Showing posts with label কান্তাচার্য্য. Show all posts
Showing posts with label কান্তাচার্য্য. Show all posts

Saturday, May 16, 2020

বিমল আনন্দে জাগো রে


টুপ টুপ করে সারা জঙ্গল জুড়ে যেন ভালোবাসা ঝরে পড়ছে। ভোরে উঠে সরু নদীর পাড়ে বসে থাকা কান্তাচার্য্য’র আজ মনটা প্রসন্ন। এমন প্রসন্ন মন কদাচিৎ হয়। এ যেন বৈশাখের ভোরের ঠান্ডা হাওয়ার প্রসন্নতা। কান্তাচার্য্য গাইছেন, “বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া...।” কান্তাচার্য্য একলা বেড়াতে এসেছেন।

       আকাশটা মেঘলা। কান্তা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমায় এমন মেঘের মত ভালোবাসা দাও, আমার মনের সমস্ত আকাশ জুড়ে থাকুক এমন একটা ভালোবাসা। আমার বাকি ভালোবাসাগুলো সে ভালোবাসায় আশ্রয় পাক!
       কান্তাচার্য্য নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে। স্বচ্ছ জল। নদীর বুকের মধ্যে পাথরের ছোটো-বড় নুড়ি, মাছেদের চলাচল – সব দেখা যাচ্ছে। কান্তাচার্য্য বলল, আমার বুকের মধ্যে এমন স্বচ্ছ চেতনা নদী হোক। সব কিছু যেন স্পষ্ট দেখি – নিজেকে, অন্যকে...
       কান্তাচার্য্য’র বুকে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের জট ছিল। কান্তা মনটাকে এলোপাথাড়ি খুঁজে ফেলল। কোত্থাও পেল না। ভালোবাসা জন্মালে প্রশ্ন জন্মায় না। ভালোবাসা মানে গলে যাওয়া। ভালোবাসা মানে ফুলের উপর প্রজাপতি এসে বসা – পরাগসংযোগ হওয়া। ভালোবাসা মানে তুলোর মত উড়ে যাওয়া – এমন হালকা হওয়া। কান্তা ক্লান্ত হল না আজ। নইলে সারাটাদিন মনের সাথে লড়াই করে ক্লান্ত হয়ে যায়। সেও ভালো লাগে। সবার লড়াই কি আর বাইরের জগতে, বাইরের শত্রুর সাথে? নিজের মধ্যে যে কত বৈরিতা! আত্মবৈরিতা – নিজের সাথে নিজের শত্রুতা।
       কান্তা শর্ট প্যান্টটা শুধু পরে, বাকি জামাপ্যান্ট পাড়ে রেখে নদীতে নেমে গেল। নদীর মধ্যে গিয়ে বসল। কি স্রোত! কি টান! কান্তা’র নাভি অবধি ডুবে নদীতে। কান্তা পদ্মাসনে বসে। “ওগো আমায় ভালোবাসা দাও। ওগো আমায় শুদ্ধ ভালোবাসা দাও। যে ভালোবাসা শুদ্ধের প্রতি সেই তো শুদ্ধ ভালোবাসা। যেমন আগুনকে ভালোবেসে মানুষ আগুন হয়, জলকে ভালোবেসে মানুষ জল হয়, তেমন শুদ্ধকে ভালোবেসে মানুষ শুদ্ধ হয়। ওগো শুদ্ধ স্নিগ্ধ মানুষেরা, আমার ভালোবাসা নাও। আমার সমস্ত ভালোবাসা তোমাদের দিকে যাক। যে শুদ্ধকে ভালোবেসে তোমরা শুদ্ধ, সেই বুদ্ধ-মুক্ত-শুদ্ধ’র দিকে আমার প্রাণের টান হোক। আমি নানা থেকে একের দিকে এগোই - যেমন এই নদী, যেমন এই গ্রহপুঞ্জ, যেমন মাতৃগর্ভে এক অমরার টান – ওগো আমায় একের দিকে আনো, ওগো আমার সমস্ত সেই একের দিকে যাক। আমার মনে অভিসারী টান লাগুক। আমার মন কি কেবলই অপসারী হয়ে নিজেকে ক্ষয় করবে?
       কান্তা স্নান সেরে পাড়ে এসে বসল। কাকে ভয় সংসারে? ভয় শুধু নিজের প্রবৃত্তিকে। নির্বোধ প্রবৃত্তিকে। “লক্ষ্য-শূন্য লক্ষ বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে, / জানি না কখন ডুবে যাবে কোন্‌ / অকুল-গরল-পাথারে! / প্রভু বিশ্ব-বিপদহন্তা, / তুমি দাঁড়াও, রুধিয়া পন্থা; / তব, শ্রীচরণ তলে নিয়ে এসো, মোর / মত্ত-বাসনা গুছায়ে! / মলিন মর্ম মুছায়ে”...
       কান্তার চোখে জল। কান্তার মায়ের চরণযুগলের কথা মনে পড়ছে। ডানপায়ের মধ্যমাতে একটা আঙট। রূপোর আঙট। মা’কে শেষ কবে প্রণাম করেছিল কান্তা? শেষ দাহের সময়। মায়ের শরীরটা যখন বৈদ্যুতিক চুল্লীর সামনে রাখা।
       বৃষ্টি শুরু হল। কান্তা ভিজছে। তার পাশে রাখা জামাকাপড় ভিজছে। কান্তা উঠতে চাইছে না। উঠে কি হবে? সব রাস্তা মিশে মাঠ হয়ে গেছে। কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? শুধু শরীর চালাতে যেটুকুর খোরাকি। মনের খোরকি কি হাটের জিনিস? মানুষ সারাটা জীবন কতক্ষণ আর শরীরে বাঁচে? বাঁচে তো মনে। “কেন রে তোর দু হাত পাতা-- / দান তো না চাই, চাই যে দাতা--”।
       ভয় বলো, কাম বলো, সুখ বলো, দুঃখ বলো, শান্তি বলো, উদ্বেগ বলো – সবই এই মনের খেলা। ভালোবাসাটুকু নয়। মন ভালোবাসা বোঝে না। ভালোবাসা মানে চৈতন্য। মন যদি ভালোবাসার দাস হয়, তবে তো সবই সোজা – সত্য বলো, সুপথে চলো। তা তো না, মন চায় ভালোবাসার উপর প্রভুত্ব। চোরাগোপ্তা শরীরী সুখের উমেদারি। ভালোবাসাকে বশ করতে চায় – ক্ষ্যাপা মন।
       কান্তার চোখ বন্ধ। ঠোঁটের কোণায় হাসির ছটা। আকাশ জুড়ে মেঘ। মাটি ভাসছে অঝোর ধারায়। পাহাড়ি নদী কলকল করতে করতে ছুটছে। সব দাস, ভালোবাসার দাস। দাস না হতে পারলে সব নষ্ট – মহতী বিনষ্টি। কান্তা গান গাইছে – “নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে...।”


