বাচ্চাটার এক পায়ে জুতো, আরেক পা খালি। মন্দিরের চাতাল দাপিয়ে
বেড়াচ্ছে। মা উদাস চোখে বসে। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। হাতে শাখাপলাও নেই। সিঁথিতে যেন
কোনোকালের মোছা সিঁদুরের আবছা দাগ। শুকনো অববাহিকায় পড়ে থাকা নুড়ির মত কয়েকটা
শ্রীহীন চুল হালকা বাতাসে উড়ছে। দৃষ্টি দূরে। মানুষ খুব গভীরে তাকালে দৃষ্টির
দূরত্ব বাড়ে। হঠাৎ কি খেয়াল হল, বাচ্চাটার দিকে চমকে তাকালেন, বললেন, নেমে এসো,
জুতো খুলিয়ে দিই, এটা ভগবানের জায়গা না? বাচ্চাটা বিগ্রহের দিকে একবার তাকালো।
অপ্রসন্ন দৃষ্টি। তার এক পাটি জুতোর ধুলোও সইতে পারেন না যিনি তিনিই ভগবান, সে
বুঝল। বলল, কেন মা? ঠাকুরের হাঁপানি হবে দাদুর যেমন ধুলো লাগলে হয়?
ভদ্রমহিলা
অপ্রতিভ হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি বুঝেও অন্যমনস্কতার ভাণ করে বাচ্চাটার দিকেই
তাকিয়ে থাকলাম। বাচ্চাটা আমার মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে গুটিগুটি পায়ে নেমে জুতোটা
খুলে, আগের খোলা জুতোর পাশে রেখে ফের মন্দিরের চাতালে উঠল। গোল গোল ঘুরতে লাগল।
এখন আর তার দেবতায় ভয় নেই। পায়ে ধুলো জুতো নেই যে!
আমি
পরপর রাখা দুটো জুতোর পাটির দিকে তাকালাম। নিরপরাধ দুটো পাটিজুতো। রাস্তার ধুলো
লেগে অপবিত্র হল। দেবতার রোষের কারণের সম্ভাবনা রাখে তারা।
বাচ্চাটার
ঘুরন্ত ফ্রকের দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা খামচে ধরা একটা ব্যথা হল। আমার চোখের সামনে
কাশ্মীরের দেবস্থান ভেসে এল।
আজ
নোয়াম চোমস্কি ও আরো নানান বিদ্বজ্জনদের লেখা প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিটা পড়লাম।
শেষ লাইনটায় ধাক্কা খেলাম, guilty of silence থেকে নিজেদের বিবেককে বাঁচানোর জন্যে
এ চিঠি লেখা। শব্দটায় চমক খেলাম। ঠিক এই শব্দটাই খুঁজছিলাম, নীরবতার অপরাধ। বহু
মানুষকে দেখছি এই প্রতিবাদ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক রোষের লেখনী লিখতে। তাদের এক পক্ষের
যুক্তি, কিছুতেই কিছু হয় না। আর আরেক পক্ষের যুক্তি আরো নিকৃষ্ট, যদি আপনার বাড়িতে
হত আপনি কি এইভাবে ফেসবুকে সোচ্চার হওয়ার সময় পেতেন?
'কিছুতেই
কিছু হবে না' মতাবলম্বীদের জন্য আমার চিরকালীন শ্মশান সান্ত্বনা। সে আগেও
জানিয়েছি। সে কথা থাক। কিন্তু দ্বিতীয়দের বলি, যে যুক্তিতে আপনি সব প্রতিবাদকে
প্রহসন ইত্যাদি আখ্যা দিচ্ছেন, সেই যুক্তিতেই বলি, সেরকম হলে আপনিই কি, কে কি
প্রতিবাদ করছে এ সব সুক্ষ্ম বিচারের সময় পেতেন? কার সমবেদনায় কতটুকু ভণ্ডামী
বিচারের এমন অখণ্ড অবসর পাচ্ছেন বলেই না এত সুন্দর করে বিধান দিতে পারছেন!
আসলে
বেঁচে থাকার একটা লড়াই আছে। আমাদের বাড়ি যিনি বাসন মাজেন তিনি IMF -এর প্রধানের
গুরুত্বের চাইতে পাড়ার মাতব্বর বিশুদার (কাল্পনিক নাম) গুরুত্ব বেশি বোঝেন। সেটা
তার অপরাধ নয়। সেটা তার সীমাবদ্ধতা। তথ্যে অনেক কিছু জানলেও অনুভবে অনেক কিছু
আবেদন জানায় না। আর তখনই অত্যন্ত সুচারুভাবে নিজের অবস্থানকে জাস্টিফাই করার
প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সাথে অন্যেরও। কারণ অনুভবের, সমবেদনার অনুভব যেখানে নেই সেখানে
শুষ্ক বিচার-প্রবণতার প্রবণতা বাড়বেই।
আমার
একটাই অনুরোধ, আপনি আপনার কক্ষপথে নিশ্চিন্তে ঘুরুন যতক্ষণ না কোনো কিছুর সাথে
ধাক্কা লাগছে বা ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা জাগছে, কিন্তু সবাইকে এইটা বোঝাতে আসবেন
না, কার প্রতিবাদের ধরণ কি ধারার হওয়া উচিৎ। আমি সহমত হতে না পারি, তাই বলে
অশ্রদ্ধা রাখার মত ঔদ্ধত্য দেখানোটা নিতান্তই মূর্খামি।
বাচ্চাটা
মায়ের সাথে ফিরে গেল। দেবালয়ের শুদ্ধতা ছেড়ে পাদুটো তার সাধের জুতো জোড়ায় গলিয়ে এই
ধুলো রাস্তাতেই হাঁটতে হাঁটতে গেল। ভাগ্যে বিশ্বজোড়া দেবালয় নয়, তবে তার জুতোর
সাথে আরো কত কি যে ভগবৎপ্রীত্যর্থে ছাড়তে হত কে বলবে? মানুষ সুরক্ষিত একমাত্র
মনুষ্যত্বে, এটা বুঝতে আরো কতজন কবীরের দরকার বুঝি না। যিনি বলতে পেরেছিলেন -
নিজের ঘর নিজেই জ্বালিয়ে
দাঁড়িয়ে মশাল হাতে
আসতে চাও তো আসো বন্ধু
শুধু ঘরটা জ্বালাও আগে
No comments:
Post a Comment