সেদিনও এরকম মেঘলা ছিল…. হয় তো বর্ষাকাল
হবে… আমি পড়ে ফিরছি… রেলের হাস্পাতালটা পেরিয়েই বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছ… তার মাথার উপর
কালো মেঘের ছায়া..গাছটা ফুলে ভর্তি…. কি যে অপূর্ব লাগছে….
ফার্স্ট এভিনিউয়ের মোড়ে দেখলাম জটলা…
রেললাইনের ধারে নাকি বডি পাওয়া গেছে একটা…
সাইকেল থেকে নামলাম… বেশ কয়েকটা পরিচিত
মুখ…. দেখলাম এড়িয়ে যাচ্ছে…. নাকি ঘাবড়ে ভীষণ…
দুটো পা দেখলাম… টান টান, অল্প বয়েসী
ছেলে…
আমি আর এগোলাম না…. ভয় লেগেছিল হয়
তো…
======
বাড়ি এসে দেখলাম বাড়ির পরিবেশ বেশ
থমথমে। মা খেতে দিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে টিভি চালালেন। যেটা মা করেন না। এই সময়ে রুটিন
বকাঝকা, খোঁজখবর নেওয়া ইত্যাদি করেন। আমারও এই সময়ে আবদার, বায়নার লিস্টি শোনানোর সময়।
আজ হল না। বাবার অফিস থেকে ফেরার সময় হয়নি এখনও। এই সময়টা পড়ন্ত বিকেলের রোদ আমাদের
রেলের কোয়াটার্সের কাঠের জাফরি ভেদ করে চাকাচাকা বরফির মত ডাইনিং হলের মেঝের উপর পড়ে
থাকে। আজ নেই। আজ ভীষণ অন্ধকার। ঝড় উঠল। সঙ্গে বৃষ্টি। আমার মনে হল পা দুটো ভিজে যাচ্ছে
নিশ্চয়। ওকি ল্যাংটো ছিল? সব লাশ কি ল্যাংটো হয়?
=======
খানিকবাদে জানলাম ঘটনাটা। আমাদের বাড়ি
যে কাজ করে, তার ছোটোছেলে। বেশ কিছুদিন থেকে নিখোঁজ ছিল। ওরকম প্রায়ই হত। নেশাটেশা
করত। বদসঙ্গে মিশত। ক্লাস সেভেন অবধি পড়েছে। প্রায়ই নিখোঁজ থাকত বলে কেউ খোঁজ করেনি
এবারও। ওর মা মাঝে মাঝে মায়ের কাছে কান্নাকাটি করত, এটা ওটা রেগে বলত, শুনেছি। আমি
তাকে দেখিনি কখনও। আজ পা দুটো দেখলাম। মৃত।
=====
হিরি প্রায় এক সপ্তাহ বাদে কাজে এসেছিল
মনে আছে। মা সাধারণত যে কাজগুলো করেন না, হিরিই করে, মাকে সেগুলো করতে দেখে আমার একটু
অস্বস্তি হত… মাকে সাহায্য করা আর পড়ায় ফাঁকি দেওয়া… এই দুই কারণেই মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা
করতাম… কিছু করে দেব?
"আমি না পারলে বলব…..",
মায়ের উত্তর ছিল।
মা রোজই পেরেছিলেন। আমার ফাঁকি দেওয়া
বা সাহায্য করা কোনোটাই হয়ে ওঠেনি….