Sunday, August 24, 2014

কান্তাচার্য্য ও মুকুন্দ

১ 
----- 
মুকুন্দ চায়ের দোকানে বসে চায়ে নুন মেশাচ্ছে। এরকম মুকুন্দ প্রায়ই করে। বিশেষ করে রেগে গেলে বা মন খারাপ থাকলে। 


     মুকুন্দ তবলা শেখায়। শ্যামনগরের একটা গ্রামেই তার বাড়ি আর বাড়িতেই স্কুল। 'আসুন তবলা বাজাই' - তার স্কুলের নাম। তার বয়স পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশ হবে। খুব লাজুক প্রকৃতির ছেলে। 

বাবা আছেন। তাঁর মুদির দোকান। কার্তিকবাবু। খুব কম কথা বলেন। বিশেষ করে চুনিবালাদেবীর মারা যাওয়ার পর থেকে। এদিকে মুকুন্দও বিয়ে থা করেনি। ওনার আর সংসার ভালই লাগে না। মাঝে মাঝেই ভাবেন কাশী চলে যাবেন। স্টেশান অবধি গিয়েও ফিরে এসেছেন হতভাগা মুকুন্দটার জন্য। ভাবেন, "যা হোক যে কদিন বাঁচি ছেলেটার সাথেই কাটাই, একটু যদি বিষয়বুদ্ধি থাকত ব্যাটার!" 

     আজ সকাল থেকেই মুকুন্দের মন খারাপ। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তরও দিচ্ছে না ঠিক করে। মদনের চায়ের দোকানে এসে এক কাপ চিনি ছাড়া চা চাইল। তখনই মদন বুঝেছে, এইবার পকেট থেকে নুন বার করে মেশাবে চায়ে। 
     হলও তাই। মদন প্রায় মুকুন্দের সমবয়সী। সে বললে, "কি হয়েছে রে মুকুন্দ, বাবার সাথে ঝামেলা করেছিস?" 
     মুকুন্দ মাথা নাড়ল। 
     "তবে?", দোকানটা একটু ফাঁকাই ছিল, মুকুন্দের পাশে এসে বসল মদন। 
     "কি জানি, কিচ্ছু ভাল লাগেনা আজকাল।", এই বলে সে নুন মেশানো চায়ে চুমুক দিল। আগে মদনের গা গুলিয়ে উঠত এই দৃশ্য দেখলে। এখন আর গুলায় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। 
"বিয়ে থাওয়াও করলি না। খারাপ তো লাগবেই। এত বড় জীবন একা একা কাটানো যায়।", দীর্ঘশ্বাস ফেলল মদন। তার বউটা বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গেছে বছর দশ হল। মদন আর বিয়ে করে নি। তার মেয়ে পাশের গ্রামেই তার মামাবাড়িতে মানুষ হচ্ছে। সে দু'দিন অন্তর গিয়ে দেখে আসে।
     কি একটা ভেবে হঠাৎ সে বলল, "একটা কথা শুনবি মুকুন্দ? না বলিস না কিন্তু।" 
     মুকুন্দ মাথা নীচু করেই বলল, "বল, আগে শুনি।" 
     "তুই একবার কান্তাদার কাছে যা। ভাল লাগবে দেখবি। আমার যখন ঘর পুড়ল তখন কান্তাদাই আমায় দাঁড় করালেন, তুই যা ভাই আজই বিকালে যা। বাড়ি চিনিস তো?", বলতে বলতে মদনের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। 
     মুকুন্দ নিরুত্তাপ গলায় বলল, "দেখি।" 




২ 

--- 

কান্তাদাকে মুকুন্দ খুব ভাল করেই চেনে। কান্তাচার্য্যও মুকুন্দকে ভালভাবেই চেনেন। পাশের কয়েকটা পাড়া পরেই মুকুন্দের বাড়ি। পাড়ার সব ফাংশানে মুকুন্দই প্রধান তবলা বাদক থাকে প্রায়, খুব ভাল ছেলে। কান্তাবাবু বেশ স্নেহই করেন মুকুন্দকে। 


