গাছটার নাম জানি না। এক হাত তার দৈর্ঘ্য হবে। ফুলের বালাই নেই। কয়েকটা
শ্রীহীন এবড়ো খেবড়ো সবুজ পাতা আর খয়েরি খয়েরি সরু লিকলিকে কান্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক
মাস হল মাটির উপরে। মাড়িয়ে গেলেই হয়, এমনই বিপদসঙ্কুল অবস্থান তার। চোখে পড়ার মত কোনো
গুণ নেই, কিন্তু পায়ে আটকাবার মত পাতার খোঁচা তার। গাছটা তবু আছে। তার আশেপাশে কত পাতাবাহার,
জবা, গোলাপ, টগর, নতনতারা ইত্যাদি ইত্যাদি। সেগুলোর যত্ন আত্তি আছে, তাদের শরীর স্বাস্থ্যের
খোঁজ নেওয়া আছে। এসবই ওর চোখে পড়ে, কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না, এমন একটা ভাব তার। সবার উপেক্ষাটাই যেন মস্তবড় একটা অহংকারের
বিষয় তার কাছে।
সেদিন হল কি, একটা প্রজাপতি দেখি ওর পাতার একটা কোণায়
বসে। অবাক হলাম। ভাবলাম প্রজাপতিটা কি অন্ধ? নাকি ঘ্রাণশক্তি এক্কেবারে লোপ পেয়ে গিয়েছে?
তারপাশে অমন সুন্দর গোলাপ ফুটে রয়েছে, ওর কি চোখে পড়েনি, নাকি আচমকা করুণা করার গুপ্ত
নেশার আকর্ষণ ছাড়তে পারেনি? ভাবলাম দিই উড়িয়ে। বাগান থেকে নির্বাসিত করি চিরকালের মত।
গুণের কদর জানে না যে, তার ফুলের বাগানে কি কাজ? যাক গিয়ে আস্তাকুঁড়ের ঝোপেঝাড়ে, বারণ
করেছে কে? অমন আগাছার তো আর অভাব নেই বিশ্ব সংসারে? যত্নহীন, পরিচর্যাহীন বেড়েই চলেছে,
বেড়েই চলেছে যারা।
আমার এ বিদ্রুপে কিছুই এলো গেলো না। না ওই গাছের,
না প্রজাপতির। কয়েক হপ্তা গেল। হঠাৎ একদিন সকালে দেখি, ওই গাছের এবড়োখেবড়ো পাতার কোল
ঘেঁষে একটা ছোট্ট মতন কুঁড়ি। দুদিন পরে ফুটল ফুল। লাল রঙের বিচিত্র শোভা তার। লজ্জা
পেলাম। কোথায় যেন হেরে গেলাম।
প্রজাপতি এসে বসেছে গোলাপে। এটাই নিয়ম। মনে
মনে ভাবছি প্রজাপতিটা কি উড়ে বসবে ওই ফুলে? ওর কি আজও করুনার নেশা জাগবে, নাকি ওই প্রথম
পেয়েছিল কুঁড়ি আসার খবর? আমার ভুল জানায় আমিই কি পড়লাম ফাঁকিতে? এক পা, এক পা করে এগোচ্ছি
ওর দিকে, হঠাৎ গ্লাভস পরা দুটো হাত উপড়ে নিলো গাছটাকে চক্ষের নিমেষে আমার সামনে। একগাল
হেসে ময়লা জামা পরা লোকটা বলল, আসলে বাবাটা মরল দাদা, তাই আসতে পারিনি। ডাক্তার বলল
বাড়ি নিয়ে যাও, ভালো করে খাওয়াও দাওয়াও, শরীলে রক্ত নেই। গরীবের আবার ভালো করে খাওয়া।
ওদিকে বউটার আবার ডেলিভারির ডেট সামনে.... সেকি কম খরচ বলো?... ইস বড্ড আগাছা জন্মে
গেছে গো... কি অবস্থা দাদা তোমার বাগানটার !
No comments:
Post a Comment