মাটির নীচে শুয়ে পড়লে আর কেউ বয়সের
হিসাব রাখে না। যে সাতাত্তর বছর চারমাস পনেরো দিনের মাথায় তেরো দিনের কোমা কাটিয়ে মাটির
নীচে শুয়ে পড়ল, তার বয়েস মাটির উপরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিলে হত আজ বিরাশি।
মাটির উপরে বসে যে প্রৌঢ়, সে তার একমাত্র
পুত্রসন্তান। গীতবিতান কোলে বসে আছে, ছাতা খোলা, এক হাতে ধরা। ফুল রাখা মাটির উপর বানানো
সমাধিতে। সমাধির চারধার ঘিরে জমেছে শেওলা। সবুজ।
আজ বাইশে শ্রাবণ। সে মানুষটার শেষদিন।
রবীন্দ্রনাথ গোটা রচনাবলী সরিয়ে শুধু গীতবিতান নিয়ে দেখা করতে আসতেন বাবার সঙ্গে। আসলে
সে রবীন্দ্রনাথ না। মায়ের গানের শিক্ষক। বাবার ছোটোবেলার বন্ধু। প্রৌঢ় মানুষটা সেদিন
বালক।
======
বাবাকে প্রতি বাইশে শ্রাবণ গান শোনায়।
বাবার খুব অভিমান ছিল। আজীবন। মা চলে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। পরে জেনেছিল সে
রবীন্দ্রনাথ নয়, অসীম মিত্র। কলেজে পড়ান। গান তার নেশা। মায়েরও নেশা ধরেছিল। গানে,
গলায়, মানুষটায়। বাবার সঙ্গে থাকতে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল। বাবা দেখাননি।
সে নিজেই দেখেছিল, বাবার ফাইলে। প্রেসক্রিপশনের ফাইলে। তখন সে কলেজে পড়ে। মা মারা গেছেন
ওভারিয়ান ক্যান্সারে, পাটনায়। তাদের বাড়ি কলকাতায়। উত্তরে।
বাবার নেশা ধরল গানের। তার গলা ভালো।
গান গায় হেমন্ত, দেবব্রত, সাগর সেনকে নকল করে। না, বাবা বলেন, অনুকরণ করে। বাবা মায়ের
নেশা অনুকরণ করেন। মা হিন্দু হয়ে মারা গেলেন। তারা খ্রীশ্চান। বাবার ঠাকুর্দা ব্রাহ্ম
হওয়ার পর খ্রীশ্চান হয়েছিলেন। ঠাকুর্দার হাতের লেখা দেখেছে সে। ডায়েরির পাতায় লেখা,
ভগবান মানে ভালোবাসা, আলো, ক্ষমা।
বাবা শিখতে চেয়েছেন আজীবন, নিজেকে
নিরুত্তাপ, উদাসীন রাখার। তবু ক্ষোভ, রাগ, ঈর্ষার অন্ধকার এসেছে। বাবা বাগানে পায়চারি
করেছেন। লোহার জং ধরা নক্সা কাটা চেয়ারটায় বসে বসে পা দুলিয়েছেন। বারবার দুটো হাতকে
কোলের উপর, মাথার উপর, ঘাড়ের পিছনে রেখেছেন। অবশেষে জিতে ঘরে এসেছেন। বাবুকে, মানে
ছেলেকে গান গাইতে বলেছেন, পিয়ানো বাজিয়ে, ঠাকুমার পিয়ানো। ঠাকুমা চিত্রাঙ্গদা হতেন।
সুরূপা, কুরূপা দুই-ই গাইতেন। দারুণ নাকি ছিল গলা। শ্যামা রিহার্সালের দিন ঠাকুমার
সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। কয়েক ঘন্টার মধ্যে সব শেষ।
======
আজ বেশ বৃষ্টি। পরিতোষ ঘড়িটা দেখল,
দম দেওয়া হয়নি। বন্ধ। গতকাল রাতের উত্তেজনায় ভুলে গেছে। বাবার প্রিয় গান, যা পেয়েছি