হিরি এলো যথারীতি সকালেই, আমার স্কুলে
যাওয়ার আগে।
=====
প্রথমে কোনো কথা বলল না। আমাদের কারোর
দিকে তাকালো না। আমার স্নান হয়ে গেছে। স্কুলের ইউনিফর্ম পরছি। বাবা অফিসে। হিরি চৌবাচ্চার
কাছে বসে বাসন মাজছে।
======
আমার খাওয়া শেষ। মা হিরিকে রান্নাঘরের
সামনে খেতে দিয়েছে… আমি বাইরের দরজার সামনে সিঁড়ির উপর বসে জুতো পরছি…. কেটসের অতগুলো
ফিতেকে শুরু থেকে শেষ অবধি টানটান করে বাঁধতে আমার বরাবর বেগ পেতে হত।
হঠাৎ হিরির কান্নার আওয়াজ পেলাম।
যেখানে আমি বসেছিলাম সেখান থেকে বসার
ঘর পেরিয়ে রান্নাঘর সোজা দেখা যায়। মা পিঁড়িতে বসে, মায়ের হাঁটুর উপর মাথা রেখে হিরি
ফোঁপাচ্ছে….. আর বলছে….
"বৌদি বুকের দুধ খাইয়ে বড় করসি….
দশমাস প্যাটে ধরসি…. কুকুরবেড়ালগুলো দ্যাখেন দুধগুলো প্যাটের কাসে দিসে ভগবান (পেটের
কাছে)... ওদের তাই অত মায়াটায়া নাই.… জন্মালো… খেল… ক'টা বাঁচল…ক'টা মরল… তাও ওরা দুদিন
হলেও কাঁদে.. তারপর সয়ে যায়… ওরা পারে…আমরা তো মানুষ বৌদি…..আমাদের এই বুকে..এইখ্যানে
দুধ দেসে ভগবান… এই বুকের থেকে রক্ত ছেঁসে ছেঁসে দুধ খাইয়ে বড় করতে হয়…চোর ডাকাত যাই
হোক….ভোলা যায়?!….আমি তো মা!!……"
আমি ব্যাগটা নিয়ে সাইকেল নিয়ে রাস্তায়
এসে দাঁড়ালাম। এখান থেকেও হিরির গলা শোনা যাচ্ছে।
======
সেদিন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম,
কুকুর বেড়াল গরু…সবার স্তন পেটের কাছে… মানুষেরই বুকের কাছে…. আগে ভাবিনি এভাবে… আমারও
অল্প অল্প কান্না পাচ্ছে। মায়ের কান্না দেখে? জানি না। আমি সাইকেল চালালাম না। ইচ্ছা
করছে না। আমার হারকিউলিস ক্যাপ্টেন লাল সাইকেলের সামনের চাকার হাওয়াটা খুলে বার করে
দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে যাব। অনেক সময় আছে।
=====
এ ঘটনাটা অনেকদিন, অনেকবার মনে পড়েছে।
আজও পড়ে। হিরির কান্না। মায়ের অসহায়তা। সব মনে পড়ে। সেদিন অস্পষ্টভাবে জেনেছিলাম, আজ
অনেক স্পষ্টভাবে জানি, ভালোবাসার কোনো অথোরিটি হয় না। সত্যের কোনো অথোরিটি হয় না। মানুষকে
অকারণে জাজ করতে গেলে মানুষের অনেকটা বাইরে পড়ে থাকে। খাঁটি অনেকটা।
হিরি বেশিদিন কাজ করেনি আর। দিল্লি
চলে গিয়েছিল কোনো পরিবারের সঙ্গে, চব্বিশঘন্টার কাজের লোক হয়ে।
আজ হিরি বেঁচে আছে কিনা জানি না, এতবড়
অতিমারী কাটিয়ে। কিন্তু সেদিন হিরি আমাকে একটা বড় শিক্ষা দিয়েছিল, একটা বড় বোধ… সত্যের
কোনো অথোরিটি নেই… ভালোবাসারও কোনো অথোরিটি নেই যে বলে দেবে এটা ঠিক, আর এটা ভুল। সেদিনে
তার কান ফাটানো কান্নার চাইতে সত্যি কিছু না। কিচ্ছু না। সবল প্রাণ কোনো কিছুরই অথোরিটি
চায় না। সে নিজেই নিজের অথোরিটি।
No comments:
Post a Comment