অনবরত কড়া নাড়ল, ফিরে যাবে ভাবল। ভিতরে কেউ ছিল? নাকি ছিল না। কাঁচে নাক ঠেকালো। শ্বাসের বাতাস কাঁচে ঘুরে, সব ঝাপসা করে বলল, নেই।
দূরে কুকুর
ডাকছে। জঙ্গলের ভিতর থেকে। এত গভীর জঙ্গলে একা একা দাঁড়িয়ে কেন?
রাস্তায় পায়ের ছাপ নেই। চলাফেরার নিশানা নেই। হাতলে ধুলো জমে আছে।
তবু মনে হচ্ছে কেউ আছে।
সন্ধ্যে হব হব।
আর দেরি করা যাবে না। কিন্তু এটাই তো ছিল ওদের বাড়ি। এটাই,
ভুল হয়নি। স্টেশান দূর আছে। হেঁটে তিরিশ মিনিট। হাতে আরো আধঘন্টা
সময়।
আবার দরজায় কড়া
নাড়ল। ঘরে ফেরা পাখিগুলো চীৎকার করছে। কুকুরটা জঙ্গল ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে।
ডাকছে না। লেজ নাড়াচ্ছে।
এবার ফিরতে
হবে।
========
রাস্তার বাঁক
থেকে ঘুরে তাকালো। দরজাটা খোলা না? হুড়মুড় করে দৌড়ালো। রাস্তায় পাথরে জুতোতে মস মস আওয়াজ। কুকুরটা সঙ্গে
দৌড়াচ্ছে।
দরজাটা বন্ধ।
সত্যিই বন্ধ? ঠেলা দিল। খুলে গেল।
বড় ঘরটা অন্ধকারে জুবুথুবু হয়ে বসে। ঠাণ্ডা বাড়ছে।
বাড়িতে কেউ
থাকে না। তবু যেন বারবার মনে হচ্ছে কেউ থাকে। নইলে চিঠি আসবে কেন?
ঠিকানা তো এই বাড়িরই লেখা। কতদিন পরে এলো? তিরিশ
বছর হবে।
মোবাইল অন্
করল। নেটওয়ার্ক নেই। আলোটা জ্বালালো মোবাইলের। দেওয়ালে সেই ছবিগুলো। ওই তো মাসি,
মেসো। কুকুরটা। ওই তো তার মা বাবা সে। ওই তো কাজের দিদি। ওই তো
স্কুলের গ্রুপ ছবিটা। মাসি আনিয়ে রেখেছিল। এখন কারা যেন থাকে। চিঠিটায় স্পষ্ট করে
লেখেনি। শুধু লেখা, এখানে একবার আসুন। কাজ আছে।
মাসি কি এই
বাড়ি, জমি তার নামে লিখে গেছে? কিন্তু না তো! শুনেছিল আশ্রমে দিয়ে গেছে। শুনেছিল মাসি শেষের দিকে পাগল
হয়ে গিয়েছিল। মেসো গলায় দড়ি দিয়েছিল মাসিকে খুন করে। এই বাড়িতেই। এই বাড়ি কেউ
কিনতে চায় না। তবে?
=======
আজ থাকবে। দেখি
কি হয়। বিস্কুট আর কেক আছে সঙ্গে। শুধু বাড়িতে একবার খবর দিলে হত আজ ফিরবে না।
দেরাদুনে বাড়ি। মল্লিকা চিন্তা করবে। আট বছর হয়েছে বিয়ের। বাচ্চা নেই। হবে না।
মল্লিকা চায় না। সে-ও না।
চেয়ারে বসল।
বাইরে অন্ধকার। বৃষ্টি শুরু হল। কাঁচে হাওয়ার ঝাপটা। খড়খড় করে কাঁপছে। হঠাৎ মনে হল
টয়লেটে কেউ কলটা চালালো। উঠে গিয়ে টয়লেটে যেতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল। কে যেন সিঁড়ির
উপর থেকে বলল, ইস্...!
মোবাইলের আলোটা
জ্বালল। কপালটা কেটেছে।
টয়লেটের কলটা
খোলা। ড্রপ ড্রপ জল পড়ছে।
"দাদা একটু দেখি?"
