ভোরের আলো, গোধুলির আলো, প্রথম
বর্ষাভেজা মাটির গন্ধ, নিখিল ব্যানার্জি'র সেতারের একটা মীড় – এরা বড্ড
ক্ষণস্থায়ী। সুজিত সরকারের ‘অক্টোবর’-ও তাই। কবিতার কোনো শরীর হয় না। কবিতাকে যদি
ধরা যায় তবে সে আর কবিতা থাকে না। কবিতা যদি মনের স্তরের পর স্তর সরিয়ে অন্তঃসলিলা
চেতনার কাছে পৌঁছাতে না পারে তবে তা পানের অযোগ্য হয়। আসলে কবিতার কোনো ধর্ম হয়
না। কারণ কবিতা হয় সত্য নয়তো কিছু না। আলোর যেমন কোনো আলো হয় না, রঙের যেমন কোনো
রঙ হয় না, যেমন অনুভবের কোনো অনুভব হয় না, তেমন কবিতার কোনো ধর্ম হয় না। মানুষের
সেই গভীর মানুষের টান লাগলে মানুষ ক্ষেপে ওঠে। তখন তার মধ্যে যে জাগে সে প্রচারক
নয়, ধর্মের ব্যবসায়ী নয়, মানুষের ছদ্ম-উদ্ধারকারী নয়, সে পুরোদস্তুর একটা মানুষ।
গোটা মানুষ মানেই খ্যাপা মানুষ। সমাজ তাই সেই মানুষের ডানা কেটে, তাকে খাপে পুরে
ব্যবহারযোগ্য করে তোলার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে রাতদিন। কত তার চোখ রাঙানি, কত তার
হম্বিতম্বি, কত তার শাসন-অনুশাসন। আসলে সে যে কেউ না পাছে এই সত্যটা তার সবার কাছে
কিম্বা নিজের কাছেও ধরা পড়ে বলে সে সন্ত্রস্ত থাকে সবসময়।
কিন্তু যে খেপার সে খেপেই ওঠে। সে
ভালোবাসে বলেই ভয় করে না। আর সে ভয় করে না বলেই সবাই তাকে ভয় করে। কেউ বলে মেরে
ফেলো, কেউ বলে জেলে ভরো, কেউ বলে ওকে এলেবেলে করে রেখে দাও – এরকম কত কথা ওঠে।
কিন্তু যাকে নিয়ে এত কথা তার কানে সে সব পৌঁছায় না। সে নিজের ভালোবাসায় নিজেই
বুঁদ। নিজের মনের মাধুর্যে নিজেই মগ্ন। সে মন্দিরে যায় না, স্তোত্র পড়ে না, অঞ্জলি
দেয় না – কারণ সে ভয় পায় না। যে নিজেকে ভয় পায় না সে ঈশ্বরকেও ভয় পায় না। মানুষের
যত নিয়ম সব তার নিজেকে নিয়ে নিজের যত গোল হয় বলে। তার অচলায়তন গড়ে ওঠে বুদ্ধির
জ্যোতিতে নয়, বুদ্ধি যেখানে বাধা পেয়ে ছায়া তৈরি করে সেই ছায়াতে। যার যত বড় ছায়া
তার তত বড় অচলায়তন। এমন মানুষ নিয়ে সংসারও হয় না, ধর্মও হয় না। এরা হয় খেপা। এরা
হয় বাউল। এরা হয় সুফী। এরাই হয় দিওয়ানা। কামের সাথে যেখানে শরীরের গন্ধ সেখানে
স্বার্থেরও গন্ধ। কামের সাথে যেখানে আত্ম-নিবেদনের ব্রত সেখানে প্রেমের গায়ে
গেরুয়া। সেখানে বাউলের গান, সুফীর সংগীত, ঝরণার অবিরাম আওয়াজ, সমুদ্রের ঢেউ
ভাঙ্গার শব্দ, ভোরের আলোর প্রথম পাহাড়ের ঢাল ছোঁয়ার শব্দ, মায়ের গায়ের গন্ধ, এক
আকাশ নিঃশব্দ তারার মধ্যে যে সুর তার শব্দ সেখানে মিলেমিশে একাকার। তার ভাষা মানবী
ভাষা নয়। সে ভাষার স্লেট একমাত্র চোখ। চোখের উপরের পাতার কোল থেকে নীচের পাতার কোল
ছুঁয়ে যে উপত্যকা, সেই প্রেমের উপত্যকা। সেই উপত্যকায় ঋতু পরিবর্তন হয়। বৃষ্টির
মেঘ জমে, শরতের মেঘ জমে, আবার তীব্র দাবদাহের মত জ্বলনের চিহ্নও দেখা যায়।
নিঃশব্দতার সে ভাষা কেউ শেখায় না। শিখেই আসে মানুষ, ভুলে যায়। কারোর কারোর আবার
মনে পড়ে যায়। সে তখন সে ভাষায় ফুল ফোটায়, ভোরের আলোয়, নিঃশব্দ রাতের অন্ধকারে
অনুভব করতে পারে। আবার শুনতে শুরু করে।
একটা ছেলের (বরুন ধাওয়ান) ভালোবাসার
গল্প। যাকে নিয়ে তার (বনিতা সান্ধু) ভালোবাসা তার কোনো মানবীয় ভাষা নেই। যাকে নিয়ে
তার আবেগ, তার যন্ত্রণা, তার অধীরতা – সে মানুষটার কোনো চঞ্চলতা নেই। সে স্থির।
জীবন আর মরণের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে সে। ভালোবাসা প্রতিক্রিয়া নয়। ভালোবাসা, ভালোবাসা
