ঘরের কোণে একটা ওয়াশিং মেশিন পড়ে থাকত। যদি আট বছরের ধুলো সরানো
যায় তবে দেখা যাবে ওয়াশিং মেশিনটার রঙ খয়েরি। উপরে একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের কভার। সেটা
এখন স্বচ্ছ নেই। ধুলোয় খেয়েছে ওরও স্বভাব।
ওয়াশিং মেশিনটা বারান্দায়
বাথরুমের পাশে রাখা। সেখান থেকে চোদ্দো পা দক্ষিণ দিকে এগোলে শোয়ার ঘর। সকালে নতুন
চাদর পেতে গেছে আয়া। শীর্ণ শরীরটাকে টানটান করে এদিকে তাকিয়ে শুয়ে আশি ছুঁই ছুঁই
মানুষ একজন; একসময় যে গৃহকর্তা ছিল। এক চোখের ছানি কাটা
হল গেল বছর। আরেক চোখে ছানি পাকতে শুরু করেছে। মেয়ে জামাই এ বছর আসতে পারেনি,
করোনার জন্য। ছানিটাও যেন পাকতে বন্ধ হয়ে গেছে।
ওয়াশিং মেশিনের গায়ে একটা
টিকটিকি এই সকালে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যের পর আসে না। ওদিকের ডুমটা কেটে গেছে কয়েক
মাস হল। মানুষটা চশমাটা চোখের সাথে সাঁটিয়ে দেখতে চাইছে টিকটিকিটা এসেছে কিনা।
ভুরু দুটো কুঁচকানো। এই সময়টা আয়া তার ছেলের সাথে কথা বলে পাশের ঘর থেকে। ওর
স্বামী পঙ্গু। ছেলেটা সারাদিন নাকি ঘরে মা মা করে। আয়া কাঁদে মাঝে মাঝে ছেলেটার
সাথে কথা বলতে বলতে। বৃদ্ধ মানুষটাও কাঁদে। নিঃশব্দে। সংসারে কিছু কান্না অন্যের
জন্য রাখতে হয়, নইলে স্বার্থপর হয়ে যায় মানুষ।
সেবারে মেয়ে বলল, বাবা এই ওয়াশিং মেশিনটা দিয়ে দিই ইন্টারনেটে?
ওতে কি হয়?
কেউ কিনে নেবে?
ব্যবহার করা জিনিস?
হ্যাঁ বাবা
এত গরীব বেড়ে গেছে
দেশে?
উফ, তা নয়,
লোকে সাশ্রয় করতে শিখেছে। আমারও কটা টাকা হল, সেও একটা চলতি জিনিস কম দামে পেয়ে গেল।
না থাক, তোর মা শখ করে
কিনেছিল... কিন্তু ব্যবহার করতে পারল না...
তাই তো বলছি, সুমনাও তো
ব্যবহার করতে চায় না...
ও কি পারে রে ওসব...
কেন শিখে নেবে..
আর কত শিখবে... পঙ্গু
স্বামী, ছোটো ছেলেকে বাড়িতে রেখে একা একা থাকে, মাসে
একবার যায়...
সে তো অনেক চাকরি করা
মহিলারাও করে বাবা.....
কিন্তু তারা তো জানে
তাদের বাড়ির লোক বাড়িতে ভালো খায়, পরে বল.... কোথায় একটা যেন পার্থক্য... এর গলা দিয়ে
একটা পাকা মাছ এমন কাঁটা বিঁধিয়ে নামত না রে মা.... এখন বলে অভ্যাস হয়ে গেছে....
তুমি বেশি ভাবো
নাকি বেশি দেখি.....