      তবে হঠাৎ সাত-সক্কালে মুকুন্দকে দেখে বেশ অবাক হয়েছেন তিনি। 

     রবিবার। সকাল আটটা হবে। তিনি কাগজে একটা কোষ্টকাঠিন্যের বিজ্ঞাপন পড়ছিলেন মন দিয়ে। কয়েকদিন ধরেই খুব সমস্যা হচ্ছে সকাল হলেই। ইয়ে করতে যাওয়ার আগে তাঁর মুখটা, অঙ্ক পরীক্ষার দিন পটলার যেরকম মুখের গতি হয় সেরকম হয়ে যায় আজকাল। 

     যা হোক মুকুন্দ আসল। তিনি বললেন, "হ্যাঁ রে কাকাবাবু ঠিক আছেন তো রে?" 
     মুকুন্দ বলল, "হ্যাঁ দাদা, বাবা ঠিক আছেন। আসলে আমি এসেছি আমার নিজেরই জন্য।" 
    মুকুন্দর হঠাৎ কিরকম লজ্জা লাগতে শুরু করল। মনে হল, ইস্, এইসব কারণের জন্য কাউকে বিরক্ত করা। না, মদনের কথায় নাচাটা তার ঠিক হয়নি। রাগ লাগতে লাগল নিজের ওপর। কি বলবে সে এখন কান্তাদাকে? 'আমার মন ভাল যাচ্ছে না বলে আপনার কাছে এলুম' - ছি ছি! উনি কি ভাববেন! 
    কান্তাচার্য্য মুকুন্দের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। ওর ইতস্তত ভাব দেখে কিছু বুঝলেন। তারপর বললেন, "চলো মুকুন্দ বাগানে হেঁটে আসি একটু।" 
মুকুন্দ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বলল, "চলুন।" 





৩ 

--- 

"কান্তাদা আমার বেশ কিছু মাস হল কিছুই ভাল লাগছে না। তবলা শেখাতে না, গান শুনতে না, কারোর সাথে কথা বলতে না, কিচ্ছু না। লোকে ভাবছে আমি বিয়ের জন্য এরকম করছি, কিন্তু বিশ্বাস করুন আদৌ তা না। আমার কেন ভাল লাগছে না আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারছি না", কথাগুলো প্রায় এক নিশ্বাসে বলে গেল মুকুন্দ। 


     বেশ বড় বাগান। কয়েকটা আমগাছ, পেয়ারাগাছ আর অনেকগুলো নারকেল আর সুপুরি গাছ আছে। কান্তাবাবুর স্ত্রী কয়েকটা ফুলগাছ লাগিয়েছেন পূজোর জন্যে - জবা অনেকরকম, নয়নতারা, টগর। মার্চের মাঝামাঝি, তবু খুব গরম পড়েনি এবছর এখনো। বেশ ভালই লাগছে হাঁটতে কান্তাবাবুর। 

