মহাকাব্যের একটা সুর থাকে। হঠাৎ মনে এলো সেই ক্ষণটার কথা ---
গভীর রাত; একজন নারী একজন পুরুষের সাথে গোপনে দেখা করতে
যাচ্ছেন, নিজেকে রক্ষার বিনতি জানানোর জন্য। কারণ কীচক তাকে
বিরক্ত করছে। কীচক তার মর্যাদায় হাত দিতে চাইছে। কার মর্যাদায়? যাকে জনসমক্ষে চূড়ান্তভাবে লাঞ্ছিতা হতে হয়েছে রাজনৈতিক কূটনীতির জন্য,
তার মর্যাদায়। যার কাঙ্ক্ষিত পুরুষ, চারজন আরো
পুরুষের সাথে সমকক্ষ হয়ে গেল, পারিবারিক নীতির জন্য, তার মর্যাদায়। যাকে কামুক, লোভী, নীতিবান, অসুর, ঋষি, পরিবারের গুরুজন ইত্যাদি সবার কাছে বারবার লাঞ্ছিতা হতে হয়েছে, এমনকি নানা নীতির ছদ্মবেশেও লাঞ্ছিতা হতে হয়েছে যা আগে বললাম, তার মর্যাদায়। সেই মানুষটা নিজেকে গোপন করে নিয়ে চলেছে একজন পুরুষের কাছে,
আত্মরক্ষার বিনতি জানানোর জন্য।
মহাভারত তার চরিত্রের সংখ্যা গরিষ্ঠতায়, ঘটনার
জটিল বুননে, সময়ের বিশাল মানচিত্রে দাঁড়িয়েছিল বলে মহাকাব্য
হয়নি। এত জটিল ঘটনা, সময়ের ঘূর্ণাবর্তেও মানুষের যে সুক্ষ্ম
বলিষ্ঠ আত্মমর্যাদা বোধে সে মানুষ – সেই কথাটা প্রথম থেকে
শেষ অবধি সার্থকভাবে বলতে পরেছে বলে তা মহাকাব্য। মনুষ্যত্বের মহিমাটুকু অক্ষুণ্ন
থেকে গিয়েছে।
কাব্য কেন? কারণ মানুষ গদ্য শরীরে, কাব্য আত্মায়। মহাকাব্য কেন? কারণ সেই শরীরের সবটুকু
অস্তিত্ব ক্ষুদ্রতা, জটিলতা, স্থূলতা
স্বীকার করেও সে আত্মা অবধি পৌঁছাতে পেরেছিল বলে। একটা ডিঙি নিয়ে নদী পার হওয়া আর
একটা প্রকাণ্ড জটিল কলকব্জা সমন্বিত জাহাজ নিয়ে সমুদ্র পার হওয়া তো সমান কথা নয়।
মহাভারত তা পেরেছিল।
যে ক্ষুদ্র মুহূর্তটার কথা বলছিলাম তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না
ঘটনা প্রবাহের মধ্যে, তবু সেই ক্ষণটায় যে মাধুর্য কবি
এঁকেছেন তা অদ্ভুত। দ্রৌপদী তখন সৈরিন্ধ্রী। পঞ্চপাণ্ডব অজ্ঞাতবাসে বিরাট রাজার
কাছে। কীচক, বিরাট রাজার শালার কুদৃষ্টিতে দ্রৌপদী তখন। সে
রাজা বিরাট ও তার স্ত্রী সুদেষ্ণাকে গিয়ে বলেছে কীচককে সাবধান করার জন্য, এও বলেছিল তার পাঁচ গন্ধর্ব স্বামীর হাতে সে অবশ্যই মারা যাবে, কিন্তু কেউ শোনেনি সে কথা। আচ্ছা, যখন স্বৈরিন্ধ্রী
সেই পাঁচ স্বামীর কথা ভেবেছিল তখন সে কি সত্যিই পাঁচজনের কথাই ভেবেছিল, নাকি তার মাথায় শুধু একটাই মুখ ভেসে এসেছিল – বল্লভ,
ভীমের ছদ্মবেশ। হয়ত তাই।
সেই মুহুর্তটার কথা একবার ভাবুন, যে কোনো
