Showing posts with label গদ্য কবিতা. Show all posts
Showing posts with label গদ্য কবিতা. Show all posts

Sunday, December 10, 2023

মিশিয়ে নিও

     প্রতিযোগিতায় দৌড়াতেই হবে কেন? হেঁটে দেখলে কেমন হয়? 

     হাঁটতে, হাঁটতে, অনেক পিছোতে পিছোতে, অনেক বন্ধু বানাতে বানাতে, অনেক বন্ধু হারাতে হারাতে বুঝে গেলাম -

      বেশ লাগছে। 

     কেউ করুণা করল। কেউ নিরাসক্ত মহাপ্রাণ ঠাওরালো। কেউ সুচতুর মতলবী ঠাওরালো। আরো অনেকে অনেক কিছু ঠাওরালো। 

    আমি শুধু হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম, হাঁটাও যায়। বসাও যায়। দরকার হলে ঘুমানোও যায় খানিকক্ষণ। সবার দৌড়ের বেগে পায়ের ধাক্কায় ওড়া ধুলো আবার রাস্তায় থিতিয়ে পড়ে। আবার সব শান্ত হয়।  

    শান্ত ধুলো জিজ্ঞাসা করল, দৌড়ালে না? 

    আমি বললাম, না গো। 

    ধুলো বলল, বসবে? 

    আমি বললাম, বসেছি তো। 

    ধুলো বলল, সব শান্ত হলে তোমার কি মনে হয়? 

    আমি বললাম, ভরা দীঘির টলটলে জলের আনন্দ। 

    ধুলো বলল, যদি না পৌঁছাও? 

    আমি বললাম, সে ভয় নেই। ভয় হয়, যদি পৌঁছিয়ে গিয়ে নিজের আনন্দ খুঁজে না পাই! যদি আনন্দ ধার করতে মহাজনী কারবারে বাঁধা পড়ি! 

    সব শান্ত। দশদিক মিলে একদিক। একদিকে বাজছে সুর। সুরে জাগছে ব্যথা। ব্যথার মধ্যে জাগছে সত্য। সত্যের বুকে জাগছে আনন্দ।

   ধুলো বলল, আমাকে মনে রেখো। 

   আমি বললাম, আমাকেও। মিশিয়ে নিও।

Monday, December 4, 2023

বিষ


প্রাণে শুধু সুখ না, বিষও জন্মায়। রাগের তাপে বিষের ঢাকা খোলে। উপুড় করে। মাথার মধ্যে এসে জমে। বিন্দু বিন্দু। তারপর মুখে, ঠোঁটে, জিভে, চাহনিতে, বাক্যে এসে জমে। 

   একটা, “হ্যাঁ”-এর অপেক্ষায়।  

    তারপর সব বিষাক্ত। 

যদি বলো, “না”। 

  ফিরতে চায় না। 

     প্রশ্ন করে। স্পর্ধা দেখায়! বলে, তবে ডেকেছিলে কেন? 

    যদি বলো, তাকিয়ে দেখো দশদিকে, সব কেমন ভালো। সুন্দর। স্নিগ্ধ। 

সে বলতে পারে, কাপুরুষ। ভীতু। 

   চুপ করে থাকার পর, 

          সে হাতের তলা, পায়ের তলা, ঘাড় বেয়ে নামতে থাকে। মাটিতে, বাতাসে মিশে যায়। পৃথিবী তো সর্বসংহা। সব শুষে নেয়। 

        মাথার উপর জাগে চন্দ্রমৌলি। শান্ত। স্নিগ্ধ। মধুর। চারদিকে জেগে ওঠে কঠিন কৈলাস।

    কঠিন। 

  কিন্তু বিষাক্ত নয়।


(ছবি - গুগল)

Saturday, October 28, 2023

কি বর চাই?


ভোগ গুছিয়ে সে গেল। শাড়িটা নতুন। একবার পরা। অষ্টমীতে।

 

  এই তো বাগান। এই তো ফুল। হিংসা তোদের। রোজ দেখিস ওকে। রোজ পুড়িস ওতে।

 

    দরজা বন্ধ। খুলবি নাকি, পাল্লাদ্বয়? লাগল ভয়। যদি সে না থাকে! যদি সে থাকে!

 

   ভোগ হাতে যে, সে এখন ক্লাস ইলেভেন। আর যার জন্যে সাজানো তার ভোগের থালা, সে কলেজে।

 

    কলিংবেল বাজল। বুকের উপর ছিঁড়ে পড়ল ধ্রুবতারা।

 

     ওই তো সে। এই তো সে।

 

    হাত বাড়িয়ে নিল। বলল, বাপ রে, শাড়ি পরেছিস! কার শাড়ি? মায়ের?

 

  ইস। কি যে বলে! মায়ের কেন হবে। তারই শাড়ি। এই তো দেখো।

 

   বলা যায় নাকি!

 

  বলল শুধু, আসি। খেয়ে নিও।

 

  তারপর সে বাগান পুড়িয়ে, রাস্তা পুড়িয়ে, দশদিক পুড়িয়ে, পুড়তে পুড়তে, অকারণে ভেসে চোখের জলে নিজের ঘরে এলো।

 

  পূর্ণিমার চাঁদে ভর করে, লক্ষ্মী ফিরছে দোরে দোরে। কে আছিস জেগে? কে রে? কে আছিস জেগে?