      তিনি মন দিয়ে সব শুনছিলেন। মাঝে মাঝে খেয়ালও করছিলেন মুকুন্দকে। 

    হ্যাঁ, ছেলেটার মুখে একটা ছাপ পড়েছে বটে ওর মনের। চোখের তলায় কালি, যদিও ভালভাবে না দেখলে বোঝা যাবে না। মুখের মধ্যে একটা অস্থির ভাব। 
     "তোমার কিছু কি মনে হয়? যেমন ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা, বা কোনো সুপ্ত বাসনা অপূর্ণ থাকার ক্ষোভ, বা কোনো খারাপ ব্যবহার খুব কাছের কোনো মানুষের থেকে?" কান্তাবাবু দাঁড়িয়ে পড়ে, মুকুন্দের চোখের দিকে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করলেন। 
     মুকুন্দ অস্বস্তিতে পড়ল। তার উচ্চাকাঙ্খা যে ছিল না তা তো না। তাকে দেখতে ভাল ছোটবেলা থেকেই, তাই সাধ ছিল সিনেমায় অভিনয় করার। আর একটা সাধ ছিল পাইলট হওয়ার। তা দুটোই উচ্চাকাঙ্খাই বটে। বিশেষ করে পরেরটা। কিন্তু পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল না সে। মাথা পরিস্কার ছিল না। না পারত ইতিহাস মুখস্থ রাখতে না পারত অঙ্ক কষতে ঠিক মত। ভাগ্যিস তবলাটায় তার খুব আগ্রহ ছিল বরাবর, তাই আজ করে খেতে পারছে কিছু! 
     তবে কি তার উচ্চাকাঙ্খাটাই এর মূল কারণ? না, তা কি করে হবে? সে পাট তো চুকিয়েই দিয়েছে কবে। ভাল দেখতে হলে কি হবে, সংলাপ মুখস্থই রাখতে পারত না সে। অন্যের সংলাপ নিজেই বলে স্টেজে প্রায় কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দিয়েছিল দু'বার। ক্লাবের ছেলেরা এই মারে তো সেই মারে! তারপর থেকে সে অভিনয়ের কথা তো আর ভাবে নি! 
     আর পাইলট? তার যা অঙ্কে মাথা, সে প্লেন চালালে সোজা বৈকুণ্ঠে গিয়ে ল্যান্ড করত। 
না:। এসব না। এসব তো সে কবেই মেনে নিয়েছে। তবে মনের গভীরে আরো কিছু বাসা বেঁধে আছে? 
     মুকুন্দের সব গুলিয়ে যেতে লাগল। মনে হল মনের তলানিটাকে ধরে নাড়িয়ে দিলেন কান্তাবাবু। কিসব খেয়াল আসছে তার। লোকের ঠাট্টা, ইয়ার্কি তাকে নিয়ে। 
     স্টুডেন্টদের বাড়ির লোকেরা বড্ড ছোট করে দেখে তাকে - "মাস্টারমশায় আপনার কাছে ও আর আসবে না সামনের দু'বছর, মাধ্যমিক তো, বুঝতেই পারছেন।" বা কেউ বলল, 'উচ্চমাধ্যমিক তো সামনে!', আবার কেউ বলল, 'আপনার ডেটটা পাল্টাতে হবে স্যার, ওর অঙ্কের স্যার ওই সময়টাতেই আসবেন বলছেন। আগের সময়টা উনি ওনার মেয়েকে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যাবেন।' 
       কেউ ছেলেকে ক্রিকেট শেখাতে নিয়ে যাবেন, তো কেউ এক্সট্রা কোচিং ক্লাসে। 
    আর সব জায়গায় কে ডেট অ্যাডজাস্ট করবে? না মুকুন্দ। সে যেন একটা ফালতু, এলেবেলে। 
     রাগ লাগে, অপমান লাগে। কিছু বলতে পারে না। কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। তার কান্না পেতে লাগল। বুকের ভেতরটা হাঁচড় পাঁচড় করতে লাগল। কি করবে সে এখন? পালিয়ে যাবে? সেই ভাল। যদি সে কেঁদে ফেলে কান্তাদা আর কিছু বললে? না না এই বেলা চলে যাওয়াই ভাল। 
সে তড়িঘড়ি করে বলল, "কান্তাদা পরে আসব। কয়েকদিন একটু ভেবে নি যা বললেন। পরে আসব।" 
     বলেই কান্তাচার্য্যকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল মুকুন্দ। 
কান্তাচার্য্য কিছু আন্দাজ করেই আর আটকালেন না মুকুন্দকে। 





৪ 

--- 

মুকুন্দ উত্তর পেয়ে গেছে। কান্তাচার্য্য বুঝতে পেরেছেন। সে আর আসবে না। কিন্তু এই সহজ কথাটা সে বুঝতে পারছিল না কেন? নিজেকে স্বীকার করলেই তো সব ঝামেলা চুকে যায়, সেই গুরুদেবের কথা, "ভালো মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে", কিন্তু এই সহজ কথাটা বুঝতে পারে না কেন মানুষ!


     কান্তাচার্য্যের মাথা কেমন করতে লাগল। গা ভারী হয়ে আসল। তিনি বুঝলেন তাঁকে একা থাকতে হবে এখন। 

      তিনি ছাদে উঠলেন। নীচে বলে গেলেন কেউ যেন তাঁকে না ডাকে। 

     তিনি ভেবেই চলেছেন, এই সহজ কথাটা বোঝার জন্য মুকুন্দকে তাঁর কাছে আসতে হল কেন? মুকুন্দের চোখে তিনি জল দেখেছেন। আনন্দাশ্রু? মানুষ যখন কোনো গভীর সত্য অনুভব করে তার চোখে জল আসে। আসতেই হবে, সে সত্য দুঃখের হোক চাই সুখের। তাই সত্যকে উপলব্ধি করলেই আসে আনন্দ। সত্যের চেতনার আনন্দ। যাঁকে আরো গভীরে গিয়ে উপনিষদ বলেন, 'সৎ-চিৎ-আনন্দ' বা 'সচ্চিদানন্দ'। 
     বেলা গড়িয়ে বিকাল হল। কান্তাচার্য্য নীচে নামেননি। এক পটলা ছাড়া কেউ খায়নি বাড়িতে। বিকেলবেলা তারাসুন্দরীদেবী এসে বললেন, "হ্যাঁ গো সময় যে বয়ে গেল, কিচ্ছুটি মুখে কাটনি সকাল থেকে, কিছু খেয়ে নাও।" 
     কান্তাচার্য্য চমকে উঠে তাকালেন তারাদেবীর দিকে। বললেন, "কি বললে গিন্নী, কি বললে! আবার বলো!" 
    তারাদেবী অবাক হয়ে বললেন, "কি আবার বললুম। বলছিলাম সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, খাবে কখন, এরপর পিত্তি পড়বে যে....." 
     আরো কি বলে যাচ্ছিলেন তারাদেবী। কান্তাচার্য্যের কানে কিছু আসছিল না। 
     