======
চমকে তাকালো। অন্ধকারে
কেউ একজন দাঁড়িয়ে। হাতে ব্যাগ।
"কলটা খারাপ। আমার আসার সময় হয়নি। দু'দিন আগেই খবর
পাঠিয়েছিলেন ম্যাডাম।"
প্রবাল চুপ।
ঘাম হচ্ছে। দরজাটা খোলা। বাইরে অন্ধকার। ঝড় শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ চমকালে বাইরের
জঙ্গলটা দেখা যাচ্ছে।
লোকটা একটা বড়
ইলেক্ট্রিক আলো নিয়ে এসেছে। টয়লেটে হাঁটু মুড়ে বসে। তার দিকে পিছন ফিরে। কলটা খুলে
ফেলেছে। কালো জল বেরোচ্ছে।
প্রবাল বলল,
আপনার নাম?
ভল্লু।
ম্যাডামকে ডাকুন। এ আজ হবে না। মার্কেটে যেতে হবে। এই দেখুন এটা খারাপ হয়ে গেছে।
এই যে তাকান।
লোকটা কাছে এসে
দাঁড়ালো। কি একটা গন্ধ বেরোচ্ছে সারা গা থেকে। চেনা গন্ধ।
হলঘরে এসে
দাঁড়ালো। ম্যাডাম… ম্যাডাম…
হাড় হিম হয়ে
গেল। মাসি নামছে। হাতে হ্যারিকেনের মত কিছু একটা।
তার পাশ দিয়ে
গেল। তার দিকে তাকালো না। ভল্লু মাসিকে বোঝাচ্ছে। হাতে কলটা ধরা। কাশির শব্দ শুনে
চমকে তাকালো প্রবাল। মেসো বসে সোফায়। মাসির দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে খেয়াল করছে না?
=====
মাসি বলছে,
এখনই লাগিয়ে দাও। এখনই। ছেলেটার কলার চেপে ধরেছে। মেসো বলছে,
ছাড়ো ছাড়ো। কি করছ? মেসো বসে বসেই বলছে। শান্ত
হয়েই।
কলের ছেলেটা
বলছে, ছাড়ুন ছাড়ুন। কি করছেন ম্যাডাম। লাগছে,
উফ্...। এই জন্যে কেউ আসে না আপনাদের বাড়িতে। কেউ না। শালা পাগলের
বাড়ি।
মেসো উঠে
দাঁড়ালো। প্রবালের পাশ দিয়ে গেল। খোলা দরজাটা দিয়ে বাইরে চলে গেল। ততক্ষণে মাসি
ছেলেটার মাথাটা দেওয়ালে চেপে ধরেছে। কি বীভৎস আওয়াজ করছে মুখে! যেন কোনো পাগল পশু।
মেসো এলো।
দরজাটা ধড়াস করে বন্ধ করে দিল। হাতে একটা লোহার রড। ভল্লু দেখেনি। প্রবাল চীৎকার
করে উঠে মেসোকে ধরতে গেল। পারল না। এগোতেই পারল না।
মেসো ভল্লুর
মাথার পিছনে লোহার রড দিয়ে প্রচণ্ড জোরে মারল। ভল্লু ছিটকে মাটিতে পড়ল। মাথাটা
ফেটে ঘিলু ছিটকে লাগল দেওয়ালে। মাসির দিকে এগোচ্ছে মেসো। মাসির মাথাতেও মারল। মাসি
সোফায় উপুড় হয়ে পড়ল। মাসিকে মেরেই যাচ্ছে এলোপাথাড়ি মেসো। পায়ে রক্ত লাগছে। গরম
রক্তের স্রোত। প্রবাল বসে পড়ল মাটিতে। মেসো উঠে যাচ্ছে দোতলায়।
====
প্রবাল
দাঁড়ালো। পা কাঁপছে। বমি হয়ে গেল। মাসির পিঠে। স্যাণ্ডুইচ। শ্বাস পড়ছে না। ভল্লুর
চোখদুটো খোলা। সে-ও শেষ। ধীরে ধীরে দোতলায় উঠল প্রবাল। মেসো স্টাডিরুমের সিলিং-এ
ঝুলছে। প্রবাল মাটিতে বসে পড়ল। মোবাইলটা অন্ করে উপুড় করে রাখল। মেসোর হিসি পড়ছে
বিছানায়। টপ টপ করে।
সিঁড়ি দিয়ে কেউ
উঠছে। প্রবালের মাথা কাজ করছে না আর।
একজন মাঝবয়েসী
লোক এসে দাঁড়ালো ঘরে। মেসোর দিকে তাকিয়ে বলল, ও গড! সরি! ছি ছি!