 

   মধ্যরাত। সে রয়েছে জেগে। পোড়া ছাই যেন চাদরে মিশে। লক্ষ্মী বলল, কি বর চাই?

 

  সে বলল, আমার একটু লজ্জা কমুক…আমায় একটু অলক্ষ্মী করে দিও….


Tuesday, August 15, 2023

যদি তুমি

 


তুমি যদি খুব কাছ থেকে, তোমার

সব ফিতে, স্কেল, দাড়িপাল্লা সরিয়ে একজন মানুষের চোখের দিকে তাকাও.... দেখবে একটা মানস সরোবর। তার হৃদয়ে জমে মেঘ। বৃষ্টি হয় দিনরাত। সে মানস সরোবরে ওঠে ঢেউ।

যদি আরো ভালো করে তাকাও, দেখবে তার টলটলে স্বচ্ছ জলে তোমারও মুখের ছায়া। বড্ড চেনা। বুঝবে, আসলে কেউ-ই নয় অপরিচিত একেবারে।

Wednesday, July 12, 2023

অবাধ

আমার হাতের বাইরে দিয়ে, আঙুলের ফাঁকের ভিতর দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে সময়।

বয়ে যেতে যেতে, সময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, এরপর কি বল তো?

সুখ, না দু:খ, না ভয়?

আমি সময়কে বললাম,

আমার হাতের দশ আঙুলের মধ্যে আটটা ফাঁক, তাই দিয়ে বয়ে যাও.... বাকি দুদিক খোলা অসীমে.... কোনো ফাঁক নেই... একদিন মনে পড়বে আমায়..... ভুলে যাবে কি কি নিয়ে এসেছিলে... সুখ, দুঃখ, ভয়.. কিচ্ছু নেই সেদিন... ফাঁকা সমুদ্রতীর.... শূন্য খোল ঝিনুক.... মনে পড়বে দশ আঙুলের মধ্যে আটটা ফাঁক দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, অসীম স্রোতে..... অবাধ...

Wednesday, May 31, 2023

এখন নেই

ঘটনাটা ছিল এই, হলুদ একটা পাতা খসে দীঘির জলে পড়েছিল, ভাসছিল, তার উপর একটা নীল প্রজাপতি এসে বসেছিল।

গ্রামে অনেকেই দেখল। কিন্তু কেউ বলতে পারল না আসলে কি দেখল। কেউ বলল, প্রজাপতি ছিল, পাতা কই? কেউ বলল, পাতা ছিল, প্রজাপতি কই? কেউ বলল, আসলে পাতাটা রুগ্ন ছিল, কেউ বলল, পাতাটা বিদ্রোহী ছিল, কেউ বলল, আসলে গাছটাই চাইছিল না পাতাটা থাকুক।

আবার কেউ বলল, দীঘির জলের ষড়যন্ত্র ছিল। কেউ বলল, প্রজাপতিটার জন্যেই সব হল। কেউ বলল, বাতাসের জন্য সব হল। কেউ বলল, পাতাটাই ছিল বেইমান।

যারা দেখেনি, যারা শুধু শুনেছে, তারা এরপর থেকে এই দীঘির পাড়টা এড়িয়ে যেতে লাগল। যারা দেখেছে, তারা অন্যের দেখার বর্ণনার সঙ্গে নিজের দেখা গুলিয়ে মনের মধ্যে এক বিভীষিকা তৈরি করল।

শুধু কি এই? কেউ জলের স্তব লিখল। কেউ পাতার গান লিখল। কেউ প্রজাপতির কবিতা লিখল। কবি বলল, এর মধ্যে আছে ছন্দ। দার্শনিক বলল, পরিণামের সঙ্গে পরিণামীর কি সম্পর্ক ভেবে দেখা হয়েছে? রাজা বলল, এ তো অনাচার, আমি নিন্দা করি! বিরোধী শিবির বলল, আমাদের সময়ে এরকম হতই না, কোন স্পর্ধায় পাতার উপর বসে প্রজাপতি!

এখন কেউ মাদুলি পরে, কেউ তাবিজ পরে, কেউ সে গাছের নীচে বসে ঝাড়ফুঁক করে, শিল্পী ছবি আঁকে, দার্শনিক শুয়ে-বসে ভাবে, কেউ স্তব গায়, কেউ যাত্রাপালা লিখে অভিনয় করায়, কেউ ভাষণ দেয়।

এত সব হল, অথচ কেউ বলল না, ঘটনা তেমন কিছু নয়, একটা হলুদ পাতা উড়ে এসে জলে পড়েছিল, ভাসছিল, তার উপর একটা নীল প্রজাপতি এসে বসেছিল। এর কোনো মানে নেই। উদ্দেশ্য নেই। শুধু এক খণ্ড ছবি ছিল। এখন নেই।

Tuesday, April 4, 2023

মানুষ হয় না

তারপর কেউ কাউকে চিনতে পারল না

সবাই বলল, মার মার....

কেউ জানল না সকালে কে কি খেয়ে এসেছে, কিম্বা কার কার খাওয়া জোটেনি। কিম্বা কার বাড়ির ওষুধের বিল কত আসে? কার ছেলেটা, কার মেয়েটা চাকরি পায়নি? শিক্ষা সম্পূর্ণ করেও। কিম্বা কারোর কারোর শিক্ষার গণ্ডী কেন প্রাথমিক স্কুল পার হল না। কেউ জানতে চাইল না।

এ সব কথা কেউ জানতে চাইল না। শোক, অভাব, দু:খ, ক্ষোভ...  গাড়ি চাপা কুকুরের মত কয়েকবার কেঁউ কেঁউ করে শান্ত হয়ে গেল..... সবাই বলছে মার মার মার....

