গোটা রাত
কেটে গেল একা। একার মধ্যে এলে তুমি। কে তুমি? আমার জ্বরে পোড়া
কপালে হাত রাখলে। আমার অস্থির শরীরের মধ্যে এসে বললে, ঠিক
হয়ে যাবে। বুকের মধ্যে তখন হাপর পেটানো শব্দ। কে তুমি?
বললাম… গ্লানি… পাঁকে ডুবে যাচ্ছি…..
তুমি বললে, তাই তো এলাম… কোথায় পাঁক? তাকাও…..
চোখ মেলেছ যখন…. তখনই জানি আসতে হবে আমায়….
=====
বাইরে তখন
রোদ। আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। টলোমলো শরীর। ধূ ধূ করছে বালি বালি চারদিক। কই তুমি?
কোনো উত্তর
নেই। আকাশ নীল। বাতাসে ঠাণ্ডা অনুভব। রোদ চড়তেই গরম বাড়বে। জানি।
কেউ নেই।
দূর-দূরান্ত কেউ নেই। হাঁটতে শুরু করলাম। বালির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে পা। কত দূর যেতে
হবে? কেন যাচ্ছি? কোথায় যাচ্ছি? আমায় টানছ তুমি। তোমায় চিনব কি করে? এই যে আমি
রাস্তায়। আমি জানি তুমি জানো। এই যে আমি উৎকণ্ঠায়, তবু তাকে
ঘিরে প্রশান্তি। আমি আসছি।
=====
ঝড় উঠল।
দাঁড়িয়ে পড়লাম। ঝড় এলো কোনদিক থেকে? এখন কি আমার ঝড়ের
দরকার ছিল? এখন কি আমার সমস্ত শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার দরকার
ছিল? তুমি জানো। নইলে এত বড় ঝড় কেন? তুমি
জানো, নিশ্চয়ই জানো। এই যে আমি। এই যে আমি কিচ্ছু দেখতে
পাচ্ছি না কোনোদিকে কিছু। এখন কি আমার অন্ধ হওয়ার দরকার ছিল? তুমি জানো।
=====
ঝড়ে রাস্তা
হারিয়ে গেল। এ কোথায় এসে পড়লাম। কি রুক্ষ চারদিক। কি বীভৎস চারদিক। শিকার চলছে, এ ওকে, তাকে। অত্যাচার চলছে। আর্তনাদে কান ফেটে
যাচ্ছে আমার। যে কোনো মুহূর্তে একটা ধারালো ফলায় আমার মাথাটা ধড় থেকে নেমে যেতে
পারে। আমার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে দিয়েও তুমি যাও? এই রাস্তা দিয়ে? তোমার কানে এই আর্তনাদ, এই বীভৎসতা বাজে? তোমায় আমি বুঝি না। আমি আমাকেও
বুঝি না। প্রতিদিন তোমার আর আমার একটা করে গিঁট খুঁজে পাই। ধরতে গেলে মিলিয়ে যায়।
জমাতে গেলে হারিয়ে যায়। তবু তুমি থেকে যাও। আমি থেকে যাই।
উফ! আমার
বুকের মধ্যে দেখো…. এই দেখো…. তীর বিঁধল….
উফ কি রক্ত… কি রক্ত…. দেখছ….
আমার কি এর দরকার ছিল? নিশ্চয়ই ছিল…. ও মাগো… মাথার পিছনে কে আঘাত করল একটা…. এ আঘাতেরও দরকার ছিল? ছিল? নিশ্চয়ই
ছিল, নইলে পাঠাবে কেন তুমি? আমি কুঁকড়ে
যাচ্ছি। তীরের ফলাটা আমার হৃৎপিণ্ডটাকে বাঁদিকে ছেদ করে বেরিয়ে গেছে। রক্তের নদী।
ভেসে যাচ্ছে। তুমি যদি চাও সে বয়ে যাক। নিশ্চয়ই দরকার আছে। নিশ্চয়ই আমাকে নিংড়ে
দুমড়ে মুচড়ে ফেলার দরকার আছে। আমায় ছেড়ে যেও না। অভিযোগের হাতে একলা রেখে আমায়
ছেড়ে যেও না। আমি রক্তাক্ত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে তছনছ হয়ে যেতে রাজী আছি…কিন্তু অভিযোগের পর অভিযোগের তুষে হাত পা জ্বলিয়ে বসে থাকতে রাজী নই। আমি
বরং চলি।
======
আমার হৃৎপিণ্ডের
আধখানা তীরবিদ্ধ পড়ে থাকল। থাক। নিশ্চয়ই দরকার ছিল। আমার সারা পিঠ, বুক, পেট, হাত পা ছিদ্রে
ছিদ্রে ভরে গিয়েছে। মাথাটার অর্ধেক ঢাকনা খোলা। তুমি চেয়েছ নিশ্চয়ই? হয় তো এসবেরই দরকার ছিল।
আমার
সর্বস্ব জুড়ে ব্যথা শুধু। শুধু যন্ত্রণা। এক আকাশ তারার নীচে শুয়ে আছি। মাটিতে।
অন্ধকারে। শুনছি আশেপাশে কোনো নদীর আওয়াজ। কুলকুল করে জল বয়ে যাওয়ার শব্দ। আমার
সমস্ত ব্যথার মধ্যে আরাম জাগছে। আঘাতে আঘাতে শতছিদ্র শরীর আমার। সে পথে সে নদীর জল
ঢুকছে। মাটি ঢুকছে। আমি বুনোফুলের গন্ধ পাচ্ছি আমার সারাটা শরীর জুড়ে। আমার আধখানা
হৃৎপিণ্ডের খাঁজে জমেছে জল। তারার আলো এসে পড়েছে সে জলে। আমার দৃষ্টি অল্প অল্প
স্বচ্ছ হচ্ছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছে আমার ডানে-বাঁয়ে-পায়ের তলার দিকে- মাথার দিকে-
আমার বুকের উপরে-পিঠের নীচে… সব দিকে তুমি দাঁড়িয়ে আছ। সব দিক
নিয়ে। আমি তাকিয়ে নেই। তবু সব দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তুমি যেন কিছু বলছ…
ওঠো… আরো আরো রাস্তা বাকি….
=====
আমার সবটুকু
শান্তি বাতাসে ভাসিয়ে আমি আবার রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমার চারদিকে আবার সেই ধূ ধূ
মরুভূমি। কেউ কোত্থাও নেই। আমার শতছিদ্র শরীর, আধখানা হৃৎপিণ্ড,
আর অর্ধেক ঢাকনা খোলা মাথা নিয়ে আমি হাঁটছি। এ হাঁটার শেষ নেই
যতক্ষণ না শতছিদ্র সহস্র ছিদ্র হয়…. যতক্ষণ না…. আমি…..
সেখানে শব্দ
যায় না। বাক্য যায় না। অনুভব যায় না। অনুভব করবে কে?
আমি জানি
সবটুকুর দরকার ছিল। নইলে এ বড় মহাশূন্যে এত কোলাহল কেন? সমস্ত অর্থহীনতার শেষে এক যুগান্তব্যপী নিরবচ্ছিন্ন চেতনার বিন্দু বিন্দু
ক্ষরণ কেন? সবটুকুর দরকার ছিল বলেই না!
No comments:
Post a Comment