তিয়াত্তর বছর, ন’মাস, দশদিনের দিন রাতে হঠাৎ খেয়াল করলেন তার জীবনে যা যা ঘটেছে সব ঘটনা
স্বাভাবিক নয়। অথচ সব ঘটনাকে উনি এতদিন স্বাভাবিক মনে করে এসেছেন। রাত সাড়ে
বারোটা। এখন ডাকলে কেউ আসবে না। কিন্তু কাউকে একটা তো বলতে হবে। কিভাবে বলবেন?
বিছানা ছেড়ে উঠলেন, যে বিছানায় ছেচল্লিশ বছর
একজন মহিলার সাথে শুয়েছেন, তার দুই সন্তানের মা, তিন বছর আগে মারা গেছেন। জানলায় এসে দাঁড়ালেন। সামনে একটা দোতলা বাড়ি
উঠছে। সামনের মাঠটা আর দেখা যাবে না। তারাগুলো একইরকম রয়ে গেছে। একই সজ্জা। যদিও
বিজ্ঞানীদের মতে নাকি ওরা সরে সরে যায়। শেয়াল ডাকছে। টয়লেটে যেতে হবে। সুগারটা
অনেকদিন চেক করানো হয় না। টয়লেটে ফ্ল্যাশ করতে গিয়ে মনে হল, গন্ধটা
মিষ্টি লাগল না? আরেকবার কুঁথলেন, এক
ফোঁটা বেরোলো, হাতের তালুতে নিয়ে শুঁকে দেখলেন, মিষ্টি গন্ধ কি? একবার জিভ ঠেকালেন, না, বিচ্ছিরি স্বাদ, পানসে।
বসার ঘরে এসে বসলেন। কুশানগুলো সব মনোরমার পছন্দের। মনোরমাকে তিনি
ভালোবাসতেন না। কোনোদিন ভালোবাসেননি। তা বলে খুব ঝগড়া হত যে তা নয়, আবার একদমই হত না, তাও নয়, উল্লেখযোগ্য
কিছু না তেমন। একটা ভালো বোঝাপড়া ছিল। এখন একটা শূন্যতা লাগে। ভালোবাসার অভাবের না,
অভ্যাসের। আলো জ্বালাননি ইচ্ছা করে। অন্ধকারটা ভালো লাগে। সিকিওর
লাগে। বিশেষ করে এই মাঝরাতটায়। সিগারেটের প্যাকেটটা আনতে গেলেন। পেলেন না। শেষ হয়ে
গেছে! শেষ হয়ে গেলে দিনের আয়াটা ফেলে দেয়। কিন্তু কিছু বলে
গেল না তো! রাতে আয়া থাকে না। ছেলে বউমা দু'জনেই বাড়িতে থাকে, তাই আর অনর্থক খরচ বাড়িয়ে লাভ কি।
সোফায় শুয়ে পড়লেন। যা কিছু জীবনে ঘটেছে সব অস্বাভাবিক। তাদের যৌথ পরিবার
ছিল, একপ্রকার উদ্বাস্তু বলা যায়। বাবা একটা মিলে কাজ করতেন।
কি করে পড়াশোনা হল ওই পরিবেশে.. একটা ভালো চাকরি হল ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরিতে..
বিয়ে হল মোটামুটি একটা ভালো পরিবারের মেয়ের সাথে.. এক মেয়ে.. শ্বশুর উকিল, ভালো পসার.. এত স্মুদ হয় কি করে! তারপর শ্যামনগরে একটা বাড়ি হল, দোতলা... ছেলে ব্যাঙ্কে সুচাকুরে, বউমা স্কুল
শিক্ষিকা। সব কি অদ্ভুত ছকে বাঁধা। বড্ড অস্বাভাবিক না? অভাব,
অশান্তি, পরকীয়া কিছুই তো হল না, এটা একটা অস্বাভাবিক জীবন না? কোনো উত্তেজনা নেই
একটা জীবনে হতে পারে! অ্যাডভেঞ্চার বলতে হেঁটে টাইগার হিল থেকে হোটেল অবধি ফেরা,
এটা একটা অ্যাডভেঞ্চার হল? অথচ এটাই এতদিন ধরে
ভেবে এসেছিলেন সব চাইতে বড় অ্যাডভেঞ্চার তার জীবনে!