প্রথম দিনে…. দেবব্রত'র মত করে গাইতে গেল। হয়নি। নিজের মত হয়ে গেল। ভালো হল না। নিজের
মত করে গাইলে ভালো হয় না। বাবা নিশ্চয়ই ভুরু দুটো কুঁচকে মাটির নীচে শুয়ে। ভালো না
লাগলে বাবা ভুরু দুটোকে কুঁচকে রাখত। দুটো ভুরু যেন হাত ধরাধরি করে গল্প করত।
বৃষ্টি বাড়ল।
======
একবার বাবার চেম্বারে উঁকি মেরে দেখেছিল
পরিতোষ, বিকু পিসির খোলা বুক। বিকু পিসির কাঁধটা জড়িয়ে, বাঁদিকের স্তনে চুমু খাচ্ছে
বাবা। নাকি স্তনপান করছে? বাবার চেম্বারে একজন মেমের ছবি আছে, চেয়ারে বসে কোলে বাচ্চা
নিয়ে স্তনপান করাচ্ছে। বিকু পিসি বাবার ঘোরানো চেয়ারটায় বসে। বাবা দাঁড়িয়ে।
বিকু পিসি তাদের বাড়ি রান্না করত।
মাঝে মাঝে বিকেলে বাবার স্টাডিতে দু'কাপ চা নিয়ে ঢুকত। বাড়ি চলে যাওয়ার পর সে গিয়ে
দেখেছে দু'কাপ ঠাণ্ডা চা রান্নাঘরে সিঙ্কের পাশে রাখা। কাল এসে মাজবে বিকু পিসি।
মাঝে মাঝেই স্টাডিরুম থেকে বাবার গলা
পেত সে। বাবা রবীন্দ্রনাথের গান শোনাচ্ছে বিকু পিসিকে। বাবার গলায় সুর ছিল না। জোর
ছিল। পরিতোষকে সবাই ডাকত তখন বাবলু বলে। বাবলু ছাদে চলে আসত। তার বুকের মধ্যে একটা
কাঠবেড়ালি লাফাতো। বারবার জিজ্ঞাসা করত, পালিয়ে যাবি? চ…. চ…. মায়ের কাছে যাবি?
যেত না। যায়নি কোনোদিন। মায়ের ফোন
আসত। দু-একটা কথা বলে রেখে দিত। ভয় করত। নিজেকে।
বিকু পিসি বাবার জন্মদিনে সারপ্রাইজ
দিল। কেক বানিয়ে না, সে তো প্রত্যেক বছরই বানাতো। রবীন্দ্রনাথের গান শুনিয়ে --- আলোকের
এই ঝরণাধারায় ধুইয়ে দাও। গলায় সুর আছে। কিন্তু ভুল সব লাইন গেয়ে গেল। বাবা মুগ্ধ হয়ে
শুনল। তার দিকে তাকালো না। তারা দু'জনেই জানে বিকু পিসি ভুল গাইছে। বাবা এক টুকরো কেক
নিজে কামড়ে বিকু পিসির ঠোঁটে গুঁজে দিল। আবার কাঠবেড়ালিটা লাফালো বাবলুর বুকে। বলল,
যাবি। রাতের ট্রেন। যাবি? চ।
======
বিকু পিসির বর আর পুণেতে কাজ করবে
না। চলে এলো। বিকু পিসিও কাজ ছাড়ল। বাবা রুগী দেখার সময় বাড়িয়ে দিল। বাবলু ক্রমে পরিতোষ
হয়ে যাচ্ছে তখন। বুকের ভিতর কাঠবেড়ালিটা আর নেই। তার শূন্য কোটরে শুধু ভালোবাসার বীজ
ভরতি। কারোর হাতে তুলে দেবে। তাকে বলবে একটা বাগান বানিয়ে দাও।
পরিতোষের জটিল এক স্নায়ুর রোগ ধরা
পড়ল। এতে মারা যাবে না সে এখনই। কিন্তু স্বাভাবিক বাঁচবেও না। পরিতোষ সব বীজ শূন্যে
ছড়িয়ে দিল। যাক যেদিকে খুশী।
বাবা চলে যাওয়ার পর পরিতোষ নিজেকে
শেষ করে দিতেই পারত। ভেবেওছিল। কিন্তু পারেনি। বাবা বড্ড একা হয়ে যাবে। বাবাকে সারা
