?
বিদ্রোহ করে উঠল মানুষটার হৃদয়, মিথ্যা সব! সব কৌশল, আচার, বিধি-নিষেধকে তুচ্ছ করে
গিয়ে বসল বৃক্ষের তলদেশে।
এর
পরেরটা তো ইতিহাস। আজ আমাদের ভগবানের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বুদ্ধকে। ঐশী শক্তিতে নয়।
করুণার বাণীতে। আত্মশক্তি জাগাতে অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাসী হতে হয় না, নিজের সাথে
বিশ্বস্ত থাকতে হয়, বুদ্ধ শেখাল। বুদ্ধের বাণীর মর্মস্থলে একটা যন্ত্রণা আছে।
নিজের ক্ষুদ্রতা থেকে, সঙ্কীর্ণতা থেকে উত্তরণের জাগরণস্পৃহা। সেটা যন্ত্রণা।
বুদ্ধের বাণীর মর্মস্পর্শ করতে তাই সেই যন্ত্রণার অংশীদার হতে হবে। সেই যন্ত্রণাকে
নানান আজগুবি বিশ্বাসে ধামাচাপা দিতে যতই চেষ্টা করব, নিজের অন্তরের অন্তঃস্থলে
ততই দুর্বল থেকে দুর্বল হতে থাকব। পুরোহিত, জ্যোতিষী, তাবিজ, গ্রহ-নক্ষত্র, তিথি,
পঞ্জিকা আর তেত্রিশ কোটি তো রইলেনই - কেউ রেয়াত করবে না। সবার দরজায় ভিখারির বেশে
দাঁড়াব গিয়ে, তবু ভিক্ষার ঝুলি কোনোদিন ভরবে না। জন্মভিখারির অবস্থা তখন আমার।
বুদ্ধ
বললেন, কি চাও? যন্ত্রণার সাময়িক কপট উপশম, না যন্ত্রণার মূল উৎপাটন? যদি
দ্বিতীয়টা চাও তো আমার কাছে এসো। আমি পথ পেয়েছি। সে পথে শুধু আমি না, তুমিও হাঁটতে
পারো যদি চাও। বুদ্ধ কোনো মানুষ না, বুদ্ধ একটা অবস্থা। তাই তোমার জীবনের
বুদ্ধপূর্ণিমার আয়োজনের পথ তোমায় করতে হবে। তুমি বুদ্ধ হও। নিজেকে উদ্ধার করো।
সবার
আগে তোমার দেখাটাকে বদলাও। ভুল দেখছ বলছি না। দূর থেকে দেখছ। কাছ থেকে দেখো। দেখো,
প্রতিটা অণু-পরমাণু প্রতিটা ক্ষণের সাথে পরিবর্তনশীল। এটা মনে রেখো। তুমি নিজেও
নানা পরিবর্তনের একটা মালা। সে মালার যে সূতো সে তোমার স্মৃতি। সেও মিথ্যা। তোমার
অস্তিত্ব একটা শিখার মত। যে শিখা প্রতি মুহূর্তের দহনের ক্রমাগত রূপ একটা। তোমার
অস্তিত্ব একটা বহমান নদীর মত, যে নদীর স্রোত প্রতি মুহূর্তের বয়ে যাওয়া জলধারার
নিরবচ্ছিন্ন গতিধারা একটা। তুমি আছো, আবার নেইও। এটা বুঝতে চেষ্টা করো। যেমন তুমি,
তেমন তোমার চারপাশ - বহতা ধারা। আটকাতে যেও না, আঘাত পাবে। তোমার জীবনের প্রথম
তৃষ্ণাকে মারো - সব সুখ স্থায়ী করার ইচ্ছা। হবে না, বোঝো, কারণ জগতে দুঃখ আছে।
তুমি চাইলেও এড়াতে পারো না। তুমি চাইলে তার মূল বিনাশ করতে পারো।
এরপর
তোমার ভালোবাসার দিকে তাকাও। ওকে আরো বড় করো। ভালোবাসা বড় হলে প্রেম হয়। আর প্রেম
বড় হলে হয় করুণা। করুণা অসীমের প্রতিশব্দ। ওর সীমা হয় না। তার একদিকে ক্ষমা আরেক
দিকে তিতিক্ষা। ভার লাগবে না দেখো। তুমি জাগো। অসীমে ডানা মেলো। অসীমকে পাও অসীমকে
আঁকড়িয়ে নয়, অসীমে মিশে গিয়ে। অনস্তিত্ব হও। নিজেকে বুদবুদের মত মিশে যেতে দাও। ভয়
পেও না। ভয় বুদবুদের, সাগরের নয়। সাগর হও। করুণায়।
যে
ভালোবাসা আর জ্ঞান বোধের অঙ্কুরকে সিক্ত রাখে সেই সাধনা। সেই সাধনার সিদ্ধাবস্থাকে
বলে - বুদ্ধ। আমার হাত-পা-নাক-চোখ-মুখ-গা-হৃৎপিণ্ড-ফুসফুস-মস্তিষ্ক এরা কেউ বুদ্ধ
নয়। অকারণ আমায় পূজো কোরো না। আমার বোধের মধ্যে যে বোধের শিখা সে-ই বুদ্ধত্ব। সেই
শিখাকে আলিঙ্গন করো। তোমার ভক্তিতে যদি যন্ত্রণা না থাকে তবে তা আমার সামনে এনো
না। সে দিবাস্বপ্ন ভেঙে ফেলে এসো আমার কাছে। আমি চিরকালের। কারণ এ আমি সে আমি নই
যে মাতৃগর্ভে জন্ম নিয়েছিল। এ আমি সে আমি, যে বোধের জ্যোতিতে জন্মেছে নিজেকে নিজের
তৈরি অজ্ঞান আবরণের থেকে মুক্ত করে। মানুষকে অজ্ঞান রাখে কোনো ঈশ্বর নয়, তার নিজের
তৈরি করা নিজের হাতে বোনা অজ্ঞানতার মসলিন চাদর। সরিয়ে দাও, নিজেকে জানো। সেই
নিজের মধ্যে সব'কে জানো। বুদ্ধ হও।
(ছবিঃ ইন্টারনেট)

excellent ...
ReplyDelete