জল খেলেন উঠে। ঘটিতে জল খান। পিতলের ঘটি। লিভার ভালো থাকে, শুনেছেন। একটা সিগারেট পেলে ভালো হত। টয়লেটে গেলেন আবার। নীচু হয়ে খুঁজে
দেখলেন কোনো ফেলে দেওয়া টুকরো আছে কিনা, নেই। হঠাৎ কি মনে হল,
টয়লেটের পিছনের দিকের জানলার উপরে হাত বাড়ালেন, এক টুকরো সিগারেট পেলেন। বসার ঘরে এসে লাইটারটা নিলেন, জ্বালিয়ে সোফায় বসলেন। এতটা অস্বাভাবিক জীবন যাপনের অর্থ কি? পাখাটা বন্ধ করে দিলেন। ঘামবেন। ছোটোবেলার মত। ভাদ্র মাস, গুমোট গরম। ছোটোবেলায় বাড়িতে পাখা ছিল না। উদ্বাস্তু কলোনিতে পাখা কোথায়?
তারপর এলেন ভাড়াবাড়ি বনগাঁয়, কারেন্ট আসে উনি
যখন নাইনে পড়েন। বাবা মারা যান পরের বছর, পাখার হাওয়াতেই।
ক্যান্সার হয়েছিল ফুসফুসে। খুব বিড়ি খেতেন। জ্বলন্ত সিগারেটের দিকে তাকালেন। সোফা
থেকে উঠে একবার বেসিনের সামনে দাঁড়ালেন। তাকে পুরো বাবার মত দেখাচ্ছে। তার কি
ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে? পারে হয়ত। জামাটা খুলে
পাঁজরগুলো টিপে টিপে দেখলেন। জোরে একটা শ্বাস নিলেন। বেসিনে থুতু ফেলে দেখলেন রক্ত
আসছে কিনা। নেই। ক্যান্সার হয়নি।
দুটো বাজে। সারা গা ঘামে ভিজে সপসপে। ফ্যানটা চালালেন। বমি পাচ্ছে। গ্যাস
হল? কার্বোজাইমটা বউমাদের ঘরে। বউমার খুব অম্বলের বাতিক। ওর
গলস্টোন হয়নি তো? হতে পারে। গলস্টোন প্যানক্রিয়াসের মধ্যে
ঢুকে যাওয়া খুব খারাপ। এই কথাটা আগে মাথায় আসেনি তো! ওরাই বা কি করে এত উদাসীন
থাকে! এত লেখাপড়া শিখে, এটুকু কমোন সেন্স নেই? আমার না হয় বয়েস হয়েছে, তোদের?
ভাবতে ভাবতেই কখন সিঁড়ির কাছে চলে এসেছেন টের পাননি। কিন্তু এত রাতে ওদের
জাগানো কি ঠিক হবে? কিন্তু কাল যদি ভুলে যাই? ওরা তো অফিস যাবে!
আজ রবিবার, মনে নেই সেটা ওনার। সিঁড়ির আলোটা
উত্তেজনায় জ্বালতে ভুলে গেলেন। চারটে ধাপের পর লুঙ্গিতে পা জড়িয়ে পড়লেন যে সিঁড়িতে
সেই সিঁড়িতে আজ বারো বছর ওঠানামা করছেন। কয়েক ঘন্টা আচ্ছন্ন ছিলেন।
রবিবার ছেলে বউ উঠেছিল সাড়ে আটটার পরে। ডাক্তার বলেছিল সাড়ে চারটে নাগাদ
মারা গেছেন হয় তো বা। সোমবার ওনার রুটিন চেক-আপ করার কথা, প্রতি
মাসের প্রথম সোমবার, সোডিয়াম-পটাশিয়াম, সুগার, আরো কয়েকটা রুটিন চেক-আপ করানো হয়। পাড়ার
ল্যাবে বলাই থাকে। সেই ল্যাবেই ওনার বউমার ধরা পড়ল গলস্টোন, দুই
মাস পরে।
No comments:
Post a Comment