ঠিক তখনও
ভোর হয়নি। আলো ফোটেনি। তবু ঘুম তো নেই। ঘরের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে তারা ছাদের
অন্ধকারে এসে দাঁড়ালো।
রাস্তা
ফাঁকা। কুকুরগুলো ঘুমাচ্ছে। সাইকেলের দোকান, মুদির দোকান,
ইস্ত্রির দোকান.... সব বন্ধ। তারা আকাশের দিকে তাকালো। মেঘ। গুমোট।
কি করবে এখন?
তারা নামতা
বলতে শুরু করল। দশের ঘরের পর, এগারো অবধি পারবে জানত। তারপর আর
এগোলো না। গুন করে করে এগোতে লাগল। কিন্তু বাধা এলো। রাস্তায় কে দাঁড়িয়ে?
একটা লোক।
লুঙ্গি পরা। খালি গা। তাকে ইশারায় ডাকছে। হাত নাড়ছে। তারা চেনে না। নাকি চেনে, চশমাটা আনতে ইচ্ছা করছে না।
তারা ছাদের
অন্যদিকে এসে দাঁড়ালো। এদিকে পুকুর। তার ওপারে স্কুলের খেলার মাঠ। পাঁচিল দেওয়া।
তারা আবার
নামতা পড়তে শুরু করল। কিন্তু আবার ধাক্কা খেল, এবার তেরোতে।
অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ না?
দৌড়ে গেল।
সামনের গলির ভিতর থেকে লোকজন বাইরে আসছে। স্ট্রেচার নিয়ে দুজন গলিতে ঢুকে গেল। কে
ডাকছিল? নিমাইদা? পরেশদা? সুজন?
বলাইদা?
তারা ছাদে
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, দু-চারটে কুকুর জমা
হয়েছে রাস্তায়। কয়েকটা বাড়ি আলো জ্বালালো। পর্দা সরিয়ে দেখল। তারা অন্ধকারের দিকে
সরে এলো। কাঁঠাল গাছটার আড়ালে। ইঁচড় হয়ে রয়েছে, চারটে। কাল
থাক, রবিবার পাড়বে। মেয়ে-জামাই আসবে।
স্ট্রেচারে
একজন মহিলা শুয়ে মনে হল। কে? পরমা? রাণীদি?
কাকলি? জয়ন্তী? ঘোষ
কাকিমা?
চশমা নেই।
ঝাপসা। তবু ইচ্ছা করছে না। চোখটা জ্বালা জ্বালা করছে। ঘুম আসবে এবার।
সিঁড়ির
দরজাটা টেনে দিয়ে, শিকল লাগিয়ে দিয়ে নামছে। অ্যাম্বুলেন্সটা
যাচ্ছে। আওয়াজটা বুক খালি করে। কয়েকটা বাইকের আওয়াজ পেলো। বুবুনের মা? সঞ্চারীর মা? অঞ্জুর কাকিমা?
পাশে
ঘুমাচ্ছে, খোকন, স্বামী। মুদির দোকান তাদের। অনেক
পুরোনো।
তারা হাই
তুলল। চোখ জুড়ে ঘুম আসছে। কাল সকালে খোঁজ পাবে। রত্না এলেই পাবে।
মাথার মধ্যে
একটা শব্দ হচ্ছে। কলিংবেলের। কেউ যেন দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। কেউ যেন স্ট্রেচারটা
ধরতে বলছে। কেউ যেন বলছে, কাকিমা তোমার কাছে একটা পুরোনো নাইটি হবে?
মায়েরগুলো ছেঁড়া... হাস্পাতালে... বুঝছই তো.... কাকিমা এক হাজার
টাকা হবে.... মাস পড়লেই দিয়ে দেব..... জানলার গারদের ওপারে কারা যেন ফিসফিস করে
কথা বলছে। সে জেগে গেলেই কথা বলবে। চশমাটা কোথায়? কারোর মুখ
দেখা যাচ্ছে না কেন?
"এই ওঠো... চা... এই...."
রোদ এসে ঘরে
দৌরাত্ম শুরু করেছে। আটটা কুড়ি।
শোনো রত্না
আসবে না। ওর মায়ের রাতে স্ট্রোক। ওর বাবা নাকি তোমায় দেখেছিল ছাদে.... রাতে.... আমি
ফুল তুলতে গিয়েছিলাম.... মানিক বলল..... তুমি অত রাতে ছাদে কি করছিলে?
রত্না আসবে
না? হ্যাঁ গো.... এতগুলো বাসন.... এর মধ্যে অন্তরা আর সুকান্ত
আসবে.....
না করে দেব?
ছি ছি... ইয়ার্কি
মেরো না.... খুব সিরিয়াস?....
সে কি করে
বলব....
হুম.... আচ্ছা
দাঁড়াও.... ফোনটা আর চশমাটা দাও তো.....
হ্যালো... এই
অঞ্জনাদি.... বলছি তুমি একটু শ্যামলীকে বলবে গো আমাদের বাড়ি...... হবে না, না? আর কেউ আছে তোমার চেনা?... আমি? অত রাতে ছাদে? আরে মালখোর
একটা... কি দেখতে কি দেখেছে.... নইলে নিজের মেয়েকে কেউ ওরম বিয়ে দেয়... মেয়েটা
কদিন সংসার করল.... হ্যাঁ গো...রত্নার কথাই বলছি..... না না.... কে দেখেছে?
ছাদে? আমাকে? না না... সব
ঠিক আছে.... কি? সামনে এসে বলুক আমাকে.... জানি না গো.... এত
সময়ই বা পায় কি করে...... আচ্ছা রাখি বুঝলে....
"অ্যাই... রত্নার বাবা এসেছেন।" খোকন বলল, যেন
পায়েসে মুখ দেওয়া বেড়াল জানলা ডিঙিয়ে আবার এসেছে।
তারার বুকটা
ধক্ করে উঠল। বলল, কি বলছে?
খোকন বলল, জানি না.... যাও গিয়ে শোনো... তোমার শরীরের খোঁজ করছিল... তুমি নাকি
ছাদে.....
তারা বলল, তুমি ওনাকে ডাকো.... আমি চায়ের জল বসাই....
খোকন বলল, এখানে?
তারা বলল, হ্যাঁ.... আর আজকে একটা ইঁচড় কেটে এনো তো..... একা একা কি রাঁধবে খাবে... একটু
পাঠিয়ে দিলে হবে.....
তারা চা
বসালো। চায়ের জলটা ফুটছে। হাল্কা লাগছে কোথাও। আবার অস্বস্তিও। কোনটা ভালো? তারা বাসনগুলোর দিকে তাকালো। কান্না পাচ্ছে। তবু হাল্কা লাগছে। চা পাতা
দিল। ভালো পাতা। সিটিসি না। চিনি খান? চিনির কৌটে চামচ আটকে।
দ্বিধায়। জিজ্ঞাসা করবে, না দিয়ে দেবে। এক চামচ?
No comments:
Post a Comment