বিনয়ী
মানুষেরা হয় দুষ্টু মানুষ, নয় মহাপুরুষ হয়। আজ যেমন চারদিকে বিনয়ী মানুষ দেখা যাচ্ছে
তাতে বোধ হচ্ছে বিনয় এখন সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন না,
এ বলা চলে সামাজিক নির্বাচন – ইয়েস ম্যান (এখানে 'ম্যান' অর্থে সব লিঙ্গ'র কথা হচ্ছে
কিন্তু, আমাকে কেউ আবার লিঙ্গবৈষম্যকারী ঠাওরিয়েন না।)। চালাক মানুষ, শয়তান মানুষ,
দুষ্টু মানুষ – সবাই বিনয়ী। আগেকার ভিলেনদের মত কেউ জগত কাঁপিয়ে 'হা হা হা' করে হাসেন
না। তারা মিষ্টি হাসেন। মিষ্টি করে কথা বলেন। কারণ বিনয় এখন বেস্ট স্ট্র্যাটেজি। কারণ
এটা সেলসের যুগ। আপনাকে বিকোতে হবে। বিকোতে গেলে অবশ্যই আপনাকে বিনয়ী হতে হবে। গালাগাল
খেয়ে হাত কচলাতে হবে। সত্য-মিথ্যা বলে কোনো শব্দ এই নতুন শতাব্দীতে আমরা বিশ্বাস করি
না, তাই এখন তাকে সরিয়ে নতুন শব্দমালা – ইউজফুল গার্বেজ। মিথ্যা যদি 'ইউজফুল' হবে তবে
আমায় তাই-ই সত্য হিসাবে মেনে নিতে হবে, পরম সত্যও যদি অকাজের হয় তবে নির্মম হয়ে তাকে
তাড়াতে হবে।
বিনয়
তিন প্রকার – সুগন্ধী বিনয়, কেঠো বিনয়, ভ্যাদভেদে বিনয়।
১)সুগন্ধী বিনয়
----------------------
মহাপুরুষোচিত।
কেমন ব্যাখ্যা করা যাক। সাচ্চা বিনয়ের সাথে যেটা আসে সেটা হল 'অক্ষুব্ধতা'। জানিনা
এমন বাংলা হয় কিনা। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’তে একটা চমৎকার কথা আছে, “কৃষ্ণভক্ত সদা শান্ত”,
কেন? না “প্রাকৃত ক্ষোভে তার ক্ষোভ নাহি হয়”। অর্থাৎ এ বিনয় অত্যন্ত দুর্লভ। মহাপুরুষদের
জীবনীতে পড়েছি। এখানে 'মহাপুরুষ' শব্দটা একটু বলে নিই। 'মহাপুরুষ' শব্দটা আমার কাছে
হল, যে একক সত্তার মধ্যে অনেক ক্ষুদ্রসত্তা দিশা পায়। এরা তাড়িয়ে নিয়েও বেড়ায় না, চালিয়ে
নিয়েও বেড়ায় না, এরা জাগিয়ে নিয়ে সাথে ফেরে। এদের মধ্যে জন্ম থেকেই এক স্বর্গীয় আনন্দ।
যে আনন্দে মশগুল থেকেই বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজ, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি নানা সাধনায় আত্মমগ্ন
হওয়া যায়। কারণ সংসারে একে অন্যকে মগ্ন করে মানে অন্যকে চুবিয়ে নিজেকে উঁচিয়ে রাখতে
চায়। সব চাইতে কঠিন কাজ যে নিজেকে ডোবানো, সেই কঠিন 'আমি'টাকে নিয়ে মানুষ নাজেহাল।
একবার গুরুর পায়ে দেয়, একবার নেতার পায়ে দেয়, একবার শুঁড়িখানার পায়ে দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই 'আমি'টা অনেকটা সেই পিঠের নির্দিষ্ট জায়গার মত যেখানে নিজে গিয়ে চুলকানো যায় না।
কারোর সাহায্য ছাড়া সে স্থানে গিয়ে অহমিকাকুণ্ডয়ন তৃপ্তি অসম্ভব।
কিন্তু মহাপুরুষগোছের মানুষদের কথা আলাদা। এ ধরণের মানুষদের অক্ষুব্ধ চেতনা মনকে প্রসন্নতা
দেয়। ভাগবত বলেন যাকে দেখলে মন প্রসন্ন হয়, পবিত্র হয় সেই সাধু। বুঝলেন তো, এ সেই গেরুয়া
কেস নয় কিন্তু। নিতান্ত পরীক্ষামূলক কথা। এমন অক্ষুব্ধ, আত্মমগ্ন মানুষ ছাড়া সত্যি
বলতে বিনয় আর কোনো স্থলে নেই। কারণ এনারা জানেনই না এনারা কি।
নীৎজেকে
নিয়ে লিখতে গিয়ে রাসেল তার অমর গ্রন্থ 'পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস'-এ রীতিমত বকাঝকা
করেছেন নীৎজেকে। এত তোমার কিসের সিনিকের কথা বাপু? যেন দুনিয়ায় একটা বিন-মতলবী ভালো
মানুষ নেই, প্রেম নেই, শুধুমাত্র কিছু অত্যন্ত লোভী, ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের গপ্পো দিয়েই
যেন জগৎ ভরা!