ওই তো টিকটিকিটা এসে
গেছে, দেখতে পাচ্ছে, মানে এখন সকাল দশটা বেজেছে.... সুমনা
আজ হাসছে.... আবার হয় তো কাল কাঁদবে... যেদিন কাঁদে সেদিন তরকারিতে নুন দিতে ভুলে
গেলে কিছু বলে না মোহনকান্তি। চুপ করে গিলে ফেলে। স্বাদ তো শুধু জিভে। পেট স্বাদ
বোঝে না। ভাগ্যি, নইলে সব মানুষ বাঁচত কি করে? মানুষের শরীরের কতটুকু আর এই জিভ... কিন্তু কি দাপট!
ওয়াশিং মেশিনটা চালাব
দাদু?
ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল
বুকের মধ্যেটা.. যদি না চলে... তার মানে তো কুমকুম নেই.... একেবারেই নেই... যেন
শেষ ইচ্ছাটাও নেই... কুমকুমের ইচ্ছা... থাক...। ওর ধুলো ঝাড়তে দেয় না মোহনকান্তি।
ধুলোরা কুমকুমের চলে যাওয়ার হিসাব রাখে। মোহনকান্তি স্নানে যাওয়ার আগে ধুলোয় আঙুল
ছোঁয়ায়। ধুলোর এত গভীর স্তর। এতটা ভালোবাসা। ধুলোর গভীরে ভালোবাসার নোঙর।
সর্বনাশ হল যেদিন ভূমিকম্পে
একটা বড় চাঙড় ভেঙে পড়ল ওয়াশিং মেশিনটার উপর। পুরোনো বাড়ি। ভাঙতেই পারে। ঢাকনাটা ভেঙে
ভিতরে ঢুকে গেল। সব ধুলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একশা। ঝাঁট না দিলে তো হয় না। সুমনা
বলল, দাদু একটা টিকটিকি মরে গেছে গো ওই চাঙড়ের চাপে.. কি অবস্থা গো....
মোহন মড়া টিকটিকিটাকে
হাতে নিতে চেয়েছিল। মৃতেরাও আদর চায়। সুমনা দেয়নি। স্নান হয়ে গেছে তার যে। মোহন
খায়নি কিছু সেদিন।
চাঙড় ভাঙার চতুর্থদিন
মোহন মারা গেল। সুমনার ফোনে ফোন এল, ওরা রওনা দিয়েছে। দাহ কাজ সেরে নিতে,
অপেক্ষা না করতে। ওদের দেরি হবে আসতে। প্রাইভেট গাড়ি। অনেকটা
রাস্তা। লকডাউন না!
ফাঁকা ঘর। খাটের উপর
থেকে গদিটা তোলা। কঙ্কালের মত হাঁ করে খাটটা শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে। মৈত্রী
ওয়াশিং মেশিনটার কাছে এসে আঁতকে উঠল, একি করে হল?
সুমনা বলল, উপরের দিকে
তাকাও...
মৈত্রী চোখের কোলটা
রুমালের কোণা দিয়ে মুছে,
বলল, তোমায় বলেছিলাম না অরিত্র এ বাড়িটা
বিক্রি করতেই হবে এইবার.. আর এত ভালো একটা জিনিস কেমন পড়ে পড়ে নষ্ট হল দেখো... কোনো
মানে হয়.... বয়েস হয়ে গেলে আমরাও কি এরকম ননসেন্স সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাব?
সুমনা বাড়ি ফিরবে। কাল
থেকে নতুন কাজ। দিদিকে বলে যদি কাজটা পরের সপ্তাহ থেকে যাওয়া যায়। সুমনার আঁচলের
তলায় একটা চিরুনি, দাদু দিয়ে গেছে তাকে। দিদিমার ছিল, চিরুনির
কোণায় এখনও হাল্কা সিঁদুরের দাগ লেগে। দাদু বলে, ভালোবাসার
রঙ মেলায় না।
মৈত্রী বলল, ও কিছু নিয়ে
গেল অরিত্র?
অরিত্র হেসে বলল, নেওয়ার মত
তোমাদের এই ঐতিহাসিক বাড়িতে কিছু আছে অবশিষ্ট?
No comments:
Post a Comment