পাখিটা উড়ে গিয়ে পুকুরপাড়ের গাছটায় বসল। সন্ধ্যে হব হব। বকের
সারি ধানক্ষেতের উপর দিয়ে উড়ে গেল। একটু একটু শীত শীত করছে। এদিকটা এত ফাঁকা ফাঁকা।
শেয়াল ডাকতে শুরু করল। এ সব শুনব বলেই তো গ্রামে আসা। তবে এবারের অ্যাডভেঞ্চারটা অন্য।
আমার পিসেমশায়ের বন্ধুর ছেলে তারকদার সঙ্গে এসেছি। তারকদা কলেজ অবধি পড়েছে। অ্যাকাউন্টেন্সি
অনার্স ছিল। খুব মিশুকে। আহেরিটোলায় আমাদের বাড়িও গিয়ে থেকেছে কয়েকবার। বিশেষ করে যখন
কলকাতায় কোনো চাকরির পরীক্ষা পড়ত। আমার সঙ্গে বেশ ভালোই পটে। অল্প অল্প পানদোষ আছে
জানি, কিন্তু আমি থাকলে সঙ্গে খায় না। এমনকি বিড়িও বাইরে গিয়ে খেয়ে আসে।
ধানক্ষেতের মধ্যে একটা একচালার ঘর। টিনের চাল।
ঘরের মধ্যে একটা বড় চৌকি। দু'জনে শোয়া যায়। একটা টেবিলে জলের ফিল্টার। দেওয়ালটাও টিনের।
একদিকে আয়না আর ঘড়ি ঝোলানো। আরেকদিকে একটা মা কালীর ছবি।
আজ রাতে এখানেই থাকা। আমি আর তারকদা যখন ঘরে এসে
ঢুকলাম তখন সাতটা মত বাজে। তারকদাকে প্রায়ই রাতে এখানে থাকতে হয়। সামনে বড় বড় চারটে
পুকুর। মাছ চাষ হয়। সবই তারকদাদের। রাতে পাহারা দিতে হয়। মাঝে মাঝে অবশ্য তারকদার বাবা
চিত্তকাকুও থাকে।
চ, চালা..
তারকদা বাইরে গিয়ে বিড়ি খেয়ে এলো। আমাদের আজ সিনেমা
দেখার কথা একসাথে। ল্যাপটপটা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। দু'জনে চৌকির উপর বেশ গুছিয়ে বসলাম।
তারকদা মশা মারার ধূপ জ্বেলে দিয়েছে ঘরে। গন্ধটা খারাপ না।
সিনেমাটা হাসির - ধামাল। তারকদার দেখা হয়নি। এমনিতে
খুব যে সিনেমা টিনেমা দেখে তাও না।
সিনেমাটা অল্পক্ষণ দেখার পর বলল, দাঁড়া, মুড়ি
আর চা নিয়ে আসি।
এতক্ষণ খেয়াল করিনি, ঘরের কোনে একটা স্টোভ রাখা
আছে। আমি মোবাইল ঘাঁটতে শুরু করলাম। সিনেমা মাঝখান থেকে বন্ধ করে এটা-সেটা করা আমার
একদম পোষায় না। এরকম বেরসিকের সঙ্গে সিনেমা দেখা পোষায় না বাবা।
যা হোক। মুড়ি আর চা নিয়ে আবার শুরু করা গেল। খানিক
বাদেই শুনলাম বাইরে খস খস আওয়াজ। তারকদার দিকে তাকাতে বলল, শেয়াল। সারারাত জ্বালায়।
দরজার পাশে দেখ্ একটা লাঠি রাখা আছে। রাতে টয়লেট করতে গেলে ওটা নিয়ে যাবি।
সিনেমা শেষ হল। রাতের খাবার মা করেই পাঠিয়েছিল।
ডিম কষা আর পরোটা।
খেতে খেতে সাড়ে দশটা হল। আমাদের প্ল্যানমত আমি
আর দাদা বাইরে বেড়াতে বেরোলাম। বাইরেটা যে কি অপূর্ব লাগছে লিখে বোঝানো যাবে না! জ্যোৎস্নায়
ভেসে যাচ্ছে চারদিকে। সামনের বড় পুকুরটায় চাঁদের ছায়া ভাসছে। তড়াক তড়াক করে মাছ লাফাচ্ছে।
দূরে মাঝে মাঝেই শেয়াল ডেকে উঠছে। ভয় নেই, তারকদার হাতে লাঠি আছে, এই ভরসা।
তারকদা বলল, একটা কথা বলব? যদি পারমিশান দিস….
ধরাও…
থ্যাংক ইউ……
আমরা হাঁটছি। দূরে হাইরোড দিয়ে স্পিডে লরি যাচ্ছে।
সাঁ সাঁ করে আওয়াজে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমার মাথায় এলোমেলো নানা চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তেমন সিরিয়াস কিছু না। প্যাঁচা ডেকে উঠছে এখানে ওখানে। ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। বেশ লাগছে।
হঠাৎ একটা টিনের আওয়াজ ভেসে এলো। বড়পুকুরের ধার
থেকেই। তারকদা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারদিকটা দেখে বলল, চল, আর বাইরে না।
আমি বুঝলাম না। এদিকে যত আমাদের ঘরটার দিকে যাচ্ছি
টিনের আওয়াজটাও ততই বেড়েই যাচ্ছে। তারকদা হাঁটার স্পিড বাড়ালো। আমার হাতটা ধরে একরকম
টেনেই ঘরের মধ্যে নিয়ে ঢুকল। দরজাটা বন্ধ করে বলল, খাটে বস।
বসলাম। বললাম, ওই আওয়াজটা কিসের?