অবলম্বী। ভালোবাসা সঞ্চয় করার নয়। ভালোবাসা সংরক্ষণের। মানুষ তো কত কিছু সঞ্চয়
করে। কিন্তু সংরক্ষণ কই তার জীবনে? সে যত্ন কই? সারাটা জীবন তার প্রতিক্রিয়া আর
স্বার্থসিদ্ধির ছকের ঘুঁটি সাজাতে সাজাতে ভুলেই যায় যে যে-কোনো মুহূর্তেই খেলার
ঘুঁটি শুধু নয়, খেলার বাকি সব উপকরণই বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে। বিষাদ আর অবসাদই
তার জীবনের একমাত্র সাথী হতে পারে না যদি না সে নিজেই নিজের বন্ধ দরজাকে নিজের
প্রান্তসীমা বানিয়ে ফেলে। বহু মানুষের হাততালির চেয়ে একজন মানুষের একটা আশ্বাসের
হাত যে অনেক মূল্যবান সেটা বুঝতে বুঝতে তার অনেক দেরী হয়ে যায়। যখন তার বিষাদ আর
অবসাদকেই পরম দোসর লাগতে শুরু করে। প্রতিদিন কয়েকটা করে প্রজাপতি মেরে তাদের পাখা
দিয়ে বদ্ধ ঘরের নকশা সাজানোকেই সে চূড়ান্ত কর্মকুশলতা মনে করে। সে ভুলে যায় তার
বাড়িটা একটা অনন্ত বাগানে ঘেরা, একদিন তার এই বাড়ির মেয়াদ ফুরোবে। তাকে লক্ষ
প্রজাপতি হত্যার কৈফিয়ৎ দিতে হবে।
সুজিত সরকার
যে কঠিন কাজটা পেরেছেন সেটা হল পুরো সিনেমাটাতে এক মুহূর্তের জন্যেও সুর নামতে
দেননি। একটা একতারার মত অধরা ভাষা সিনেমাটার মুখ্য আবহ। একটা ফুল, বৃষ্টি, কুয়াশা,
রাতের নিঃসঙ্গ পথ --- সবাই এ গল্পের চরিত্র। আর এ গল্পের সব চাইতে বড় চরিত্র চোখ।
একটা সময়ের মুহূর্ত থেকে আরেকটা সময়ে সরণ বড় সূক্ষ্ম। তার কাটে না। টানা হ্যাঁচড়া
করতে হয় না। অসামান্য অভিনয় গীতাঞ্জলী রাও'য়ের, যিনি মেয়েটির মায়ের চরিত্রে অভিনয়
করেছেন। প্রত্যেকের অভিনয়ই আমার ভালো লেগেছে। কাউকেই কষ্ট করে বিশ্বাসযোগ্য করে
তুলতে হয়নি কোনো মুহূর্তেই। আমার খালি খালি মনে হচ্ছিল এরকম একটা সিনেমা বাংলায় কি
দেখেছি? মনে পড়ল না। অনেক বাঙালী পরিচালক হিন্দী ভাষায় অত্যন্ত সংবেদনশীল এক একটা
সিনেমা বানিয়ে চলেছেন, আমাদের অসুবিধাটা কোথায় হচ্ছে? অভাবটা কোথায়? ভাষায়, না
গল্পে, না অভিনয়ে, না প্রযোজনায়, না রাজনৈতিক পরিবেশে? কোথায়? যদি এর একটাও হত তবে
ইরান কি করে পারছে ওই মাত্রার সংবেদনশীল মানবিক সিনেমা বানাতে একটার পর একটা?
‘অক্টোবর’-এর মত এমন একটা গল্প, যাতে না সেক্স, না কোনো হিট গান, না প্রথম সারির
কোনো বিশাল স্টার – তাও তো মানুষ দেখছে... বাঙালীরাও দেখছে... যাদের ভাষায় কি কি
সব সিনেমা বিশ্বের দরবারের হাজির হয়েছিল? তবে আজ কি হল? আমার একটাই কথা মনে হয় –
আসলে যেন আমরা সাহস হারিয়েছি। আসলে যেন আমাদের ভীষণ ভয়। আসলে যেন আমরা আমাদের
হৃদয়ের, কণ্ঠস্বরের, মস্তিষ্কের মৌলিকতাকে ভীষণ একটা ব্যতিক্রমী উৎপাত ঠাওরিয়েছি।
তাই বিশ্বের সব আলোবাতাস আসার দরজা জানলা বন্ধ করে “আহা রে, এককালে আমাদের কি সব
সাহিত্য, কি সব গান, কি সব... হয়ে গেছে... সারা বিশ্বে এখন কি লেখা হচ্ছে, বানানো
হচ্ছে, ভাবা হচ্ছে, তাতে কার কি আসে যায়?... তুমি কৃষ্টি ভুলো না... আমাদের অতীতের
গর্বের বঙ্গকৃষ্টি”...। অগত্যা আমরা আমাদের ঐতিহ্যের ঘরের ঝুলকেও অত্যাধুনিক সাজ,
পচা ডোবার গন্ধকেও মৌলিক উদ্ভাবন, বদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে নাকি কান্নার সুরকে
সঙ্গীত, আর বিকারকে মৌলিক চিন্তা আখ্যা দিয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছি। আর মাঝে
মাঝেই কালের খাতায় আমাদের অতীত কীর্তিগুলোর জন্যে পেনসান আনার লাইন দিচ্ছি। কথা
হচ্ছে ক'দ্দিন চলবে এভাবে সে মহাকালই জানেন।

No comments:
Post a Comment