তারপর সব শান্ত হয়ে গেল। ক্লান্তিতে আর অবসাদে হারজিতের কথা মনে না থাকলেও, সবার মনে হল, কিছু একটা হল...অনেকদিন পর...মড়া পাঁক অনেকদিন পর গন্ধ ছড়ালো... কিছু তো হল....

কেউ জানতে চাইল না কে কি পেল... কার বাড়ি কত টাকার ওষুধের বিল এলো.... কার পড়াশোনা কাকে কোথায় নিয়ে গেল... অথবা সন্ধ্যের আকাশে যখন চাঁদ উঠল আধখানা.... বা ভর্তি সিলিণ্ডারের পয়সা না দিতে পেরে, ফাঁকা সিলিণ্ডারের পাশে বসে ঘুঁটে জ্বেলে যে রান্না করল.... বা সারাদিন টিউশান পড়িয়ে বাবার হরলিক্সের টাকাটা মায়ের হাতে দিয়ে যে স্নানে ঢুকল.... তাদের কি কি পার্থক্য হল.....

ফুটপাতের কোণে জন্মানো ছোটো আগাছা গোত্রের চারাগাছটার উপর যখন কয়েক পশলা বৃষ্টি পড়ল.... যখন শেষ ব্যাণ্ডেল লোকালটা ফাঁকা স্টেশান কাঁপিয়ে চলে গেল.... তখন কোনো এক পাগল পাশ ফিরে শুলো.... কোনো এক ভিখারি নোংরা জলের বোতল থেকে দু ঢোক জল খেয়ে পচা রুটির ঢেকুর তুলে বলল, শালার বৃষ্টি....

কেউ জানল না কে কাকে কেন মারতে গিয়েছিল.... এমনিতে কারোর মনে থাকে না..... তারাই মনে রাখে যাদের পুরোনো খাতা ঝেড়ে ধুলো উড়িয়ে চোখ ধাঁধিয়ে লাভের গুড় চাটে.... দল পাকিয়ে মারে আর মার খাওয়ার মতলব আঁটে...

কুকুরটা খোলা আকাশের নীচে শুয়ে.... কালকের অপেক্ষায় নয়... আজকে এই মুহূর্তে বেঁচে আছে, সে-ই আনন্দে.....

সেও জানে না, কারা কাকে মারতে গিয়েছিল.... কেন গিয়েছিল...

তবু কাল হয়... পরশু হয়.... মাস বছর হয়.... মানুষ আর মানুষ হয় না....

Wednesday, March 1, 2023

না - হ্যাঁ

জলের উপর উড়ে এসে, ডালে বসেছিল। বসেই জলকে বলল, জানো, যখন উড়ে এলাম, ছায়া পড়ল তোমার বুকে। আমার ছায়া। কই দেখাও? তুমি দেখেছ?

জল বলল, হ্যাঁ।

এখন কিসের ছায়া আছে?

জল বলল, নীল আকাশের।

পাখি বলল, আমার?

জল বলল, আকাশকে জিজ্ঞাসা করো।

পাখি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি যে উড়ে এলাম, তোমার মনে আছে?

আকাশ বলল, সময়কে জিজ্ঞাসা করো।

পাখি সময়কে খুঁজতে গিয়ে দেখল কই সে নিজে? কই আকাশ, কই জল?

পাখি চুপ করে ডালে এসে বসল আবার। তার ছায়ার কথা কেউ মনে রাখবে না?

দশদিক দিয়ে প্রতিধ্বনি এলো, না না না।

পাখির গা থেকে একটা পালক খসে গেল। বলল, মনে রেখেছ আমাদের? খসে গেছি কত তোমার অজান্তে?!

বসন্তের পাতা বলল, উড়ে যাওয়া মেঘ বলল, ধুলো বলল, একবিন্দু শিশির আর এক বিন্দু বৃষ্টির জল বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।

 

Tuesday, February 21, 2023

বাংলা

যখন বৃষ্টি শুরু হয়, মেঘ নেমে আসে মাঠের উপর দিগন্ত ছুঁয়ে, মনে হয়, যে ভাষায় মাটির সঙ্গে আকাশের কানাকানি, সে বাংলা।

যখন ধানক্ষেতে হাওয়া দিয়ে যায়, কি আমগাছের পাতাগুলো ঝরঝর শব্দে বেজে ওঠে, মনে হয় বাতাসের সঙ্গে যে ভাষায় ওদের আলাপ জমেছে, সে ভাষা বাংলা।

দেখেছি গ্রামের রাস্তায় ছাগল, গরু, হাঁস, মুরগীর সঙ্গে মানুষ কথা বলছে বাংলায়,... এই কই গেলি রে… আরে আয় টিটিটিটি…. খেলি না কেন আজ?..... এমন কত কথা! পশুপাখি সবাই বুঝে যায়, বাংলা।

