বাইক সার্ভিসিং হচ্ছে। দাঁড়াতে হবে বেশ কিছুক্ষণ। মাইকে শুনছি
তত্ত্বকথা, "অজ্ঞানের এ সংসার। মায়ায় আবদ্ধ আমরা। কেন একটা থাকলে দুটো
চাইবেন? অল্পে তুষ্ট হতে শিখুন। সংসারকে ঈশ্বরের করে তুলুন। গোলকের মত"।
এগিয়ে
দেখতে গেলাম। বাড়ির দরজার সামনে তোরণ। ফুল লতাপাতা দিয়ে সাজানো। স্টেজের উপর
সিংহাসন। তাতে গেরুয়াধারী গুরু। পাশে আরো দু’জন গেরুয়াধারী চোখ বুজে বসে। নীচে
বেশিরভাগ মহিলা, কয়েকজন পুরুষ। মহিলাদের বেশির ভাগ সাদা শাড়ি, লালপাড়। কপালে
চন্দনের টিপ।
ফিরে
এসে আবার সার্ভিসিং এর সামনে দাঁড়ালাম। আধঘন্টা ধরে
চলল মাইকে বক্তৃতা। "ব্রহ্মকে চাইতে হবে। এ অনিত্য সংসারে কেউ আপনার নিজের
নয়..."
গান শুরু হল। সাদা শাড়ি মহিলাদের দল বেরোলো একে, জোড়ায়, দলে দলে।
একটা সাদা বড় গাড়ি এসে দাঁড়ালো। সন্ন্যাসী উঠলেন। পিছনে উপঢৌকন সারি সারি। আমার
সামনে তখন পাঁচজন বয়স্কা মহিলা। গায়ে শ্রমের রঙ। পায়ে হাওয়াই চটি, লালপেড়ে শাড়ি
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমায় এসে বললেন, "এদিকে টোটো পাওয়া যাবে?"
বললুম,
যাবে, একটু দাঁড়ান।
দাঁড়ালেন।
কথা দাঁড়ালো না। আসার সময় কে টাকা দিয়েছিলেন, এবারে কে দেবে, খিচুড়িতে নুনটা কম
ছিল, এই শীতে সাধারণ কম্বলে মানায় না, লক্ষীদেবী রাধারাণীর কাছে হেরেছিলেন, অমুকের
বাবার হাঁপের টানটা বেড়েছে, মঙ্গলবার করে আমিষ চলে না, পট বদলাতে হবে...
টোটো এলো। দরদাম বেশি হল না। একই শ্রেণীতে হয়ও না। একে অপরকে
বোঝে। কোথায় থামতে হয় জানে, কতদূর এগোতে হয়ও জানে। চলে গেল টোটো।
হিসাব জানল না শুধু ওই ধনী সন্ন্যাসী, ব্রহ্মের সাথে এত দরদাম
সংসারীর চলে? এত সংযম, এত কাড়াকাড়ি, এত দাবী-দাওয়া মেটাতে পারে? ব্রহ্ম এত নিয়ে
রাখবেনই বা কোথায়? ব্রহ্মের তো মঠ নেই। আর না তো তিনি অধ্যক্ষ।
তবু দু'পক্ষই মুখোমুখি হবে, গেরুয়া আর গৃহী। একজন সংসার থেকে
বেরোতে চাইবার আছিলায় এসে আরো বড় সংসারে জড়াবে, আরেকজন ভক্তির ব্যবসা ফেঁদে আখের
গুছিয়ে সরে পড়বে। এ চিরকাল হবে। শখের ঠকাঠকিতে ভয় নেই তো। সংসারের গভীরে যে ফাঁকি
আর সে ফাঁকির একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন এ যে তার কাছে এক বিরাট ভরসাস্থল। সেই ফাঁকির
কর্তা ভালোবেসে তার সব ফাঁকি ফাঁস করে একদিন তার কাছে ধরা দেবে, এই আশায় সে বুক
বেঁধে লড়ে যায়। মানুষের কাছে আর ঈশ্বরের কাছে তার তো একটাই দাবি, সব ক্ষতি সে মেনে
নেবে, ফাঁকির হিসাব সে চাইবে না, তবে যেন সেও না চায়।
No comments:
Post a Comment