বাপরে, এই সব কথা বলে, শেষে কি বলছেন শুনবেন? টুকে দিই দাঁড়ান। বুদ্ধকে নীৎজের মুখে
দাঁড় করিয়ে দিয়ে কথা বলা হচ্ছে। অ্যাঁ! বুদ্ধ কেন? আরে বুদ্ধও শূন্যবাদ, অনীশ্বরবাদের
কথা বলেছিলেন কিনা, তাই। তো কথাটা হচ্ছে, তিনি লিখছেন, মানে বার্ট্রান্ড রাসেল লিখছেন,
“Buddha
replies, ’because you love pain and your love of life is a sham. But those who
really love life would be happy as no one can be happy in the world as it is’.
For
my part, I agree with Buddha as I have imagined him. But I do not know to prove
that he is right by any arguments such as can be used in a mathematical or a
scientific question. I dislike Nietzsche becasue he likes the contempaltions of
pain, because he erects conceit into a duty, because the men whom he most
admires are conquerors, whose glory is cleverness in causing men to die. But I
think the ultimate argument against his philosophy, as against any unpleasent
but internally self-consistent ethic, lies not in an appeal to facts, but in an
appeal to the emotions. Nietzsche despises universal love; I feel it the motive
power to all that I desire as regards the world. His followers have had their
innings, but we may hope that it is coming rapidly to an end.”
তেমন
তেমন মহৎমানুষ আমি দেখেছি। কোনো কারণ নেই সুখী হওয়ার, তবু তার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ
নেইকো। সত্যি বলতে হিংসা হয়েছে। এমন সচেতন সৃষ্টিশীল জীবন আর কি হতে পারে? সৃষ্টি কি
শুধু লেখা, মূর্তিগড়া, লেকচার দেওয়া, আরো ইয়ে ইয়ে সব? না তো। সব চাইতে মধুর সৃষ্টি
এমন একটা জীবনচর্যা। সেকি আর চাইলেই হয় গা, অনেক জন্মের পুন্যি লাগে, লোকে বলে। সেই
হল গিয়ে সুগন্ধী বিনয়ী মানুষ।
২) কেঠো বিনয়
-----------------------
এ
খুব কঠিন বিনয়। এরা সত্যের প্রতি বিনীত। প্রচণ্ড বিনীত। কথা বললেই বোঝা যায়, বিনয় তপ্ত,
ফুটছে। হুলের মত বিনয়। “আমি সত্য ছাড়া বলি নে”, ঔদ্ধত্যের মত বিনয়। ভাবটা এই, সত্যের
প্রতি আমার আনুগত্যে অপারগ হয়েই বলছি, আর কোনো কারণ নেই। এই আনুগত্যের মূলেও একটা অতৃপ্তি,
ক্ষোভ। কোথাও ঈর্ষা।
সত্য
– শব্দটা অনেক সময় রূঢ় কিন্তু নিষ্ঠুর নয়। এই রূঢ়তা আর নিষ্ঠুরতার মধ্যে যে পার্থক্য
সে মনের প্রসন্নতার। শিক্ষক যখন অত্যন্ত অবাধ্য ছাত্রকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রূঢ় হন,
সে রূঢ়তা তার নিজের চিত্তের সাম্য ও প্রসন্নতা বিঘ্নের কারণ হয় না। কষ্টের কারণ হয়
বইকি। তাই "দণ্ডিতের সাথে / দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে / সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার"।
কিন্তু সে সত্য উচ্চারিত হতে গেলে চিত্তের যে মৈত্রীবোধ জন্মাতে হয় সে যদি না থাকে?
