Sunday, May 7, 2023

চাতাল, সাত সকাল

এত সকালে জলখাবার করলে দিদি?

আজ ছেলেটা কলকাতা যাবে গো

একজন বয়স্কা মহিলা, কলের তলায় বাসন মাজছে, আরেকজন ওর চেয়ে অল্পবয়েসি মহিলা গঙ্গার ধারে সিঁড়ির উপর বসে কথা বলছে। দুজনেই বিধবা। সামনে মা কালীর মন্দির, রাধাকৃষ্ণের মন্দির।

আর বোলো নাএই সাত সকালে ছেলেটা বেরোবেজলখাবার করে আজ মন্দিরের কাজে লাগতে অনেক দেরি হয়ে যাবেএমনিতেই রবিবারভিড় বেশি….

তাই তো দেখছি

মন্দির থেকে মা বললেন, কাল খিচুড়িতে নুন বেশি দিয়েছিলি

বাসন মাজতে মাজতে সে বলল, আমার ছেলে খেতে পারে না অমন আলুনি…. জানোই তো….

মা বললেন, টাকা বাড়ানোর কথা বলেছিলি এদের? তোর ওষুধের যা খরচ….

সিঁড়িতে বসা মহিলা বলল, আর বললেই বা কে শুনছে মা…. এই বুড়ো হাভাতে পুরুষগুলোর গুমর দেখো নানড়তে চড়তে বারো মাসরেঁধে মুখের সামনে না ধরলে পেটে পিত্তি পড়ে মরবেতাও…..

মা বললেন, আরে ধীরে বলইনি ঘুমাচ্ছেনউঠলেই আবার শুরু করবেন….

বাসন মাজতে মাজতে মহিলা বলল, আমার মড়াটা আজ কি করছে গো? শরীর ছাড়া ইস্তক তো যা ডানা গজিয়েছে….

মা বললেন, ধুরআজকাল আর অত খেয়াল রাখি না…. এদিক বল, ওদিক বলমনের কারখানা রে…. সে শরীর থাকুক চাই না থাকুকএই দেখ নানথটা দেখকবে থেকে বাঁকা পরিয়ে রেখেছে…. সোজা করে পরাবার কথা মনে থাকে এদের?... উপরের ঝাড়লণ্ঠনটা দেখ…. জন্মের ঝুল পড়ে….

তুমি বা একটু গতর খাটিয়ে ঠিক করে নাও না কেন মা? তোমাকেও বলিহারি যাই…. সিঁড়িতে বসা মহিলা বলল।

মা বললেন, খেপেচিসএকটু ওসব দেখালে এখানে এমন ভিড় লাগাবে যে তোর বাসন মাজতে মাজতে কোমর খসে যাবে…. আর তোর এই তল্লাটে আসা ঘুচে যাবেচারদিকে পাহারায় পাহারায় আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে রেখে দেবে…. মা নিজের নথ নিজে বদলেছেন…. নিজের ঝুল নিজে ঝেড়েছেনএমন প্রচার লাগাবে যে ইনি আমায় কৈলাসেও আর ঢুকতে দেবেন না…. বলবেন যাও গিয়ে সেলিব্রিটি হয়ে থাকো…. জানিস তো…. আজকাল…. হুজুগ তুললেই সব হত্যে দিয়ে এসে পড়বে….

তা মা সবাই যায়ই বা কোথায় বলো…. বাসনগুলো ঝাঁকায় রাখতে রাখতে বলল

আহা যাবে না কেনআসবে আসুককিন্তু আমায় একটা সোজা কথা বল অন্যকে শান্তি দিতে না চাইলে কেউ নিজে শান্তি পায়?....

=====

ছেলে বেরিয়ে গেল। দুই মহিলা বসল মন্দিরের চাতালে।

মা বললেন, ছেলে তো প্রেম করছে….

বাসন মাজা মহিলা বলল, জানি তো। নিয়ে এসেছিল নাও.. সেদিন তো তুমি ভীষণ ব্যস্ত…. পয়লা বৈশাখ ছিল….

হঠাৎ তারস্বরে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে একজন মহিলা ঢুকল। কপালে বিরাট সিঁদুরের টিপ। স্থূল শরীর ঘেমেনেয়ে একশা।

"মা গো…. ডাকাত সব এক একটাডাকাতএই মিষ্টি নাকি পঞ্চাশ টাকা নিলবলি তোমায় প্রণামীই বা কি দেব…. আর ফেরার টোটোভাড়া…. মাগো মা…."

কপালটা সিঁড়িতে ঠুকতে ঠুকতে সে মহিলা বসে পড়ে বলল, এখনও পুরুত আসেনি গো….

বাসন মাজা মহিলা বললেন, না নাআরো আধঘন্টা

মা বললেন, একটু বসে ঠান্ডা হ আগে….

সে বলল, আর ঠান্ডা হকাল তোমার জামাই মাল খেয়ে এসে…. উফ শ্বশুরে জামাইয়ে যা মিল গো মা….

মা বললেন, দেব এক থাপ্পড়বাবাকে নিয়ে ওসব বলাউনি একটু খান ওসবকিন্তু আমায় অসম্মান করতে কবে দেখলি….

সিঁড়িতে বসা মহিলা বললতা ঠিক গোতারপর ঘুরে আগের প্রসঙ্গে ফিরে বলল...... তা দিদি তোমার হবু বউমা কেমন?...

বাসন মাজা মহিলা বলল, ওই যেমন হয় আর কি…. ভালোই….

শ্যামসুন্দরের মন্দির থেকে শ্রীরাধা বলে উঠলেনইসতাই না তাইও তোমার ছেলেকে খুবই ভালোবাসে…. দেখো ভালোই সংসার করবে….

