অনেক রাতে ট্রেন। প্রদ্যুত যখন হাওড়া স্টেশানে এলো তখন পৌনে এগারোটা। এখনও এক
ঘন্টা বাকি। প্রদ্যুত বিশাখাপত্তনম যাবে। অফিসের কাজ। এসি ২ -তে লোয়ার বার্থ।
প্রদ্যুত ডিনার সাথেই এনেছিল। স্টেশানেই খেয়ে নিল। ট্রেন দেয়নি এখনও প্ল্যাটফর্মে।
মোবাইলটা অন্ করে ওটাস অ্যাপটা অন্ করতেই বোর্ডে চেন্নাই মেলের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে
দিল।
উঠে
দেখে একজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, আরেকজন বাঙালী মাঝবয়েসী ভদ্রলোক তার সহযাত্রী। প্রদ্যুতের
বয়েস এই তিরিশের আশেপাশে। ভদ্রলোকের চল্লিশের মাঝামাঝি হবে। ইন্টারেস্টিং
অ্যাপিয়ারেন্স। উচ্চতা চার ফুটের কাছাকাছি হবে, মাথায় টাক, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। নীল
ফতুয়া আর একটা রেগুলার জিন্স পরা। বেশ মিশুকে। নিজের থেকেই সবার সাথে পরিচয় করে
নিলেন। তিনি চেন্নাই যাচ্ছেন ব্যবসার কাজে। বয়স্ক দম্পতি যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য।
সবারই
খাওয়া হয়ে গেছে। ট্রেন ছাড়তেই বিছানা করার পর্ব শুরু হল। প্রদ্যুত আগে থেকেই ঠিক
করেছিল লোয়ার বার্থটা ছেড়ে দেবে। বৃদ্ধা খুব খুশী হলেন। যা হোক, প্রদ্যুত ব্যাগটা
মাথার কাছে রেখে শুয়ে পড়ল। একটা ছোটো ট্রলি সীটের নীচে ভরা। বৃদ্ধ-বৃদ্ধার একটা বড়
ট্রলি প্রদ্যুত যে দিকটায় শুয়েছে সেই দিকে নীচে ঢোকানো। আর মাঝবয়েসী ভদ্রলোক, নীলোৎপলবাবুর
একটা নীল সুটকেশ প্রদ্যুতের উল্টোদিকের লোয়ার বার্থের নীচে ঢোকানো। আলো নিভিয়ে
দেওয়া হল। প্রদ্যুতের সামনে একটা নীল নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। আওয়াজ বলতে কয়েকটা এদিক
ওদিক নাক ডাকার আওয়াজ। প্রদ্যুত মোবাইলটা অফ্ করে চোখ বন্ধ করল।
ঠক্
করে একটা আওয়াজ। প্রদ্যুত উঠে বসল। আওয়াজটা নীচ থেকে এলো মনে হল। নীচের দিকে
তাকিয়ে দেখে নীলোৎপলবাবুর সুটকেশটা বাইরের দিকে এসে গেছে। বুড়ো মানুষ দু'জনের যে
কেউ নামতে গেলেই পড়বেন। প্রদ্যুত তাড়াতাড়ি নেমে এসে সুটকেশটা ভিতরে ঢোকালো। জলের
বোতলটা হাত বাড়িয়ে নিলো নিজের সিট থেকে, এক ঢোক খেয়ে মনে হল একবার টয়লেটে যেতে
হবে।
টয়লেট
থেকে ফিরে এসেই হোঁচট খেল। সুটকেশটা আবার বাইরে। সুটকেশটা ঠেলে ভিতরে ঢোকাতে গিয়ে
দেখে সেটা ভীষণ শক্তভাবে মেঝের সাথে এঁটে রয়েছে। কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না। কি
মুশকিল রে বাবা। একবার ভাবল নীলোৎপলবাবুকে ডাকে। লজ্জা লাগলো, এটা একটা ডাকার কারণ
হল? আবার চেষ্টা করতে ঝুঁকে যেই একটা ঠেলা দিয়েছে, অমনি মনে হলে সুটকেশের হাতলটা
একটা হাতের মত হয়ে তার হাতটা চেপে ধরল। প্রদ্যুত এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে
তাড়াতাড়ি আলোটা জ্বাললো। কি আশ্চর্য, কই সুটকেশ? কিচ্ছু নেই তো!