আগুন, জল, মাটি, বাতাস, আকাশ…. জন্মসূত্রে বাংলায় কথা বলে আমার সঙ্গে। ছাপাখানায় ছাপা অভিধান নয়, রক্তে ভাসা অভিধান…. শব্দস্রোত… বাংলা…

Friday, February 3, 2023

দয়া

দরিদ্র রমণী এক, পুত্র সন্তান ক্রোড়ে, আসিলেন জঙ্গলে। রন্ধন উপযোগী শুষ্ক কাষ্ঠ সংগ্রহের তরে।

পুত্রেরে রাখিয়া ভূমে, কহিলেন স্নেহে, এই স্থানে করো ক্রীড়া, যাইয়ো না দূরে। আমি যাই জঙ্গল গভীরে, কাঠ আনিবার আছে, রাঁধিবার তরে।

ধ্যানমগ্ন তথাগত আছিল ধ্যানাসনে, কিঞ্চিৎ আড়ালে। দীর্ঘকাল খেলিতে খেলিতে, জননীর আসার পথ হেরিতে হেরিতে, দেখিল বুদ্ধেরে।

বুদ্ধের কাছে আসি, ক্ষুদ্র অসহায় দুই হস্ত প্রসারি কহে, ওগো, তব ক্রোড়ে দিবে কি ঘুমাবারে? বড্ড পাইছে ঘুম, মা আসি লয়ে যাবে ঘরে?

হাসিয়া বুদ্ধ তারে বলিল সস্নেহে, আসহ বৎস, পড়হ ঘুমায়ে, আমি আছি জাগি, মা আসিলে তব, দিব জাগাইয়ে।

খানিক সময় পরে, মা আসি, দেখি আপন সন্তান ঘুমন্ত বুদ্ধ ক্রোড়ে, লজ্জিত হইয়া পড়ে ভূমি পরে লুটে। দুই হস্ত জোড় করি, ভাসি অশ্রু নীরে, কহে অপরাধ না লইও নাথ, ক্ষমো ক্ষমো এ অবোধ পুত্রেরে। তব মহিমা না জানি, যে অপরাধ ঘটায়েছে, আমি ক্ষমা মাগি। ক্ষমা করো নাথ, করো দয়া অভাগা বিধবারে।

বুদ্ধ হাসিয়া কহে, বৃথা পাও ভয়, যাও লইয়া পুত্র তব, মম আশীর্বাদ জেনো গো নিশ্চয়।

বহু বৎসর গেল। মৃত্যু শয্যায় সে মাতা। শিয়রে বসিয়া পুত্র, কাতর হইয়া কহে, মাতা, কি তব শেষ আজ্ঞা?

ক্লেশবহ শ্বাস টানি, ক্ষীণ কণ্ঠে কহে মাতা, এক সাধ মনে, শিশুকালে যেমতি মস্তক রাখি ঘুমায়েছিলি বুদ্ধক্রোড়ে, প্রাণবায়ু রাখি সেই যোগে।

চমকি পুত্র কহে, তথাগত সম্বরি মানবলীলা, ত্যাজিয়াছে ভবে। কিমতে আনিব তারে? মাগো, অন্য কিছু কহো, এ দীন পুত্র দ্বারা যাহা সম্ভবে।

হেনকালে দ্বারে আসি দাঁড়ালো বৌদ্ধভিক্ষু ভিক্ষা লভিবারে।

পুত্র কহে, ওহে ভিক্ষু, দয়া করি আসিও অন্য সময়ে, মাতা মোর অন্তিম শয়নে, অধিক সময় নাহি, পরম ক্ষণ আসিছে ঘনায়ে।

ভিক্ষু কহে, ভিক্ষা এই, মাতারে লইতে আসিয়াছি, প্রভু আজ্ঞা দিয়াছে ধ্যানের গভীরে। যদি আজ্ঞা দাও, আপন ক্রোড়ে রাখি ওর মাথা, স্মরণ করি প্রভুর করুণ চরণেরে।

উঠিল স্তবগান দরিদ্র কুটিরে। পুত্র জুড়ি দুই কর, মাটিতে মস্তক রাখি, কহিল, ওগো প্রভু, এ দীনদরিদ্রেরে রাখিয়াছো মনে, যেমতি রবিরশ্মি স্পর্শে দীনহীন তৃণেরে, না করে অবজ্ঞা। ওগো প্রভু, করো দয়া এই, তব দয়া হতে যেন বঞ্চিত না হই।

Saturday, January 7, 2023

শান্তিসৌধ

সংসারে শান্তি রাখতে চেয়েছিল মানুষটা। আজীবন।

"ছেলেটার মাথা গরম আমার, তুমি শান্তি রেখো", শাশুড়ি হাত ধরে শুধু এই কথাটাই বলেছিলেন।

মানুষটা তাই একটা বাড়তি কথা বলেনি কোনোদিন। একটাও প্রতিবাদ করেনি, হাজার ন্যায্য হলেও। একটা বাড়তি চাল গেলেনি। টুঁ শব্দটা করেনি আজীবন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে। বেমানান বলতে ছিল, মাড় দেওয়া শাড়ি শুধু। ভীষণ অবাধ্য।

এখনও বেঁচে আছে মানুষটা। লাইফ সার্টিফিকেট জানে।

শান্ত। পাথুরে শীতল।

শান্তিসৌধের মত।

 

Wednesday, January 4, 2023

এক্কাদোক্কা

অনেকটা রাস্তা ভিড়ে একা একা হেঁটে ফেললাম। শীতের আমেজ।

"দাদা টয়লেটটা কোথায় বলবেন?"