প্রবালের দিকে
তাকালো। কাছে এলো। উবু হয়ে প্রবালের পায়ের কাছ থেকে কিছু কুড়ালো একটা। প্রবাল দেখল
চুরুট। মেসোর।
নেমে গেল।
প্রবাল পিছনে পিছনে নামল।
ঘরে দুটো আলো
জ্বলছে। লোকটাও একটা হ্যারিকেন এনেছে সঙ্গে।
ভল্লুকে দেখল।
মাসিকে দেখল। তারপর ভল্লুকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে চলে গেল।
====
প্রবাল বসে
মাটিতে। কি হচ্ছে এগুলো?
কাঁধে হাত রাখল
কেউ।
চমকে দাঁড়ালো
প্রবাল। ভল্লু'র কাটা হাত একটা।
প্রবাল ছিটকে সরাতে গেল। পারল না।
কাটা হাতটা
আচমকা কলারটা চেপে ধরল প্রবালের। প্রবাল দেখল সামনে সামনে হাঁটছে ভল্লুর দুটো কাটা
পা। টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়ালো দুটো পা।
আরেকটা হাত
ইশারা করে ডাকল, টয়লেটের দরজা থেকে
বেরিয়ে এসে।
কলারটা খামচে
ধরে ভল্লুর কাটা হাতটা টয়েলেটে নিয়ে গেল প্রবালকে। হিঁচড়েই প্রায়। ভল্লুর কাটা
মাথা বেসিনে বসানো।
প্রবালকে দেখেই
বলল, শালা হারামি আমায় নিয়ে গিয়ে আমার বউটাকে রেপ
করল আমার বডির পাশেই শুইয়ে! তারপর কুচি কুচি করে কেটে আমায় জঙ্গলের ভিতরে একটা
কুয়োতে ফেলে এলো। আমারও দোষ আছে। আমার সঙ্গে ওর বউয়ের অ্যাফেয়ার ছিল। কিন্তু সে তো
বিয়ের আগে থেকেই। আমাদের জাত এক না। আমি ছোটোজাত বলে বিয়ে হল না।
প্রবাল দাঁড়িয়ে
দরজা ধরে। ভল্লুর কাটা পা দুটো টয়লেটের মেঝেতে শুয়ে নড়ছে। যেন কেউ পা নাড়াচ্ছে।
হাতদুটো টয়লেটের জানলার পর্দা ধরে ঝুলে।
আপনি পুলিশে
যাবেন। সব বলবেন। আর মনে রাখবেন আপনার বউয়ের লাফড়ার কথা আমি জানি। আপনিও খুন করবেন
বলে প্ল্যান করছেন আমি জানি। রণদীপ ব্যানার্জি। আপনার কলিগ ছিল। আগের অফিসের। আপনি
সুযোগ খুঁজছেন এখন। আমি আপনার সঙ্গে অনেকবার আপনার গাড়িতে গেছি। আপনার পাশে
শুয়েওছি।
প্রবালের মনে
পড়ে গেল গন্ধটা কোথায় পেয়েছে। ইদানীং গাড়িতে উঠলেই গন্ধটা পেত। কিসের বুঝত না।
আমি আপনাকে
হেল্প করব খতম করতে শালাকে। দেরাদুন আসছে সামনের রবিবার। আপনার পুণে যাওয়ার আছে।
ওরা জানে। এই সুযোগ। মুসৌরিতে উঠবে। হোটেল ডিম্পল। রুম নাম্বার তিনশো চার। আপনি
দেখে এসেছেন রুমটা। আমিও গিয়েছিলাম।.... আর যদি না শোনেন,
আমি আপনাকেই…
হঠাৎ হাতদুটো
পর্দা ছেড়ে প্রবালের গলার কাছে এসে কলার ধরে ঝুলে পড়ল।
ভল্লু বলল,
ছাড়… এখন না….
প্রবাল শূন্য
দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভল্লুর কাটা মাথার দিকে। মাথার মধ্যে রক্ত ছুটছে। মল্লিকার ঠোঁট
কামড়ে শুয়ে আছে রণদীপ ব্যানার্জি। ডান হাতটা মল্লিকার উন্মুক্ত স্তনে।
No comments:
Post a Comment