সবার শেষ কথা কি বাজারে
কাটতি? বক্স অফিস হিট? এমন একটা ধারণার
বিপরীত মানে কি আঁতলামি? বলা হয় আঁতেল শব্দটা নাকি
ইন্টেলেকচ্যুয়ালের ফরাসী উচ্চারণের অপভ্রংশ। হবে হয় তো। তবে কথাটা ব্যঙ্গাত্মক এই
নিয়ে সন্দেহ নেই।
তবে যে কোনো সৃষ্টির
অনুপ্রেরণার উৎস কি হবে? বাজারের চাহিদা না নিজের
বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্কুশাঘাত? বলা শক্ত। কারণ এই দুইয়ের মধ্যে
যে বিচরণ করে সে চরিত্র। আমি কোন দিকে ঝুঁকব, কতটা ঝুঁকব আর
কেনই বা ঝুঁকব - তার মাত্রা, বিচারের ভার আমার চরিত্রর। মূল
মানসিক গঠন।
সমস্যা হল যখন ছদ্ম আঁতলামি
আর শুদ্ধ আঁতলামির মধ্যে ফারাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি আঁতলামি শব্দটাই বেছে নিলাম,
শব্দটা ব্যঙ্গের হলেও খোঁচাটা আরামদায়ক। খোঁচায় কোথাও একটা মান আছে।
ছদ্ম আঁতলামির আত্মপ্রসাদের দোকানে যে মাছি ওড়ে আর শুদ্ধ আঁতলামির রুক্ষতায় যে
মরীচিকা - এই দুইকে চিনতে শিখলেই সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু মরীচিকার ভয়ে অনেকেই
পথ বদলায়, যেন সেই চিটেগুড়ের আত্মপ্রসাদে পচন ধরবে না
কোনোদিন, এমন ভাব। মরীচিকা একদিন মিলিয়ে গিয়ে ধাঁধাঁ কাটায়,
কিন্তু সম্পৃক্ত আত্মপ্রসাদ বিকারের বেশি আর কিছু অবশেষে দিয়ে উঠতে
পারে না।
যে কারণে লিখতে বসলাম।
আমাদের লেখায় মৌলিক প্রবন্ধের অভাব। প্রবন্ধ রাজনীতি, ধর্ম,
সমাজ, খেলাধুলা, সঙ্গীত
সাহিত্য যে কোনো বিষয়ভিত্তিক হতেই পারে। কিন্তু সে ছাড়াও আরেক বিশেষ ধরণের প্রবন্ধ
হয়, যা শুধুমাত্র চিন্তার উৎকর্ষতার তাগিদেই সৃষ্টি। দর্শন
তার উচ্চতম শিখর নিঃসন্দেহে। সেখানে চিন্তার জন্যেই চিন্তা, কোনো
কিছু প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠার জন্য না। সত্যান্বেষণের তাগিদেই দুরূহ পথে এগোবার
দুঃসাহস রাখা সে পথে। মানুষ ভ্রান্তির আঁশ ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে বোধের অন্তঃকরণে প্রবেশ
করে, পথ খোঁজে, আলো দেখার প্রয়াস পায়।
সত্যতে প্রবেশ করে সত্য হয়। সৎ সাহিত্যের জন্ম হয়।
এই কথাটাই মূল - সত্য। সত্য
অর্থে আমি ইংরাজিতে যাকে ফ্যাক্ট বা বাস্তব বলতে বোঝায় তা বলছি না, সত্য বলতে আমি বোঝাতে চাইছি একটা সৎ দৃষ্টিভঙ্গী। মানুষ নিজে একটা জটিল
বহুমাত্রিক ধারাবাহিক সত্তা। এই ধারাবাহিক সত্তার মধ্যে মূলসুর খোঁজার একটা তাগিদ
থেকে জন্মায় সত্যের অন্বেষণ, শুধু বিচার দিয়ে নয়, নিজের সমস্ত অন্তঃকরণটা দিয়ে। হয়ত আমি এই অন্তঃকরণ শব্দটা দিয়ে স্বজ্ঞা বা
ইনট্যুইশান ইঙ্গিত করতে চাইছি যা অভিজ্ঞতা সঞ্জাত।
রাশিয়ায় দস্তোইয়েভস্কির 'ব্রাদার্স কারামাজোভ' এর মতন আরেকটা সৃষ্টি বিশ্বের সারা
লেখনীর ইতিহাসে বিরল। আমি বহুবার বইটার উল্লেখ করেছি, কারণ
যা কিছু পড়ার পর এই বইটার সমতুল্য কোনো ক্ষুরধার দুঃসাহসী মানবিক বিশ্লেষণের
উদাহরণ আমি আর কোনো লেখনীতে পড়ে উঠিনি আজ অবধি, পেলে অবশ্যই
স্বীকার করব।
মানুষ আর তার মন একটা অসীম
রহস্য। তার শরীরও কম কিছু নয়। সে শরীরের রহস্য উন্মোচনের দায়ভার নিয়েছে বিজ্ঞান।
মানুষের অন্তঃস্থলের সত্য উন্মোচনের দায় সাহিত্যের, ওরফে
ভাষার। ভাষা যেন দড়ি-বালতি। সেই দড়ি-বালতি কুয়োতে নামানো হবে কুয়োর কতটা গভীরে সে