প্রদ্যুত
আলোটা নিভিয়ে নিজের সিটে এসে শুলো আবার। কম্বলটা দিয়ে মাথাটা ঢেকে নিলো। এতটা ভুল
দেখল? প্রদ্যুতের ঘাম হচ্ছে রীতিমত। নার্ভাস লাগছে। একবার ভাবলো উঠে গিয়ে টয়লেটে
গিয়ে একটা সিগারেট খেয়ে আসে। গেল না। এক তো কাজটা অনুচিত, প্রদ্যুত সচরাচর করে না;
আর দুই, কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল নীচে নামতে হবে ভাবলেই। আবার একটা খট্ করে
আওয়াজ।
প্রদ্যুত
কম্বলটা সরিয়ে পাশের দিকে তাকালো। নীলোৎপলবাবু অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। প্রদ্যুতের ঘাম
হচ্ছে। বুকটা ধকধক করছে। সে বেশ বুঝতে পারছে সুটকেশটা আবার বাইরের দিকে বেরিয়ে
এসেছে।
প্রদ্যুত
নীচের দিকে তাকাতেই তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিম শিরশিরানি নেমে গেল। সুটেকেশটার
দুটো বোতামের জায়গায় দুটো চোখ, তার দিকে তাকিয়ে আছে। নীল আলো বেরোচ্ছে চোখদুটো
থেকে। প্রদ্যুতের গলা শুকিয়ে কাঠ। নীলোৎপলবাবুকে ডাকতে চাইছে। কিন্তু গলা দিয়ে
আওয়াজ বেরোচ্ছে কই? সে কোনো রকমে হাতটা বার করে আলোটা আবার জ্বাললো। কিচ্ছু নেই।
বৃদ্ধা
মুখটা বার করে বলল, আলোটা নিভিয়ে দেবেন ভাই প্লিজ, নইলে আমার ঘুম হবে না। আর ঘুম
না হলে কাল সারাদিন শরীরটা ভীষণ খারাপ হবে।
প্রদ্যুত
আবার আলো নিভিয়ে দিল। কম্বলে মুড়ি দেওয়া। টেনের দুলুনি অনুভব করছে। ঘড়িটার লাইট
অন্ করে দেখল ১.১৯, খড়গপুর পেরিয়ে গেছে? না তো। নেমে যাবে? আবার খট্ করে আওয়াজ।
এবার আওয়াজটা আরো কাছে। যেন তার পাশেই। প্রদ্যুত ঠকঠক করে কাঁপছে রীতিমত। ভীষণ
শীতশীত করছে। কম্বলটা ফাঁক করে পাশে তাকাতেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল কয়েক
মূহূর্তের জন্য। নীলোৎপলবাবু কই? এতো সুটকেশটা, তার দিকে তাকিয়ে। নীল চোখের ভিতর
থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে যেন। তবে নীলোৎপলবাবু? নীচের দিকে তাকিয়ে দেখে
নীলোৎলবাবুর কাটা মাথা একবার এদিক, আরেকবার ওদিক গড়াচ্ছে। বাকি শরীরটা সিটের নীচে
ঢোকানো, বাইরে শুধু পায়ের কিছুটা দেখা যাচ্ছে।
প্রদ্যুত
কিছু বোঝার আগেই একটা বরফের মত ঠাণ্ডা হাত তার মাথাটা ছুঁলো। সে বুঝল সুটকেশটা।
একটা হাত ওই বার্থের রড ধরে, আরেকটা হাতে তার মাথার কাছের রড ধরে তার দিকে আসছে।
প্রদ্যুতের সারা মুখে নীল আলো।
পরেরদিন প্রদ্যুতকে আর পাওয়া গেল না। পুলিশ
অনেক খুঁজলো। শুধু বৃদ্ধ মানুষটার একটা জিনিস অবাক লাগল, নীলোৎপলবাবুর তো একটা
সুটকেশ ছিল শুধু, আরেকটা লাল সুটকেশ কোথা থেকে এলো। ভাবলেন, হয়ত ছিল, কাল রাতের
বেলায় খেয়াল করেননি। তবু, একটা জলজ্যান্ত লোক ট্রেন থেকে হাপিশ হয়ে গেল অথচ লোকটা
এত নিরুদ্বেগই বা কেন?
No comments:
Post a Comment