তারকদা বলল, পুকুরের ধারে বড় বড় টিনের কৌটো বাঁধা
আছে দেখেছিস তো বাঁশের সঙ্গে?
আমি বললাম, হ্যাঁ তো। ওতে দড়ি বাঁধা থাকে, দড়িতে
টান পড়লেই টিনটার সঙ্গে বাঁশের ধাক্কা হয়, তাইতে পুকুরে পাখি বসে না, মাছ খায় না। তোমার
বাবাই তো বলেছেন। জানি তো। হাওয়ায় দুলছে নিশ্চয়। বাইরে হাওয়া দিচ্ছে খেয়াল করোনি? কি
ভীতু গো তুমি?
আমি হাসার চেষ্টা করলাম। নিজেকে স্মার্ট দেখানোর
চেষ্টা করলাম। কিন্তু তারকদা সেটা পাত্তা না দিয়ে বলল, আজ বাবা তোকে আনতে বারণই করেছিল।
কেন আজ কি?
আজ খোকাদা আসে।
কে খোকাদা?
আমাদের এখানে কাজ করত। সামনে যে আমগাছটা দেখেছিস?
ওই গাছেই গলায় দড়ি দিয়ে মরে। ওর কাজ ছিল গুলতি দিয়ে পাখি তাড়ানো, আর টিন বাজানো।
বাজে বোকো না…. যত্তোসব কুসংস্কার... কেন গলায়
দড়ি দিয়েছিল?
ধার করেছিল অনেক টাকা... নিজে ব্যবসা করতে চেয়ে
ডুবেছিল….
বুঝলাম। তুমি ভেবো না বেকার। ওসব হাওয়ায় হচ্ছে।
শুয়ে পড়ো তুমি।
তুই?
আমি একটু হোয়াটস অ্যাপ করে নি... বন্ধুগুলো বড্ড
জ্বালাচ্ছে... আমাদের একটা পিকনিক ঠিক হচ্ছে সামনের রবিবার…
তারকদা শুয়ে পড়ল। আমি এটা ওটা ঘাঁটছি, শব্দটা
আবার শুরু হল। সত্যি বলতে কি টিনের এতটা আওয়াজ হওয়ার মত হাওয়া দিচ্ছে না। তবে কি কোনো
জন্তু?
আমি উঠে ধীরে ধীরে জানলার কাছে গেলাম। তারকদা
ঘুমাচ্ছে। এই ভয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল, কি করে ঘুমায় এত তাড়াতাড়? অবশ্য যা পরিশ্রম যায়!
আমি জানলাটা খুললাম ধীরে ধীরে। পুকুরটা এদিকেই।
মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে ওদিকে ফেললাম, টিনটা সত্যিই পাগলের মত ধড়াং ধড়াং আওয়াজ করে
পড়ছে। কিন্তু কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না!
আবার এসে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছে না। মোবাইলে একটা
গান চালিয়ে চোখটা বন্ধ করেছি। অল্প অল্প ঘুম আসছিল, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় জানলাটা
খুলে গেল। আমার সারা গা বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল। জানলার ওপাশে কেউ একজন এদিকে
তাকিয়েই দাঁড়িয়ে!
আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। শরীরটা অসাড়
লাগছে। পাগল-টাগল কেউ? লাঠিটাও বেশ কিছুটা দূরে। আমি চিৎ হয়ে শুয়ে। ডান দিকে জানলাটা।
হঠাৎ দেখলাম সরে গেল। কেউ নেই। বাইরেটা শুধু জ্যোৎস্নার আলো।
আমি উঠে জানলার দিকে এগোলাম। জানলাটা দিয়ে দিতে
হবে। কেউ পাগল-টাগল ছিল হবে। কিন্তু জানলাটা খোলা থাকলে আমার ঘুম আসবে না।
জানলাটা দিয়ে যেই পিছন ফিরেছি মনে হল অন্ধকারে
কেউ যেন ধাঁ করে ঘরের একদিক থেকে আরেকদিকে চলে গেল। ঘরটা অন্ধকার এখন। আমার মোবাইলটা
খাটে। আমার সারা গা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আবার জানলাটা খুলব?
আমি আবার জানলার দিকে ফিরতেই মনে হল আমার পিঠে
কেউ ঠাণ্ডা একটা হাত রাখল। ভিজে ভিজে ঠাণ্ডা একটা হাত! আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
তোর বাবার কাছ থেকেও দশ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। বাবাকে বলে দিস, আমায় যেন ক্ষমা করে।
আমি পারলাম না….
আমার জ্ঞান যখন ফিরল আমি তখন চৌকিতে। তারকদা বলল,
তুই জানলার কাছে কেন গিয়েছিলি? কিছু দেখেছিলি?
আমি কিছু বললাম না। তবে বাড়ি এসে জানলাম, মিথ্যা
বলেনি। সত্যিই দশ হাজার টাকা নিয়েছিল খোকাদা বাবার কাছ থেকে।
[ছবিঃ সুমন]

No comments:
Post a Comment