     তিনি বুঝেছেন! 
    মানুষ যেটা বোঝে, সেটার দিন-ক্ষণ, আকার-বিকার সব বলতে পারে। কবে পূর্ণিমা, কখন জোয়ার ভাঁটা, কবে কোন ধূমকেতু আসবে সব সে বলতে পারে। কারণ সে বুঝেছে এগুলো। কিন্তু সে কখনো বলতে পারে না, কখন সে বুঝবে। কেউ বলতে পারে না। কোনো বিজ্ঞানী বলতে পারেন না, তিনি কখন বুঝবেন তাঁর তত্ত্ব। সহজ বা কঠিন যাই হোক না কেন, মানুষ কোনো দিন বলতে পারবে না সে কখন কোনো জিনিস বুঝবে বা উপলব্ধি করবে। কারোর গায়ের জোর খাটবে না। না- না- না, কারোর জোর না, কারোর না। এটা যাঁর হাতে তাঁরই হাতে। 
   তাঁর দু'চোখ জলে ভরে আসল। তিনি তারাদেবীকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন। আর বলতে লাগলেন, "বুঝেছি গিন্নী বুঝেছি, সময় না হলে কেউ বুঝবে না, কেউ না"। 
    তারাদেবীও কাঁদলেন। কেন কাঁদলেন তিনি জানেন না। হয়তো তাঁর সেটা বোঝার সময় হয়নি এখনো। 
     বিকালের পড়ন্ত আলো তাঁদের অশ্রুতে প্রতিবিম্বিত হতে থাকল। আনন্দাশ্রুতে।

Sunday, July 13, 2014

কান্তাচার্য্য ও শ্মশান


কান্তাচার্য্য ঠান্ডা মাথার মানুষ। সবাই জানে। কিন্তু সেদিনের কান্ড দেখে সবার আক্কেল গুড়ুম। এত রাগতেও পারে কান্তা! 

     ঘটনাটা খুলেই বলি। কান্তাবাবুদের বাড়ির পাশেই থাকেন চক্কোতি বাবু। রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি নিয়ে বিশাল সংসার। কিন্তু চক্কোতি মশায়ের মেজাজটা বড় উচ্চগ্রামে বাঁধা। কদাচিৎ তাঁর কন্ঠে কেউ মধ্যম বা মন্দ্র সপ্তক শুনতে পান।
     সে যা হোক। ঘটনাটার সূত্রপাত হল পুঁটিকে নিয়ে। আরে পুঁটি গো, মানে কান্তাবাবুদের পোষ্য বেড়াল। সে বেটি বাচ্চা বিয়োবার আর জায়গা পেলো না। তিন তিন খান ফুটফুটে সাদা বাচ্চা চক্কোতি মশায়দের রান্নাঘরের কোণে জন্ম দিল। প্রথম কদিন কেউ টের পায়নি। কান্তাবাবুর গিন্নী অবিশ্যি মাঝে পুঁটির খোঁজ কয়েকবার করছিলেন। কিন্তু বিড়াল হারালে তো আর পুলিশে রিপোর্ট লেখে না, তাই চুপ করেই ছিলেন। 
     ওদিকে কয়েকদিনের মধ্যেই পুঁটির বংশবৃদ্ধির খবরটা জানাজানি হয়ে গেল। চক্কোতি মশায় কংস রূপ ধারণ করলেন আর তিনটে বাচ্চাকেই স্বধামে পাঠিয়ে ক্ষান্ত হলেন। চক্কোতি গিন্নী বার কয়েক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন "ওগো শোনো। ওরা মা ষষ্ঠীর বাহন, এরকম কোরো না। আমি বরং তারা বৌদিকে (কান্তাবাবুর স্ত্রী) বলি, সে এসে নিয়ে যাবেখন।" তা কে কার কথা শোনে। ষষ্ঠীর বাহনদের গুষ্ঠি নাশ করেই ছাড়লেন চক্কোতিবাবু। 
     এ খবর কান্তাবাবুদের কানে গেল। ব্যস। রোববারের সকাল। লেগে গেল নারদ নারদ। তবে মাইরি বলছি, কান্তাবাবুর এ রূপ আমিও কোনদিন দেখিনি। প্রায় হাতাহাতি হয়ে যায় আর কি! পাড়ার ছেলেরা, পটলা, তারাদেবী মায় কাজের মাসি পর্যন্ত রণক্ষেত্রে নেমে কান্তাবাবুকে ঘরে আনলেন। ওদিকে চক্কোতি মশায়ের ছেলেরা, নাতিরা, জামায়েরা এমনকি বড় ছেলের শ্বসুর অবধি টানাটানি করে তাঁকে মানে চক্কোতি মশায়কে ঘরে নিয়ে গেলেন। কেউ যদি দূর থেকে দেখে থাকেন, শব্দগুলো কানে না গেলে মনে হবে দু'পক্ষের বুঝি অদৃশ্য দড়ি নিয়ে টাগ অফ ওয়ার খেলা হচ্ছিল। 
     কান্তা ঘরে ফিরে সকাল থেকে কিছু খেলেন না। তাঁর যে মূর্তি তারাদেবী দেখেছেন, তাতে তাঁর নিজেরও আর সাহসে কুলাচ্ছে না ওঁকে খাওয়ার কথা বলতে। তিনি পটলাকেই শুধু দুগ্রাস খাইয়ে দিলেন। সে বেচারাও খুব ভড়কে গেছে, বাবার এত রাগ সে বাপের জন্মে দেখেনি! 
     কান্তা সারারাত ঘুমোতে পারলেন না। না, রাগে না। রাগ তাঁর পড়ে গেছে সন্ধ্যের পর থেকেই। এখন কেমন একটা অনুশোচনা হচ্ছে। চক্কোতি মশায় না হয় ভুল করেইছেন, তা বলে তিনি নিজে যা করতে যাচ্ছিলেন তাই বা কম কি? ছি: ছি:। একেবারে গায়ে হাত তুলতে যাওয়া! ভাগ্যিস পাড়ার ছেলেগুলো ঠেকিয়েছিল, না হলে তো রক্তারক্তি কান্ড হতে পারত! ছি: ছি: ছি:! 
     ভোর ভোর উঠলেন। মনটা খচখচ করেই যাচ্ছে। রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন হাঁটতে। বেরোবার সময় একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন চক্কোতি বাড়ির কেউ উঠেছে কি না। না, কেউ ওঠেনি। কি লজ্জা! যা হোক মনটা তবু বিষন্ন। চক্কোতি মশায়ের কাজটাও কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। পুঁটির মুখটা মনে পড়লেই তাঁর রাগ, কষ্ট মিলে কিরকম করে উঠছে বুকের মাঝখানটা। তিনি না পারছেন নিজেকে ক্ষমা করতে, না পারছেন চক্কোতি মশায়কে ক্ষমা করতে। কি যন্ত্রণা! 
     কান্তাবাবু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছেন। এমন সময় কানের পাশেই "বল হরি...হরি বোল", শুনে কান্তাবাবু চমকে তাকালেন। তাঁর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে শববাহী শ্মশান যাত্রীর দল। শ্মশান যাত্রীদের কান্তাবাবু আলাদা করতে পারেন না। মনে হয় সব এক। এবারও তাই হল। তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। খোলের আওয়াজ, কান্নার আওয়াজ, হরি-ধ্বনিতে পুঁটি, চক্কোতি, তিনি নিজে - সব ভেসে গেল।

     কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর মনে নেই। কিন্ত হঠাৎ তিনি হনহন করে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করলেন। বাড়ি গেলেন। টাকার ব্যাগ নিলেন। আবার হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন।

     শ্মশানে যখন পৌঁছলেন তখন তিনি যাকে বলে এক্কেবারে গলদঘর্ম অবস্থায়। একটা কোণে চুপ করে বসলেন। দাহকাজ শেষ হল। তারা চলে গেল। এখন শ্মশানঘাট ফাঁকা। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শ্মশানের অফিস ঘরের দরজায় মুখ বাড়িয়ে বললেন, "আসব?" 
     একজন আনুমানিক বয়স তিরিশের ছেলে খাতায় ঝুঁকে কি লিখছিল। মুখ না তুলেই বলল, "আসুন, বসুন।" 
     কান্তাবাবু ঢুকলেন। বসলেন। 
     ছেলেটি মুখ তুলে বলল, "বলুন?" 
     কান্তাবাবু হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, "আমি কান্তাচার্য্য, মিত্তিরপাড়ায় থাকি।" 
ছেলেটিও প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলল, "আমি নিমাই। বলুন কি সাহায্য করতে পারি?"
     ইতিমধ্যে একজন বুড়িকে দাহ করতে একদল এসে গেছে হইচই করতে করতে। কান্তাবাবুর মনে হচ্ছে যেন চড়ুইভাতি করতে এসেছে, মনটা আবার বিগড়ে যাচ্ছিল। যা হোক কথায় ছেদ পড়ল। নিমাই তার কাজ সেরে আবার কান্তাবাবুর দিকে ঘুরে বললেন, "বলুন।"
     কান্তাবাবু কিছুটা আমতা আমতা করে নিমাই-এর হাত দু'খানি ধরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন বললেন, "একটা উপকার তোমায় করতেই হবে বাবা। 'না' বললে চলবে না।"
     নিমাই তো একেবারে হাঁ। শ্মশানে কান্নাটা নতুন কিছু না। কিন্তু এভাবে বিনা ভুমিকায়! লোকটাকে দেখে তো পাগল মনে হচ্ছে না।
     সে খাবি খেয়ে, ঢোক গিলে বলল, "আচ্ছা বলুন না। তারপর দেখছি।" 
কান্তাবাবু বললেন, "দেখছি না বাবা। এটা তোমায় করে দিতেই হবে।" 
     "আচ্ছা বেশ, কি বলবেন তো?" 
কান্তাবাবু তার হাতদুটো ধরে আরো কাছে এসে বললেন, "আমাকে দাহ করার টাকাটা তোমায় এখনি নিতে হবে বাবা, আজই, অগ্রিম। আর একটা রসিদ কেটে দিতে হবে।"
     নিমাই-এর মুখটা কেমন দেখাচ্ছিল আমি বলে বোঝাতে পারব না। তবে তার মনে হচ্ছিল তার সামনে খাটে শোয়ানো ঠাকুমাও যেন নড়ে উঠলেন মানুষটার কথা শুনে। 
     সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "তা হয় না কাকাবাবু। জ্যান্ত লোকের টাকা আমি কোন রসিদে কাটব?" এরপর অনেক অনুরোধ, উপরোধ। কিন্তু কাজ কিছুতেই হল না।   
     কান্তাবাবু অবিশ্যি জানতেন এ সহজ কাজ না। তাই গিন্নীকেও বলে এসেছেন যে তাঁর ফিরতে দেরি হবে, আজ অফিস যাবেন না। বাড়ির কেউ যেন দুপুরে তাঁর জন্য অপেক্ষা না করে। খেয়ে নেয়।
     যা হোক, এদিকে ফ্যায়সলা হল, কান্তাবাবুকে মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান অধীর বাবুর সাথে দেখা করতে হবে। অগত্যা। তিনি একটা দোকানে চা, বিস্কুট খেয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন মিউনিসিপালিটির সামনে।  
