আদতে একটা মানুষ নিজে ভালো না হলে কি কারোর ভালো বন্ধু হতে পারে?
‘বন্ধুর মত’ হতে পারে, কিন্তু বন্ধু হয়ে ওঠা কি এত সোজা? তাকে দিয়ে আমার কিছু প্রয়োজন
মেটে আর আমাকে দিয়ে তার, এটা একটি চলতি বন্ধুত্বের মতন কিছু একটা হলেও বন্ধুত্ব তো
নয়। যার সঙ্গে স্বস্তি আর তোষণ তবে কি সেই বন্ধু? কিছুটা সত্যিই হলেও পুরোটা কি? নয়।
কারোর সঙ্গই সদা-সর্বদা সুখের কারণ হতে পারে কি? পারে না। তাই স্পেস বলে একটা কথা আছে।
স্পেস তো শুধু স্থানের না, সময়েরও। আর তোষণের বিকার তো আছেই। যে ভুল পথে যাচ্ছে তাকে
তুষ্ট করতে চাওয়ার জন্য তার সাথে বিপথে যাওয়া কি বন্ধুত্ব? তবে বন্ধুত্বর বীজটা কোথায়?
মানুষ প্রথম যে জায়গায় নিজেকে অনুভব করে, সে
তার একাকীত্বে। একাকীত্ব সসঙ্গ আর নিঃসঙ্গ দুই-ই হতে পারে। যদিও প্রথমটা দ্বিতীয়টার
থেকে পীড়াদায়ক বেশি। সেই একাকীত্বের সাথে বন্ধুত্ব একটা মানুষের প্রথম কাজ। সেখানে
ফাঁকি থাকলে তার জীবনে একটার পর একটা ফাঁকিই জমতে থাকে শুধু। তার সব কিছুই তখন সেই
একাকীত্ব বা শূন্যতা বোধের পরিপূরক। সে আদতে কাউকে চায় না, সে নিজের সেই একাকীত্ব থেকে
বাঁচতে চাওয়ার একটা বিকল্প খোঁজে। সে সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ে, তার বন্ধুত্বের ফাঁস কিছুতেই
গলার নীচে নামতে চায় না, অতন্দ্র প্রহরীর মত সর্বক্ষণ সন্দেহে জেগে থাকে আর প্রতিক্ষণে
কৈফিয়েৎ দাবী করে – এ সুস্থ বন্ধুত্ব নয়। প্রথম প্রথম মনে হতে পারে, ‘আহা রে আমি কি
গুরুত্বপূর্ণ মানুষটার কাছে’ কিন্তু সেই আরামই ক্রমে হাসফাঁসের কারণ হয়ে উঠবে, রুদ্ধ
লাগতে শুরু করবে চারদিক। কারণ যে নিজের একাকীত্বকে সম্মান করে না, সে অন্যের একাকীত্বকেও
সম্মান করে না, তার মর্যাদা রাখে না। সে তার সেই একাকীত্বকেও ঈর্ষা করে বলে, “কেন তুমি
আমায় ছাড়া ভালো আছো? হতেই পারে না। আমায় ছাড়া তুমি একা থাকতেই পারো না (কারণ আমি পারি
না, আমার তোমায় খুব প্রয়োজন, তোমার জন্য না, আমার জন্যে)।“
কিন্তু এই একাকীত্বের সাথে বাস করাটা যখন রপ্ত
হয়ে আসে সুস্থ ভঙ্গীতে তখন নিজেকে নিজের মধ্যে স্বাবলম্বী হিসাবে পাওয়া যায়। সে তখন
বন্ধুত্বের প্রয়োজনে ফেরে না, বন্ধুর প্রয়োজনে ফেরে। বন্ধুত্ব একটা একাকীত্ব, একঘেঁয়ে