মুহুর্তেই তারা ধরা পড়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা তো উড়িয়ে
দেওয়া যায় না, আবার বনবাস হবে তবে, তার
মধ্যে কীচকের উৎপাত। এমন একটা প্রেক্ষাপটে কবি শুধু বাইরের ছবি আঁকলেন না। তিনি
দুটো হৃদয়ের ছবি আঁকলেন। কবি এমন একটা দৃশ্যপট আঁকলেন যা মহাকালের প্রবাহে
চিরকালের সুর। যুদ্ধ, হিংসা কোনোদিন মহাকালের সম্পদ নয়। সেই
প্রেমের বর্ণনায় চাঁদ ছিল না, নানা ফুলের সৌরভ ছিল না,
ছিল না কোনো স্বর্গীয় সঙ্গীত। যা ছিল তা হল কঠোর বাস্তব, বিপদ, দুর্যোগ। তার মধ্যে জাগল প্রেম। আঁকা হল
একান্ত নিবিড় একটা মানবিক প্রেমের অধ্যায়।
সেদিন রাত্রে লুকিয়ে এলেন সৈরিন্ধ্রী রন্ধনশালায়। যেখানে মেঝেতে
শুয়ে ভীম। এই প্রথম দ্রৌপদী যেন নিজের ভাষা খুঁজে পেলেন। যা নীতির কথা না, অভিমানের কথা। কি লিখছেন কাশীদাস মহাশয়,
বিরাট রন্ধনগৃহে ভীমের শয়ন।
নিদ্রা যায় বৃকোদর হয়ে অচেতন।।
সঙ্কেতে বলেন দেবী চাপি দুই পায়।
উঠ উঠ, কত নিদ্রা যাও মৃতপ্রায়।।
হীনজন সাধ্যমত আপন ভার্য্যারে।
প্রাণপণে করি রক্ষা সঙ্কটেতে তারে।।
সভামধ্যে যত মম অপমান কৈল।
সিংহের রমণী লৈতে শৃগাল ইচ্ছিল।।
চরণ চাপিতে ভীম হন জাগরিত।
দ্রৌপদী কাতর দেখি উঠেন ত্বরিত।।
কহ ভদ্রে, এত রাত্রে কেন আগমন।
দুঃখিতের প্রায় দেখি মলিন বদন।।
যে কথা কহিতে আছে, শীঘ্র কহ মোরে।
কেহ পাছে দেখে শুনে, যাহ নিজ ঘরে।।
ভীমবাক্য শুনি আরো বৃদ্ধি পায় দুঃখ।
নয়নে সলিল পড়ে, কৃষ্ণা অধোমুখ।।
ভীম বলে, কহ প্রিয়ে কি হেতু শোচন।
কি দুঃখ তোমার কহ করিব মোচন।।
এত শুনি সকরুণে বলেন পার্ষতী।
কি দুঃখ শোচন, যার যুধিষ্ঠির পতি।।
জানিয়া শুনিয়া কেন জিজ্ঞাসিছ মোরে।
আপনার দুঃখ কিবা বলিব তোমারে।।
হস্তিনায় দুঃশাসন যতেক করিল।
কুরুসভা মধ্যে সবে বসিয়া দেখিল।।
একবস্ত্রা পরিধানা আমি রজঃস্বলা।
কেশে ধরি আনিবেক করিয়া বিহুলা।।
তদন্তরে অরণ্যেতে দুষ্ট জয়দ্রথ।
বলে ধরি লয়ে গেল পাপিষ্ঠ উন্মত্ত।।
দ্বাদশ বৎসর বনে দুঃখে বঞ্চি শেষে।
মৎস্যদেশে সুদেষ্ণার দাসী হৈনু এসে।।
গোরোচনা চন্দনাদি ঘষি নিরন্তর।
দেখ দেখ কলঙ্কিত হৈল দুই কর।।
সে সব দুঃখের কথা নাহি করি মনে।
তোমা সবা দুঃখ দেখি ভুলি ক্ষণে ক্ষণে।।
বিনা অপরাধে মোরে কীচক দুর্ম্মতি।
সবার সাক্ষাতে মোরে মারিলেক লাথি।।
এ ছার জীবনে মোর নাহি প্রয়োজন।
এত লঘু হয়ে জীব কিসের কারণ।।
রাজকন্যা হয়ে মোর সমান দুঃখিনী।