কাঁচরাপাড়া। ব্যস্ত শহর। ব্যস্ত বাজার। ব্যস্ত ছন্দে প্রাণোচ্ছল আনন্দ লহরী।

গলির ভিতর জন্মে আছে আরেক গলি। বাঁকের পর বাঁক। অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ। পাবলিক টয়লেট।

কালো চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে আদ্যোপান্ত ঢেকে বসে একজন। সামনে বোঁচকাবুচকি ঘেরা একহাতি সংসার।

মাথার উপর লোহার বড় বড় রডের ফাঁদে আটকে আসন্ন পূর্ণিমার চাঁদ। রডগুলো ধরে দাঁড়িয়ে আছে বিজ্ঞাপন। সারা গা গয়না গায়ে আধশোয়া এক রমণী। অর্ধনগ্ন। ন্যায্য দাম ছাড়া যারা সোনা বিক্রি করে না। তারাই সাজিয়ে দেবে মনের মতন। দুধেল সাদা আলোর বন্যায় ভাসা প্রতিশ্রুতি।

এক কাপ কফি। ধোঁয়া উঠছে। হাতের চেটো পয়সা দিয়ে কেনা তাপে সেঁকে নিতে নিতে দেখছি গ্যাস বেলুনের সুতো চেপে ধরা বাচ্চার উদ্বিগ্ন খুশীর মুখ। তার আরেক হাতে ভিজে চকোলেট। সুখ চিনছে।

ফেরার পথ। দেখছি সবার হাতে একটা করে গ্যাসবেলুন। যে সুখে উদ্বিগ্নতা নেই, সে সুখ কি আদৌ সুখ! আঙুলে প্যাঁচনো সুতো বলল, না। অহংকারে।

আকাশ ছুঁয়ে থাকা চাঁদ, কম্বলে মোড়া ঝাঁঝালো গন্ধে বাঁচা মানুষ এক্কাদোক্কা খেলছে। উদাসীন। খেয়াল করছে না কাউকে। অপেক্ষা করছে বাজার বন্ধ হওয়ার। আলো নিভে যাওয়ার। সারাটা বাজার যখন তাদের। খেলবে উদোম। এক্কদোক্কা। লুকোচুরি। কিম্বা ছোঁয়াছুঁয়ি।

কেউ জানবে না। হয় তো বা।

 

Tuesday, December 27, 2022

এমন একা অহংকারী

সাইকেলটা একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে, সে মাঠের মাঝখানে বসে আছে। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। পরে আছে গেরুয়া মোটা গেঞ্জি, আর ঢোলা একটা প্যান্ট। দুটোই ময়লা।

তখন অফিস টাইম। সবাই নাকেমুখে গুঁজে দৌড়াচ্ছে মাঠের সামনের রাস্তা দিয়ে। তার দিকে তাকাবার সময় নেই কারোর। কিম্বা তাকালেও চোখে পড়ছে না।

সে বসে সবার দিকে তাকিয়ে। উদাসীন। এমন রাজার মত তার হাবভাব, যেন গোটা আকাশ, গোটা মাঠটা, সারা শীতের সকালটা সে কিনে নিয়েছে একাই। সবাই অধীন তার মালিকানায়। অথচ তার কারোর উপর যেন কোনো দাবী নেই। ঈশ্বরের মত।

এমন একা অহংকারী মানুষ আমি অনেকদিন পর দেখলাম।

Thursday, December 22, 2022

ভুলে গেল

মানুষটা ধীরে ধীরে ভুলে গেল, দস্তুরমত ভুলে গেল,

তার সামনে এমন মিষ্টিগন্ধ ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আসত না, এমন রংবেরঙের গরম জামা থাকত না, এমন সুইচ টিপে ঘর ঠাণ্ডা-গরম করার মেশিন ছিল না, এমন জল গরমের যন্ত্র ছিল না, এমন হাত-পা ছড়িয়ে বসার অবকাশ ছিল না....

তার মনে হত এগুলো তো আজীবন ছিল....

ক্রমশ সে অভ্যস্ত হয়ে গেল। তার সুখ কমে আসতে আসতে আবার সুখের তেষ্টা বাড়তে লাগল। তার চারদিকে বাজারে লেগেছে নতুন বসন্ত। অথচ তার চারদিকে কই সে নতুন বসন্তের সাজ? সে সুখী হতে হতে, অভ্যস্ত হতে হতে, ক্ষুব্ধ হতে শুরু করল। নিজেকে আবার মনে হল - বঞ্চিত। বঞ্চিত যেন সে আজীবন।

তাকে ডাকছে নতুন বসন্ত। বাজারে এসেছে তারই জন্য। এ সবই তার জন্যেই সৃষ্টি। পৃথিবীর সব সুখ শুধু তারই জন্য তো সৃষ্টি। সে ক্ষুব্ধ হতে হতে বাজারে এসে দাঁড়াচ্ছে বারবার.... সেই অজানা উদ্বেগ!