বেঁচে থাকার বিকল্প। যা বলছিলাম আগেই। তবে এ একাকীত্বকে কি করে বশে আনা যায়? কথাটা
ভুল হল, একাকীত্ব বোধের যন্ত্রণা থেকে কি করে মুক্তি পাওয়া যায়। প্রথম শর্তই হল, এটা
বুঝতে হবে, আমার সাথে সব সময় যে থাকে সে হলাম আমি। ‘আমি’ একটা অস্তিত্ব। আবার সেই
‘আমি’ কে সব সময় পর্যবেক্ষণে আর তুলনা বিচারের মধ্যে যে রেখেছে সে একজন পর্যবেক্ষক,
সেও আমার অংশ, তবে সে অনেকটা বাইরের মশলায় তৈরি, মানে বাজারী মশলায় আরকি। সে সব কিছুর
সাথে সব কিছু তুলনা করে, বিচার করে। বলে,”তুমি ওর মত কেন হলে না”। এই ‘পর্যবেক্ষক আমি’
আর ‘অস্তিত্ববান আমি’ র মধ্যে যে সমঝোতা করায় সে হল আমার স্বাভাবিক বুদ্ধি। তার পরিমিতি
বোধ আছে, সংযম আছে, রুচি আছে। কিন্তু তার তাড়া নেই, মাতব্বরি করার সাধ নেই। ফলে তার
কথা শোনার দায়ও নেই। কিন্তু দায় না থাক, মঙ্গল অবশ্যই আছে। সেই বুদ্ধির অনুগামী হয়ে
চলাতেই একাকীত্বের সাথে সহবাস সম্ভব। এ হল মোদ্দা কথা। ছবি এঁকে, গান গেয়ে, নেচেকুঁদে,
কবিতা লিখে সে থেকে পরিত্রাণ নেই, সে সবের ক্লান্তি আছে। যদি না তারা সেই শুভ সাধারণ
বুদ্ধি দ্বারা অভীদীপ্ত হয়ে থাকে।
এই বোঝাপড়াটা হয়ে গেলে তো তার আর কারোর প্রয়োজনই
থাকবে না? তখন সে বন্ধু নিয়ে কি করবে?
ভুল কথা। বন্ধু কোনো খাদ্য না যে খিদে পেলেই
কাজে লাগে। কোনো অভাবের পরিপূরক হয়ে সে আসে না। বন্ধু পরিপূর্ণ হৃদয়ের গভীর আলিঙ্গন।
সেই বন্ধুত্ব স্থায়ী, সেই বন্ধুত্ব সুস্থ। কারণ সে দুই পূর্ণের মিলনের ফলে জাগে। সেখানে
দৈন্য নেই, সেখানে অভিযোগ নেই। তবে সে দীঘির মত নিস্তরঙ্গ নয়, সে সমুদ্রের মত গভীর,
প্রাণোচ্ছ্বল, আনন্দে টইটুম্বুর। সব প্রতিকূলতার মুখে সে দাঁড়াতে পারে, কারণ তার মধ্যে
কোনো গোপন শর্ত বা মতলব নেই। এই বন্ধুত্ব অর্জন করতে হয়, পালন করতে হয়, চর্চা করতে
হয়। আর দায়বদ্ধতার থেকে গভীর বন্ধন হৃদি-বদ্ধতা। দায়বদ্ধতার বিকল্প, ফাঁকিবাজির পথ
থাকে, কিন্তু হৃদি-বদ্ধতাতে সেই ফাঁকির ইচ্ছাটা জন্মানোর অবকাশই মেলে না, তো ফাঁকির
প্রশ্নই ওঠে না। এ জীবনে সে এক পরম সম্পদ। বন্ধুত্ব বন্ধুর সাথেই হয়, ‘বন্ধুর মত’ র
সাথে হয় না। সে কোনো প্রশ্নের উত্তর নয়, তার কোনো বিকল্প নেই, সে পরিপূর্ণ হৃদয়ের তৃষ্ণা,
তাই তার কোনো উপমাও নেই।
No comments:
Post a Comment