     সাড়ে এগারোটা নাগাদ চেয়ারম্যান আসলেন। শুনলেন। প্রথমটা কাঁদবেন না হাসবেন, উনি ঠাট্টা করছেন কিনা, বিরোধী পার্টি কোনো চাল চালছে কি না... এরকম সম্ভাব্য অসম্ভাব্য অনেক চিন্তা করলেন। কিন্তু কোনোটাই ধোপে টিকল না। এমন কি ভদ্রলোক (না উন্মাদলোক ?) অনশনের ভয় অবধি দেখিয়েছেন। সামনে ভোট। তাই এত রিস্ক নেওয়া যাবে না। কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায় কে বলতে পারে। অগত্যা উনি কান্তাবাবুকে বিকাল চারটেতে আসতে বলে বিশেষ মিটিং ডাকলেন। 
     মিটিং-এর সবিস্তার বর্ণনা দিতে যাব না। তাতে আরেকটা গল্প হয়ে দাঁড়াবে। শুধু এতটা বলতে পারি, মিটিং-এ সবার বিষম লাগা সামলাতে মিটিং চলাকালীন দু'বার বিরতি ডাকতে হয় চেয়ারম্যানকে।
     বিকাল ঠিক চারটের সময় কান্তাবাবু হাজির। বাড়ি যান নি। শ্মশানেই বসেছিলেন। সামনের দোকান থেকে দুপুরে ভাত খেয়ে নিয়েছেন। 
     "শুনুন কান্তাবাবু, এ ধরণের অনুরোধ তো আগে আসে নি। তাই আমরা খুবই কনফিউজড ব্যাপারটা নিয়ে। আমরা ঠিক করেছি একটা সাদা কাগজে আপনার বয়ান নিয়ে, সই নিয়ে একটা কাঁচা রসিদ দেব। তারপর উপর তলায় চিঠি লিখে দেখব এরকম কোনো নিয়ম বানানো যায় কি না। বুঝলেন?" 
     কান্তাবাবু মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে শুনছিলেন। চেয়ারম্যান এর কথা শেষ হতেই খপ করে ওনার হাত দুটো ধরে খুব করে, গদগদ স্বরে নিজের কৃতজ্ঞতা জানালেন। তারপর কথা অনুযায়ী কাজ হল। আশেপাশে লোকজন দেখে গেল উঁকি মেরে। কাজ পুরো হলে, রসিদ নিয়ে অধীর বাবু কান্তাবাবুর হাতে দিলেন।
     তারপর চেয়ারম্যান বললেন, "আপনাকে একটা প্রশ্ন করব? যদি কিছু মনে না করেন।" 
     "বলুন না?" প্রসন্ন মুখে কান্তাবাবু চাইলেন চেয়ারম্যান এর দিকে। 
     "আপনার কি রোগ? মানে বলছিলাম সাউথে তো চিকিৎসার খুব উন্নতি এখন। তা সে দিকে কি গিয়েছিলেন একবারও?" কান্তাবাবু হাসলেন।
     "না চেয়ারম্যান সাহেব। আমার শরীরে কোনো রোগ নেই। রোগ আমার মনে। 'আমি' রোগ। ঠাকুর বলতেন না 'আমি ও আমার', এ সে রোগ মশায়। সহজে ছাড়বে কেন? ঠাকুর আরো বলতেন 'আমি মলে ঘুচিবে জঞ্জাল'। এই জঞ্জাল থেকেই এত লোভ, ক্ষোভ, মারো, কাটো চেয়ারম্যান সাহেব। আমি ভাবলাম এই যে এত রাগ, ক্ষোভ, লোভ, অভিমান আমাদের, কিসে যায়? দেখলাম মশায় দেখলাম - মৃত্যুর মুখোমুখি হলে যায়। এই রসিদ, রাখলাম আমার ওয়ালেটে। যেই বাবু মাথাটি তুলবেন অমনি আমি একে ওর নাকের ডগায় ধরব। সে সুড়ুৎ করে তার গর্তে ঢুকে যাবে। আমি জানি সে বেটা যত হম্বিতম্বিই করুক না কেন, ভারী ভীতু সে। এখন আর আমায় পায় কে?" বলতে বলতে কান্তাবাবু উঠে দাঁড়ালেন। "চলি", বলে হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন। গুন গুন করে গাইছেন.. 'ওরে আগুন আমার ভাই আমি তোমারি জয় গাই'। চেয়ারম্যান সাহেবের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। তিনি টেবিলের বেল চেপে চাপরাশিকে ডাকলেন। বললেন, "গাড়ি বার করতে বলো। শ্মশানটা একবার দেখে আসি। অনেকদিন যাওয়া হয় না।"

Saturday, June 28, 2014

কান্তাচার্য্য ও গঙ্গা

(কান্তাচার্য্য ও শপিং মল -এর পরবর্তী অংশ) 




     শপিং মল থেকে ফিরে ইস্তক কান্তবাবুর মনে শান্তি নেই। পূর্ণ ও খন্ড তাঁর মাথা খন্ড খন্ড করে তুলছে। 