======

মানুষটা ধীরে ধীরে ভুলে গেল, দস্তুরমত ভুলে গেল,

একদিন সে ভীষণ কেঁদেছিল। একদিন তার গোটা জগত শূন্যবোধ হয়েছিল। একদিন পায়ের তলায় মাটি হারিয়ে গিয়েছিল। একদিন বেঁচে থাকার কম্পাস খাট আর দেওয়ালের মাঝে সুক্ষ্ম ফাঁকে গড়িয়ে পড়ে হারিয়ে যেতে বসেছিল।

তার মনে হতে শুরু করল কোনো বড় দুঃখ পায়নি সে আজীবন। আসল বড় দুঃখটা এখনও আসেনি। সামনে কোথাও, লুকিয়ে আছে তার অপেক্ষায়। তাকেই মারবে ছোবল। সে-ই সব চাইতে বড় অভাগা এ সংসারে।

সারাদিন সে অজানা আশঙ্কায় কাটায়। কারোর বাড়ি অঘটন শুনলে ভাবে, আসলে তাকে মারতেই এসেছিল, একটুর জন্য বেঁচে গেল যেন সে নিজে। রাতে ঘুম থেকে উঠে দেওয়াল, জানলা, দরজা, ছাদ পরীক্ষা করে দেখে, সেই আসল বড় দুঃখটা কোথায় ওত পেতে বসে তার অপেক্ষায়। সারাদিন তার সতর্ক নজর। প্রতিটা কলিংবেলের শব্দে, অচেনা পায়ের শব্দে বুক কেঁপে ওঠে। সেকি আসছে? এসে গেছে?

প্রতিটা ক্ষণ কাটে তার উদ্বেগে। অজানা উদ্বেগে। সব আঁকড়ে রাখে। যেন কোনোদিন কিছু হারায়নি সে জীবনে।

Tuesday, November 1, 2022

হারিয়ে

মানুষটা হাতের উপর রাখল জিভ, কান, চোখ, হৃদয় সাজিয়ে। বলল, নাও। আজ থেকে আমি তোমার।

=========

সব ধোপাঘরে পাঠিয়ে দাও। কিছু ফিরে আসুক শুদ্ধ হয়ে। বাকি যা কিছু সব যাক হারিয়ে।

 =========

কারণ মানুষটা একই রাস্তায় গেল দু'বার হারিয়ে, একই ভুল মানুষকে দু'বার ভালোবেসে।

ভুল মানুষকে ভালোবাসাটা ভুল। এই ভুলটা বুঝতে, নিজেকে নির্ভুল প্রমাণ দিতে সে ঠিক মানুষকে ভালোবাসল।

ঠিক মানুষ তার সবকিছু ঠিক করে দিল। সে ভুলেই গেল তার ভুল করারও অধিকার ছিল।

Monday, October 10, 2022

বাবা ম্যাজিক জানতেন

বাবা ম্যাজিক জানতেন। নইলে এত কিছুর পরেও মা সারাজীবন জলের গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন, খাবার বেড়ে দিলেন! যেখানে অনায়াসেই মেশানো যেত বিষ!

দেননি। কারণ, বাবা ম্যাজিক জানতেন।

এই যে বললাম, 'এত কিছুর পরেও', এর মানে কি? মারধোর? সিগারেটের ছ্যাঁকা? খেতে না দেওয়া? ম্যারিটাল রেপ?

শেষেরটা জানি না। তবে আগেরগুলো কোনটাই নয়। ওসব লাগেনি, কারণ, বাবা ম্যাজিক জানতেন। কখন, কিভাবে, কোথায়, কোন কথায় আত্মসম্মান ঝুরঝুরে করে দেওয়া যায়, বাবা জানতেন। মা মিশতেন মাটিতে। সঙ্গে আমরাও। দুই বোন।

কারণ, বাবা ম্যাজিক জানতেন। মা আজীবন সিঁদুর পরে গেলেন, জানতেন যদিও সিঁদুরে নাকি থাকে বিষ। পেটে গেলে মৃত্যুও তো হতে পারে! সেই বিষ সিঁথিতে রাখলেন, কপালে রাখলেন, শাঁখায় রাখলেন --- আজীবন... মৃত্যুর মত নিশ্চিত। কি করে পারলেন?

কারণ, বাবা ম্যাজিক জানতেন।

আমার ছোটবোন ক্লাস টেনে থাকতেই একটা ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেল। যোগ্য ছিল না ছেলেটা, তবু, বিয়ে করল। যখন ভুল ভাঙল, ফিরতে চাইল। বাবা তাকে বললেন, খবরদার না! কি ম্যাজিকে তার সব ফিরে আসার ইচ্ছাটুকু হাপিশ করলেন! এমনকি যখন সে গলায় দড়ি দিল তিন বছরের বাচ্চাটাকে রেখে, বাবা ম্যাজিক করলেন। আমরা কেউ শ্মশানে গেলাম না, মুখাগ্নি করলাম না। সবাই জড়োসড়ো হয়ে বাবার মন্ত্রবাঁধনে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম। কারণ, বাবা ম্যাজিক জানতেন।

আমি ভালোবেসেছিলাম কাউকে যেন। বাবার ম্যাজিকে সে ভালোবাসা বুকের কৌটো থেকে পায়রা হয়ে উড়ে গেল। নীল আকাশে এমন মিলিয়ে গেল, আমি আকাশ ভুললাম, পায়রার পালকের ছোঁয়া ভুললাম, আমাকে ভুললাম। আমার বিয়ে হল তেপান্তরের মাঠে।

বাবা ম্যাজিক করলেন। ঘর করলাম পঞ্চাশটা বছর। এখন আমার পশ্চিমের ঘরে সংসার। আমার সংসারে আমাকেই কেউ ভরসা করেনি কোনদিন। আমিও করলাম না নিজেকে। ম্যাজিকে এমন অভ্যস্ত ছিলাম, নিজের হাত-পা-চিন্তা-সুখ-ইচ্ছাকে মনে হত, এরা কারা? কেন আমার সঙ্গে ফেরে? বাবা জানে? বাবা তো নেই। কাকে জিজ্ঞাসা করি? বাবা কাউকে শিখিয়েছে ম্যাজিকগুলো? কাউকে না! যদি শিখতাম!