যেতে পারবে সেই তাগিদ নিয়ে। সে নিয়ে আসবে শুদ্ধ জল। কিন্তু শুধু দড়ি-বালতি নামানোর
নানা কৌশল রপ্ত করে, রঙীন দড়ি আর অলঙ্কৃত বালতির মোহে কুয়োর
গভীরে যাওয়ার তাগিদকে এড়িয়ে যাওয়াটা নিতান্তই জোচ্চুরি। তাতে প্রচুর কোলাহল হয়,
প্রচুর হাততালি মেলে, প্রচুর খ্যাতি হয়,
কিন্তু কাদের সামনে? যারা একটা ঝিনুক নিয়ে
এসেছে সমুদ্রের সামনে। তাদের ঝিনুক ভরার খ্যাতিতে দিন কাটালে দিনের শেষে যা জমে তা
শুধুই ফাঁকি। অবশেষে সে ঝিনুক যায় ভেঙে, অথবা সেই স্বল্প জল
কালের মার্তণ্ডে কখন যায় শুকিয়ে। যা পড়ে থাকে তা কেবল ফাঁকি - মুখব্যাদান করে,
মহাকালের দরবারে ভিখারির বেশে। এতে মানুষের গৌরব নেই। এতে শুধু
আড়ম্বর আর সজ্জা-কৌশল আছে। যদি বলো সেও কি কম মূল্যবান, তবে
আমার কিছু বলার নেই। সে মূল্যের মূল্য দেওয়ার মত সময় বা রুচি, বিধাতা আমাদের বোধহয় দেননি। তাই বিশ্ব দরবারে নিজেদের মহিমা নিয়ে দাঁড়াতে
গেলে এত ম্লান হয়ে আসে আত্মপ্রসাদের দুর্বল শিখার তেজ আমাদের।
সত্য খোঁজার তাগিদ জীবন থেকে
আসে। কারণ জীবনটা সত্য-মিথ্যা উভয়ের নিটোল বুনন। "তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ
আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী"... কবির অন্তিম উচ্চারণ প্রায়।
সন্ন্যাসী গুহার গভীর অন্ধকারে নিজের মনের মধ্যে ডুবে যে সত্য আবিষ্কার করে আর
শেয়ার মার্কেটে দীর্ঘদিন কাটানোর পর একজন সুচতুর বিজ্ঞ বাজারের যে সত্য আবিষ্কার
করে, এই দুটোই জীবনের পক্ষে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ জীবনটা
অবিনশ্বরও নয় ঈশ্বরের মত আবার লাভ-লোকসানের তরল হিসাবও নয় বাজারের মত। তবে?
তাকে এককথায় বলতে চাওয়ার মত মূর্খামি যার যেই করুক সৎ সাহিত্য
কোনোদিন করেনি। সে দুই অতিবাদকে অর্থাৎ ত্যাগ-ভোগ এই দুইয়ের তত্ত্বকেই দূরে রেখে
নিজের চলার পথ খুঁজতে চেয়েছে, আবিলতা সরিয়ে, প্রেয়ের ঊর্দ্ধে শ্রেয়কে স্থান দিয়ে। সব সময় পারেনি, এও সত্য। তবে চেষ্টা করেছে। প্রেয় আকাঙ্ক্ষীর দল ব্যঙ্গ করেছে, বিদ্রুপ করেছে, তবু সে তার অন্তরের ঋজুতা থেকে সরে
আসতে চায়নি। কারণ সে জানে বাজারের হাওয়ার খেয়া ভাসালে হয়ত কুবের হতে পারবে
ধনে-মানে কিন্তু ধ্রুবতারার সাথে বিচ্ছেদ ঘটবে চিরকালের। মানব সভ্যতার যে
যাত্রাপথে সে চলতে চাইছে, অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার সে স্রোত
কোলাহল থেকে অনেক দুরে। নিঃশব্দ নীরব সে চলায় বিরাম টেনে নিজেকে ব্যর্থ করার কোনো
অর্থই হয় না বাজারি লাভের লোভে। অধ্যাত্ম সাধনায় মুক্তি আর বাজারে লাভ - দুই
ব্যক্তিগত। সাহিত্য সে ক্ষুদ্র সঙ্কীর্ণ ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির জন্য না। এ সিদ্ধি
সবার। তার মূল্য সত্যকারের তৃষ্ণায়। সে তৃষ্ণা জাগলে পরে তবে সে সেই তৃষ্ণা
নিবারণের আনন্দ উপলব্ধি করে। সার্থক হয় লেখক আর পাঠকের নিভৃত একান্ত আলাপন। সে
যাত্রাপথের আনন্দগান পৃথিবীর কোনো না কোনো ভাষার লেখনীতে ফুটে ওঠেই, আর সে বাজার ছাপিয়ে, কালের স্রোতে ভেসে পথিকের হাতে
আসবেই, বণিকের কাছে মূল্যহীন হয়ে। বণিকের কাছে সে নিছক
আঁতলামিই।
No comments:
Post a Comment