রুক্মিণী আঠারো বছর রুটি বানালো, বিক্রি
করল, মেয়েদুটোকে মানুষ করল, কেউ জানলই না যে তার বর এই দোকানের নীচেই চাপা পড়ে আছে,
বিষাক্ত তরকারি আর রুটি খেয়ে, যে রুটি রুক্মিণীরই বানানো, বিষও তারই দেওয়া।
এমনকি কৈলাস মারা যাওয়ার পর রুক্মিণী
নিজেই গিয়ে যখন থানায় জানালো বরের লাশের কথা, তখনও সবাই আশ্চর্য হল। কৈলাসের সঙ্গে
রুক্মিণীর সম্পর্কের কথা সবাই জানত। মেয়েদুটো যে রুক্মিণীর নাক চোখের সঙ্গে কৈলাসের
মুখের গড়ন পেয়েছে সেও একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। এতদিন সবাই জানত যে মদন, মানে রুক্মিণীর
স্বামী ভীষণ ধার্মিক, বৈরাগ্যের তোড়ে সংসার ছেড়েছে। রুক্মিণী জানত, আর কৈলাস জানত সে
নপুংসক। বিষ কৈলাসই এনে দিয়েছিল। মদন মারা যাওয়ার আগে বলেছিল, আমায় না মারলেই পারতিস।
রুক্মিণী তার মাথাটা কোলে নিয়ে বলেছিল, সো যাও…
=====
রুক্মিণী সুন্দরী। তবে শুধু সুন্দরী
নয়, সঙ্গে কোথাও একটা চাপা আগুনের তেজও আছে। লোহা তাপানো চোখ, দরকারে ঝলসে উঠতে দেরি
করবে না। কৈলাস লরি চালাত। সুপুরুষ চেহারা। বিয়ে করল না। রুক্মিণী চাইল না বলেই। ক'টা
মন্ত্র আর সমাজের বাঁধনে কি আছে। গনগনে আঁচে যাই দাও জ্বলে যায়। প্রেম তেমন জ্বলন্ত
হলে পাপও পুড়ে যায়। শুধু ভয়ের জল না পড়ুক, আঁচ না নিভুক। কৈলাস চায় তাকে। কৈলাসের ঘামের
গন্ধ, বুকের লোমের বিছানা, শক্ত পেশীর বন্ধনে কোথাও দাবী নেই, একটা আকুতি আছে। প্রতিবার
ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে রুক্মিণীর মনে হয় কৈলাস যেন তাকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে, সব ছাড়িয়ে।
কৈলাসের মধ্যে মুক্তি আছে। আনন্দ আছে। আর তীব্র সুখের এক ব্যথাও আছে। গনগনে আঁচে উনুনের
মাটির বুকে যে ব্যথা জাগে তেমন ব্যথা। সে ছেড়েও যেতে পারে না, ধরেও রাখতে পারে না।
শুধু পুড়ে যায়। সেই দহনেই সুখ।
=====
মদনের লাশটা যখন পুলিশ খুঁড়ে বার করার
জন্য খাট সরালো, আলমারি সরালো, রুক্মিণীর ভাঙা সংসারের জন্য ব্যথা লাগল না, ব্যথা লাগল
কৈলাসের জন্য। কত স্মৃতি!
মদন কঙ্কাল। মায়া লাগল রুক্মিণীর।
কবেই বা মানুষ ছিল! কঙ্কালই তো ছিল। চললে, কথা বললেই কি মানুষ হয়! তবে তো কুকুর-বেড়ালের
সঙ্গেও ঘর করা যায়।
পুলিশের ভ্যানে উঠে মেঝের দিকে তাকিয়ে
থাকল। দুই মেয়ে-জামাই, কেউ আসেনি। জানত আসবে না। সুখের মধ্যে ভয় বাঁচিয়ে বাস করে ওরা।
কৈলাস সবার জীবনে আসে না। যে সুখকে প্রতিদিন আগুনের তাপে সেঁকে উপার্জন করতে হয়। তখন
একটা একটা শিকল ভেঙে যায়। মানুষ বুঝতে পারে, সুখের বাইরে ভয় পেরোলে আসল সুখ। যা ঠিক
সুখ নয়, পুড়ে যাওয়া সুখ। খুব কম মানুষ এই সুখের নাগাল পায়। তারাই বেঁচে যায়। মরে বাঁচে।
=====
বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল। বছর
তিনেক পরে বড়মেয়ে এলো। বিধবা হয়ে। আগুনে পুড়ে বর, শাশুড়ি, শ্বশুর সব মরেছে। সে তার
মায়ের দোকানটা খুলতে চায়।
রুক্মিণীর মনে হল কাবেরীর দিকে তাকিয়ে,
সে যেন অন্য মানুষ, অপরিচিত। তার নিজের কেউ নয়। আসলে এত এগিয়ে গেছে সে তার অতীত থেকে!
