কোভিডের
কারণে যখন সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করা হল তখনও অভিব্যক্তি বাদ গিয়েছিল। আমি হাউমাউ করে
এটা সেটা লিখেছিলাম। যা হোক, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে আবার ডারউইন
ফিরে এসেছেন। শান্তি!
রিচার্ড
ডকিন্স, জ্যান্ত বিজ্ঞানী, মেলা বইপত্র নিয়ে
ঘাঁটাঘাঁটি করেন, ধর্ম নিয়ে তর্কবিতর্ক করেন, খোঁচাটোঁচা মারেন, তিনি একটা বড় প্রোগ্রাম করেছিলেন
স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে ডারউইনের ক্রমবিবর্তন তত্ত্ব বোঝানোর জন্য। আমাদের স্কুলের
না, অগো দেশের। তাদের স্কুলে অভিব্যক্তি তত্ত্ব পড়ানো হয় না
কারণ ক্যাথলিক পণ্ডিতেরা আপত্তি করেন। তো গ্যালাপাগোস দ্বীপে নিয়ে গিয়ে টিয়ে
ডকিন্স সাহেব বাচ্চাদের হাতে করে প্রমাণ করাতে সচেষ্ট হলেন যে, দেখ ভাই এসব ঘটনা আদতে ঘটেছিল।
তারা বুঝল
কি বুঝল না জানি না, অন্তরের কথা আর ক্যামেরার কথা কি এক দাদা?
তো ডকিন্সের মাথা ঘাড়েই থাকল। ডারউইন ডারউইনেই থাকল। আজকাল আর
ক্যাথলিকেরা অমন ব্রুনো, গ্যালিলিও-র মত করে না। আপত্তি
জানায় এত অবধিই। যেমন অ্যাবর্সান, কণ্ডোম নিয়ে জানিয়েছিল।
কিন্তু ঘাড়ে কোপ মারাটারা হয় না। সে সব তারা মোটামুটি ছেড়েছে বড় অংশে। কোনো গলিঘুঁজিতে
কি হয় সে আমি জানি না অবশ্য।
=====
এই যে গোটা
ফরাসী বিপ্লব ঘটল, তখন হচ্ছিলটা কি? একবার
রাজার হাত ধরে ক্যাথলিকের পণ্ডিতেরা, আবার ক্যাথলিক
পণ্ডিতদের হাত ধরে রাজারা। মোদ্দাকথা সাধারণ মানুষদের নাজেহাল করে দিচ্ছিল। একদম
পুজোপাঠ করবে না, আর পুজোপাঠ করতেই হবে…. এই দুটোই তো বড় বালাই। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে দুই পক্ষই এসেছে। আছে। এ
বলে, ধর্ম না করলে প্যাঁদাব। ও বলে, ধর্মের
নাম শুনলে প্যাঁদাব। উফ্..., মানুষের উপর এ তো গা জোয়ারি কি
ভালো?
কিন্তু কথা
হচ্ছে ভারতে তো অমন ধারা কোনোদিন ছিল না বাপ! চার্বাক, বেদান্তী, বৌদ্ধ, জৈন সব
একসঙ্গে ছিল, আছে, থাকবেও। এই
বুদ্ধগয়ার কথাই ধরো না কেন। বুদ্ধগয়া আর গয়া, কয়েক কিলোমিটার
দূরত্ব। বুদ্ধ বলল, ঈশ্বর নাই, আত্মা
নাই, কিস্যু নাই। ওদিকে গয়াতেই দেখ, লোকে
আত্মা আছে জেনে তাদের পিণ্ডি দিচ্ছে। এই বিশ্বের একজন পিতা আছে এমন বিশ্বাস করে বিষ্ণুর
পাদচিহ্নে প্রণাম জানাচ্ছে। ঐতিহাসিক বলবে, ওটা বুদ্ধের পা।
আর হলই না হয়, ভাগবতে বুদ্ধকেও তো করুণাবতার করে আপন করে
নিয়েছে নাকি? তবে? আবার কাশী আর
সারনাথ। পাশাপাশি। এক কেস। এদিকে আদিদেব মহাদেব। অটো চড়ে কিছুদূর যাও, বুদ্ধের দর্শন। প্রথম ধর্মচক্র শুরু হল যেখান থেকে। তবে? কই কেউ তো ভাই মারামারি করে না? আবার কিছুদূর যাও,
পরেশনাথ। জৈন মন্দির। তিনিও ঈশ্বর আছেন বলেন টলেন না। বলেন, তুমি অনেকান্তবাদী হও না কেন। মানে এক সত্যকে অনেকভাবে দেখো না কেন?
=====
এট্টু
জ্ঞানের কথা বলব? ধরো একটা অসীম আয়না আছে। তো হল কি, তাতে যদি প্রতিবিম্ব না পড়ে তুমি বুঝবে কি ওখানে একটা আয়না আছে? তেমনই আমাদের যে চেতনায় এত বড় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ছবিছায়া পড়ছে, তবেই যে না জানি একটা চেতনা বলে বস্তু আছে! কান্ট সাহেব তাঁর সুকঠিন,
সুবিশাল গ্রন্থে কেমন গাঁট্টা মেরে মেরে আমাদের এ সব কথা বুঝিয়েছেন!
