দুই সত্তা
-------------
মানুষের
দুটো রূপ আছে। তার ভালোর দিক, আর তার খারাপের দিক। দুটোই অস্তিত্ববান তার চেতনায়।
মানুষ যত তার ভিতরের রূপটা চিনতে শিখল তত সে বিচ্ছিন্নভাবে, বিশ্লিষ্ট করে নিজের
নানা গুণ আর অবগুণগুলোকে অনুধাবন করতে পারল। তারা পৃথক পৃথকভাবে স্বনির্ভরশীল
অস্তিত্ত্বে যেন তার মধ্যে সদা বিবাদমান। তার বাইরের ভয় কমল। বাইরেটাকে সে একটা
নিয়মের মধ্যে দেখতে শিখল, আর নিজের ভিতরকে সে রহস্যাবৃত দেখল। সে রহস্য যেন জটিল
থেকে জটিলতর হতে শুরু করল। তার মধ্যে একটা স্বাভাবিক প্রবণতা ভালোর দিকে। কাকে সে
ভালো বলল? যে গুণ বা বৃত্তিগুলো তাকে স্থিতি, বৃদ্ধি, নানা মানুষের সাথে সহাবস্থান
করতে শেখালো। সে বুঝল, তার পক্ষে একা একা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাকে সমাজ গঠন করতে
হবে। যে সমাজের মূল নীতিই হল সহাবস্থান আর পারস্পরিক সহায়তা। এই শক্তিতেই সে সমাজ
গড়তে চাইল। এই বৃত্তির অনুকূল যা, তাকেই সে ভালো বলে গ্রহণ করল, আর যা কিছু
প্রতিকূল তাকে সে প্রত্যাখ্যান করতে চাইল। যদিও পারল না। কেন সে কথায় পরে আসছি।
দুই সত্তার ভিত্তি
----------------------
সহমর্মিতা,
ভালোবাসা, সত্যপরায়ণতা, সংযম, জ্ঞান, নির্ভীকতা, ন্যায়পরায়ণতা – মোটামুটি এইগুলোকে
সে ভালোর পর্যায়ে ফেলল। কারণ এগুলো সামাজিক সহাবস্থানে সহযোগী। এর বিপরীতগুলো
কিন্তু সহযোগী নয়। যেমন হিংসা, মিথ্যাচার, চুরি, উচ্ছৃঙ্ক্ষলতা, অজ্ঞতা, দুর্বলতা,
শঠতা – ইত্যাদি মানুষে মানুষে পারস্পরিক সহাবস্থানের বৃত্তির বিপরীত, তাই সেগুলোকে
সে বলল খারাপ। এরকম একটা বিশ্বাস নিয়ে মোটামুাটি তার সভ্যতার যাত্রা শুরু হল।
কিন্তু সে বুঝল না তার ভিতর এই ভালো আর মন্দ বৃত্তিগুলোর প্রেরক কে? সে অপরাধীর
শাস্তি আর ভালোর অভ্যর্থনার ব্যবস্থা তো করল, কিন্তু এই দুই প্রবৃত্তির উৎসটা তার
কাছে একটা ধোঁয়াশাই রয়ে গেল। একদিন সে প্রকৃতির নানা ঘটনাকে দেবতার নানা খেলা রূপে
দেখেছে। সূর্য, চাঁদ, তারা, মাটি, জল, বাতাস, আলো, ঝড়, ভূমিকম্প, দাবানল,
স্বাস্থ্য, রোগ ইত্যাদি সব কিছুর আলাদা আলাদা ব্যক্তিরূপ বিশ্বাস করেছে। পূজো
করেছে। কেন সে ব্যক্তিরূপ বিশ্বাস করেছে? কারণ সে নিজেকে ব্যক্তিরূপে অনুভব করেছে।
মানুষ নিজেকে একটা পৃথক সত্তারূপে অনুভব করে। শরীর আর মন দিয়ে গড়া একটা সত্তা, সব
কিছুর মধ্যে থেকেও সব কিছু থেকে আলাদা। কারণ সে যা কিছু চিনছে সব নিজের
ব্যক্তিত্ত্বের মধ্যেই চিনছে। সে যেন স্বতন্ত্র। এই বোধটাই সে যা কিছু তার অনুকূল
কিম্বা যা কিছু তার প্রতিকূল সবার উপর আরোপ করেছে। সবার আলাদা আলাদা দেব-দেবী
হয়েছে। বাইরের প্রকৃতির সাথে তার ভিতরের প্রকৃতিরও। যেমন বুদ্ধি, স্বাস্থ্য, রূপ,
ঐশ্বর্য ইত্যাদি।
পাপ পূণ্য
--------------
কিন্তু