তবে শুধুই আক্রোশ।
আক্রোশ,
ঘৃণা, অপছন্দ – এই শব্দগুলো আবেগের। বড্ড একপেশে। আমাদের রাজনীতির আলোচনায় দেখেছি,
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই "যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা" গোছের মানসিকতাজাত
মন্তব্যে ছয়লাপ।
বিনয়
বুদ্ধিজাত। বুদ্ধি যখন বোধের সীমাকে পরিমাপ করতে পারে না, কিন্তু তার অস্তিত্বকে স্বীকার
করে নেয়, তখন তার মধ্যে যে বিস্ময়জনিত রূপ সৃষ্টি হয়, তাই বিনয়। বিনয় আর বিস্ময় একে
অপরকে ছেড়ে থাকতে পারে না। যেমন কপট বিনয়ের সাথে ক্ষুব্ধতা বা ঈর্ষা বা মতলব না এসে
পারে না।
৩) ভ্যাদভেদে বিনয়
---------------------------
এর
দুই ভাগ আবার। এক, মতলবীর ভ্যাদভেদে বিনয়, আর দুই, ঈর্ষাপীড়িত ক্ষুব্ধাত্মার ভ্যাদভেদে
বিনয়। একজন মতলবী, অর্থাৎ তেলু, দ্বিতীয়জন ক্ষুব্ধ, অর্থাৎ ঘ্যানঘেনে।
“তোমাদের
কতবড় ক্ষেত গো, তোমাদের গাছে কত সীম হয়েছে গো, আমাদের কথা ছাড়ো, আমরা কি আর সেই ভাগ্য
করেছি”... কিম্বা... ”এই গরীবের বাড়িতে আপনার পা পড়েছে... আমি আর কি, আপনিই সব।
এ
ধূর্তামি আর চালাকি। শ্রদ্ধা নেই, বিস্ময় নেই, প্রসন্নতা নেই। ঔদ্ধত্য আছে, উন্নাসিকতা
আছে, চূড়ান্ত আত্মতৃপ্তির সুর আছে। সাথে বিনয়ের মোড়ক। এই বিনয় বিষ। এই নিয়ে আর কি লেখার,
আজ রাজনীতি থেকে ধর্মনীতি, স্কুল-কলেজ, বাড়ি-ক্লাব এই বিনয়ের গুঁতোয় অস্থির। একেই ভদ্রতা
বলে আজকাল। যেন এই সাধনা, কতটা রপ্ত করতে পারলাম তার উপর আমার চলনশীল হয়ে ওঠা সমাজে।
স্পিনোজা
'বিনয়' শব্দটাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। ওনার মতে বিনয় হল গিয়ে 'pain
accompanied by the idea of our weaknesses, is called humility.' সেই ভালো। অন্তত
বিনয়ের অভিনয়ের চাইতে চুপ থাকা ভালো। দুর্বিনীত হওয়াটাই যে কাজের কথা তাও নয়। মাঝে
একটা জায়গা আছে নাক না গলানো, মানে চুপ করে থাকা সেই নিয়ে যদিও আমার তেমন কোনো বক্তব্য
নেই। কিন্তু মনের মধ্যে যতক্ষণ ক্ষোভজাত অশান্তি, ততক্ষণ আমার যে এই মধ্যস্থানে দাঁড়ানো
অসম্ভব, আমায় যে একটা ঘোঁট পাকাতেই হবে। যে মানুষ কোনো একজায়গায় স্থির, সৎ, স্বচ্ছ
সে-ই অমন করে কাঁদতে পারে, যা সারা পৃথিবী ISRO-তে প্রত্যক্ষ করল। এ কান্না সত্য কান্না।
প্রাণের কান্না, চেতনার কান্না। কোনো মিথ্যা প্রবোধে নিজেকে ভোলানো নয়।
মিথ্যা
সেইটাই যখন দেখছিলাম একই চন্দ্রযানের ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বপক্ষে
আর বিপক্ষে পোস্টের ঢেউ। অর্থাৎ আমরা মিথ্যার বেসাতিকেই আমাদের ক্ষুরধার বুদ্ধির উপজীব্য
বানিয়ে নিয়েছি। আমার পরিচয় হয় আমার বিরোধীতায় নয় চাটুকারিতায়। লাগাতার বিরোধিতা আর
লাগাতার চাটুকারিতা ঔদ্ধত্য আর কপট বিনয়ের নামান্তর। সে আমি সমর্পিত প্রাণ কম্যুনিস্ট
হই কি ভগবানিস্ট, সমস্যা একই, "গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে... গাড়ি চলে না।"
No comments:
Post a Comment