তো আমাদের আত্মা আছে নেই তত্ত্বটাও অমন। কঠিন হল? মেলা কঠিন।
মায় গীতাতেও বাসুদেব বলে বসলেন, আচ্ছা ভাই যদি আত্মা নাও
থাকে, তবু কর্তব্য তো আছে! তুমি ভাই উঠে যুদ্ধুটা করে নাও না
কেন? এমনকি শুরু থেকে শেষ অবধি অনেকবার বুদ্ধির শরণে গিয়ে
কাজ করার পরামর্শও দিয়েছেন। মায় পুরো গীতাটা বলে নিজের বোধগম্যি অনুযায়ী কাজ করতেও
বলেছেন। রামকৃষ্ণদেব যেমন বলতেন, আমি বলে রাখলাম, তুমি এবার ল্যাজামুড়া বাদ দিয়ে নিও তোমার মত করে।
=====
উদার হও, ভায়া উদার হও। ধর্ম চিত্তবৃত্তির ব্যাপার, বিজ্ঞান
বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপার। চিত্তবৃত্তিকে ইনটুইশানও বলতে পারো, বিবেকবুদ্ধিও
বলতে পারো। তুমি যদি চোখ খুলেই মুসলমান, খেষ্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি এইসব দেখো, তবে তো বুঝতে হবে তোমার
শাস্ত্রজ্ঞানই হয়নি ঠিক করে। গীতা বলছে যে, সত্যিকারের
তত্ত্বদর্শী সে বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন পণ্ডিত, কুকুরে, হাতিতেই কোনো পার্থক্য দেখে না, আর তোমরা মানুষে
মানুষের এত ভেদ টানো? জানো না ওগুলো মত! চিত্তবৃত্তি অনুযায়ী
মানুষ দু'প্রকার হয়, এক পাষণ্ড,
আর এক বিবেকী। এর বাইরে সব ভাগ অশাস্ত্রীয়। ভালো করে পড়ো। তোমার কোন
পুরাণে কি লেখা আছে সে প্রামাণ্য নয়। এ কথা বিবেকানন্দ, রাধাকৃষ্ণাণ
প্রমুখ বহু পণ্ডিতে বলেননি? তুমি কোথা থেকে সব অদ্ভুত তত্ত্ব
আবিষ্কার করছ!
দেখো আধুনিক
কালের বিজ্ঞানী কালাম সাহেব থেকে ক'দিন আগের রবি ঠাকুর,
মহাত্মা, সুভাষ, রাধাকৃষ্ণাণ
ইত্যাদি ধর্মকে যে আলোতে দেখেছেন সেই আলোতেই দেখো না বাপ আমার!
ধরো একজন
সুপণ্ডিত শারীরবিদ্যার বিজ্ঞানী কি চিকিৎসক। তিনি যখন কোনো মানুষকে সামাজিকভাবে, আত্মিকভাবে ভালোবাসেন, তখন কি সেই শারীরিকজ্ঞান নিয়ে
ভালোবাসেন? মানে তার কোলে নাতি এসে বসলে কি তিনি ভাবেন,
আহা একটি নানা কোষ-কলা সমৃদ্ধ, নানা
তন্ত্রযুক্ত একটি সচল জীব আসিয়া আমার অঙ্কে উপস্থিত হইল? ভাবেন?
ভাবেন না। অন্তত সুস্থ স্বাভাবিক হলে ভাবেন না। কারণ সেটি তার
চিত্তবৃত্তির জায়গা। কিন্তু তিনিই যখন নাতির পিঠে ফোঁড়া দেখবেন, তখন আবার বুদ্ধিবৃত্তিকে অবলম্বন করবেন। তখন নাতি কাঁদলেও আপাতভাবে তার
ভালোর জন্যেই কঠিন হবেন। এই তো জীবন দাদারা!
এখন দেখুন
সব কিছুরই একটা সঙ্কীর্ণ ব্যাখ্যা আছে, আবার উদার ব্যাখ্যাও
আছে। বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেই যেমন বিজ্ঞানী, এ সংকীর্ণ
অর্থে। তেমন গলায় কণ্ঠি, তিলক মানেই বৈষ্ণব। কিন্তু উদার
অর্থে বৈজ্ঞানিক আর সঠিক বৈষ্ণব দুটো আলাদা তত্ত্ব। সত্যের অন্বেষণে একান্ত
অনুরাগী বুদ্ধিবৃত্তি, আর তৃণাদপি সুনীচেন চিত্তবৃত্তি দুই-ই
বিরল এ সংসারে। ডারউইন সিলেবাসে থাকুক চাই না থাকুক, বোর্ডের
প্রশ্নপত্র আর নানাবিধ চাকুরির প্রশ্নপত্র কিসে আগ্রহী ছাত্রছাত্রী সমাজের বৃহদংশ
তাতেই আগ্রহী।
অবশেষে বলি, ওহে অল্পদর্শী সিলেবাস জনক-জননীরা, তোমাদের
আহাম্মকিতে খাঁটি ধর্ম, খাঁটি বিজ্ঞান কারোরই ক্ষতি নাই
অন্তত আজকের এই ইন্টারনেটের যুগে। জ্ঞান এখন আগ্রহ নির্ভর। সুযোগ অর্থ নির্ভর তত
নহে। জ্ঞান কৌলিন্য ত্যাগ করিয়া সবারে গ্রহণ করিতেছে। তোমরা এটা-সেটা বাদ দিয়া
নিজেদের বাতিল করিবার প্রয়াসে লাগিয়াছ। ইহাই উপসংহার।
No comments:
Post a Comment