     কিসে মেলে এই দুই পরস্পর বিরুদ্ধ ভাব? তিনি হাসপাতাল দেখেছেন, শ্মশান দেখেছেন; দারুখানা দেখেছেন, জেলখানা দেখেছেন। কোথায় পূর্ণতা? এ তো শুধু হাহাকার, অসহায়তা। গ্লানি আর ধিক্কার। তবে? পূর্ণ কি কল্পনা! 
     কান্তবাবু কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন। খাওয়া কমে গেছে। গিন্নী প্রমাদ গুনছেন। পটলা ইতিমধ্যে কতকগুলো ভিডিওগেম জোগাড় করে ফেলেছে বন্ধুদের কাছ থেকে। পুঁটিও রান্নাঘরে ঢোকার মহড়া দিতে শুরু করেছে। অপেক্ষা শুধু কান্তবাবুর জ্ঞান হারাবার। 
     সে দিন কান্তবাবু বাজার করে ফিরছেন। সাথে পটলা। এটা পটলার মায়ের আদেশ। বেশ কয়েকদিন ধরে বাজারের গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। এই তো সেদিন তারা দেবী একটু পুঁইশাক আনতে বলেছিলেন বলে দু'ব্যাগ ভর্তি করে শুধু পুঁইশাকই আনলেন কান্তবাবু। আরেকদিন শুধু কাটা কাতলা, আরেকদিন শুধুই বরবটি। আর না। তাই সাথে পটলা। 
     যা হোক, কান্তবাবু হাঁটতে হাঁটতে বললেন, "পটলা বাজারগুলো মাকে দিয়ে আয় দিকিনি। আমি একটু গঙ্গাদর্শন করে আসি।" 
     "আচ্ছা বাবা", বলে দৌড় দিল পটলা। 
     কান্তবাবু গঙ্গার ধারে বসলেন। সামনে কুলকুল করে ধীরে প্রবাহিণীর দিকে তাকিয়ে তাঁর মনটা শান্ত হয়ে আসল। নির্জন চারিদিক। হাল্কা বাতাস বইছে। হঠাৎ সাইকেলের আওয়াজ শুনে পিছন ফিরে তাকালেন। হারু এসেছে। পটলার বন্ধু। 
     "কাকু এখানে? আজ অফিস জাননি?" 
     "না রে। আজ যাব না। তুই? স্নান করবি?" 
     "না কাকা, ঠাকুমা গঙ্গাজল আনতে পাঠালেন। আজ বাড়িতে সত্যনারায়ণ পূজো আছে। কাকিমা জানেন।" 
     তাই তো! হারুর হাতে দুটো ফাঁকা বোতল খেয়ালই করেন নি। 
     তিনি "আচ্ছা যা", বলে আবার গঙ্গার দিকে ফিরে বসলেন। 
     হারু লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে গেল ঘাটে। হারু গঙ্গার জল ভরছে। ব্যস! কান্তবাবুর মাথা কেমন করতে লাগল। বুকের মধ্যে কি যেন সরে সরে যেতে লাগল। কি আলো এসে পড়ল চোখে মুখে চিন্তায়। 
     দেখলেন পূর্ণ গঙ্গা। যুগ যুগ ধরে মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জল নিয়ে চলেছে কলস ভরে, বোতল ভরে, আঁজলা ভরে। তবু সেই পূর্ণ গঙ্গা। 
     প্রাণের কেন্দ্রে এইরকমই একটি পূর্ণ প্রস্রবণ আছে। তাকে প্রেম বলো, আনন্দ বলো। তুমি আঁজলা ভরে প্রতিদিন বাইরের সংসারে নিয়ে এসো, সে ফুরোবার নয়। প্রতিদিন সেই প্রস্রবণের তীরে পৌঁছানোটাই সাধনা। সেই স্রোতের সাথে বিচ্ছিন্ন হলে অন্তরের দারিদ্রতার সীমা থাকে না। ধার করে, কৃত্রিম উন্মাদনা সম্বল করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয়। 
     না,পূর্ণতা কল্পনা না। বরং অসম্পুর্ণতাই কল্পনা, খন্ডিত করে দেখা। 
     বহুক্ষণ কেটে গেল। কান্তবাবু ধ্যানমগ্ন। তাঁর মন পাখির মত ভেসে বেড়াচ্ছে অনন্ত চিদাকাশে, চিরপ্রবাহীনীর সম্মুখে। 
     এমন সময় পিঠে হাতের স্পর্শ পেলেন। 
     "বাবা, মা খেতে ডাকছেন", পটলার ডাকতে এসেছে। 
     তিনি ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। কান্তবাবুর মুখের প্রসন্নতায় পটলার মনটাও ভিজে এলো। সে বাবার পাশে বসে পড়ল। 
     "কি ভাবছিলে বাবা?" 
     কান্তবাবু ছেলের মুখের দিকে তাকালেন, তাঁর চোখ ভিজে এল। 
     তিনি বললেন, "বাবা যাই হোক, জীবনে যত ঝড় আসুক, নিজের মনকে কখনো অবিশ্বাস করবিনি। তার ভিতর অসীম শক্তি। একটা-দুটো ভুল হল বলে হাল ছেড়ে দিস নি বাবা। তুই অনন্তের সন্তান - এ কথা গর্বের সাথে মনে রাখবি। দেখবি প্রাণে বল পাবি, মনে উৎসাহ পাবি।" 
     আরো কি বলতে যাচ্ছিলেন কান্তবাবু। একদলা কান্না এসে তাঁর গলা চেপে ধরল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললেন, "চল। তোর মা অপেক্ষা করছেন।" 
     পটলা বললে, "চলো", বলে সে বাবার হাত ধরলে।