'চক্ষুলজ্জা'র ইংরাজি অভিধানে মনের মত পেলাম
না। সংসদের অভিধানে তো একটা রচনাই লিখে বসেছে দেখলাম। কেন বলুন তো? তবে কি ওদের ওদিকে
লোকে এমনধারা লজ্জা পেতে লজ্জাবোধ করে? জানি না। তবে আমাদের বাঙালিজাতটার আর কিছু লজ্জা
থাকুক চাই না থাকুক এই চক্ষুলজ্জাটা কিন্তু বেশ দগদগে। শুধু চক্ষুলজ্জা কেন হবে, কর্ণলজ্জাও
আছে তার সাথে।
'লজ্জা' জিনিসটা সমাজের খাতিরে না বিবেকের খাতিরে
– এটা আগে স্থির করতে হবে। সমাজের লজ্জাটা অভ্যেসের। স্থূল। প্রাণশক্তিহীন। নিজের তৈরি
করা নিজের ভাবমূর্তির প্রতি চূড়ান্ত একটা আনুগত্য নিয়ে বাঁচতে চাওয়া। তবে কি অভদ্রের
মত আচরণ করাটাই চক্ষুলজ্জার বিপরীত শব্দ? তবে কি আমরা যে ভদ্র আচরণ করি তা শুধু অভদ্র
আচরণ করলে চোখে লাগবে বলে? নাকি সেইভাবে আচরণ করাটাকে আমার ঠিক বলে মনে হয় বলে? সেই
গোল্ডেন রুলের কথা চলে এলো – ‘তুমি অন্যের সাথে সেইভাবেই ব্যবহার করো যেরূপ ব্যবহার
তুমি অন্যের কাছ থেকে আশা করো’। একটু অন্য কথা হলেও বলে নিই- এই গোল্ডেন রুলটা পৃথিবীর
সব ধর্মে কোথাও না কোথাও উল্লিখিত আছে। সেটা এবার কলেজ স্কোয়ারের বইমেলায় বিরাট করে
টাঙানো আছে দেখলাম। কারণটা যদিও বুঝলাম না। যাক গে সৎ চিন্তার প্রসারের জন্য হয়ত বা।
তো যেটা বলছিলাম, তবে কি আমরা যে ভদ্র ব্যবহার
করি তা সামনের মানুষটার মানসিক আঘাত যাতে না লাগে সেই ভেবে না আমি অন্যরকম ব্যবহার
করলে আমার ভাবমূর্তিটা নষ্ট হবে সেই ভেবে? এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা খুব গোলমেলে হয়।
এরাই মনে হয় সেই 'সাপের গালেও চুমু আর ব্যাঙের গালেও চুমু' গোত্রের হয়। এরা অন্যের
মনের আঘাতের থেকে নিজের ভাবমূর্তির রঙচটা নিয়ে বেশি ব্যস্ত। তো হল কি আমাদের ভদ্রতাবোধ,
সৌজন্যবোধ প্রাণের সেই সাড়াটা পায় না বলে বোধহয় কিরকম একটা কৃত্রিমতার আড়ষ্ঠতার ভাবটা
কাটিয়ে উঠতে পারে না। এই বোধটা আমার বোধগয়ায় হয়েছিল। কিছু একটা কারণে আমায় একজন সাহেব
মানুষ সুন্দর হেসে thank you বলেন। কথাটা আর সুরটা আমার কানে বাজে। এর আগে যে এ শব্দবন্ধটা
শুনিনি তা তো নয়। তবে এরকম আরাম লাগল কেন প্রাণে? তারপর বুঝলাম, আসলে কথাটা প্রাণের
গভীরের ধন্যবোধ থেকে জন্মেছে। তাই সেটা সত্য হয়ে উঠেছে। সুরে মিথ্যা আসে না। কারণ সত্যটা
তো কোনো কথা না, একটা সুর। প্রাণে বাজলে তবেই চোখে-মুখে ফুটে বেরোয়। নইলে এত ভাণ, এত
বাক্যবিস্তার, এত চাকচিক্য – কবে আমরা সত্যযুগে পৌঁছিয়ে যেতুম, যদি এর সিকির সিকি ভাগও
সত্য হত। আমাদের 'thank you' -টা হল, ‘এই আমি আমার তরফ থেকে দিয়ে রাখলুম কিন্তু’ –
এই ধরণের। ওতে প্রাণের সুর নেই, দায়সারা গোছের কিছু একটা আছে। তাই মাঝেমধ্যে আমাদের
sorry -টাও ‘বেশ করেছি’ টাইপের শোনায়। শুধু বলতে হয় তাই বলা। সেই মনে আছে ‘আগন্তুক’-র
শেষ দৃশ্যে ছুটদাদু কেমন thank you -টা নিতে চাইলেন না। বাচ্চাটার একমুখ হাসি নিয়েই
নিরুদ্দেশে পাড়ি দিলেন আবার।
দেখলেন কোথাকার কথা কোথায় এসে পড়ল? শুরুতেই
যা নিয়ে বলছিলাম, চক্ষুলজ্জা। তবে কি চক্ষুলজ্জার জন্য আমরা কোথাও বড় হয়ে উঠতে পারছি
না। অথবা বড় হয়ে ওঠার নামে এমন ছড়াচ্ছি যে হাঁটা যাচ্ছে না? কিরকম একটু ভেঙে বলি। আমি
দেখেছি অনেকেই যৌনতা বিষয়ে কোনো কথা হলেই বলেন – বড়দের কথা-বড়দের সিনেমা-বড়দের গল্প-বড়দের