জীবন ছেড়ে যায়নি সে আর রবীন্দ্রনাথ। সেও যদি চলে যায় বাবাকে গান শোনাবে কে? বাবা তার
কাছ থেকে আজীবন শুধু এইটুকুই তো চেয়েছিল। সব মিলিয়ে হয়তো চব্বিশটা রবীন্দ্রনাথের গান
শুনত। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এইগুলোই তো। একবার বলেছিল, জানিস বাবলু, বাইশে শ্রাবণ আসলে রবীন্দ্রনাথের
জন্মদিন। কারণ সেদিন থেকেই তো আমরা গোটা মানুষটাকে দেখতে পেলাম। এ মাথা ও মাথা - স্পষ্ট।
বুঝলাম রবীন্দ্রনাথ মানে কি। কতটা বিস্তারিত। কতটা গভীর।
======
বিকু পিসি মেয়ে নিয়ে একা থাকে। হাওড়ায়।
তার বর জেলে। নিজের মেয়েকে বিক্রি করতে গিয়েছিল নেশার টাকা জোগাড় করতে না পেরে।
বাবা মারা যাওয়ার দিন বিকু পিসি এসেছিল।
বাবার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসেছিল। শরীর ভেঙে গেছে। সেদিন পরিতোষের মনে হয়েছিল বাবাকে
যদি একবার জড়িয়ে ধরে বিকু পিসি। বাবা উঠে বসবে। না হয় ভুল লাইনে রবীন্দ্রনাথের গান
গাইবে। গাক্। সুরটাই তো আসল। বাবাও কি তাই চায় না?
======
বৃষ্টিতে ভিজে একটা বক এসে বসেছে একটা
বিশাল গাছের ডালে। দু'বার গা ঝাড়া দিয়ে তাকালো যেদিকে বাবা শুয়ে, ভিজে মাটির নীচে।
পরিতোষের মনে হল, রবীন্দ্রনাথ এসে বসেছেন। নইল অমন শ্বেতশুভ্র রঙ হয়! পরিতোষ ছাতাটা
বন্ধ করে, গীতবিতানটা আর চশমা প্লাস্টিকে ভরে, ব্যাগে ঢুকিয়ে, গাছটার নীচে এসে দাঁড়ালো।
যেন অসীম আকাশ থেকে সজল হাতে রবীন্দ্রনাথ ছুঁচ্ছেন তাকে। তার গালে ভিজে আঙুল ছুঁইয়ে
বলছেন, নির্মোহ হ। আকাশের নীলের মত। সব নিয়ে সব ছেড়ে ভেসে যা।
"বাবলু!"
চমকে তাকালো ঘুরে পরিতোষ। চশমা নেই।
তায় জলে ঝাপসা চোখ। তবু মনে হল, বিকু পিসি দাঁড়িয়ে।
পরিতোষ বলল, "তুমি? সব ঠিক আছে?"
বলতে ব্যাগ খুলে চশমাটা বার করল। পরল। বিকু পিসির সিঁথিতে সিঁদুর নেই।
বিকু পিসি তার জিভ জড়িয়ে যাওয়া কথা
বুঝে গেল। হঠাৎ তার হাতটা ধরে বলল, আমার মেয়ে আজ বাইশে শ্রাবণে গাইবে রেডিওতে। আমি
তোমার বাবাকে শোনাব? যদি অনুমতি দাও……
অনুষ্ঠান দেরি আছে। বিকু পিসি আর সে
চুপ করে বসে। বৃষ্টি ধরে আসছে। মেঘ কেটে যাচ্ছে।
রেডিওতে নাম ঘোষণা হল। অনুরাধা ঘোষ।
"সমুখে শান্তি পারাবার".... একটা লাইনও ভুল নেই। বিকু পিসি মুখে আঁচলটা চেপে
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পরিতোষ দেখল ডালে বসা সাদা বকটার গায়ে পড়েছে পশ্চিমে ঢলে পড়া
সূর্যের আলো। যেন ভোরের আলো।
No comments:
Post a Comment