রোহিত মর্গ থেকে বেরিয়েই দেখল প্রচণ্ড রোদ বাইরে। হাসপাতালের
এদিকটায় কেউ আসে না এই দুপুরের সময়টাতে। একটা বিশাল বটগাছের তলায় একটা বেঞ্চ পাতা।
বেঞ্চটার অর্ধেকটা ভেঙে গেছে। কাঠের বেঞ্চ। কাঠের উপর দাগ দাগ খাঁজগুলোতে পুরু
ময়লার স্তর। রোহিত একটা আঙুল দিয়ে সরালো।
রাওজি এই হাসপাতালে নতুন। মর্গেই ডিউটি। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হত।
তারপর জুনেত মাল ধরালো। মাল মানে এখানে মদ। দিশি মদ। রাওজি জানত না। এখন অল্প অল্প
অসুবিধা হওয়াটা কমেছে। তবে যখন নেশা তুঙ্গে থাকে তখন মনে হয় মর্গের লাশগুলো সব
জ্যান্ত। তার সাথে অদ্ভুত ভাষায় তারা কথা বলছে। সে বুঝছে। উত্তর দিচ্ছে। সে তখন
যেন লাশেদের বন্ধু। আগে মনে হত যমদূতের সাথেও দেখা হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন। এখন
মনে হয় না। তবে এখন যেটা হয়, নেশা বেশি হলে মনে হয় সে যেন
ওদের দেখতে পাচ্ছে। ওই যে বাইক অ্যাক্সিডেণ্টে মারা যাওয়া ছেলেটা বাইরে এসে বেঞ্চে
বসল।
রোহিত উপরের দিকে তাকালো। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যটা চোখে লাগল,
অথচ জ্বালা করল না। এটা রোহিত আগে খেয়াল করেনি। সে খেয়াল করল তার
কিছুই অনুভব হচ্ছে না। অথচ সব কিছু দেখতে শুনতে বুঝতে পারছে। মল্লিকাকে কলেজে
নামিয়ে... হ্যাঁ ক্লাবটার মোড়ের কাছেই লরিটা এসে... মল্লিকাকে দেখতে যাবে? না নিজেকে একবার দেখতে যাবে? মল্লিকার কাছেই যাবে।
আরেকটু পর উঠবে। এখনই ইচ্ছা করছে না। একটা ঘোরের মতন লাগছে। সামনে একটা বেঁটে রোগা
লোক বারান্দার একটা কোণে হাঁটুদুটো ভাঁজ করে বসা, তারই দিকে
তাকিয়ে আছে। ও কি দেখতে পাচ্ছে তাকে? রোহিত হাত নাড়ল।
আশ্চর্য! লোকটাও হাত নেড়ে মৃদু হাসল।
রাওজি হাতটা নেড়ে একটা বিড়ি ধরালো। আগুন দেখলেই নিজের বউটার পোড়া মুখটা
মনে পড়ে। সিলিণ্ডার ফেটে মরেছিল। মছলিপট্টমে বাড়ি ছিল। বাচ্চাকাচ্চা ছিল না।
প্রবলেম অবশ্য তার নিজের শরীরে ছিল। ও পুড়ে মরার পর ভবঘুরে হয়ে কয়েক বছর কাটিয়ে
দিল। ঘুরতে ঘুরতে কলকাতায় এলো। জুনেতের সাথে আলাপ হল মদের ঠেকে। সে-ই এই কাজটা
দিল। ছেলেটা একটু ঝুঁকে কি একটা খুঁজছে।
রোহিত অনেকক্ষণ ধরে একটা নুড়ি তোলার চেষ্টা করছিল। পারছিল না। গ্রিপে আসছে
না। রোহিতের এখন নিজের বলতে কেউ নেই। মা বাবা ছোট বয়সেই মারা গেছে। ঠাকুমার কাছে
মানুষ। ঠাকুমাও মারা গেল তিন বছর হল। এখন সে একা। কলকাতায় বেশ কয়েকটা বাড়ি তাদের।
সেগুলো ভাড়া দেওয়া। তাই দিয়েই চলে যায়। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে মুখ তুলে তাকালো।
একদল ছেলেমেয়ে ঢুকছে। আরে ওই তো মল্লিকা! খবর পেয়ে গেল এরই মধ্যে!পুলিশও তো সাথে।
রাও ছেলেমেয়েগুলোকে নিঃস্পৃহ চোখে দেখল। এরকম প্রায়ই হয়। কান্নাকাটি,
চীৎকার, অভিযোগ, ভাঙচুর।
দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুলো। একটু পর রেবন্তী আসবে তাকে চুমু খেতে।
পোড়ামুখ সেরে গেছে তার। রাওয়ের এখন ঠোঁটের অপেক্ষা। শিরশির করতে শুরু করেছে সারা
গা। মানে রেবন্তী আসছে।
রোহিত জানে ওর অস্তিত্ব ওরা বুঝবে না। বুঝলও না। শুধু দেখল প্রসূন একটু
ঘনিষ্ঠ যেন মল্লিকার। ওকে জড়িয়েই কাঁদল মল্লিকা। রোহিত পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তাকাতে
ইচ্ছা করছে না। বারান্দায় বসা লোকটা চোখ বন্ধ করে ঝিমোচ্ছে। ওর পাশে বসে ওই
মহিলাটা কে? তার দিকে তাকিয়েই বা আছে কেন? রোহিতের অস্বস্তি হতে লাগল। মহিলার জন্য না, প্রসূন
আর মল্লিকার জন্য। শুনেছিল আগে কিছুটা অবশ্য। রোহিত আবার বেঞ্চটায় গিয়ে বসল।
বিকাল হল। ম্যাটাডোর এসে গেছে। ফুল ধূপকাঠি, খাট
বন্ধুরা সব নিয়ে এসেছে। তাকে সাজিয়ে ম্যাটাডোরে তোলা হল। রোহিতের মনে হল সেও যায়।
ইচ্ছা করল না। জীবিতের সংসারে তার প্রেম মৃত। দাবিহীন। রোহিত তবু দাঁড়ালো।
মল্লিকার কাছে গিয়ে তার ঠোঁটে অনেকক্ষণ ধরে একটা চুমু খেলো। মল্লিকা কিছু বলল না।
মল্লিকা কিছু বুঝল না। প্রসূনের গালে সপাটে একটা চড় মারল। পেটে লাথি মারল। ওর
পুরুষাঙ্গে লাথি মারল। প্রসূনও কিছু বুঝল না।
রোহিত এগিয়ে গেল। বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখল লোকটা বসে, ওর পাশে কাঁধে মাথা দিয়ে সেই মহিলা। লোকটা হাত নাড়ল। বউটা হাসল। রোহিত
হাসপাতালের বড় গেটটার কাছে, হঠাৎ মনে হল তার পিঠে কে হাত
রাখল। একজন মহিলা। চিনতে পারছে অথচ পারছে না। হঠাৎ মনে পড়ল। ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে
ঝোলানো ছবিটা। মা!
এই প্রথম সে 'মা' উচ্চারণ করল।
জীবনে না, মরণে।
[ছবিঃ সুমন]

No comments:
Post a Comment