এরপর যখন সে ভালো-মন্দের মধ্যখানে এসে দাঁড়ালো, বাইরের আর ভিতরের প্রকৃতির
খেলাটাকে একটা নিয়মে চিনল তখন তার দেব-দেবীর আধিপত্য আর আগের মত আর অনুভব করল না।
কিন্তু তার অস্তিত্বের কেন্দ্রে এই সৎ আর অসৎ প্রবৃত্তির উৎসটাকে সে কিছুতেই চিনে
উঠতে পারল না। কিন্তু সেটাকে স্থির করতে না পারলে সমাজকে সুষ্ঠ শৃঙ্ক্ষলায়
পরিচালনা করা মুশকিল। সে নিজের গভীরে গিয়ে একটা বিশ্বাসের সন্ধান পেল। সে বুঝল তার
সব কিছু সৎ গুণাবলী একত্রিত হয়ে যে মানুষী রূপটা দাঁড়ায় সে হল ভগবান; আর সব অসৎ
প্রবৃত্তি একত্রিত হয়ে যে মানুষী রূপটা দাঁড়ায় সে হল শয়তান। এই বিশ্বাসের শক্তিতে
সে ভালো আর মন্দের ভিত তৈরি করে সমাজটাকে দাঁড় করাতে চাইল। আর বিশ্বাস যখন আসবে
তখন ভালো-মন্দের একটা বিশ্বাসগত নামকরণও লাগবে – পাপ আর পুণ্য। যা কিছু খারাপ,
স্থিতি-সহাবস্থানের বিপরীত তাই পাপ; যা কিছু স্থিতি আর সহাবস্থানের অনুকূল তাই
পুণ্য। তার একদিকের প্রণেতা ভগবান আর আরেকদিকের প্রণেতা শয়তান। ভারতের দর্শনে এই
দুইয়ের উৎসকে আবার একই দেখানোর চেষ্টা আছে। কারণ আরো গভীরে সে বুঝেছে যে দুই-এর
উৎসই তার মন, তার অন্তঃকরণ। কিন্তু কোথায় গিয়ে তারা এক তার হদিশ তারা বুঝতে
পারেনি।
সাম্যতা
-----------
সবের
মূল একটা কথা ধ্রুব যে মানুষের আদিম প্রবৃত্তির একটা কেন্দ্র হচ্ছে তার সামাজিক
হয়ে ওঠার তাগিদ। তাহলে যে কথাটা ছেড়ে এসেছিলাম, তবে মন্দের উৎস কোথায়? মন্দ বলতে
তাই ধরে নেওয়া হচ্ছে যা কিছু এই সামাজিক সহাবস্থানগত স্থিতির পক্ষে হানিকর। তার
একটা প্রধান কারণ আমাদের মধ্যে পশুত্ব। 'পশুত্ব' বলতে যা কিছু শুধুমাত্র আমাদের
সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তার কথা বলতে চাইছি। যার উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ
নেই। আমাদের সত্তার মধ্যে আমাদের সমষ্টিগত আর ব্যক্তিগত অবস্থান পাশাপাশি। একটা
আরেকটাকে ছেড়ে দাঁড়াতে পারে না। তাই কোনোভাবেই সোশ্যালিস্ট (রাজনৈতিক অর্থে না) বা
ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট পৃথকভাবে একছত্র অধিপতি মানবসত্তার ক্ষেত্রে হতে পারবে না। কোনো
একটা বাড়লেই মানুষ তার ভারসাম্যতা হারাবে। ইতিহাসে জোর করে একত্রীকরণ আর
সমমাত্রীকরণের কি পরিণাম আমাদের ভালোভাবেই জানা। এই দুইয়ের কোনো একটাকে প্রধান
করতে গেলেই শয়তানের আবির্ভাব ইতিহাসে হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। এই দুই-এর ভারসাম্যতেই
মানুষের প্রকৃতির সাম্যতা। আমার শরীর, অথবা আমার বাড়ির পাঁচিল, অথবা আমার দেশের
সীমারেখাই আমার ব্যক্তিগত আর সমাজগতরূপের ব্যবধায়ক নয়। আমার মধ্যে আমিই ব্যক্তি
আবার আমিই আমার মধ্যে সমাজ। আমার মধ্যে আমি নিজেকে সমাজরূপে, মানবতারূপে দেখেছি
বলেই যে না বাইরে তার রূপটাকে গড়তে পেরেছি?