স্বামীর জীয়ন্তে কেহ, না দেখি, না শুনি।।
আজি যদি কীচকেরে তুমি না মারিবে।
নিশ্চয় আমার বধ তোমারে লাগিবে।।
গরল খাইব কিংবা প্রবেশিয়া জলে।
প্রভাতে মরিব আমি কীচকে দেখিলে।।
নিত্য আসে দুরাচার আমার নিলয়।
মোর ভার্য্যা হও বলি অনুক্ষণ কয়।।
সৈরন্ধ্রী বলিয়া মোরে করে উপহাস।
ধিক্ মোর ছার প্রাণে, আর কিবা আশ।।
ভীম কাঁদলেন। অনুতাপে, আক্রোশে, যন্ত্রণায়। যে কাজ তিনি রাজসভায় নিমেষে করতে পারতেন সেই কাজ তিনি পারেননি
যুধিষ্ঠিরের মর্যাদা রক্ষায়। আজ সে কথা বলেই ফেললেন।ভীমের সে অনুতাপ পৌরুষের বললে
বড় একপেশে কথা হয়ে যায়, এটা আত্মমর্যাদার কথা। ওই যে শুরুতেই
বলছিলাম, মহাকাব্য মানুষকে বিশাল প্রেক্ষাপটে মনুষ্যত্বেই
দেখে, তার মানবতার সম্পদেই তাকে গরীয়ান করে তোলে। তাই ভীম
কাঁদলেন,
এত বলি কান্দে দেবী মুখে দিয়া কর।
তিতিল নয়নে নীরে ভীম কলেবর।।
কৃষ্ণার ক্রন্দন দেখি কান্দে বৃকোদর।
করপদ কাঁপে ঘন, কাঁপে ওষ্ঠাধর।।
ধিক্ মোর বাহুবল, ধিক্ ধনঞ্জয়।
তোমার এতেক কষ্ট দেখি প্রাণ রয়।।
আমারে কি বল কৃষ্ণা, আমি কি করিব।
আত্মবশ হৈলে কেন এত দুঃখ পাব।।
যেখানে তোমারে দুষ্ট মারিলেক লাথি।
সেইখানে পাঠাতাম যমের বসতি।।
সভাসহ মারিতাম নৃপতি সহিতে।
কাহারে না রাখিতাম অন্যেরে কহিতে।।
বিদিত হইলে পুনঃ যাইতাম বন।
এত অপমান অঙ্গে হয় কি সহন।।
কটাক্ষে চাহিয়া মোরে রাজা মানা কৈল।
সে কারণে দুরাচার কীচক বাঁচিল।।
যুধিষ্ঠির বাখ্য আমি লঙ্ঘিতে না পারি।
নহিলে এ গতি কেন হইবে সুন্দরী।।
ইন্দ্রের অধিক সুখ শত্রুগণে দিয়ে।
এত দুঃখ হৈল শুধু তাঁর বাক্যে রয়ে।।
সভামধ্যে করিলেক যত দুঃশাসন।
মৃত্যু ইচ্ছা হয় তাহা করিলে স্মরণ।।
সে সকল অপমান বসি দেখিলাম।
যুধিষ্ঠির আজ্ঞা লাগি সব সহিলাম।।
ক্রন্দন সম্বর দেবি, দুঃখ হৈল ক্লেশ।
অল্পদিন হেতু আর কেন ভাব ক্লেশ।।
ভীম এবার সৈরিন্ধ্রীকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে পুরাণ কথা শোনান (না
পুরানো কথা শোনান?)। কাকে কাকে অতীতে কোন কোন যাতনার মধ্যে দিয়ে যেতে
হয়েছে সে কথা শোনান। দ্রৌপদী শান্ত হয়ে সবটা শোনেন। ভীমের বলা শেষ হলে বলেন,
তুমি যা বললে ভীম সবটাই আমি জানি। কিন্তু আমি যে বলেছি আমার পাঁচ
গন্ধর্ব স্বামী আছে, তার কি হবে ভীম? আমার
কথা নিয়ে সে দুষ্ট কীচক আমায় কিনা পরিহাস করে, বলে সে তাদেরও
হত্যা করবে। আমার কথা তবে মিথ্যা হবে ভীম? আমি মিথ্যাবাদী হব?