বিচারক যখন তার শাস্তি ঘোষণা করল, খারাপ লেগেছিল, মনে হল কৈলাস কষ্ট পাবে। ফাঁসি হলে
হয় তো কৈলাস সুখী হত। তাকে পেত। কিন্তু কষ্ট পায়নি কৈলাস। সেদিন রাতে কৈলাস জেলের গারদের
বাইরে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল ঠিকই আছে, ভয়ের কিছু নেই। কৈলাস তারই থাকবে। জেলের বাইরে,
ভিতরে কি পার্থক্য? গারদ মানুষের বানানো। আইন মানুষের বানানো। ভালোবাসা আকাশ, নদী,
পাহাড় আর জঙ্গলের বানানো। কৈলাস জেলের বাইরে বসে বসে তার লরি চালানোর গল্প বলে। কত
নতুন নতুন ঘটনার কথা বলে। একবার লরি অ্যাক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পড়েছিল সারারাত। কেউ
আসেনি। সবাই ভেবেছিল মরে গেছে। শেষে এক ভিখারি এসে চোখেমুখে জল দেয়। তার ছেঁড়া ঝোলা
থেকে একটা আধখাওয়া কোল্ড্রিংক্স বার করে খাওয়ায়। তারপর সে-ই তাকে হাস্পাতালে নিয়ে যায়।
কৈলাস তাকে হাস্পাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে খুঁজেছিল, পায়নি। সেদিন থেকে সে জানে ঈশ্বর চাইলে
কিভাবে যে রাখে! রুক্মিণীকেও ঈশ্বরই রাখবে। একদিন সে জেলের বাইরে যাবে সে। কিন্তু কি
করবে? রুক্মিণী প্রশ্ন করে। কৈলাস হাসে।
দোকানটা কাবেরীকে দিয়ে দিল। কাবেরী
খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে এখন। ছিঁড়ে খাবে লোকে। ছেলে আছে একটা কাবেরীর, অমিতাভ। রুক্মিণী
বোঝালো কাবেরীকে, তোর তো একটা ছেলে আছে, মানুষ কর তাকে, ভেঙে কেন পড়বি?
বলল বটে, কিন্তু, জানে কাবেরী সে ধাতুতে
গড়া না। তার একটা অবলম্বন লাগবে, বাঁচতে। লতার মত। অবলম্বনের করুণায় বাঁচাকে এদের জাতের
মেয়েরা ভাবে ভালোবাসা। ঝড় উঠলে যখন অবলম্বন ভেঙে যায়, আরেকটা খোঁজে। এরা কাউকে না ভালোবাসে,
না ভালোবাসা পায় কারোর। ভালোবাসা মানে এরা ভাবে বাঁচার কৌশল।
তাই হল। কাবেরী এক মাতালের সঙ্গে ঘর
বাঁধল। মার খেলো। চোখের নীচে কালশিটে পড়ল। পিঠে দাগ পড়ল। কি আশ্চর্য, চোখেমুখে সেই
আগের উদভ্রান্ত ভাবটা উড়ে গেল। মার খাক, যাই খাক, অবলম্বন তো পেয়েছে।
=====
কাবেরীকে আসতে বারণ করে দিল রুক্মিণী।
তাকে দেখলে তার বিরক্ত লাগে। কৈলাস আর তার মেয়ে এত দুর্বল হয় কি করে!
অবশ্য কাবেরীও আসতে পারত না বেশিদিন।
মাকে কেমন পাগল পাগল লাগত তার। কথা বলতে বলতে উদাস হত। হেসে উঠত খিলখিল করে। বলত রোজ
নাকি কৈলাস আঙ্কেল দেখা করতে আসে তার সঙ্গে। কৈলাস নামের সঙ্গে কাবেরীর আর তার বোন
সুলেখার একটা বিরক্তি মিশ্রিত প্রশ্রয় জড়িয়ে। তাই যখনই কৈলাসের নাম শুনত কাবেরী আর
সুলেখার মনে হত যেন এমন একটা বাড়িতে তারা আছে যার দেওয়াল নেই, কিন্তু ছাদ আছে।
=====
রুক্মিণীকে সবাই এড়িয়ে চলে। তাকে এখন
জেলে না, হোমে রাখা হয়েছে। একে তাকে আঁচড়ে, কামড়ে দেয়। সবাই তাকে কৈলাসের নাম করে রাগায়,
বিরক্ত করে। তার পেটে নাকি কৈলাসের বাচ্চা। সবাই বলে। খেপায়।
এরপর গল্প কিছু নেই তেমন। রুক্মিণীকে
দেখতে হোমে কাবেরী, সুলেখা এসেছে। রুক্মিণী চিনতে পারেনি। তাকায়ওনি। একবার বমির 'ওক'
টেনেছে শুধু।
রুক্মিণী শাস্তির মেয়াদ ফুরানোর আগেই
মারা গেল। যখন দাহ করা হচ্ছিল পরিবারের কেউ আসেনি। জানানোও হয়নি কাউকে।
কাবেরী তার ছেলের বিয়ের কথা মাকে জানাতে
গিয়ে জেনেছিল মা নেই। কেঁদেছিল। শান্তিতে।
বাড়ি ফিরে বাবা আর মায়ের ছবি টাঙাতে
গিয়েছিল। প্রতিশোধ নিতে মায়ের উপর, কৈলাস আঙ্কেলের উপর। মদনের ছবিটা মায়ের ট্রাঙ্কে
পেয়েছিল। কিন্তু ছবিটা টাঙানোর দু'দিন পরেই ভেঙে যায়। কাবেরী ভয়ে পেয়ে দুটো ছবিই পুড়িয়ে
দেয়।
দোকানটা চলেনি আর। এখন একটা বন্ধ স্তূপ
হয়ে আছে। লোকে বলে রাতে নাকি মাঝে মাঝেই কান্না, হাসির আওয়াজ পাওয়া যায়। গরম রুটি সেঁকার
ঘ্রাণ আসে। কেউ যায় না। শুধু এই শীতে লোকে দেখল পাড়ার হলুদ ঘেয়ো কুকুরটা চারটে বাচ্চা
দিয়েছে দোকানের মধ্যে। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে থাকে দোকানে। কেউ সামনে গেলেই ঘড়ঘড় করে রাগ
দেখায়। লোকে বলে রুক্মিণীর মেজাজ পেয়েছে।
No comments:
Post a Comment