আপোষ
------------
তবে
যে দুই মেরুর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ভগবান আর শয়তান – এই দুইয়ের অধীশ্বরও তো
আমি-ই। ভারতের দর্শনের একটা শাখা সেই অবধিও পৌঁছিয়েছিল তো বটেই। সে দর্শনকে সে
"অদ্বৈতবাদ" বলেছে। সে নিজের সাথে তার সৃষ্ট সব কিছু'র একাত্মতা তৈরি
করতে করতে নিজেকেই ঈশ্বর বলে অনুভব করেছে। অর্থাৎ যা কিছু ভালো তার সব কিছুর উৎস
সে নিজে, আবার যা কিছু অমঙ্গল তার সব কিছুর মূলও সে নিজে। এমন একটা সত্যে সে উপনীত
হয়েছে, যদিও সামাজিকভাবে সে তত্ত্ব ভয়ে হোক আর যে কোনো কারণেই হোক জনপ্রিয়তা
পায়নি। হতে পারে মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে যে, মানুষ ভয়ে যতটা সংযত, স্বাধীনতায়
ততটা নয়। তাই মানুষ অতটা স্বাধীনতাকে ভয় পেয়েছে। সে দায় অধিকাংশ মানুষ নিতে না
পেরে ব্যভিচারী হয়ে উঠবে এমন একটা আশঙ্কা হয়ত করেছে। আর সে আশঙ্কাও অমূলক নয় সে
আজকের দিনেও স্পষ্ট। আজও আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, ফাইন না বসালে, আইন-জেল,
পুলিশের ব্যবস্থা না থাকলে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে সৎ থাকা মুষ্টিমেয়
কয়েকজন ক্ষণজন্মা ছাড়া বোধহয় হয় না। মানুষের দৈব শাস্তির ভয় যত কমছে তার
অপরাধপ্রবণতা কি ততটা বাড়ছে? জানি না। সমাজবিদরা বলতে পারবেন।
তোর
ভিতর জাগিছে কে রে
--------------------------------------
পৃথিবীতে
সবক'টা প্রধান ধর্মে ঈশ্বরের আবাসস্থল হিসাবে তার অন্তঃকরণকেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
যদিও তার অনেক শাখা-প্রাশাখা সে মূল সত্যটাকে চাপা দিয়ে আগাছার মত অন্ধকার করেছে
মানুষের চেতনা অনেক বেশি যুগযুগ ধরে। তবে এই কথাটা আমার বেশ লাগে, যা কিছু ভালোর
চূড়ান্তরূপ আমার ঈশ্বরের আবাসস্থল আমার হৃদয়ে। এটা পুরোনো মানুষের উপলব্ধ সত্য। আজ
সে সত্যকে চাপা দিয়ে একটা প্রশ্ন, তবে প্রবলতম নিষ্ঠুর মানুষটার হৃদয়ে তিনি কি
নিদ্রাগত? তবে অমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ঈশ্বরের সাথে আমাদের কিসের সম্পর্ক?