বাসনমাজা মহিলা বলল, তুমি থামো রাইদিদি…. নিজে সংসার করলে বুঝতে…. ও আগে থেকে কিছুই বলা যায় না গো…. শ্যামের বাঁশিতে ডুবে আছ সেই ভালো….

শ্রীরাধিকা বললেন, তুমি ডোবোনি?

=======

বাসনমাজা মহিলা হাতের উপর হাতটা রেখে বলল, ছিল একজন জানো…. আমার দাদার বন্ধু

শ্রীরাধা বললেন, তারপর?

সবাই কি আর জাতের বাইরে যায় গোমুসলমান ছিল….. বাড়িতে বললে কচুকাটা করে দিত…..

শ্রীরাধা বললেন, আর তোমাদের?

স্থূল মহিলা বলল, না রাইদিদিআমার ওসব হয়টয়নিপনেরোতেই বাবা একজনের গলায় ঝুলিয়ে দিলেনসেই থেকে আমি তেনাকে ধরে ঝুলে আছিআর তিনি আমাকে ধরে কুমড়োর মত গড়াচ্ছেন…. একে যদি প্রেম বলো তো প্রেম….

সিঁড়িতে বসা মহিলা বলল, আমার একবার প্রেম হল জানোআমার মাসির ছেলের সঙ্গে…. সে শালার আমার হৃদয়ের থেকে হৃদয়ের খোসার উপর ছুঁকছুঁক ছিল বেশি…. আমি ভাবতুম এই বুঝি প্রেমতখন অল্প বয়সখারাপও লাগত না…. কিন্তু মনে একটা ধন্দ লাগত ব্যাটা আমার কথা তো শোনে নাখালি ফাঁকা ঘর খোঁজার ধান্দাবলি প্রেম কি হাগামোতা যে রাতদিন নির্জনে করতে হবে…. একদিন যেই একটু বেশি এগিয়েছে দিলুম খামচে….

স্থূল মহিলা বলল, কি দিদি?

বাসনমাজা মহিলা বলল, অ্যাইকি সব অসভ্যতা হচ্ছে….?

স্থূল মহিলা বলল, তেনারা রসে মুখ ডুবিয়ে খেয়ে গেলে দোষ নেই….. আমি মুখে শুধু বললেই অসভ্যতা…..

শ্রীরাধা বললেন, বুঝেছিপ্রেম মানে আসলে বোঝোইনি তোমরা….

তিনজনে একসঙ্গে বলে উঠল….. থাক থাক রাইদিদিও তোমার প্রেম বুঝে আমাদের কাজ নেই…. বৃন্দাবনে তুমি পাও প্রেমআমাদের হনুমান সামলাতে সামলাতে প্রাণ যায়কেন তোর চশমাটা নিয়ে গেল মনে নেই…. (বাসন মাজা মহিলা সিঁড়িতে বসা মহিলাকে বলল)..... আমাদের একটু মানইজ্জত নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারলেই হল গোশুধু এইটুকু আশীর্বাদ কোরো…. তবেই হবে…. সুখ চাই না গোএকটু স্বস্তি হলেই হয়

======

অ্যাইঅ্যাইমন্দিরে বসে কি গুলতানি হচ্ছে?

স্থূল মহিলা বলল, এই যেএখন আসার সময় হলআর গুলতানি কি দেখছেন? গল্প করছি….

পুরোহিত বলল, গল্প আমার ঢের জানা আছে…. সব পরনিন্দা পরচর্চাতাও মন্দিরে বসে….

স্থূল মহিলা বলল, ঢং রাখো ঠাকুরতোমরা চাট্টি রাজনীতি, খেলা, সিনেমা নাটক নভেল নিয়ে চর্চা করলে ওটা খুব ঠিক চর্চা হয়ওগুলোও পরচর্চা…. আর আমরা যে এই পরনিন্দা পরচর্চা দিয়ে সংসারের কত নোংরা ন্যাতাকাতা থুপে থুপে পরিষ্কার করি সে তো বুঝতে হয় না…. সংসারের অলিতে-গলিতে ঢুকেই দেখো না…. আপসে সব বেরোবে….

মন্দিরের মা বললেন, রাখ তোএদের বোঝানো….

শ্রীরাধা বললেন, তোমরা ভালো থেকো…. মা যদি আশীর্বাদ হয়আমি চিত্তের অনির্বচনীয় সুখমনে রেখো….

স্থূল মহিলা বলল, তোমরা আমাদের প্রণাম নিওএই জ্ঞান থাকতে থাকতেভুলচুক ক্ষমা কোরোআর কি যে মনে থাকবে আর থাকবে না সে হলফ করে কি বলি রাইদিদি…. হয় তো বিছানায় হেগেমুতে পড়ে থাকলামনিজের নামই হয়ত মনে নেইতা তোমাদেরতবে ওপারে এলে আমরা চিনতে না পারলেও তোমরা চিনে নিও…. আর কি বলি

মা বললেন, যা তোরাও ওঠআমি মন্তর শুনি…. আর শোন…. ফেরার টোটো পেয়ে যাবি…. তোদের পাড়ার নরেন…. ও ফাঁকা আসবে এদিকেতোকে নিয়ে নেবে….

স্থূল মহিলা বলল, মা আর লোক পেলে নাও তো যা ছোঁচা

শ্রীরাধা বললেন, তোমায় চায় বুঝি….

সিঁড়িতে বসা মহিলা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বললে, অ্যাই রাইদিদিচুপকি হচ্ছে….

বাসনমাজা মহিলা বলল, যা যা মর মর..

শ্রীরাধা বললেন, বালাইষাট!

No comments:

Post a Comment