ছবি ইত্যাদি। যেন আমরা সব অতি ভোলাভালা শিশুর মত যৌনবোধরহিত শুদ্ধ অপাপবিদ্ধ আত্মা।
বাকি সব যা তা! আমাদের যৌনতা নিয়ে বাড়াবড়ির অন্ত নেই। পর্ণোগ্রাফি আর রামায়ণের মাঝে
যে একটা রাস্তা আছে সেটা বোঝার মত বোধ তৈরি হতে আমাদের সময় লাগবে কি আরো? জানি না।
তবে এই চক্ষুলজ্জার চক্করে পড়ে আমাদের সাহিত্য তথা শিল্পের যে প্রভূত ক্ষতি হচ্ছে সেটা
মাঝে মাঝে মনে হয়। আমরা ‘ওসব’ কথা ইংরাজিতে বলি, পড়ি, কিন্তু বাংলায় উচ্চারণ করতে গেলেই
আমাদের চক্ষু-কর্ণ লজ্জা এসে উপস্থিত হয়। রবীন্দ্রনাথের 'চোখের বালি' আর 'যোগাযোগ'
উপন্যাস লিখবার সময় যে নিন্দা, কটুকথা সহ্য করতে হয়েছিল তা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শিবনারায়ণ
রায় বলছেন, একটা সমাজিক পরিবেশ যে কিভাবে একটা উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টিতে বাধা হতে পারে,
পূর্ণ না হলেও আংশিক দায়ভার তো বটেই, তা রবীন্দ্রনাথের এই দুটি উপন্যাস দেখলে বোঝা
যায়। এতে আমাদের ক্ষতি।
এতো গেলো যৌনতা সাহিত্যে। আমাদের শিক্ষাতেও
বহু শিক্ষক শিক্ষিকারা যৌনতা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনায় কুন্ঠিত হন – তাদের
একটা চক্ষুলজ্জা আছে না? একটা মান-সম্মান আছে না? অর্থাৎ সেই ভাবমূর্তির প্রশ্ন।
আমার অনেক বয়স্য কি তার চাইতেও বড় মানুষ এসব
কথা বললে লজ্জা পান দেখেছি। লুকিয়ে আলোচনা করেন। গোপনে পর্ণোগ্রাফি দেখে ব্রাউজিং হিস্ট্রি
ডিলিট করে এমন সাধু সেজে বসেন, যে মুখ দেখে মনে হয় সদ্য মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হলেন।
আবার এর বিপরীতও আছে, যা আগেই বলেছি। কলম দিয়ে না যৌনাঙ্গ দিয়ে লিখছে বোঝার উপায় নেই।
আসলে তাই তো হয়, যে স্বাভাবিক সুস্থ আলোচনা-শিক্ষা আমাদের দেশে চক্ষুলজ্জার ফিকিরে
আটকিয়ে সেখানে বিকার থাকাটাই স্বাভাবিক। আরো ভয়ংকর অবস্থা হল এই চক্ষুলজ্জা যখন অবচেতনেও
ছাপ ফেলতে শুরু করে। অমানুষ জড়বস্তুতে পরিণত করে। বিধবা বলে এটাসেটা করতে চক্ষুলজ্জার
দোহাই, অথচ সেই বিধবার সাথে রাতে ছেনালি করতে সমাজের বাধেনি - এমন উদাহরণ একালেও বিলুপ্ত
নয়।
আলোচনা অতি দীর্ঘ হল। এবার ইতি টানি। শেষ করার
আগে একটা ইঙ্গিত দিয়ে যাই খালি। আমাদের দেশের প্রাচীন লালিত আদর্শ – ব্রহ্মচর্য্য।
আমাদের শুদ্ধতার প্রতিশব্দই যৌনতারহিত। আদিম পাপ। সেই আপেল কেস। কিন্তু ওরা ওসব ছাড়িয়ে
বহুকাল আগে পরিণত হয়ে উঠেছে আর আমরা এখনও প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে – নারী নরকের দ্বার...
মেয়েমানুষের সাথে থাকলে ভগবানলাভ হয় না... ইত্যাদি আউড়িয়ে যাচ্ছি। যে ছেলেটা স্কুলে
গিয়ে যৌনতাকে সুস্থ, স্বাভাবিক পড়ল, সেই যখন তার বাড়ির লোকের কাছে শোনে বা পড়ে আমাদের
ধর্মগুরুরা বলে গেছেন মেয়েমানুষদের কাছ থেকে দূরে না থাকলে জীবন সফল হবে না... কিম্বা
বীর্য্যধারণ না করতে শিখলে তুমি পাপী-অশুদ্ধ, ভগবান রোজ তোমার কোমরের নীচ থেকে হাঁটু
অবধি শুদ্ধতা মেপে যান – তখন গোলমাল হয় বই কি। তখন চক্ষুলজ্জার উৎপন্ন হয়। কারণ যা
বিবেকে, জ্ঞানে বাধে না, তা বাইরে বাধে তো। তাই সংযম, সৌজন্যতাবোধ না বুঝে আমরা বুঝি
শিকল, আড়ষ্ঠতা, প্রাণহীন শুষ্ক অভিনয়ের ধারাবাহিকতা।
No comments:
Post a Comment