মনে
রাখতে হবে যখন এইসব ধর্মগুলোর উৎপত্তি তখন মনোবিজ্ঞান বলে কিছু ছিল না। আজ আছে।
তাও আমরা সাইকোপ্যাথ ইত্যাদি নাম দিয়ে, সংজ্ঞা দিয়ে তাকে ক্যাটাগোরাইজ করতে সক্ষম
হলেও তার উৎসটা বুঝে উঠতে পারিনি। ঠাণ্ডা মাথায় একজন কি করে একটার পর একটা নৃশংস
হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে তার মানসিকতার ব্যাখ্যাও আমাদের কাছে অজানা আর তার চিকিৎসা
পদ্ধতিও। আমরা তাই এখনও ঈশ্বর আর শয়তানের সংজ্ঞা থেকে সম্পূর্ণ নিজেকে মুক্ত করে
উঠতে পারছি না। যুক্তি আমাদের ভালো আর মন্দের উৎসকে চেনাতে পারছে না যে।
এই
বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের কত কত নিগূঢ় রহস্য আমরা ভেদ করে ফেলেছি, অণু-পরমাণু,
নক্ষত্রদের গতিপথ আকার আয়তন --- সব জেনে ফেলছি এক এক করে। প্রাণের কেন্দ্রে গিয়ে
তার জিনগত গঠন, পরিবর্তনের ইতিহাস সব জেনে ফেলছি। শুধু জানতে পারছি না কোন মানুষটা
কখন কোন মুহূর্তে আমায় ঠকাবে, কে কোনদিন কখন ধীর মস্তিষ্কে গিয়ে একটা বোমা বাজারের
মধ্যে রেখে আসবে, এক লহমায় সহস্র প্রাণ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যদি বলি মানুষ দুর্ভাগ্যে
ভয় পায়, রোগে শোকে ভয় পায়, তবে স্বল্প সত্য বলা হয়। মানুষ সব চাইতে বেশি ভয় পায়
নিজেকে আর তার চারপাশের মানুষের দুর্জ্ঞেয়তাকে। তাদের আর তার নিজের মধ্যের অগম্য
রহস্যের অন্ধকারকে। তাই যখন কোনো আলোকিত মানুষ তাকে তার মধ্যের শুভের সন্ধান দিতে
চেয়েছে, সে তার সর্বস্ব ত্যাগ করে সে দুর্গম পথে, ত্যাগের পথে হেঁটেছে। রোগ, শোক,
মৃত্যু, শারীরিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা সব জলাঞ্জলি দিয়েছে। কারণ সে শুভের
সন্ধান পেয়েছে। শান্তি পেয়েছে। শান্তি অমঙ্গলে পাওয়া যায় না। শান্তি মেলে মঙ্গলে।
আর মঙ্গল কখনও এক'কে নিয়ে নয়, সে সবাই'কে নিয়ে। আবার কালচক্রে সেই মঙ্গলঘটেই বিষ
ভরা হয়েছে, কিন্তু সে তো অন্য কথা।
বিপ্লব
---------
তাই
মানুষের ইতিহাসে বারবার ঈশ্বরের রূপের প্রতিস্থাপন হয়েছে। একজন আলোকিত পুরুষ তার
পূর্বের বিষাক্ত ঘটকে ফেলে নতুন মঙ্গলের পথের দিশা দিয়েছেন। প্রাচীন চীৎকার করেছে,
'তুমি নাস্তিক' বলে। নতুন তাকে অনুসরণ করেছে। নতুন ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে। মূল কিন্তু
ওই একটাই কথা, শুভের উৎস কি? অশুভের উৎসই বা কি? কিভাবে অশুভের বিনাশে শুভ আসবে?
কিভাবে একটা মানুষের অন্তর্জগতে পরিবর্তন আসবে? সে তো বাইরের অঙ্ক কষে, জিনের
দৈর্ঘ্য জেনে, তারা'র গতিবেগ জেনে নয়? তবে? কিসের মাধ্যমে মানুষের চিত্তের শুদ্ধি
হবে?
জগৎ
স্রষ্টা ঈশ্বর – বেঁচে নেই আজ। ঈশ্বরের নানা নামের আতঙ্ক চারদিকে ধুলো উড়িয়ে
বেড়াচ্ছে। শুধু কোনো এক পাগল হয়ত একলা মরুভূমিতে, সমুদ্রের ধারে, গভীর জঙ্গলে,
পাহাড়ের নির্জনে খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাদের সব শুভের উৎস কোথায়? সব অশুভের উৎসই বা কি?
এত ছদ্মবেশ কেন? কোনো পরীক্ষাগারে সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। কোনো
ধর্মগ্রন্থে না। পাওয়া যাবে নিজের চিত্তকে মন্থন করলে হয়ত। আর সেই নিজের চিত্তকে
মন্থন করার আবেগই ঈশ্বর। সে অনন্তের দিকে তাকিয়ে মানুষের চিত্তের ব্যকুল কান্না।
সে তো ব্যক্তি না। সে ইন্ট্রোস্পেকশান না। সে তো স্বার্থপ্রণোদিত। এ আরো গভীর। এই
নিজেকে ডুবিয়ে, নিজেকে হারিয়ে খোঁজা। উপায় কি আছে?
“আঁধার
রাতে একলা পাগল... যায় কেঁদে... বলে শুধু... বুঝিয়ে দে... বুঝিয়ে দে... বুঝিয়ে
দে...”
No comments:
Post a Comment