কিন্তু তবুও, ম্যাজিকে আমার ঘৃণা। এমন করে একান্তভাবে চাইলেও করি তুমুল ঘৃণা। ঝুরঝুরে আত্মসম্মান বয়ে যাচ্ছিল আমাদের তিনজনের রক্তে। মা নেই। বোন নেই। বাবা নেই। ম্যাজিক নেই। ঝুরঝুরে আত্মসম্মান দানা বাঁধে ভালোবাসায় - কে যেন লিখেছিল। ভালোবাসা কি নারকেলের নাড়ু? পাকিয়ে পাকিয়ে কৌটো ভরি? ভালোবাসাও নেই।

কারণ আমরা তিনজনই নিজেদের ভালোবাসিনি কোনোদিন। পৃথক স্বাধীন অস্তিত্বে দেখেছি লজ্জা!

বাবা সত্যিই ম্যাজিক জানতেন।

Tuesday, September 20, 2022

তেঁতুলগোলা জল

মোড়েই বসতো সে। বসতো কোথায়? দাঁড়িয়ে থাকতো। সেই উনিশ বছর থেকে। বাপ মরে গেল টাইফয়েডে। সেই থেকে! এখন তার তিরিশ ছুঁইছুঁই।

আর সে থাকতো মোড়ের তিনটে বাড়ি পর। ওই যে গোলাপি বাড়ি। বাবা তার হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। সকাল বিকেল লাইন লাগে রুগীর। সে পড়তে যেত একা। আগে করতো বিনুনি। তারপর চুল ছাড়া। ঘাড় অবধি। চোখে চশমা।

একদিনও সে দোকানে আসেনি। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ বসন্ত। একদিনও সে এদিকে আসেনি। এত উপেক্ষা!

অভিমান হত তার! মনের ভিতর তেঁতুল গোলা জল। টুপ্ টুপ্ করে ভিজিয়ে যেত মন। আবার শুকিয়ে যেত। সামনে দিয়ে যেত যখন। টুকরো হাসি, কি গায়ের সুবাস!

একদিন মেয়েটার বিয়ে ঠিক হল। বাবা এসে বলল, "তুমি ফুচকার স্টল দিও কেমন! টাকা নিয়ে ভেবো না। দেখো, নিন্দা যেন না হয়!"

ছেলেটার গলায় আটকালো দমকা হাওয়া কান্না। গেল না সে। ভাইকে পাঠালো। দু'দিন বেরোলই না ঘর ছেড়ে।

বছর ঘুরল কয়েক। ছেলেটার মাঝে মাঝেই আসে ঘুষঘুষে জ্বর। ক্লান্ত লাগে। মাথা ঘোরে। হাস্পাতালে গেল। ডাক্তার বলল, মারণ রোগ। সারবে না তো!

ছেলেটার সব বদলে গেল। দোকানে বসে। ক্লান্ত শরীরে ফুচকা বেচে। অকারণে কথা বলে সবার সঙ্গে যেচে যেচে। শুধু মেয়েটার কথা ভাবলে, চোখ ভরে আসে জল। কি হত, না হয় একটা ফুচকে খেল!

ছেলেটা দোকানে আসে না আর। শরীর দেয় না। ঘরের ভেতর ভাঙা স্বপ্নের নুড়ি। তাই দিয়ে ঘর ভাঙে, আবার গড়ে। একদিন ভাই বলল, শুনেছ দাদা! কি সাংঘাতিক খবর! ওই যে মেয়েটা, ডাক্তার যার বাবা, সে অকালে গেল গো করোনার ভীষণ ছোবল লেগে! একটা বাচ্চা ছেলে ছোটো… দুই কি তিন বছর হবে! কি যে হবে!

ছেলেটা শুনলো। চুপ করে। বলল না কিছু। বলার নেই তো কিছু। অনেক বলার ছিল। সব হারিয়ে গিয়ে ওপারে আছে জমে। অনেক কথা বলার আছে তাকে!

ঘর অন্ধকার। মধ্যরাত। তার প্রাণের মধ্যে ভীষণ তাড়া। তার সময় হবে কবে! উঠল বিছানা ছেড়ে! ভাইয়ের ঘরে গিয়ে ডাকল, ভাই ভাই….

ভাই চমকে এসে বাইরে দাঁড়ালো। দাদার কি সময় এলো তবে!

দাদা বলল, ছেলেটার বাড়ি জানিস? এক প্যাকেট শুকনো ফুচকা আসিস দিয়ে আমি চলে গেলে পরে। আর শোন…

ভাই তাকিয়ে, বিভ্রান্ত চোখ… মাথাটা কি খারাপ হল তবে!