কাল সকাল হলেই সে আবার আসবে আমার ঘরে, আমায়
উৎপীড়ন করবে। এ সব সহ্য করতে হবে? কেন ভীম? কেন আমায় দেবী হতে বলছ? হব না, বরং - "আজি রক্ষা পেলে পিছে হব ঠাকুরাণী।"
ভীম ক্রুদ্ধ হলেন, দ্রৌপদীর উপর না,
নিজের অসহায়তার উপর। আগে বলছিলাম না, যখন
দ্রৌপদী তাঁর পাঁচ স্বামীর উল্লেখ করছিলেন তখন তাঁর মনের মধ্যে কি সত্যিই পাঁচ স্বামীর
মুখ ভেসেছিল? ভাসেনি তো, তাই যদি হত
তবে আজ রাত্রে তিনি ভীমের কাছেই বা কেন। আর তাও স্পষ্ট করে বলছেন কাশীরাম দাস,
দ্রৌপদী বলছেন, "তোমা বিনা রাখে ইথে,
নাহি দেখি আন।।"
তবে তো সৈরিন্ধ্রী পাঁচজনের কথা ভাবেনি, সে
ভীমকে এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে তাকে জয়দ্রথ, জটাসুরের হাত
থেকে সেই ভীমই তো বাঁচিয়েছিল, তাই ভীমই দ্রৌপদীর একমাত্র
অবলম্বন এই ঘোর বিপদে। তবে কি শুধুই সেই কারণেই তার ভীমের কথা মনে হয়েছিল। তাই যদি
হত তবে অভিমানের কথা আসত না। সে জানত ভীমই পারবে, একমাত্র
সে-ই অমানবিক একপেশে পুরুষের বানানো নীতির শৃঙ্খলে নিজেকে কারারুদ্ধ করেনি। তার
মধ্যে জেগে আছে চিরকালের মানবনীতি।
কীচক বধ হয়। ভীম তাকে বধ করে দ্রৌপদীর প্রতি তার অকৃত্রিম মানবিক
প্রেমের তাগিদেই, নিজের পৌরুষের আস্ফালনে না, তাই সে আত্মগর্বের উল্লাসে দ্রৌপদীকে ডেকে বলে,
...হাসিয়া কৃষ্ণারে ডাকে পবন কুমার...
অগ্নি জ্বালি দেখ এবে যাজ্ঞসেনী সতি।
তোমা হিংসি কীচকের এতেক দুর্গতি।।
অপরাধমত দণ্ড পাইল দুর্মতি।
যে তোমার অপরাধী তার এই গতি।।
এই কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, "যে তোমার অপরাধী
তার এই গতি।"
আজ
ভারতের বড় দুর্দিন। কত লাঞ্ছিতা সৈরিন্ধ্রী যে আজ ঘরে ঘরে, সেদিনের সে কবি কল্পনাও করতে পারতেন কিনা জানি না। থাকলে তিনি আজ কৃষ্ণ না
ভীমকে আহ্বান জানাতেন তাও জানি না। তবু এই কথাগুলোর মধ্যে একটা আশা থাকে। একটা
ভরসা থাকে। একটা জাতের আদর্শ থাকে। সে আদর্শে যতই ধুলো জমুক, কাঁচে চিড় ধরে না। ধুলো সরালেই স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব ধরা দেয়, মনুষ্যত্বের। সব প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতি তাই সেই মানবিক প্রেম। তাই
ঈশ্বরের গোপাল রূপকে বলা হয় সাধনার শেষ পরিণাম (কথামৃত অনুযায়ী)। সব ধর্মের,
সব নীতির শেষ কথা মানবনীতি। তাই মহাকাব্য, যা
শুধু পাতায় না, যা জীবনপযাপনের ধ্রুবতারা হয়ে চির উজ্জ্বল।
No comments:
Post a Comment