লোকটা দরজা খুলে ঘরে ঢুকল। জানলাগুলো খুলল। রোদ এসে মেঝেতে শুলো
শরীর এলিয়ে। লোকটা ঘরের একটা পাশে রাখা চৌকিতে বসল। তার মনে হচ্ছে ঘরে কে যেন একটা
আছে। তার খুব পরিচিত, তার দিকে তাকিয়েই যেন বসে আছে কোথাও একটা। বসে আছে? না, হয়ত দাঁড়িয়ে।
লোকটা
ঘর থেকে বেরোলো। জানলাগুলো বন্ধ করা। সে জানে ঘরে কেউ নেই, তবু মনে হচ্ছে কে যেন
একটা আছে। সে যেন বলছে, "আমায় একা রেখে যেয়ো না!" লোকটা দরজাটা বন্ধ করে
তালা দিল। হাঁটতে শুরু করল হনহন করে। পুরো বাড়িটাই যেন সেই অস্তিত্বের চোখ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। তার চলে যাওয়াটা
দেখছে। বারণ করছে না। জানে বারণ করে লাভ নেই, লোকটার পায়ের গতি মনের ঘূর্ণী ছাড়িয়ে
ছুটছে।
লোকটা বাস স্ট্যাণ্ডে এসে দাঁড়াল। আরো কিছু
লোকজন এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তার মনে হল সে ঘরের লোকটা যেন এদের কারোর ছদ্মবেশে
দাঁড়িয়ে। তার দিকে তাকাচ্ছে, তার বুকের ভিতরটা সিনেমার পর্দার মত মেলা তার কাছে।
কোনো একটা লোকের মধ্যে দিয়ে সে সবটা জেনে ফেলছে। এমন কিছু যা সে নিজেও জানে না।
লোকটা কারোর চোখের দিকে তাকালো না। বাসে উঠবে না। একটা ট্যাক্সি নিল।
ট্যাক্সি ড্রাইভারের মাথার পিছনের দিকে ও
দুটো কি? চোখ? ট্যাক্সির ড্রাইভার যেন আসলে তার দিকেই ফিরে বসে আছে। দেখছে তাকে।
ফিসফিস করে কি বলছে তার মাথার মধ্যে। লোকটার ঘাম হচ্ছে। দম নিতে অসুবিধা হচ্ছে।
মাঝরাস্তায় নেমে পড়ল। ট্যাক্সি থেকে নামতেই
ট্যাক্সি ড্রাইভারটা ওই ময়লা পাঞ্জাবি পায়জামা পরেই তার মাথার মধ্যে ঢুকে গেল। ওর
চাকা ঘোরানোর রডটা দিয়ে তার মাথার মধ্যেটা চিরে দিতে চাইছে। সে প্রাণপণ নিজেকে
বাঁচাতে চাইছে, পারছে না। ডাক্তার যে ওষুধগুলো দিয়েছিল, মাসখানেক হল খাচ্ছে না।
ওগুলো খেলে সে একা হয়ে যায় বড্ড বেশি। যেন হলে বসিয়ে কেউ সিনেমা চালাচ্ছে না। তার
সামনে সিনেমার পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। ওপাশ থেকে কারা কথা বলছে। সে যেতে পারছে না।
মাঝে একটা উড়ন্ত খামখেয়ালি পর্দা। সাদা পর্দা।
ড্রাইভার
শুধু না, আরো অনেকে তার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তারা ওর একটা একটা করে পোশাক খুলে
দিতে চাইছে। সে ছুটছে। তার ছোটোবেলার স্যাণ্ডো গেঞ্জিটা খুঁজছে, ওটা কেউ খুলতে
পারে না, ওটাই এতদিন বাঁচিয়েছে তাকে। পাচ্ছে না। হঠাৎ মনে পড়ল, মা ওটা মামাবাড়ি
নিয়ে গিয়ে ফেলে এসেছিল। সেটা আনতে গিয়ে তার ভালো দাদু তার সাথে 'নুনু ধরা, নুনু
ধরা' খেলতে চেয়েছিল। তারপর মাঝে মাঝেই খেলতে আসত তাদের বাড়ি। স্যান্ডো গেঞ্জিটা
যেদিন পরত সেদিন আসত না। তার ব্যাথা করছে বললেও শুনত না। তাকে ব্যাটারি দেওয়া
ট্রেন, পিছনে টেনে ছেড়ে দেওয়া গাড়ি, দামী জিনস কিনে দিত। কিন্তু কখনও স্যাণ্ডো
গেঞ্জি দিতে চাইত না। ওতে নাকি বিশ্রী ঘামের গন্ধ।
লোকটার মাথার মধ্যে অনেকগুলো লোক। তারা সবাই
জানে সব কিছু। ডাক্তার বলে দিয়েছে, সে জানে। ব্রীজের উপর দাঁড়ালো। নীচে ট্রেন
লাইন। মাথাটা আলাদা করে দিতেই পারে। দিনের আলো স্পষ্ট তার চারদিকে। ট্রেন আসছে।
মাথার মধ্যে ট্যাক্সি ড্রাইভারটা প্যাণ্ট খুলছে। এবার সে জানে, তার মাথার মধ্যেই
সে বীর্যত্যাগ করবে। তাকে চাটতে বলবে... তার বমি পাচ্ছে, ট্রেনটা বাঁক পেরিয়ে
এগোচ্ছে। লোকটা গার্ডওয়ালের একটা ফাঁকে পা দিল, আরেকটা পা দিতে যাবে, হঠাৎ পিছন
থেকে কে যেন খামচে ধরল, ট্যাক্সি ড্রাইভারটা।
"এটা কি করছেন! আপনার মানিব্যাগটা
আমার গাড়িতে....."
মাথার মধ্যে হঠাৎ সাদা পর্দাটা। সব লোক ফাঁকা। কয়েকটা
সিট পরেই একটা সাদা স্যাণ্ডো গেঞ্জি পড়ে।
ব্রীজের নীচ দিয়ে ট্রেনটা যাচ্ছে... ঘটাং
ঘটাং... ঘটাং ঘটাং...
No comments:
Post a Comment