ভাই, আমায় ডাক্তার ক'দিন যেন সময় দিয়েছে বলে!

Monday, September 19, 2022

পড়োনি বুঝি!

অন্ধকারে আলো জ্বালতে সাহস লাগে। অন্ধকারে আলো জ্বালা তো শুধু নয়, আছে আলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায়!

তাই, আলোর মধ্যে আলো জ্বেলে আছি বসে। নিভে যায় যদি, কেউ জানবে না। নিন্দে হবে না। বিদ্রুপ নেই, রূঢ়কথাও কেউ বলবে না।

কিন্তু অন্ধকারে নিভে যায় যদি আলো! কি গভীর হবে অন্ধকার আরো! কি ব্যঙ্গ, কি বিদ্রুপ, কি নিন্দা, কি তামাশা! থাক থাক, এত বড় দায় কে নেবে ভাই!

  এমন সময় উঠল ঝড়। সব আলো গেল নিভে। আলোর মধ্যে জ্বালবো যে, সে আলোই বা কোথায়!

  দেখলাম এক আকাশ তারা নিয়ে রাত্রি চলেছে ধীর পায়ে। বললাম, ভয় করে না! নেই সংশয়? এত আত্মবিশ্বাস!

  রাত্রি বলল, অন্ধকারকে জেনেছি যে আলোয়, সে আলোকে জ্বেলেছি প্রাণের প্রদীপে। সে আলোকে ছুঁইয়ে নেব ভোরে! সংশয় নেই। অন্ধকার চুঁইয়ে নামছে গভীর আশা। তারার ভাষা! পড়োনি বুঝি!

Tuesday, June 21, 2022

মাটি আকাশ আর ঘুড়ি


নিজেকে লাটাইয়ের সুতোর মত ছেড়ে দিতে দিতে মানুষটা থমকে দাঁড়ালো। নিজের যেদিকটা অসীমকে ছুঁয়ে আছে, তাকে আর স্পষ্ট নীচ থেকে দেখা যায় না। আর যেদিকটা মাটিতে আটকে আছে সেখানে সুতো নেই পর্যাপ্ত। আর দুইপাক ঘুরলেই সুতো শেষ। শূন্য লাটাই পড়ে থাকবে মাটিতে। এখন কি করবে সে?

হঠাৎ ঝড় উঠল। আকাশ ঘিরে এলো দস্যুর মত কালো মেঘ। এক ধাক্কায় আকাশ থেকে ছিঁড়ে পড়ল তার অসীম ছোঁয়া আমি মাটিতে। আকাশে ওড়া সুতোতে লাগল কাদা। তার অসীম ছোঁয়া আমিকে স্নান করিয়ে গেল আকাশ ধোয়া বৃষ্টির জল। এবার?

মেঘ কেটে গেল। রাত গভীর। লাটাই, সুতো আর সে মাটিতে শুয়ে। আকাশ জুড়ে তারা তারা আর তারা। ঝোপের মধ্যে জোনাকির ভিড়। সে কি হারিয়ে গেল? সবটুকু ইচ্ছা কি তার শেষ হয়ে গেল? সেকি ব্যর্থ হল অবশেষে?

ভোর হল। সূর্যের আলো এসে পড়ল মাঠে। মাঠে জমা জলের মধ্যে চিকচিক করে উঠল আলো। হঠাৎ কি একটা এসে পড়ল তার গায়ে।

ফুল একটা। বৃষ্টিতে ভেজা পাপড়ি। সে বলল, তুমিও ছিঁড়ে পড়লে?

ফুল বলল, আমার কাজ হল শেষ। এবার মাটিতে মেশার পালা।

লোকটার ক্ষুব্ধ আমি বলল, কিন্তু আমার যে অসীমলোকে যাওয়ার কথা ছিল!

ফুল হাসল। বলল, অসীম মানে বুঝি আকাশ শুধু। মাটির মধ্যে যে অসীমতা তাকে জানো না বুঝি!

অভিমানী আমি বলল, তার সীমা আছে।

ফুল বলল, সে তো দেখার। অনুভবের তো না?

বিস্মিত আমি বলল, অনুভবের অসীমতা কি?

ফুল বলল, মাটি লাগা পা, মানে ভালোবাসা। অসীমকে যদি সীমার মধ্যে না পেলে তবে সে নিজেকে শুধু ভোলাবার লোভ। সীমার মধ্যে যেদিন পাবে, সেদিন তাকে বলবে, প্রেম। সেদিন হবে সার্থক।

 

(ছবি Debasish Bose)

Saturday, May 21, 2022

কে যেন বলল



আমি সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ালাম

এক আঁজলা জল তুলে বললাম, এই আমার সমুদ্র

মিথ্যা সুখী হল

কে যেন বলল, ভুল

আমি এক মুঠো মাটি তুলে নিলাম

বললাম, এই আমার পৃথিবী

মিথ্যা পুলকিত হল

কে যেন বলল, তা হয় না

আমি এক পেটিকা সুখ-দুঃখ-কান্না-হাসি জড়ো করলাম

বললাম, এই তো আমার জীবন

মিথ্যা গর্বিত হল

কে যেন বলল, ব্যস? এর বাইরে নেই কিছু?



(জে কৃষ্ণমূর্তির ছবি, যে মানুষটা একা হাঁটতে চেয়েছিলেন, সবাইকে নিয়ে, আলাদা আলাদা।)